“তাহলে রাশিয়া থেকে যে-ই আসুক না কেন সে-ই টাইটেলটা পাবে,” বললাম আমি। “তুমি মনে করছে এই লোকটা…”
“সোলারিন।”
“সোলারিন সেটা করতে পারবে?”
“হয়তো পারবে, আবার নাও পারতে পারে,” বললো লিলি। এটাই হলো দাবা খেলার সবচাইতে বিস্ময়কর আর মজার দিক। সবাই মনে করছে সে-ই সেরা তবে রাশিয়ান পলিটবুরোর কোনো সহায়তা সে পাচ্ছে না। কোনো রাশিয়ান খেলোয়াড়ের জন্যে এটা একদম জরুরি। সত্যি বলতে কি, বিগত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ানরা তাকে খেলতেই দেয় নি!”
“কেন দেয় নি?” তুলিগুলো র্যাকে তুলে রেখে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললাম। “তাদের জন্যে যদি দাবা খেলায় জেতাটা জীবন-মরণ ব্যাপার হয়ে থাকে তাহলে…”
“বোঝাই যাচ্ছে সে সোভিয়েত ঘরানার লোক নয়,” ফ্রিজ থেকে আরেক বোতল মদ বের করে পান করতে আরম্ভ করলো সে। “তিন বছর আগে স্পেনের টুনামেন্টে খুবই হৈচৈ হয়েছিলো। রাতের অন্ধকারে সোলারিনকে টুনামেন্ট থেকে তুলে মাদার রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। প্রথমে তারা বলেছিলো সে নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছে, পরে বলতে শুরু করে সে নার্ভাস ব্রেকডাউনে ভুগছে-এ ধরণের গালগল্প ছড়ানোর পর এ নিয়ে আর কোনো কথা বলে নি। একদম চুপ মেরে যায় তারা। তারপর থেকে এই সপ্তাহের আগপর্যন্ত তার কোনো খোঁজই ছিলো না।”
“এই সপ্তাহে কি হয়েছে?”
“এই সপ্তাহে বলা নেই কওয়া নেই কেজিবির কয়েকজন ক্যাডারকে সঙ্গে নিয়ে সোলারিন এসে হাজির নিউইয়র্কে। সোজা ম্যানহাটন চেজ ক্লাবে গিয়ে বলে হারমানোন্ড ইনভাইটেশনালে প্রবেশ করতে চায় সে। এখন এ নিয়ে খুব কথা হচ্ছে। ইনভাইটেশনাল মানে তোমাকে উপস্থিত থাকার জন্যে ইনভাইট করা হবে। সোলারিনকে তো ইনভাইট করা হয় নি। দ্বিতীয়ত, এটা পাঁচটা জোনে বিভক্ত হয়ে অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ নাম্বার জোনটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চার নাম্বার জোন সোভিয়েত রাশিয়া, তারা এর বিরোধিতা করেছে। তারা যখন দেখেছে সে কে তখন তাদের ভয়টা নিশ্চয় কল্পনা করতে পারছো।”
“তারা কেন তাকে প্রবেশ করতে দিলো?..না দিলেই তো পারতো।”
“কী যে বলো না!” বললো লিলি। “জন হারমানোল্ড হলো টুনামেন্টের স্পন্সর। আইসল্যান্ডে ফিশার উন্মাদনার পর থেকে দাবা খেলার জোয়ার বইছে সবখানে। এখন এই খেলায় প্রচুর টাকা। সোলারিনের মতো কাউকে টুর্নামেন্টে পাবার জন্য হারমানোন্ড খুনও করতে রাজি হবে।”
“আমি বুঝতে পারছি না সোভিয়েতরা যদি সোলারিনকে দিয়ে খেলাতে না-ই চাইবে তাহলে ওখান থেকে সোলারিন চলে এলো কিভাবে?”
