“তাই নাকি?” একটু ধাঁধায় পড়ে গেলো হারমানোল্ড। “তাহলে কে হতে পারে?”
“লম্বা, হালকা-পাতলা, ধবধবে সাদা। আকর্ষণীয় দেখতে কিন্তু শীতল দৃষ্টি…”
“ওহ্, ওটা তাহলে অ্যালেক্সি,” হেসে বললো হারমানোল্ড।
“অ্যালেক্সি?”
“আলেক্সান্ডার সোলারিন,” বললো লিলি। “যাকে দেখার জন্যে তুমি ছটফট করছো, ডার্লিং। ব্লকবাস্টার মাল।”
“তার সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন তো,” বললাম আমি।
“আসলে খুব বেশি বলতে পারবো না,” হারমানোন্ড বললো। “এখানে এসে টুনামেন্টের জন্য রেজিস্টার করার আগে আমিও জানতাম না সে দেখতে কেমন। লোকটা খুব রহস্যময়। লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করে না, ছবি তুলতে দেয় না। গেমরুম থেকে আমাদেরকে সব ক্যামেরা বাইরে রাখতে হয়েছে। আমার চাপাচাপিতে অবশেষে একটা প্রেস ইন্টারভিউ দিতে রাজি হয়েছে সে। তার উপস্থিতিটা যদি সবাইকে না-ই জানাতে পারলাম তাহলে তাকে পেয়ে আমাদের লাভটা কি হবে, বলেন?”
তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো লিলি। “ড্রিঙ্কের জন্য ধন্যবাদ, জন,” ফারকোটটা কাঁধের উপর ফেলে বললো সে।
লিলি উঠে দাঁড়াতেই আমিও উঠে দাঁড়ালাম। উপরের তলায় চলে এলাম আমরা। “আমি হারমানোন্ডের সামনে কথাটা বলতে চাইছিলাম না,” বেলকনির দিকে যাবার সময় নীচুস্বরে বললাম তাকে। কিন্তু এই সোলারিন লোকটা…তার মধ্যে অদ্ভুত একটা জিনিস আছে!”
“আমি এটা সব সময়ই দেখে আসছি,” বললো লিলি। “দাবার ভুবনে হয় কোনো বিরক্তিকর লোক নয়তো বানচোত…এই দুই ধরণের লোকজনকেই দেখবে তুমি। আমি নিশ্চিত এই সোলারিন লোকটাও এর ব্যতিক্রম নয়। এই খেলায় তারা কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারে না।”
“আমি আসলে ঠিক এটা বলছি না,” বাধা দিয়ে বললাম তাকে। “সোলারিন খেলার সময় কোনো মেয়েমানুষ দেখতে পছন্দ করে না সেজন্যে কিন্তু আমাকে চলে যেতে বলে নি। সে বলেছে আমি নাকি মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছি!” তার হাতটা ধরে রেলিংয়ের সামনে দাঁড়ালাম। নীচে দেখতে পেলাম লোকজনের ভীড়টা ক্রমশ বাড়ছে।
“সে তোমাকে কি বলেছে?” বললো লিলি। “ঠাট্টা করছো না তো। বিপদ? দাবা খেলায়? এই খেলায় একমাত্র বিপদটা হলো খেলার মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়া।”
“সে আমাকে বলছে আমি নাকি বিপদের মধ্যে আছি,” আবারো বললাম কথাটা। দেয়ালের কাছে নিয়ে গেলাম তাকে। কণ্ঠটা আরো নীচে নামিয়ে নিলাম। “নিউইয়ার্স ইভের দিন হ্যারির কাছে তুমি যে একজন গণক পাঠিয়েছিলে সেটা কি মনে আছে?”
“ওহ হো,” বললো লিলি। “এটা আবার বোলো না তুমি গুপ্তবিদ্যায় বিশ্বাস করো?” হেসে ফেললো সে।
লোকজন গেমিংরুম আর বেলকনিগুলোতে আসতে শুরু করছে। আমরাও আমাদের সিটে গিয়ে বসে পড়লাম। একেবারে সামনের একটা সারির এক পাশে। এতে করে খেলাটা যেমন ভালোভাবে দেখতে পাবো সেই সাথে একটু আড়ালেও থাকা যাবে। সিটে বসেই আমি নীচুস্বরে বললাম, “ঐ গণক মহিলা যা বলেছিলো সোলারিন ঠিক একই শব্দ ব্যবহার করেছে। গণক আমাকে কি বলেছে। হ্যারি কি তোমাকে সেটা বলে নি?”
