“ফিস্ক একবার তার রাজার চাল দিলে সে আর কুইজলিং করতে পারবে না,” লিলি আপন মনে বলে গেলো কথাটা। “বোর্ডের মাঝখানে ঝুঁকির মধ্যে চলে আসবে রাজা আর বাকি খেলায় সেটা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকবে। তারচেয়ে ভালো সে যদি কুইন আর রুককে বিসর্জন দেয়।”
কিন্তু রাজা দিয়ে ঘোড়াকে খেয়ে ফেললো ফিস্ক। সোলারিন তার কুইনকে বের করে চেক দিলে ফিস্ক তার রাজাকে কয়েকটা সৈন্যের পেছনে নিয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কুইন দিয়ে কালো নাইটকে হুমকি দিলো সোলারিন। এরপর তারা কি চাল দেবে বুঝতে পারছি না আমি। লিলির অবস্থাও আমার মতোই।
“এখানে অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে,” আমার কানে কানে বললো সে। “এটা তো ফিস্কের খেলার স্টাইল নয়।”
আসলেই অদ্ভুত কিছু ঘটছে। ফিস্ককে দেখলাম, সে চাল দেবার পরও দাবাবোর্ড থেকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। তার নার্ভাসনেস যে বেড়ে গেছে সেটা বোঝাই যাচ্ছে। তার কপালে ঘাম দেখতে পাচ্ছি। তাকে অসুস্থ দেখাচ্ছে, যদিও এখন চাল দেবার কথা সোলারিনের। ফিস্ক বোর্ডের দিকে চেয়ে আছে।
সোলারিনের ঘড়িটা এখন চলছে, তবে সেও ফিস্ককে লক্ষ্য করেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে খেলছে, প্রতিপক্ষের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে। অনেকক্ষণ পর সোলারিনের দিকে তাকালো ফিস্ক। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিলো তার দৃষ্টি। আবারো মনোনিবেশ করলো দাবাবোর্ডের উপর। চোখ কুচকে ফেললো সোলারিন। একটা খুঁটি সামনে বাড়িয়ে দিলো সে।
আমি আর চালগুলোর দিকে মনোযোগ রাখতে পারলাম না। আমার দৃষ্টি দু’জন মানুষের দিকে। তাদের মধ্যে কী ঘটছে সেটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার পাশে বসা লিলি কোলের উপর রাখা ছোট্ট দাবাবোর্ডের দিকে হা করে তাকিয়ে কী যেনো ভাবছে। হঠাৎ সোলারিন উঠে দাঁড়ালে শুরু হয়ে গেলো লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন। টেবিলে রাখা দুটো ঘড়ির বোম টিপে বন্ধ করে দিলো সে, তারপর ঝুঁকে ফিস্ককে কী যেনো বললো। একজন আরবিটার। দৌড়ে এলো তাদের টেবিলের কাছে। সোলারিনের সাথে তার কিছু কথা হবার পর লোকটা মাথা ঝাঁকালো। ফিস্ক হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। তার চোখ দাবাবোর্ডের দিকে। তাকে কিছু একটা বললো সোলারিন। আরবিটার লোকটা ফিরে গেলো জাজ টেবিলের দিকে। সব জাজ মাথা নেড়ে সায় দেবার পর। সেন্টার জাজ উঠে দাঁড়ালো।
লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলমেন,” বললো সে। “গ্র্যান্ডমাস্টার ফিস্ক অসুস্থ বোধ করছেন। দয়াপরবশ হয়ে গ্র্যান্ডমাস্টার সোলারিন ঘড়ি বন্ধ করে দিয়ে ছোট্ট একটা বিরতি দেবার জন্য রাজি হয়েছেন, যাতে করে মি: ফিস্ক একটু বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ বোধ করতে পারেন। মি: ফিস্ক আপনি আপনার পরবর্তী চাল সিল করে আরবিটারদের কাছে দিয়ে দিন। ত্রিশ মিনিট পর আমরা খেলা শুরু করবো আবার।”
কাঁপা কাঁপা হাতে ফিস্ক তার চালটা লিখে একটা এনভেলপে ভরে সিল মেরে আরবিটারের কাছে দিয়ে দিলো। রিপোর্টাররা তাকে ঘেঁকে ধরার আগেই বড় বড় পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে হলের দিকে চলে গেলো সোলারিন। পুরো কক্ষে ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে লোকজন ফিসফাস করতে লাগলো। লিলির। দিকে ফিরলাম আমি।
“ঘটনা কি? কি হয়েছে?”
“এটা তো অবিশ্বাস্য,” বললো সে। “সোলারিন ঘড়িগুলো বন্ধ করতে পারে না। এটা করতে পারে শুধুমাত্র আরবিটাররা। এটা তো নিয়মবিরুদ্ধ কাজ হয়ে গেছে। তাদের উচিত ছিলো আরবিটারদের ডাকা, দু’পক্ষ রাজি থাকলে বিরতি নেয়া যায়। কিন্তু সেটা করা যেতো শুধুমাত্র ফিস্ক তার পরবর্তী চালটা সিল করার পরই।”
“সোলারিন ফিস্ককে কিছুটা সময় দিয়ে দিয়েছে,” বললাম আমি। “কিন্তু সে কেন এটা করলো?”
আমার দিকে তাকালো লিলি। তার চোখ দুটো একদম ফাঁকা। সে নিজেও দারুণ বিস্মিত। “সে জেনে গেছে এটা ফিস্কের খেলার স্টাইল নয়,” বললো আমায়। একটু ভেবে নিলো খেলাটার বিভিন্ন চাল স্মরণ করে। “সোলারিন ফিস্ককে কুইনদের এক্সচেঞ্জ অফার করেছিলো। খেলার যে অবস্থায় সে ছিলো তাতে এটা করার দরকার ছিলো না তার। সবাই জানে ফিস্ক তার কুইন হারানোটা দারুণ অপছন্দ করে।”
“তাহলে ফিস্ক অফারটা মেনে নিয়েছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“না,” উদাস হয়েই বললো লিলি। “গ্রহণ করে নি। সে তার কুইন সরিয়ে ফেলেছে। সে বোঝাতে চেয়েছে এটা J’adoube।”
“ J’adoube মানে কি?”
“‘আমি স্পর্শ করি, আমি ঠিক করি।’ খেলার মাঝখানে কোনো ঘুঁটি এডজাস্ট করে নেয়াটা একদমই বৈধ।”
“তাহলে সমস্যাটা কি?” আমি বললাম।
“কোনো সমস্যা নেই,” বললো লিলি। “তবে খুঁটি স্পর্শ করার আগে তোমাকে অবশ্যই বলতে হবে Jadoube। চাল দেবার পরে বলা যাবে না।”
“হয়তো সে বুঝতে পারে নি…”
“ও একজন গ্র্যান্ডমাস্টার, লিলি বললো। আমার দিকে তাকিয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। “ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে।”
কোলের উপর দাবাবোর্ডের দিকে চেয়ে রইলো লিলি। আমি তাকে বিরক্ত করতে চাচ্ছি না কিন্তু সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে একে একে। আমরাই কেবল বসে আছি। আমি আমার সীমিত দাবাজ্ঞান ব্যবহার করে বোঝার চেষ্টা করছি এসবের মানে কি।
“তুমি কি জানতে চাও আমি কি ভাবছি?” অবশেষে বললো লিলি। “আমার মনে হচ্ছে গ্র্যান্ডমাস্টার ফিস্ক প্রতারণা করছে। আমার ধারণা তার শরীরের সাথে কোনো ট্রান্সমিটার লাগানো আছে।”