“মাই ডার্লিং, এটাই হলো আসল কথা,” বললো লিলি। “তার সঙ্গে থাকা কেজিবি’র বডিগার্ড বলে দিচ্ছে সে তার নিজ দেশের সকারের আশীর্বাদ পেয়েই এখানে এসেছে, বুঝলে? তারপরও বলবো পুরো ব্যাপারটা দারুণ রহস্যময়। সেজন্যেই আমি ভাবলাম আজকে তোমার যাওয়া উচিত…” থামলো লিলি।
“কোথায় যাবো?” সে কোথায় যাবার কথা বলছে সেটা বুঝতে পারলেও মজা করে বললাম। তার ভুরু কোঁচকানোটা দেখতে আমার ভালোই লাগে। “আমি মানুষের সাথে খেলি না,” লিলি একজনের কথা উদ্ধৃত করলো, “আমি খেলি দাবাবোর্ডের সাথে।” কথাটা নির্বিকারভাবে বলেই চট করে বললো সে, “আজ বিকেলে সোলারিন খেলবে। স্পেনের ঐ ঘটনার পর এটা তার প্রথম প্রকাশ্য দাবা খেলা। আজকের খেলার সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। টিকেট পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। এক ঘণ্টার মধ্যেই খেলা শুরু হবে তবে আমার মনে হয় আমরা ভেতরে ঢুকতে পারবো-”
“অনেক ধন্যবাদ তোমাকে,” তার কথার মাঝখানে বললাম। “আমি যাচ্ছি না। দাবা খেলা দেখা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর লাগে। তুমি নিজে কেন যাচ্ছো না?”
মদের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে পিয়ানোর বেঞ্চে বসে পড়লো লিলি। যখন বলতে শুরু করলো খুব নাটকীয় শোনালো তার কথা।
“তুমি জানো আমি সেটা করতে পারবো না,” শান্তকণ্ঠেই বললো সে।
আমি বুঝতে পারলাম লিলি এই প্রথম কারো কাছ থেকে অনুগ্রহ চাইছে। আমি যদি তার সাথে খেলাটা দেখতে যাই তাহলে সে ভান করতে পারবে বন্ধুর কারণেই অনেকটা বাধ্য হয়ে এসেছে। লিলি যদি একা একা খেলা দেখতে যায় তাহলে সেটা দাবা অঙ্গনে গরম খবর হয়ে যাবে। সোলারিন হয়তো বড় কিন্তু নিউইয়র্কের দাবা অঙ্গনে লিলি র্যাডের উপস্থিতি তার চেয়ে কম বড় খবর হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা দাবাড়ু হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে সে।
“পরের সপ্তাহে, ঠোঁট চেপে বললো সে, “আজকের ম্যাচের বিজয়ীর সাথে আমি খেলবো।”
“আহ। এবার বুঝতে পেরেছি, তাকে বললাম। “সোলারিনই আজকে জয় লাভ করবে হয়তো। আর তুমি যেহেতু তার খেলার সাথে একদম পরিচিত নও সেজন্যে তার কৌশল সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই…”
ক্লোসেটের দরজা খুলে কুকুরটা বের করে দিতেই আমার পায়ের কাছে ঘোৎ ঘোৎ করতে লাগলো। আমি আস্তে করে লাথি মেরে মেঝেতে পড়ে থাকা বালিশের কাছে সেটাকে ঠেলে দিলাম। আনন্দে দাঁত বের করে গদগদ হয়ে গড়াগড়ি খেতে শুরু করলো কুকুরটা।
“আমার মাথায় ঢুকছে না তোমার প্রতি ও এতোটা অনুরক্ত হলো কি করে,” বললো লিলি।
“খুব সহজ জবাব, শক্তের ভক্ত নরমের যম,” লিলিকে বললাম, সে কিছু বললো না।
কুকুরটা বালিশে গড়াগড়ি খেতে লাগলে আমরা দু’জন সেটা দেখতে লাগলাম যেনো এটা অনেক মজার দৃশ্য।
