“তুমি কেন হ্যারির কাছ থেকে একটা ফারকোট বানিয়ে নিচ্ছো না? তার ব্যবসাটাই তো ফারকোট নিয়ে, তাছাড়া তোমাকে সে ভীষণ পছন্দও করে।”
“এখন আর বলে কী লাভ,” বললাম আমি। “এবার বলো খেলাটা মেট্রোপলিটান ক্লাবে হচ্ছে কেন? কয়েক বছর পর সোলারিন খেলছে, তাও আবার আমাদের দেশের মাটিতে, স্পন্সর কি আরো বেশি প্রচারণা চায় না?”
“তা ঠিক বলেছো,” লিলি একমত পোষণ করলো। কিন্তু আজ সোলারিন খেলবে ফিস্কের সাথে। ফিস্ক একটু প্রাইভেটলি খেলতে চাইছে। লোকটাকে পাগল বললেও কম বলা হয়।”
“ফিস্কটা আবার কে?”
“অ্যান্টনি ফিস্ক,” নিজের ফারকোটটা গায়ের সাথে আরো বেশি জড়িয়ে নিলো সে। “খুব বড় খেলোয়াড়। বৃটিশ গ্র্যান্ডমাস্টার হলেও সে রেজিস্টার করেছে পাঁচ নাম্বার জোন থেকে, কারণ খেলোয়াড়ি জীবনে যখন সক্রিয় ছিলো তখন বোস্টনে বসবাস করতো। অনেক বছর ধরেই সে খেলছে না, তাই সোলারিনের সাথে খেলতে রাজি হওয়ায় আমি অবাকই হয়েছি। শেষ যে টুনামেন্টটায় সে খেলেছে সেখানে ঘর থেকে সব দর্শককে বের করে দেয়া হয়েছিলো। তার ধারণা ঘরে আড়িপাতার যন্ত্র বসানো আছে, আর সেই যন্ত্রের ভাইব্রেশনে নাকি তার ব্রেনে প্রভাব ফেলছে। সব দাবাড়ুই বয়স বেড়ে গেলে এরকম পাগলামি আচরণ করে থাকে। তুমি জানো, প্রথম আমেরিকান দাবা চ্যাম্পিয়ন পল মরফি পরিপাটী জামা-কাপড় পরে বাথটাবে বসে মারা গেছে। তার বাথটাবে মেয়েদের এক জোড়া জুতো ভাসছিলো তখন। পাগল হয়ে যাওয়াটা হলো দাবা খেলোয়াড়দের পেশাগত ঝুঁকি। তবে তুমি আমার বেলায় এটা হতে দেখবে না। এটা শুধু পুরুষ মানুষের বেলায় ঘটে।”
“শুধু পুরুষ মানুষ কেন?”
“তার কারণ, মাই ডিয়ার, দাবা হলো ইডিপাল গেম। রাজাকে হত্যা করো, রাণীকে সম্ভোগ করো, এটাই হলো এই খেলাটার আসল কথা। মনোবিজ্ঞানীরা দাবাড়ুদের আচরণ বিশ্লেষণ করতে খুব পছন্দ করে। ঘন ঘন হাত ধোয়া, পুরনো স্নিকার জুতোর গন্ধ শোকা অথবা খেলার মাঝখানে বিরতিতে হস্তমৈথুন করে কিনা, এইসব। এরপর তারা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে জার্নাল অব দি এএমএ-তে সেসব প্রকাশ করে থাকে।”
মেট্রোপলিটান ক্লাবের সামনে গাড়িটা থামলে সলের কাছে ক্যারিওকাকে রেখে লিলি আর আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। যাবার আগে সলের সাথে আমার শুধু চোখাচোখি হলো, এতোক্ষণ কোনো কথা বলে নি সে। সল আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে দিলে আমি শুধু কাঁধ তুললাম।
মেট্রোপলিটান ক্লাব ভবনটি পুরনো নিউইয়র্কের স্মৃতি ধরে রেখেছে। গত শতাব্দীর পর থেকে এই ভবনটির ভেতরের অবস্থা একচুলও পরির্বতন হয় নি। ফয়ারের বিবর্ণ লাল কার্পেট, ভেলভেট কাঠের ডেস্কটা পালিশ করা হয় নি বহুদিন ধরে। তবে মেইন লাউঞ্জটা দেখার পর ফয়ারের বিবর্ণতা আর মনে থাকলো না।
