“বানচোত, লিলি ঘোঘোৎ করে বললো। “সে ফিস্কের আত্মবিশ্বাস জয় করতে চাচ্ছে, খেলা শুরু হবার আগেই এগিয়ে থাকতে চাইছে।”
“তোমার কি মনে হয় না তুমি একটু বেশি বলছো?” জোরেই বললাম কথাটা। পেছনের সারি থেকে কয়েকজন আমাদেরকে চুপ থাকতে বললো এ সময়।
একটা ছেলে খুঁটির বাক্স নিয়ে এসে বোর্ডে সাজাতে শুরু করলো। সাদা খুঁটি নিলো সোলারিন, কালোগুলো ফিস্ক। লিলি আমাকে জানালো এই খুঁটি নির্বাচনের যে ড্র সেটা আগেই হয়ে গেছে। আরো কয়েকজন চুপ থাকতে বললে আমরা আর কথা বললাম না।
আরবিটারদের একজন নিয়মকানুন পড়ে শোনানোর সময় সোলারিন দর্শকদের দিকে তাকালো। তার পুরো প্রোফাইলটা আমার সামনে, এখন তাকে ভালো করে দেখে নেবার সুযোগ আছে। আগের চেয়ে আরো বেশি রিল্যাক্স আর নিভার মনে হচ্ছে তাকে। খেলার শুরুর আগে তার বয়সটাও যেনো আরো কমে গেছে। কিন্তু লিলির পাশে আমাকে বসে থাকতে দেখেই তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সে।
“উঁহু,” বললো লিলি। “এখন বুঝতে পারছি তার দৃষ্টিকে তুমি কঠিন-শীতল বলেছিলে কেন। দাবা খেলার আগে তার এই চাহনি দেখতে পেয়ে আমি বরং খুশি।”
সোলারিন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না আমি এখনও বসে আছি। যেনো এক্ষুণি আমাকে ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দিতে চাইছে এমনই তার চাহনি। হঠাৎ করে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, মনে হতে লাগলো এখানে থেকে গিয়ে বোধহয় বিশাল কোনো ভুলই করে ফেলেছি। খুঁটি সাজানোর পর খেলা শুরু হয়ে গেলে তার চোখ আমার উপর থেকে দাবাবোর্ডের। উপর নিবদ্ধ হলো। প্রথমেই কিংস পন অর্থাৎ রাজার চতুর্থ সৈন্যটির সামনে বাড়ালো সে। খেয়াল করলাম লিলিও তার কোলে থাকা ছোট্ট দাবাবোর্ডে একই। কাজ করলো। বিশাল একটা বোর্ডে অল্পবয়সী এক ছেলে লিখে দিলো খেলার চাল : P-K4
কিছুক্ষণ ধরে, কোনো রকম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছাড়াই খেলাটা এগিয়ে চললো। সোলারিন আর ফিরে একটা করে সৈন্য আর ঘোড়া মারা পড়েছে। সোলারিন তার বিশপ সামনে বাড়ালে দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ গুঞ্জন করতে শুরু করলো। দুয়েকজন উঠে বাইরে চলে গেলো কফি পান করার জন্য।
“মনে হচ্ছে গুইয়োকো পিয়ানো।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো লিলি। “এই খেলাটা খুব দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। এরকম রক্ষণাত্মক কৌশল কোনো টুনামেন্টে ব্যবহার করা হয় না। এটা পাহাড়ের মতোই প্রাচীন একটি কৌশল। হায় ঈশ্বর, গটিনজেন ম্যানুস্ক্রিপ্টেও এটার উল্লেখ আছে।” দাবা খেলা সম্পর্কে যে কিছুই জানে না তার কাছে লিলির এসব কথাবার্তা খুবই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে।
