“আমরা তোমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলাম।’ বললেন গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী। ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তোমাদের ওপর আমরা কোন চাপ সৃষ্টি করিনি। তোমরা আমাদের এই উদারতার প্রতিদান হিসাবে আমাদের সিপাহসালারকেই হত্যা করার চক্রান্ত করেছ। এর অর্থ হলো তোমরা নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রত্যাহার করে নিয়েছ।”
‘হে দখলদার আরব! আমি জীবন ত্যাগ করতে পারি কিন্তু ধর্ম ত্যাগ করতে পারি না। তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বলল পুরোহিত। আমরা শুধু তোমার সেনাপতিকেই হত্যা করতে চাইনি, হত্যা তালিকায় তুমিও ছিলে। তোমার সেনাবাহিনীর ছোট বড় সকল সেনাধ্যক্ষ ও কমান্ডারকেও হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তোমাদের সাথে আমাদের কোন বৈষয়িক শত্রুতা নেই, শত্রুতার মূল কারণ ধর্ম। আমরা ধরা পড়লে নির্ঘাথ নিহত হবে এই আশঙ্কা থাকার পরও
জেনে শুনেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিলাম। তোমরা তোমাদের ধর্মের জন্য যেভাবে জীবন ত্যাগ করতে পারো, আমরাও ধর্মের জন্যে জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম।
‘খুবই নির্বোধ তোমরা। বাতিলের অনুসারীদের অবস্থা এমনটাই হয়ে থাকে, প্রকৃত বাস্তবতা এরা অনুধাবন করতে পারে না।’
‘হে নির্বোধ আরব সৈনিক। আমি তোমার সাথে তর্কে লিপ্ত হবনা’ তাচ্ছিল্য মাখা কণ্ঠে বলল পুরোহিত। আমার জীবনটাতো তোমাদের তরবারীর আঘাতের জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুণছে।
শোনো, তোমাকে একথা বলে দিচ্ছি। তোমরা এই অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে পারবে বটে কিন্তু হিন্দুত্ববাদ মানুষের রক্তের সাথে বিষের মতো মিশে থাকবে এবং ধীরে ধীরে সনাতন ধর্মের প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আমাদের আত্মাগুলো প্রেতাত্ম হয়ে এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়াবে। পুরোহিত দু’হাত প্রসারিত করে ওপরে উঠিয়ে বলল, আমি তোমাকে একটা ভবিষ্যদ্বাণী করছি, শুনে রেখো-তোমাদের সিপাহসালার মুহাম্মদ বিন কাসিম শেষ পর্যন্ত নিহত হবে। হিন্দুদের হাতে যদি সে নিহত নাও হয় তবে আপনজনদের হাতে হলেও সে নিহত হবে।’
‘কেন সে নিহত হবে? জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান। আমার দৃষ্টি বহুদর দেখতে পারে। বলল পুরোহিত। হে সৈনিক, আমি জ্যোতিষী বা গণক নই, কিন্তু দিব্য দৃষ্টিতে আমি যা দেখতে পাচ্ছি তাই তোমাকে বললাম।’
“তোমরা হয়তো বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নয়তো জ্ঞানান্ধ পুরোহিত? সত্য উপলব্ধি করার মতো জ্ঞান তোমাদের নেই নয়তো সত্যকে সত্য জেনেও তোমরা তা স্বীকার করো না।” বললেন গোয়েন্দা প্রধান। অতঃপর পুরোহিতকে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সে দিনই মুহাম্মদ বিন কাসিম নিরূনের সকল মন্দির বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং হিন্দুদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে পূজা অর্চনা করার হুকুমজারী করলেন। সেই সাথে মন্দিরের চক্রান্তে জড়িত সকল পুরোহিতের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দিলেন।
নিরূনে যখন চক্রান্তকারী পুরোহিতদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছিল ঠিক সেই সময় রাজা দাহিরের রাজধানীতে হত্যাকাণ্ডের চেয়েও জঘন্য অপরাধের
অপরাধী হিসেবে অবনত মস্তকে মায়ারাণী ও উজির বুদ্ধিমানের সামনে শিমু দণ্ডায়মান। পথিমধ্যে শিমুকে কোন পানাহার করতে দেয়া হয়নি। তার হাত পা রশিতে বাধা ছিল। দীর্ঘ ভ্রমণে রশিতে হাত পা বাঁধা অবস্থায় পানাহার বঞ্চিত থাকার কারণে শিমুর শারীরিক অবস্থা এতোটাই কাহিল হয়ে পড়েছিল যে, সে ঠিক মতো দাঁড়াতে পারছিল না। এমতাবস্থায় মায়ারাণী তাকে জেরা করছিল, বিন কাসিমের পরিবর্তে তুমি পুরোহিতকে কেন বিষ পান করালে?
কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও সে শুধু এতটুকুই বলতে পারছিল আমাকে এক গ্লাস পানি দিন…। কিন্তু শিমুকে একফোঁটা পানিও পান করতে দেয়া হলো না।
এক পর্যায়ে শিমু অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, পিপাসায় যদি আমি মারা যাই তাহলে আপনারা আমার কাছ থেকে তো কিছুই জানতে পারবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে পানি পান করান, আমি কোন সত্যই গোপন করবো না। পানি না খাইয়ে মেরে ফেললে আপনারা সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবেন না।
অতঃপর তাকে সামান্য খাবার ও পানি পান করতে দেয়া হলো। সামান্য পানাহারের পর শরীরে কিছুটা শক্তি ও সতেজতা ফিরে পেলে শিমু চক্রান্ত সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছিল, তা ছিল এমন- আমরা আমাদের পরিকল্পনা মতো একজন অর্ধবয়স্কা মহিলার নেতৃত্বে কয়েকজন তরুণী মুহাম্মদ বিন কাসিমের আবাসগৃহে পৌছি। মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে গিয়ে আমাদের দলনেত্রী বিন কাসিমকে মোবারকবাদ জানায় এবং তার সৈন্যরা শহরের নারী শিশুদের ইজ্জত আব্রুর সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে এজন্য তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অতঃপর পরিকল্পনা মতো শিমু বিন কাসিমের পাশে বসে পড়ে। অন্যান্য তরুণিরা বয়স্কা মহিলার সাথে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে ফিরে যায়। তারা সবাই যেহেতু চক্রান্ত সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল তাই শিমুর জন্য তারা আর অপেক্ষা করেনি। শিমু বিন কাসিমের কক্ষেই অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে শিমুকে কক্ষে থাকতে দেখে বিন কাসিম তাকে বললেন, তুমিও চলে যাও। তোমার সাথীরা হয়তো তোমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। জবাবে শিমু বলল—আপনি কি আর কিছুটা সময় আপনার পবিত্র সান্নিধ্যে আমাকে থাকার অনুমতি দিতে পারেন না? আরবী ভাষায় আবেগাপ্ত কণ্ঠে মিনতি করলো শিমু।