প্রথমেই আছে বিশাল একটা লবি, যার ছাদ ত্রিশ ফুট উঁচুতে, বিভিন্ন ধরণের স্বর্ণখচিত নক্সা করা তাতে। সেই ছাদ থেকে লম্বা লম্বা তারে ঝুলছে বিশাল বড় একটি ঝাঁঝর বাতি। দুই দিকের দেয়ালগুলোতে সারি সারি বেলকনি। সেইসব বেলকনির রেলিংগুলো অভিজাত নক্সায় সজ্জিত। দেখে ভেনিশিয়ান রাজপ্রাসাদ বলে মনে হতে পারে। তৃতীয় দেয়ালাটিতে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বড় বড় আয়না রয়েছে। চতুর্থ দেয়ালটিকে লবি থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে বিশাল বড় একটি ভেলভেটের পর্দা দিয়ে। মার্বেলের মেঝেটা ঠিক দাবাবোর্ডের মতো সাদা-কালো বর্গে সজ্জিত। সেখানে কয়েক ডজন ছোটো ছোটো টেবিল আর চামড়ার চেয়ার পাতা রয়েছে। এক কোণে রাখা আছে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো।
আমি যখন এসব দেখছি লিলি তখন আমাকে উপরের বেলকনি থেকে ডাক দিলো। ফারকোটটা খুলে কাঁধের উপর রেখে দিয়েছে সে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে আসতে ইশারা করলো আমাকে।
উপরে উঠতেই লিলি ছোট্ট একটা ঘরের দিকে চলে আসতে বললো আমাকে। ঘরটা একেবারে সবুজ রঙের, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বড় বড় ফ্রেঞ্চ জানালাগুলো দিয়ে ফিফথ এভিনু পার্ক দেখা যাচ্ছে। সেখানে টেবিল সরানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছে কিছু শ্রমিক। আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকালো তারা।
“এখানেই খেলাটা হবে,” লিলি আমাকে বললো। “তবে খেলোয়াড়েরা এখনও এসে গেছে কিনা বুঝতে পারছি না। হাতে এখনও আধঘণ্টার মতো সময় আছে।” এক শ্রমিকের কাছে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি জানো জন হারমানোচ্ছ কোথায় আছে?”
“সম্ভবত ডাইনিং রুমে,” লোকটা বললো। “আপনি উপরে গিয়ে তাকে ফোন করতে পারেন।” লিলি তার ফারকোটটা অন্য কাঁধে সরিয়ে রাখলে আমিও আমার কোটটা খুলতে শুরু করলাম কিন্তু শ্রমিকদের একজন আমাকে বাধা দিলো।
“গেমরুমে মহিলাদের প্রবেশের অনুমতি নেই,” কথাটা আমাকে বলেই লিলির দিকে ফিরলো সে, “ডাইনিং রুমেও। আপনি নীচে গিয়ে উনাকে ফোন করলেই ভালো হয়।”
“আমি ঐ বানচোত হারমানোল্ডকে খুন করবো,” দাঁতে দাঁত চেপে বললো লিলি। “পুরুষদের ক্লাব, হা?” নীচের করিডোরে চলে গেলো সে তার শিকারের খোঁজে। আমি একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। শ্রমিকগুলো আমার দিকে শত্রুভাবাপন্ন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বার বার। লিলি যেভাবে ছুটে গেলো তাতে করে এ মুহূর্তে হারমানোল্ডকে মোটেও ঈর্ষা করছি না।
গেমিংরুমে বসে জানালা দিয়ে সেন্ট্রাল পার্ক দেখতে লাগলাম।
