“হাস্যকর কথাবার্তা!” চড়া গলায় বললাম আমি। চট করে পেছন ফিরে শ্রমিকদের দিকে তাকালো সে। “আপনি কি বলতে চাচ্ছেন সেটা পরিস্কার করে না বলা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাচ্ছি না। আপনি কে তাও আমি জানি না। জীবনে আপনাকে দেখি নি। কোন অধিকারে আপনি আমাকে
“তুমি আমাকে দেখেছো,” শান্ত কণ্ঠে বললো সে। আলতো করে আমার কাঁধে হাত রাখলো। “আবারো আমাকে দেখবে। তবে এ মুহূর্তে এক্ষুণি। তোমাকে চলে যেতে হবে।”
কথাটা বলেই যেভাবে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই নীরবে চলে গেলো ঘর থেকে। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে। বুঝতে পারলাম আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। শ্রমিকদের দিকে তাকালাম। আপন মনে কাজ করে যাচ্ছে তারা। মনে হয় না কোনো কিছু শুনতে পেয়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে যাবার জন্যে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম। আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে অদ্ভুত এই মোলাকাতের ঘটনাটি। এরপরই আমার মনে পড়ে গেলো। লোকটা আমাকে গণক মহিলার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
নীচের লাউঞ্জ থেকে লিলি আর হারমানোল্ড আমাকে দেখতে পেয়ে ডাকছে। তারা বসে আছে দাবাবোর্ডের মতো সাদা-কালো চেকচেক মেঝেতে রাখা একটি টেবিলে। তাদেরকে আমার দাবার খুঁটি বলে মনে হলো। তাদের আশেপাশে আরো কিছু গেস্টও আছে।
‘নীচে চলে আসুন,” হাক দিলো হারমানোল্ড। “আমি আপনাদের জন্যে। ড্রিঙ্ক নিয়ে আসছি।”
নীচে চলে এলাম আমি, এখনও পা দুটো দূর্বল বোধ করছি। লিলিকে একান্তে নিয়ে গিয়ে ঘটনাটা বলতে ইচ্ছে করছে।
“আপনি কি নেবেন?” তাদের টেবিলের কাছে আসতেই বললো হারমানোল্ড। আমার জন্য একটা চেয়ার টেনে নিয়ে এলো কাছ থেকে। লিলি তার পাশেই বসে আছে। আমাদের শ্যাম্পেইন পান করা উচিত। লিলি তো আর প্রতিদিন অন্যদের খেলা দেখতে আসে না!”
“এটা সাধারণ কোনো দিন না,” চেয়ারের পেছনে ফারকোটটা রাখতে রাখতে বিড়বিড় করে বললো লিলি। হারমানোল্ড শ্যাম্পেইনের অর্ডার দিলো।
“টুর্নামেন্টটা বেশ ভালো মতোই চলছে। প্রতিদিন আমাদের এখানে হাউজফুল থাকবে। প্রচারণার জন্য অ্যাডভান্স টাকা-পয়সা দেয়া হয়ে গেছে। ব্যাপক প্রচারও পাচ্ছে টুনামেন্টটা। তবে যেসব রথিমহারথিরা আসছে তা আমিও আশা করি নি। প্রথমেই অবসর থেকে ফিরে এলো ফিস্ক, তারপরই ঐ ব্লকবাস্টার সোলারিন এসে হাজির! তোমার কথাও বলতে হয়, লিলির হাটুতে মৃদু চাপড় মারলো সে। আমি উপরের ঐ আগন্তুকের ঘটনাটা বলার জন্য উদগ্রীব থাকলেও বলার সুযোগ পাচ্ছি না।
