“এক্সকিউজ মি,” বাজখাই গলায় পেছন থেকে কেউ একজন আমায় বললো। ঘুরে দেখতে পেলাম লম্বা আর দেখতে আকর্ষণীয় এক লোক, বয়স পঞ্চাশের মতো হবে। নেভি রেজার, সাদা রঙের টার্টলনেক সোয়েটার আর ধূসর রঙের ট্রাউজার পরে আছে সে।
“টুনামেন্ট শুরুর আগে এ ঘরে অন্য কারোর ঢোকার অনুমতি নেই, দৃঢ়ভাবে বললো সে। “আপনার কাছে যদি টিকেট থাকে তাহলে আমি আপনাকে নীচে বসার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তা না হলে আপনাকে ক্লাব থেকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে।”
তার মধ্যে যে আকর্ষণীয় ব্যাপারটা ছিলো সেটা তিরোহিত হয়ে গেলো। তাকে আমি বললাম, “আমি এখানেই থাকবো। যে আমার জন্য টিকেট আনতে গেছে তার জন্যে আমি অপেক্ষা করছি—”
আস্তে করে আমার বাহুটা ধরে ভদ্রলোক বললো, “আমি এই ক্লাবের কর্মকর্তাদের কথা দিয়েছি, ক্লাবের নিজস্ব নিয়ম-কানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। এর ব্যত্যয় ঘটলে সিকিউরিটি ডাকতে বাধ্য হবো আমি…”
আমার বাহু ধরে মৃদু টান দিলেও আমি বসে রইলাম। এখান থেকে ওঠার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। তার দিকে হেসে বললাম, “আমার বন্ধু লিলি র্যাডকে কথা দিয়েছি আমি তার জন্যে এখানেই অপেক্ষা করবো। সে আপনার খোঁজেই নীচে গেছে”।
“লিলি র্যাড!” যেনো গরম কোনো ছ্যাকা খেয়েছে, চট করে আমার হাতটা ছেড়ে দিলো ভদ্রলোক। তার দিকে মিষ্টি করে হাসলাম আবারো। “লিলি র্যাড। এখানে এসেছে?” আমি হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “তাহলে আমাকে আমার পরিচয় দিতে দিন, মিস…”
“ভেলিস,” বললাম তাকে, “ক্যাথারিন ভেলিস।”
“মিস ভেলিস, আমি জন হারমানোল্ড,” লোকটা বললো। “এই টুর্নামেন্টের স্পন্সর।” শক্ত করে আমার হাতটা ধরে ঝাঁকাতে লাগলো সে। “আপনার কোনো ধারণাই নেই, লিলি এখানে আসার ফলে আমরা সবাই কতোটা গর্বিত বোধ করছি। আপনি কি জানেন তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?”
“আপনার খোঁজেই আছে,” বললাম তাকে। “শ্রমিকরা বললো আপনি নাকি ডাইনিংরুমে আছেন। সে হয়তো ওখানেই গেছে।”
“ডাইনিংরুমে,” নিশ্চিত হবার জন্য কথাটা পুণরাবৃত্তি করলো সে। “আমি তাহলে ওখানেই যাই, কী বলেন? তারপর আমরা একসাথে ড্রিঙ্ক করবো নীচে গিয়ে।” দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলো হারমানোল্ড।
টুনামেন্টের স্পন্সর আমাকে খাতির করার কারণে শ্রমিকেরা এখন সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলাম তাদের কাজ। তারা গেমিং টেবিলগুলো বসাচ্ছে। চেয়োরগুলো বসাচ্ছে জানালার দিকে মুখ করে। তারপর আমাকে অবাক করে মেঝেতে টেপ দিয়ে মাপজোখ করা শুরু করে দিলো। মাপা শেষ হলে ফার্নিচারগুলো আবার ঠিকঠাক করে নিলো তারা, যেনো অদৃশ্য একটা বর্গাকৃতিতে বসানো থাকে সেগুলো।
এসব যখন দেখছি তখন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এক লোক, আমার চেয়ারের খুব কাছে আসার আগর্যন্ত আমি অবশ্য টের পাই নি। লম্বা আর হালকা-পাতলা গড়নের, একেবারে ধবধবে সাদা চুল সুন্দর করে ব্যাব্রাশ করে রেখেছে। ধূসর রঙের প্যান্ট আর সাদা ঢিলেঢালা লিনেন শার্ট পরে আছে সে। উপরের দিকে কিছু বোতাম খোলা থাকার কারণে তার বুকটা দেখা যাচ্ছে। বেশ সুগঠিত আর ড্যান্সারদের মতোই শারিরীক গঠন। আস্তে করে শ্রমিকদের কাছে গিয়ে তাদের সাথে নীচু স্বরে কথা বলতে লাগলো সে। কিছু আসবাব সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিলো। এক পর্যায়ে তার ভাবসাব দেখে বুঝতে পারলাম শ্রমিকদের কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে ভদ্রলোক। আমার দিকে আঙুল তুলেও দেখালো, তারপর চলে এলো আমার কাছে। তার দিকে ভালো করে তাকাতেই আমি কিছুটা ভড়কে গেলাম। খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে, যদিও আমি ধরতে পারছি না।
গালের উঁচু হাড়, পাতলা-সরু নাক আর শক্ত চোয়াল। চোখ দুটো বিবর্ণ সবুজ, অনেকটা তরল পারদের মতো। রেনেসাঁ যুগের পাথরে খোদাই করা সুগঠিত আর সুন্দর ভাস্কর্যের মতোই তার অবয়ব। আর আমিও পাথর খুব ভালোবাসি। তার মধ্যে কেমন জানি অভেদ্য কঠিনশীতলতা রয়েছে। আমার কাছে চলে আসাতে একটু অবাকই হলাম।
কাছে এসেই আমার হাতটা ধরে টেনে তুললো আমাকে। বাহু ধরে দরজার কাছে নিয়ে যেতে শুরু করলো সে। আমি কী বলবো বুঝে ওঠার আগেই আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, “তুমি এখানে কি করতে এসেছো? তোমার এখানে আসা উচিত হয় নি। তার বাচনভঙ্গি একটু অন্য রকম। আমি তার আচরণে যারপরনাই অবাক, একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। লোকটাকে জীবনেও কখনও দেখি নি। এরকম অপরিচিত কেউ এমন করবে ভাবাই যায় না। আমি জোর করে থেমে গেলাম।
“আরে আপনি কে?” বললাম তাকে।
“আমি কে তাতে কিছুই যায় আসে না,” ফিসফিস করেই বললো কথাটা। সবুজ চোখে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেনো কোনো কিছু স্মরণ করার চেষ্টা করছে। আমি যদি তোমাকে চিনি তাহলেই বা কি এসে যায়। তোমার এখানে আসাটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। তুমি ভয়ানক বিপদে আছো। চারপাশে বিপদের গন্ধ পাচ্ছি, এমনকি এখনও।”
এই কথাটা এর আগে কোথায় যেনো শুনেছিলাম?
আপনি এসব কী বলছেন?” বললাম তাকে। “আমি দাবা টুর্নামেন্ট দেখতে এনেছি লিলি র্যাডের সাথে। জন হারমানোল্ড আমাকে বলেছে-”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ,” অধৈর্য হয়ে বললো সে। “আমি সব জানি। কিন্তু তোমাকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে এখান থেকে। কারণ জিজ্ঞেস কোরো না, প্লিজ। যতো দ্রুত সম্ভব এই ক্লাব থেকে চলে যাও…যা বললাম তাই করো।”
