দরজার কাছে পৌঁছানোর আগে দেয়াল আয়নায় নিজেকে দেখে চুলটা করে নিলাম। মুখে কিছু বুও লেগে আছে, সেটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিজেকে যথা সম্ভব ভদ্রস্থ করে দরজা খুলে দিলাম আমি।
দাড়োয়ান বাওয়েল দাঁড়িয়ে আছে, তার ক্ষুব্ধ মুষ্টিবদ্ধ একটা হাত আছে একবার দরজায় আঘাত করতে উদ্যত। নেভি-ব্লু ইউনিফর্ম পরে আছে সে। লম্বা নাকের লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
“ক্ষমা করবেন, ম্যাডম,” ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো সে, “আবারো প্রবেশপথ ব্লক করে রেখেছে ঐ নীল রঙের কর্নিশ গাড়িটা। আপনি তো জানেনই, গেস্টরা প্রবেশপথ দিয়ে ঢোকে
“তাহলে তুমি আমাকে ফোন করলে না কেন?” আমিও রেগেমেগে জানতে চাইলাম। বেশ ভালো করেই জানি কার গাড়ির কথা সে বলছে।
“পুরো সপ্তাহটা জুড়েই আপনার হাউজ ফোনটা বিকল হয়ে আছে, ম্যাডাম…”।
“তাহলে তুমি সেটা ঠিক করো নি কেন, বসওয়েল?”
“আমি একজন দাড়োয়ান, ম্যাডাম। আমার কাজ এসব জিনিস ঠিক করা নয়। এটা করবে কাস্টোডিয়ান। দাড়োয়ান দেখবে কে ঢুকছে কে বের হচ্ছে
“ঠিক আছে। ঠিক আছে। মেয়েটাকে উপরে পাঠিয়ে দাও।” আমার জানামতে নিউইয়র্কে একজনই আছে যার নীল রঙের কর্নিশ রয়েছে। আর সেটা লিলি র্যাডের। আজ যেহেতু রবিবার তাই আমি নিশ্চিত সল তাকে নিয়ে এসেছে। মেয়েটা যখন আমার বিরক্তি উৎপাদন করতে থাকবে তখন সে গাড়িটা সরিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বসওয়েল এখনও আমার দিকে রেগেমেগে চেয়ে। আছে।
“ছোট্ট একটা জন্তুর ব্যাপারও আছে, ম্যাডাম। আপনার গেস্ট ঐ জম্বুটা নিয়ে উপরে আসতে চাইছে, যদিও তাকে আমি বার বার বলেছি-”
তবে দেরি হয়ে গেছে। ঠিক তখনই করিডোরের লিফটটা থামলো। আমার অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক সামনেই সেটা। সাদা পশমের একটা ছোট্ট জিনিস সুরুৎ করে আমার পায়ের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়লো অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে। বসওয়েল ঘৃণাভরে তাকালো সেদিকে। তবে মুখে কিছু বললো না।
“ঠিক আছে, বসওয়েল,” কাঁধ তুলে বললাম আমি। “মনে করো আমরা কিছুই দেখি নি, বুঝলে? সে কোনো সমস্যা করবে না। তাকে খুব দ্রুত আমি এখান থেকে বিদায় করে দেবো।”
এমন সময় লিলিকে দেখা গেলো আমাদের দিকে আসতে। তার গায়ের স্লিভলেস জামাটার পেছন দিয়ে একটা লেজ ঝুলছে। সোনালি চুলগুলো তিন চারটা পনিটেইল করে মাথার চারপাশে ঝুলিয়ে রেখেছে। বসওয়েল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
বসওয়েলকে কোনো রকম তোয়াক্কা না করে আমার গালে আলতো করে চুমু খেলো লিলি। বেশ মোটাসোটা হলেও লিলি খুব স্টাইল করে নিজের ওজনটাকে সামলে রাখে। অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার সময় খসখসে গলায় সে বললো, “এই দাড়োয়ানকে বলে দাও খুব বেশি হৈচৈ যেনো না করে। আমরা চলে যাবার আগপর্যন্ত সল এই বুকের আশেপাশেই থাকবে গাড়ি নিয়ে।”