“আজকের খেলাটার জন্য ম্যানহাটনে বড় কোনো হল পাই নি বলে খারাপই লাগছে,” শ্যাম্পেইন চলে এলে বললো সে। “একেবারে কানায় কানায় ভরে যেতো। তবে আমি ফিস্ককে নিয়ে একটু চিন্তার মধ্যে আছি, বুঝলে। সার্বক্ষণিক ডাক্তার রাখা আছে তার জন্য। আমার মনে হয়েছে তাকে আগেভাগে খেলিয়ে দ্রুত বিদায় করে দেয়াটাই ভালো। এই টুর্নামেন্টে তার সম্ভাবনা খুব ভালো তা বলা যাবে না। তবে তার জন্যে আমরা বেশ ভালো মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছি।”
“খুব কৌতূহল লাগছে আমার,” বললো লিলি। একসাথে দু’জন গ্র্যান্ডমাস্টার এবং নার্ভাস ব্রেকডাউন দেখাটা দারুণ হবে।” হারমানোল্ড নাভার্সভাবে তার দিকে তাকালে মদ ঢালতে ঢালতে, বুঝতে পারছে না লিলি ঠাট্টা করছে কিনা। তবে আমি বুঝতে পারছি। ফিস্ককে টুনামেন্টের শুরুতেই বিদায় করে দিলে তার নিজ দেশে বেশ হৈচৈ হবে।
“হয়তো পুরো খেলাটাই দেখবো,” শ্যাম্পেইনে চুমুক দিতে দিতে মিষ্টি করে বললো লিলি। “ক্যাটকে বসিয়ে দিয়ে চলে যাবার পরিকল্পনা করেছিলাম আমি…”
“ওহ্, তুমি যেতেই পারো না!” আৎকে উঠে বললো হরমানোল্ড। “মানে তুমি এটা মিস করো তা আমি কোনোভাবেই চাই না। এটা হলো শতাব্দীর সেরা গেম।”
“আর যেসব রিপোর্টারদেরকে তুমি ফোন করে আসতে বলেছে তারা এসে যদি আমাকে না দেখে তাহলে খুব হতাশ হবে, তাই না, ডার্লিং?” কথাটা শুনে। হারমানোন্ডের মুখ লাল হয়ে গেলো।
আমি দেখলাম আমার কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। “উপরতলায় যে লোকটাকে দেখলাম সে কি ফিস্ক?”
“গেমিংরুমে?” একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বললো হারমানোন্ড। “আশা করি সে ছিলো না। খেলা শুরুর আগে তার তো বিশ্রাম নেবার কথা।”
“সে যে-ই হোক না কেন খুবই অদ্ভুত আচরণ করেছে, তাকে আমি বললাম। “সে ঘরে ঢুকেই শ্রমিকদেরকে ফার্নিচারগুলো সরাতে বলেছে…”
“ওহ্ ঈশ্বর,” হারমানোল্ড বললো। “তাহলে ওটা ফিস্কই ছিলো। “এর আগেও সে এরকম করেছে…এটা সরান, ওটা এখানে এনে রাখুন…এরকম বাতিক আছে তার। এটা নাকি তার মধ্যে একধরণের ভারসাম্য বোধ’ নিয়ে আসে, সে বলেছে আমায়। মহিলাদেরকেও একদম সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে খেলা চলাকালীন সময়ে…” হারমানোল্ড লিলির হাতে মৃদু চাপড় মারলে সে হাতটা সরিয়ে নিলো।
“হয়তো সেজন্যেই লোকটা আমাকে চলে যেতে বলেছিলো,” বললাম আমি।
“আপনাকে চলে যেতে বলেছে?” অবাক হলো হারমানোল্ড। “এটা তো ঠিক করে নি। খেলা শুরুর আগে এ নিয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করবো। তার বোঝা উচিত, অনেক আগে সে যখন স্টার ছিলো তখনকার আচরণ বর্তমান সময়ে করা তার সাজে না। পনেরো বছর ধরে সে কোনো বড় টুনামেন্টে খেলে নি।
“পনেরো বছর?” আমি বললাম। “তাহলে তো সে বারো বছর বয়সে খেলা ছেড়েছে। উপরতলায় আমি যে লোকটাকে দেখেছি সে কিন্তু বয়সে বেশ তরুণ।”
