হিন্দুস্তানী বংশোদ্ভূত তরুণির কণ্ঠে আরবী কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বিন কাসিম জিজ্ঞেস করলেন, আরো তুমিতো আরব কন্যা নও, আরবী কোথেকে শিখলে?
মাত্র দেড় বছরে মারকানের এক আরবের কাছ থেকে আমি আরবী শিখেছি। আরবের লোকজনকে আমার খুব ভালো লাগে। তাই বলছিলাম, আপনার পবিত্র সান্নিধ্যে আর কিছুটা সময় আমাকে দয়া করে একান্তে বসতে দিন।
আমার কাছে একান্তে বসে তুমি কি করবে? আমি জানি, আপনার পক্ষেই এ ধরনের নির্দেশ জারী করা সম্ভব যে, বিজিত এলাকায় কোন নারীপুরুষের ওপর যে বিজয়ী সৈন্য কোন ধরনের অত্যাচার নির্যাতন না করে। এতেই প্রমাণিত হয় আপনি দেবতাতুল্য। দেবতাদের চেয়ে আপনি কোন অংশেই কম নয়। প্রথমে আমি মনে করেছিলাম, আপনি হয়তো বয়স্ক ব্যক্তি। কারণ এমন ধরনের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় একমাত্র বয়স্ক অভিজ্ঞলোকদের দ্বারাই ঘটে থাকে। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হয়েছে, আপনি ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জ্ঞানী বিচক্ষণ ও সুন্দর। আপনার কথা শোনার পর থেকেই আমি আপনার ভক্ত পূজারীণী হয়ে গেছি।
“এটাই হলো তোমাদের ধর্মের সবচেয়ে মন্দ দিক। তোমরা কোন বিস্ময়কর জিনিস দেখলেই সেটিকে পূজা করতে শুরু করো। কোন জিনিসকে ভয় করলেও তোমরা সেটিকে পূজা করতে থাকো। আমি পূজনীয় হওয়ার মতো কিছুই করি না। আমি যা কিছু বলি যা কিছু করি সবই আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য করি।” আমি স্বধর্ম ত্যাগ করতে প্রস্তুত। আপনি যদি আমাকে আপনার সান্নিধ্যে থাকার অনুমতি দেন তাহলে আমি আর বাড়িতে ফিরে যাব না। তোমাকে বিয়ে করা ছাড়া আমার কাছে রাখার কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমি এদেশে বিয়ে শাদী করতে আসিনি। আমি এই সব শাসকদের মতোও নই, যারা কোন শহর জয় করার পর সেখানকার সুন্দরী তরুণীদের মধ্য থেকে দু’ চারজনকে বিয়ে করে বিবি বানিয়ে রাখে নয়তো শক্তির দাপটে রক্ষিতা করে রাখে। আমি বিলাস ব্যাসনের জন্য এখানে আসিনি। আমি এদেশে এসেছি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে।
শিমু উজির বুদ্ধিমান ও মায়ারাণীর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে বিন কাসিম সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল এবং যে ভাবে যা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্মভাবে আমি সবই করেছি। আমি তাকে কামোদ্দিপ্ত করার সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করেছি। আমি কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি, হাসি, চাউনী তথা আমার রূপ সৌন্দর্যের সবটুকুর প্রয়োগ করে বিন কাসিমের পৌরুষকে আন্দোলিত করার চেষ্টা করেছি, লোকটি আমার কথায় আচরণে হাসতো,
কথা বলতো, কিন্তু তাঁর মধ্যে এমন একটা স্থির ও নির্লিপ্ততা লক্ষ্য করেছি যেন সে আশি বছরের কোন বৃদ্ধ, তার শরীরটা যেন আকাশ থেকে পতিত শিলার মতোই ঠাণ্ডা শীতল।
