“এক গ্লাস মদ চলবে?” লিলি কুকুরটাকে মেঝেতে নামিয়ে রাখলে তাতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে সারা ঘরে দৌড়াতে শুরু করলো ছোট্ট বদমাশটা। বাটলার প্যান্ট্রির ফ্রিজ থেকে এক বোতল মদ বের করে নিয়ে এলাম আমি।
“আমার মনে হয় এই জঘন্য হোয়াইট ওয়াইনটা তুমি লিউলিনের কাছ থেকে পেয়েছো, তীর্যক মন্তব্য করলো লিলি। “অনেক বছর ধরে সে এটা বাদ দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।”
গ্লাসটা হাতে নিয়ে চুমুক দিলে সে। গাছগাছালির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে একটু আগে যে পেইন্টিংটা নিয়ে কাজ করছিলাম সেটার সামনে এসে থেমে গেলো।
“তুমি কি এই লোকটাকে চেনো?” আচমকা পেইন্টিংয়ের লোকটাকে দেখিয়ে বললো লিলি। বাইসাইকেলের উপর এক লোক বসে আছে সাদা ধবধবে পোশাক পরে। “নীচের তলার ঐ লোকটাকে মডেল করে এঁকেছো নাকি?”
“নীচের তলায় কোন্ লোকের কথা বলছো?” পিয়ানোর বেঞ্চে বসে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম লিলিকে। তার নখ আর ঠোঁটে লাল টকটকে চায়নিজ রঙ লাগানো। ফ্যাকাশে সাদা গায়ের রঙের সাথে এটা একেবারে অন্য রকম অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে গ্রিন নাইটদেরকে যে কামুক দেবী প্রলুব্ধ করেছিলো তাকে ঠিক সেরকমই দেখাচ্ছে, কিংবা অর্ধমৃত এনসায়েন্ট মেরিনারের মতো।
“বাইসাইকেলের লোকটা,” বললো লিলি। “ঐ লোকটার মতোই পোশাক পরেছে। যদিও তাকে মাত্র একবারই দেখেছি, তাও আবার পেছন থেকে। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো, আরেকটুর জন্যে হলে আমাদের গাড়ির নীচে পড়তে যাচ্ছিলো সে।”
“তাই নাকি?” অবাক হয়ে বললাম। “কিন্তু আমি তো এটা কল্পনা থেকে এঁকেছি।”
“এটা খুব ভীতিকর,” লিলি বললো। “যেনো কোনো মানুষ তার নিজের মৃত্যুর উপর সওয়ার হয়েছে। লোকটা যেভাবে তোমার বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাচ্ছিলো তাতে খুব একটা ভালো ঠেকে নি আমার কাছে…”
“কি বললে তুমি?” আমার অবচেতনে কিছু একটা নাড়া খেলো যেনো। শ্বেতশুভ্র অশের পিঠে যে সওয়ার হয়েছে তার নাম মৃত্যু। এটা আমি কোথায় শুনেছিলাম?
ক্যারিওকা ছোটাছুটি বন্ধ করে সন্দেহজনক শব্দ করতে লাগলো এবার আমার একটা অর্কিডের টবের মাটি খুঁড়তে খুড়তে মেঝেতে ফেলে দিলো সে। তাকে তুলে নিয়ে ক্লোজেটের ভেতর রেখে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
“তুমি আমার কুকুরটাকে ক্লোজেটে আটকে রাখলে কোন সাহসে!” বললো লিলি।
“এই ভবনে কুকুর নিয়ে ঢোকার অনুমতি নেই, তবে বাক্সে বন্দী করে নিয়ে আসলে অনুমতি মেলে, তাকে বললাম। আমার কাছে তো কোনো বাক্স নেই তাই ওখানে রেখেছি। এবার বলো আমার কাছে কি উদ্দেশ্যে এসেছো? কয়েক মাস তো তোমার টিকিটাও আমি দেখি নি।” মনে মনে বললাম, সেটা আমার সৌভাগ্য।
“হ্যারি তোমার জন্য একটা ফেয়ারওয়েল ডিনারের আয়োজন করেছে, বললো সে। বাকি মদটুকুতে চুমুক দিতে দিতে পিয়ানো বেঞ্চে গিয়ে বসলো এবার। “সে বলেছে তারিখটা তুমিই ঠিক করে দিতে পারো। সব খাবার নাকি সে নিজের হাতে রান্না করবে।”
কুকুরটা ক্লোজেটের ভেতরে খামচাচ্ছে, তবে আমি সেটা আমলে নিলাম না।
“ডিনারে যেতে পারলে আমারও ভালো লাগবে,” বললাম তাকে। “এই বুধবারে করলে কেমন হয়? আমি সম্ভবত পরের উইকএন্ডে চলে যাবো।”
“দারুণ হয়,” বললো লিলি। এবার কুকুরটা নিজের শরীর দিয়ে ধাক্কা মারতে শুরু করলে লিলি উঠে দাঁড়ালো।
“আমি কি আমার কুকুরটা ক্লোজেট থেকে বের করতে পারি, প্লিজ?”
