“আমার সাথে তোমাকে যেতেই হবে,” অবশেষে বললো লিলি।
“আমার মনে হয় তুমি আমার কথাটা বুঝতে পারে নি।”
লিলি উঠে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বললো, “তোমার কোনো ধারণাই নেই এই টুর্নামেন্টটা আমার জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। হারমানোল্ড পাঁচটি জোনের প্রায় সব জি.এম আর আই.এম-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছে যাতে করে দাবা কমিশন এই টুর্নামেন্টটাকে র্যাঙ্ক দেয়। আমি যদি ভালো অবস্থানে থাকতাম, কিছু পয়েন্ট অর্জন করতে পারতাম তাহলে বড় লিগে চলে যেতাম। সোলারিন যদি এভাবে হুট করে উড়ে এসে জুড়ে না বসততা আমি হয়তো সেটা জয়ও করতাম।”
আমি যতোটুকু জানি দাবা খেলোয়াড়দের র্যাঙ্কিংয়ের জটিলতাটি একেবারেই রহস্যময়। গ্র্যান্ড মাস্টার (জি.এম) এবং আন্তর্জাতিক মাস্টার (আই.এম)-এর অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটাও সেরকমই জটিল পদ্ধতি। দাবা খেলার কর্তাব্যক্তিরা হলো বুড়োদের একটি ক্লাব। লিলির ক্ষোভটা আমি বুঝি কিন্তু কিছু একটা আমাকে গোলোকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে।
“তুমি যদি দ্বিতীয় হও তাহলে তাতে এমন কি সমস্যা হবে?” বললাম আমি। “তুমি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মহিলা দাবাড়ু সেটার তো কোনো হেরফের হচ্ছে না—”
“শীর্ষ মহিলা দাবাড়ু! মহিলা?” লিলিকে দেখে মনে হলো আমার ঘরের মেঝেতে বুঝি থুতু ফেলে দেবে এক্ষুণি। মনে পড়ে গেলো একবার সে মহিলাদের সাথে কখনও দাবা না খেলার যুক্তি দিয়েছিলো। দাবা হলো পুরুষ মানুষের বেলা। আর সেটা জিততে হলে তোমাকে কোনো পুরুষ খেলোয়াড়কেই হারিয়ে জিততে হবে। লিলি ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হবার খেতাব অর্জন করার জন্য অনেক বছর ধরেই অপেক্ষা করে আসছে, তার ধারণা সে এরইমধ্যে সেটা পাবার যোগ্যতাও অর্জন করেছে। আমি এখন বুঝতে পারছি এই টুর্নামেন্টটা তার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ সে যদি তারচেয়ে উপরের ব্যাঙ্কের খেলোয়াড়দের সাথে জিততে পারে তাহলে তারা তার খেতাব আটকে রাখতে পারবে না।
“তুমি কিছুই বুঝতে পারছে না,” বললো লিলি। “এটা হলো নকআউট টুর্নামেন্ট। সোলারিনের সাথে তার দ্বিতীয় খেলায় আমাকে লড়তে হবে। এভাবেই আয়োজকরা ঠিক করে রেখেছে। তারা ধরেই রেখেছে আমরা আমাদের প্রথম খেলায় জিতবো। তাদের ধারণা অবশ্য খুব একটা ভুলও নয়। আমি যদি তার সাথে খেলে হেরে যাই তাহলে টুনামেন্ট থেকে বের হয়ে যাবো। দ্বিতীয়। কোনো সুযোগ নেই।”
“তুমি মনে করছো না তুমি তাকে হারাতে পারবে?” বললাম আমি। সোলারিন অনেক বড় মাপের খেলোয়াড় হলেও আমি অবাক হবো সে যদি তার সাথে হেরে যাবার সম্ভাবনা আগে থেকেই মেনে নেয়।
“আমি জানি না, সততার সাথেই জবাব দিলো সে। “আমার কোচও মনে করে আমি জিততে পারবো না। তার ধারণা সোলারিন আমাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে। আমার প্যান্ট খুলে দেবে। দাবা খেলায় হারলে কেমন লাগে সেটা তুমি বুঝতে পারবে না। হারতে আমার ভীষণ খারাপ লাগে।” দাঁতে দাঁত চেপে বললো শেষ কথাটা।
“তারা কি তোমার সাথে তোমার সমপর্যায়ের খেলোয়াড়দের খেলার ব্যবস্থা করতে পারলো না?” জানতে চাইলাম। মনে হচ্ছে এরকম একটা নিয়মের কথা আমি পড়েছিলাম কোথাও।
“আমেরিকায় হাতেগোনা কয়েকজন খেলোয়াড়ই আছে যাদের পয়েন্ট চব্বিশ শ’র মতো,” তিক্তকণ্ঠে বললো লিলি। “তাদের সবাইকে তো আর একটা টুর্নামেন্টে খেলানোও যায় না। সোলারিনের শেষ অর্জন ছিলো পঁচিশ শ’র মতো পয়েন্ট, কিন্তু তার আর আমার মাঝখানে মাত্র পাঁচ জন খেলোয়াড় আছে এখানে। তবে টুর্নামেন্টে এতো আগেভাগে তার মতো খেলোয়াড়ের সাথে খেলা মানে আমি অন্য খেলার জন্য ওয়ার্মআপ করার সুযোগও পাচ্ছি না।”
এবার বুঝতে পারলাম। টুনামেন্টের আয়োজকেরা লিলিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তার পাবলিসিটি মূল্যের জন্য। তারা টিকেট বিক্রি করতে চায়, আর লিলি হলো দাবার জোসেফাইন বেকার। সোলারিনের সাথে খেলায় লিলিকে বলি দেবার ব্যবস্থা আর কি। তাকে অনেক আগেভাগে সোলারিনের মতে খেলোয়াড়ের সাথে খেলতে দিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিতারণের আয়োজন করা হয়েছে। অবশ্য এই টুর্নামেন্টটা তার খেতাব পাবার মাধ্যমও হতে পারে। আচমকা আমার মনে হলো দাবার ভুবনের সাথে সার্টিফায়েড পাবলিক একাউন্টেন্টদের খুব কমই পার্থক্য রয়েছে।
“ঠিক আছে, তুমি যা বলতে চেয়েছিলে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি,” বললাম তাকে। আমি আমার বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?” আৎকে উঠে বললো লিলি।
“গোসল করতে,” পেছন ফিরে বললাম।
“গোসল করতে?” উদভ্রান্তের মতো বললো লিলি। “কিন্তু কিসের জন্যে?”
“গোসল করে আমাকে কাপড় পাল্টাতে হবে, বাথরুমের দরজার কাছে এসে থেমে বললাম। “যদি এক ঘণ্টার মধ্যে শুরু হতে যাওয়া ঐ খেলাটা দেখতে যাই আমরা।” লিলি আমার দিকে চেয়ে রইলো। তার হাসিটা দারুণ। সুন্দর।
.
মার্চের তীব্র শীতের মধ্যে হুড খোলা গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছি ব্যাপারটা আমার কাছে বালখিল্য বলেই মনে হচ্ছে। লিলি একটা ফারকোট পরে আছে আর তার কুকুর ক্যারিওকা সিটের নীচে স্বল্প পরিসর জায়গায় নড়াচড়া করছে। মনের আনন্দে। আমার পরনে কেবল কালো রঙের উলের কোট। ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি।
“এই গাড়ির কি কোনো হুড নেই?” প্রবল বাতাসের মধ্যে জিজ্ঞেস করলাম।