বসওয়েল ঘোৎঘোৎ করতে করতে চলে গেলে আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। প্রচণ্ড আক্ষেপ নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকলাম এই নিউইয়র্ক শহরে সবচাইতে কম প্রিয় মানুষটার সাথে আরেকটি রোববারের বিকেল নষ্ট করার জন্য। মনে মনে কসম পেলাম এবার খুব দ্রুত তাকে ভাগিয়ে দেবো।
সুদীর্ঘ এন্ট্রান্স হলসহ আমার অ্যাপার্টমেন্টটায় রয়েছে বিশাল বড় একটা রুম, যার ছাদ বেশ উঁচুতে, বাথরুমটাও খুব সুন্দর। বিশাল রুমটায় তিনটি দরজা আর একটি ক্লোজেট আছে। বাটলারের প্যান্ট্রি আর দেয়ালঘেষা চমৎকার বিছানাও রয়েছে তাতে। পুরো রুমটায় বড় বড় গাছ আর লতাগুল্ম থাকার কারণে। জঙ্গলের মতো মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বই-পত্র, মরোক্কান। বালিশ আর জাঙ্কশপ থেকে কেনা দোমড়ানো মোচড়ানো ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্র। ভারতের তৈরি হাতে বানানো পার্চমেন্টের স্যাম্প, বেশ কয়েকটি মেক্সিকান। মাজোলিকা পিচার, এনামেলের তৈরি ফরাসি পাখি আর প্রাগ থেকে আনা একগাদা ক্রিস্টাল। দেয়াল জুড়ে আছে অর্ধসমাপ্ত পেইন্টিং, কিছু কিছুর তৈলরঙ এখনও শুকোয় নি, নক্সা করা ফ্রেমে পুরনো আমলের কিছু ছবি আর অ্যান্টিক আয়না। ছাদ থেকে ঝুলছে কতোগুলো চাইম, ঝুলন্ত ভাস্কর্য আর কাগজের তৈরি রঙবেরঙের মাছ। ঘরের একমাত্র আসবাব হলো জানালার কাছে রাখা বিশাল একটি গ্র্যান্ড পিয়ানো।
গাছপালা আর লতাগুল্মের মধ্য দিয়ে প্যান্থারের মতো এদিক ওদিক সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে এগোচ্ছে লিলি। তার প্রিয় কুকরটাকে খুঁজছে। লেজওয়ালা স্লিভলেস জামাটা খুলে মেঝেতে রেখে দিলো সে। অবাক হয়ে দেখতে পেলাম ওই জামাটার নীচে সে কিছুই পরে নি। লিলি দেখতে ফরাসি নারী ভাস্কর্যের মতো, ছোটো ছোটো পা, ভারি নিতম্ব আর মাংসল দেহের অধিকারী। পা থেকে যতো উপরে উঠেছে তার শরীরে যেনো আরো বেশি মাংস যোগ হয়েছে। উরু থেকে এই বিশাল দেহটা সে চেপে রেখেছে বেগুনী রঙের আটোসাঁটো সিল্কের জামা পরে। নড়াচড়া করলে তার নাদুসনুদুস শরীরটা থলথল করে ওঠে।
একটা বালিশ হাতে নিয়ে ছোটোখাটো পশমযুক্ত কুকুরটাকে ওটার উপরে বসিয়ে দিলো। এই জন্তুটা নিয়েই সে সবখানে ঘুরে বেড়ায়। বালিশসমেত কুকুরটাকে কোলে তুলে নিয়ে নাকি নাকি কণ্ঠে, অনেকটা শিকারের মতো শব্দ করে আদর করতে শুরু করলো।
“এই তো আমার ডার্লিং ক্যারিওকা, চুমু খাওয়ার মতো করে চুচু শব্দ করলো সে। “খালি দুষ্টুমি করে। দুষ্টু কুকুর, কোথাকার।” আমি রীতিমতো অসুস্থ বোধ করতে শুরু করলাম।