“আমি ঐ মহিলাকে কখনও দেখি নি,” পকেট থেকে ছোট্ট একটা দাবাবোর্ড বের করে কোলের উপর রাখলো সে। “আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে তার খোঁজ পেয়েছিলাম। তবে আমি এইসব ফালতু জিনিসে বিশ্বাস করি না। সেজন্যেই
আমি যাই নি।”
লোকজন লিলির দিকে তাকাচ্ছে। একদল রিপোর্টার রুমে ঢুকলো, তাদের সাথে গলায় ক্যামেরা ঝোলানো একজন আছে, লিলিকে দেখতে পেয়েই আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগলো তারা। মাথা নীচু করে দাবাবোর্ডের দিকে মনোযোগ দিলো সে। খুব নীচু কণ্ঠে বললো, “আমরা দাবা নিয়ে সিরিয়াস কথাবার্তা বলছি। সবাই যেনো তাই বোঝে।”
জন হারমানোল্ড রুমে ঢুকেই দ্রুত ছুটে এসে রিপোর্টারদের সামনে দাঁড়ালো। গলায় ক্যামেরা আছে যে লোকটা তার কলার ধরে ফেললো আমাদের কাছে আসার আগেই।
“এক্সকিউজ মি, ক্যামেরাটা আমার কাছে রেখে যেতে হবে,” রিপোর্টারকে বললো। “গ্র্যান্ডমাস্টার সোলারিন কোনো ক্যামেরা দেখতে চান না এই টুর্নামেন্ট হলের ভেতর। দয়া করে নিজেদের আসনে বসুন, খেলা উপভোগ করুন। খেলা শেষ হবার পর একটা ইন্টারভিউয়ের আয়োজন করা হয়েছে।”
নিরস বদনে রিপোর্টার বেচারা তার ক্যামেরাটা হারমানোন্ডের হাতে তুলে দিলো। সে এবং তার সাথে বাকি সবাই নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে বসে পড়লো চুপচাপ।
পুরো ঘরটা নীরব হয়ে গেলো, চলতে লাগলো নীচুস্বরে ফিসফাস। আরবিটার দু’জন নিজেদের টেবিলে গিয়ে বসে পড়লো। তাদের পর পরই একটু আগে দেখা সোলারিন আর বয়স্ক এক লোক ঢুকলো ঘরে। বুঝতে পারলাম এ হচ্ছে ফিস্ক।
ফিস্ককে দেখে নার্ভাস মনে হচ্ছে। তার এক চোখ কিছুটা নির্মিলিপ্ত, ধূসর গোঁফে বার বার হাত বুলাচ্ছে। মাথার চুল পাতলা হয়ে আসছে ক্রমশ। ব্যাব্রাশ করে রাখলেও কিছু চুল কপালের উপর এসে পড়েছে। মেরুন রঙের জ্যাকেট পরেছে সে। জ্যাকেটটা নিশ্চয় তার সোনালি দিনগুলোর সময়ের, ভালোভাবে ব্রাশ করা হয় নি। বিবর্ণ দেখাচ্ছে সেটা।
পরনের ব্যাগি প্যান্টটা দুমড়েমুচড়ে আছে। তাকে দেখে কোনোভাবেই হাল জমানার মনে হচ্ছে না। ভাবভঙ্গিতে একেবারে নৈরাশ্যবাদী বলেও মনে হচ্ছে।
তার পাশে সোলারিনকে দেখে মনে হচ্ছে ডিসকাস থ্রো খেলার একজন অ্যাথলেটের মূর্তি। ফিস্কের চেয়ে তার উচ্চতা কম করে হলেও একফুট বেশি। খেলার টেবিলে একটা চেয়ারের কাছে এসে অন্য একটা চেয়ার টেনে ফিস্ককে বসতে দিলো সে।