এক সময় তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। মনে মনে ভাবলাম, এবার তাহলে বরফ গলতে শুরু করেছে। আমি তার এতোটাই কাছে চলে গেলাম যে, আমার জামার আঁচল তার দেহ স্পর্শ করছিল। তিনি আমার ডান হাতটি তার হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন, আমি ভাবলাম এবার তাহলে শিকার আমার ফাঁদে পা দিয়েছে। আমি অপর হাতটিও তার হাতের ওপর দিয়ে দিলাম। তার ভাবদেখে মনে হচ্ছিল, তিনি আমার রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। আমার দৃষ্টি আকর্ষণীমূলক আচরণ তাকে আকৃষ্ট করেছে। তিনি আমার প্রতি আসক্তি বোধ করছেন ভেবে আমি মনে মনে দারুণ উৎফুল্ল। হয়ে উঠি। হঠাৎ তিনি আমার ডান হাতের আংটি পরিহিতা মধ্যাঙ্গুলিটা চেপে ধরলেন। আংটিটি ছিল খুবই ভারী এবং টোপ ওয়ালা। দেখতে দারুণ কারুকার্যময় ছিল সেটি।
তিনি আংটিটির টোপের ওপরে হাত বুলিয়ে বললেন, দারুন সুন্দর আংটিতে।
এটি আপনি নিয়ে নিন। হয়তো আপনার কনিষ্ঠা আঙুলে এটি ধারণ করা সম্ভব হবে? তার আগ্রহের জবাবে আবেগপূর্ণ ভাষায় বললাম আমি। না, আংটির দরকার নেই। এর ভিতরে করে আমার জন্য যা নিয়ে এসেছে, সেটি আমাকে দিয়ে দাও। তাহলেই হবে।
একথা শুনে চকিতে আমি হাত সরিয়ে নিলাম এবং অপর হাতে আংটিটি চেপে ধরলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার চেহারার রং হয়তো বদলে গিয়েছিল। তিনি আমার আংটিওয়ালা হাতটি হঠাৎ ধরে ফেললেন এবং খুব জোরে আমাকে হেচকা টান মেরে তার কাছে নিয়ে নিলেন। আমি এরপরও তার শরীরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমার শরীরের কোমলতা ও ঘ্রাণে তার মধ্যে মাদকতা সৃষ্টির প্রয়াস নিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে প্রায় জড়ানো ভাবে ধরে তার হাতের আংটির কোণা দিয়ে আমার আংটির টোপের নীচের দিকে একটা খোচা মারলেন, তাতে আমার আংটির টোপ খুলে গেল এবং ভিতরে সংরক্ষিত বিষ মেশানো তুলা বেরিয়ে গেল।
আংটির ভিতরে তুলা দেখে বিন কাসিম ঈষৎ মুচকি হাসলেন। আমার তখন প্রাণবায়ু উড়ে যাওয়ার অবস্থা। আমি বিষন্ন চেহারায় এক পলকে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি কিছুক্ষণ পর আমার দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে বললেন, সত্যি করে বলো তো? এটি কি তুমি আমার জন্য আনোনি? অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মাথা তাঁর কথায় দুলে উঠল কিন্তু অস্পষ্ট কণ্ঠে বললাম, না। তিনি দৃঢ় ও শান্তভাবেই বললেন, এই বিষ তুমি আমাকে কি ভাবে পান করানোর চিন্তা করেছিলে? আমার মনে হয়েছিল কাজটি মোটেও কঠিন হবে না, বলল শিমু। কারণ মন্দিরের পুরোহিত; পণ্ডিত ও ঋষিরতী আমার মতো সুন্দরী তরুণির স্পর্শ পেলে প্রখর রুদ্রতাপে বরফের মতোই গলতে থাকে। সেক্ষেত্রে আপনার মতো সুঠাম সুশ্রী যুবক আমার সংস্পর্শে সহজেই গলে যাবেন বলেই আমি মনে করেছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিল, মুসলমানরা মদ পান করে না। কিন্তু তোমার মতো সুন্দরী রূপসীর সংস্পর্শে সহজেই যে কোন মুসলিম তরুণ মুগ্ধ ও উত্তেজিত হবে। তোমার রূপ সৌন্দর্যে মাতাল করার মতো শক্তি আছে। আপনাকে রূপ সৌন্দর্যের যাদু বলে মুগ্ধ বিমোহিত করে পানি কিংবা শরবতের মধ্যে এই বিষ প্রয়োগ করার কথা আমাকে বলা হয়েছিল… এখন আমি একটি কথা বললে আপনি বিশ্বাস করবেন কি-না জানি না।