“তুমি কি চলে যাচ্ছো?” আশাবাদী হয়ে উঠলাম আমি।
তেলের ক্যান থেকে তুলিগুলো নিয়ে সিঙ্কের কাছে চলে গেলাম সেগুলো পরিস্কার করবো বলে, যেনো লিলি চলেই যাচ্ছে এরকম একটা ভঙ্গি করলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বললো লিলি, “আমি ভাবছিলাম আজ বিকেলে তোমার কোনো প্ল্যান আছে কিনা?”
“আমার প্ল্যান আছে তবে সেটা আজকে বাস্তবায়ন করা যাবে বলে মনে হয়,” তুলিগুলো ধুতে ধুতে বললাম তাকে।
“আমি ভাবছিলাম তুমি আজ সোলারিনের খেলা দেখবে কিনা,” দূর্বলভাবে হেসে গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো সে।
তুলিগুলো সিঙ্কে রেখে তার দিকে তাকালাম। এটা তো দাবা খেলা দেখার আমন্ত্রণ ছাড়া আর কিছু না। কোনো দাবা টুর্নামেন্টে লিলি না খেললে সেটা দেখতে যাবার মেয়ে নয় সে।
“সোলারিনটা কে?” জিজ্ঞেস করলাম।
অবাক হয়ে তাকালো লিলি। যেনো আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি ইংল্যান্ডের রাণী কে। “তুমি যে পত্রপত্রিকা পড়ো না সেটা ভুলে গেছিলাম,” সে বললো। “সবাই এ নিয়ে কথা বলছে। এটা হলো এই দশকের সেরা রাজনৈতিক বিতর্ক। কাঁপাব্লাঙ্কার পর সে হলো সবচাইতে সেরা দাবা খেলোয়াড়, বিগত তিন বছরে এই প্রথম সোভিয়েত রাশিয়া থেকে বাইরে এলো সে…”
“আমি তো জানতাম ববি ফিশার হলো এ বিশ্বের সবচাইতে সেরা খেলোয়াড়,” তুলিগুলো উষ্ণ ফেনায় রাখতে রাখতে বললাম। “গত গ্রীষ্মে রেকিয়াভিকে এতো হৈচৈয়ের কারণ কি ছিলো?”
“যাক, তুমি অন্তত আইসল্যান্ডের নামটা শুনেছো,” উঠে এসে আমার সামনে ঝুঁকে দাঁড়ালো সে। “আসল কথা হলো তখন থেকে ফিশার আর খেলে নি। গুজব আছে সে নাকি তার শিরোপা ধরে রাখতে পারবে না, জনসম্মুখে আর কখনও খেলবেও না। রাশিয়ানরা তো দারুণ উত্তেজিত হয়ে আছে। দাবা হলো। তাদের জাতীয় খেলা। শীর্ষস্থান পাবার জন্যে তারা মরিয়া। ফিশার যদি শিরোপা ধরে রাখতে না পারে তাহলে রাশিয়ার বাইরে আর কোনো প্রতিযোগী নেই সেটা করার মতো।”