“এটা কালো ঘুটিগুলোকে গুছিয়ে উঠতে সাহায্য করবে, তবে খুবই ধীরগতির, একদম ধীরগতির। সোলারিন এটা ফিস্কের জন্য সহজ করে দিচ্ছে। পরাজিত করার আগে তাকে কয়েকটা চাল দেবার সুযোগ করে দেয়া আর কি। পরবর্তী এক ঘণ্টায় কিছু ঘটলে আমাকে ডেকে দিও।”
“আরে আমি কি করে জানবো কিছু ঘটছে কিনা?” নীচুস্বরে বললাম তাকে।
ঠিক তখনই ফিস্ক একটা চাল দিয়েই ঘড়িটা বন্ধ করে দিলো। ফিসফাস শুরু হয়ে গেলো উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে। যারা চলে যেতে উদ্যত হয়েছিলো তারাও ফিরে এলো নিজেদের সিটে। আমি দেখতে পেলাম সোলারিন হাসছে। তার হাসিটা খুবই অদ্ভুত।
“হয়েছেটা কি?” লিলির কাছে জানতে চাইলাম।
“আমি যতোটা ভেবেছিলাম ফিস্ক তারচেয়েও বেশি দুঃসাহসী। বিশপের চাল না দিয়ে সে দুই ঘোড়ার প্রতিরক্ষা নিয়েছে। রাশিয়ান খেলোয়াড় এটা দারুণ পছন্দ করেছে। এটা আরো বেশি বিপজ্জনক। আমি খুব অবাক হয়েছি সে এই চালটা সোলারিনের বিপক্ষে ব্যবহার করেছে, যে কিনা…” নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। হাজার হোক লিলি অন্য খেলোয়াড়দের স্টাইল নিয়ে খুব একটা রিসার্চ করে নি।
সোলারিন এবার তার ঘোড়ার চাল দিলো, আর ফিস্ক দিলো সৈন্যের। সোলারিন সেই সৈন্যটাকে খেয়ে ফেললো। এরপরই সোলারিনের একটা ঘোড়া খেয়ে ফেললো ফিস্ক। সুতরাং আবারও সমান হয়ে গেলো তারা। ভাবলাম আমি। আমার কাছে মনে হচ্ছে ফিস্কের অবস্থা ভালোর দিকে, কারণ তার খুঁটিগুলো বোর্ডের মাঝখানে চলে এসেছে, সেই তুলনায় সোলারিনেরগুলো অনেকটাই পেছনে রয়েছে। কিন্তু সোলারিন তার ঘোড়া দিয়ে ফিরে একটা কিস্তি খেয়ে ফেললো। ঘরের মধ্যে বেশ গুঞ্জন শুরু হয়ে গেলো এ সময়। কফি পান করতে যারা চলে গিয়েছিলো তারা সবাই ফিরে এলো খেলা দেখার জন্য। বোর্ডে থেলার চাল দেয়া হলো আবার।
“ফিগাতেল্লো!” অনেকটা আর্তনাদ করেই বলে উঠলো লিলি, তবে এবার কেউ তাকে চুপ থাকতে বললো না। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।”
“ফিগাতেল্লো মানে কি?” মনে হচ্ছে ডাটা প্রসেসিং জগতের তুলনায় দাবা খেলায় অনেক বেশি দুর্বোধ্য শব্দ রয়েছে।
“এর মানে ‘যকৃৎ ভাজা।’ ফিস্কের যকৃৎ ভাজা হবে, যদি সে তার রাজা ব্যবহার করে ঘোড়াটা খেয়ে ফেলে।” আঙুল কামড়াতে কামড়াতে সে তার কোলে রাখা ছোট্ট দাবাবোর্ডের দিকে এমনভাবে তাকালো যেনো খেলাটা ওখানেই হচ্ছে। “তাকে কিছু একটা হারাতে হবেই, এটা নিশ্চিত। তার কুইন আর রুক কচু কাটা হবে। সে নাইটের কাছে অন্য যেকোনো খুঁটি দিয়ে যেতে পারবে না।”
সোলারিন এরকম চাল দেবে সেটা আমার কাছে খুবই অযৌক্তিক বলে মনে হলো। বিশপের বদলে সে কি একটি ঘোড়া বলি দিচ্ছে রাজাকে এক ঘর সরানোর জন্য?
