আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে

১. ৯৭ হিজরী মোতাবেক

আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে / মূল: এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ / অনুবাদ: মুহাম্মদ শফিউল আলম

অর্পণ:

প্রিয়তমা স্ত্রীকে,
আমার মতো অভাজন যাকে কিছুই দিতে পারেনি। তার এক পাশে আবদুল্লাহ মারযুক সাদী আর অন্য পাশে আবদুল্লাহ মাসরুর মাহদী। যাদেরকে নিয়ে আমার দিনের সাধনা, আর রাতের আরাধনা। যাদের সুখের জন্য আমি বিনিদ্র রজনী যাপন করি, যাদের কল্যাণের জন্য আমি নিরলস দিবস অতিবাহিত করি।
—অনুবাদক

.

প্রথম সংস্করণের প্রসঙ্গকথা

৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জুলাই কয়েক হাজার অকুতোভয় মর্দে মুজাহিদ আন্দালুসিয়ার (স্পেন) সমুদ্রসৈকতে অবতরণ করার পর নিজেদের রণতরী জ্বালিয়ে দেন, যেন ফিরে যাওয়ার কোন উপায় না থাকে। রণতরী জ্বালিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা বীরত্ব ও সাহসিকতার এমন এক কীর্তিগাথা রচনা করেন, যা ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও ঈমান-জাগানিয়া ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত। এই অমর বীরত্বগাথা নিয়ে রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে।

এমনিতেই আমাদের সমাজে ইতিহাস অধ্যয়নের আগ্রহ খুবই কম, তার উপর ইসলামী ইতিহাস অধ্যয়নের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এ কারণেই বোধ হয়, বাংলা ভাষায় ইসলামী ইতিহাস নিয়ে মৌলিক কোন রচনা তেমন একটা দেখা যায় না। বাংলা ভাষায় যেসব ইসলামী ইতিহাস আমরা দেখতে পাই, তার বেশির ভাগই বিদেশী ভাষার অনুবাদ।

ইসলামী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে উর্দু সাহিত্যকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ বলেই মনে হয়। তাই আমরা দেখতে পাই, উর্দু ভাষায় মৌলিক ইসলামী সাহিত্যের পাশাপাশি ইসলামী ইতিহাস নির্ভর উপন্যাসের বিশাল সংগ্রহ গড়ে উঠেছে এবং সেসব ঐতিহাসিক উপন্যাস বাংলা ভাষায় অনুদিত হয়ে বাংলা ভাষার ভাণ্ডারকে সুসমৃদ্ধ করছে।

উর্দু ভাষায় ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করে যে সকল উপন্যাসিক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদ্ভূত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ অন্যতম। তিনি তাঁর অনবদ্য রচনাশৈলী ও শিকড়সন্ধানী লেখনীর মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তাঁর লেখালেখির বিষয়-বস্তু ইতিহাসের মতো একটি রস-কষহীন বিষয় হলেও তিনি তাঁর নান্দনিক উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সাবলিল আবহ সৃষ্টি করেন যে, পাঠকগোষ্ঠী মোহমুগ্ধ হয়ে পড়েন।

এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস রচনা করলেও ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা কোথাও লজ্জিত হতে দেন না। এখানেই অন্যান্য উপন্যাসিকের সঙ্গে তাঁর স্বাতন্ত্র সুনির্দিষ্ট। তাঁর যুগে এবং পরবর্তী সময়ে অনেকেই ইসলামী ইতিহাসকে আশ্রয় করে উপন্যাস রচনা করেছেন; কিন্তু নির্মম সত্য হলো, তাদের অনেকেই ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতা লঙ্ঘন করেছেন। তারা কাল্পনিক পাত্র-পাত্রির মাধ্যমে প্রেম-প্রীতির আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছেন এবং খালেদ বিন ওয়ালিদ, মুহাম্মদ বিন কাসেম ও তারিক বিন যিয়াদের মতো ইতিহাসখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে সিনেমার নায়ক-নায়িকার সমপর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। পক্ষান্তরে এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন। পাঠক তাঁর লেখায় তথ্যসূত্রসহ পরিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস দেখতে পাবেন। সেই সঙ্গে উপন্যাসের যাবতীয় উপকরণ, রোমাঞ্চ ও এ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করবেন।

অনুবাদটি সুখপাঠ্য করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোন ত্রুটি করা হয়নি, তারপরও ভুল-ক্রটি থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই স্বহৃদয় পাঠকের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

—মুহাম্মদ শফিউল আলম
মোবাইল : ০১৯১ ৬০০৯১৫৯

.

অখণ্ড সংস্করণের প্রসঙ্গকথা

‘আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে’ বিশাল কলেবরে লেখা ঐতিহাসিক এক উপন্যাস। পাঠকের সুবিধার কথা চিন্তা করে তিন খণ্ডে উপন্যাসটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী নাদিয়াতুল কুরআন প্রকাশনী থেকে ‘আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর পাঠকদের প্রচণ্ড চাহিদা এবং দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য বারবার তাগাদার ফলে অল্প সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ সমাপ্ত করে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে উক্ত প্রকাশনীর পক্ষ থেকে অবশিষ্ট খণ্ডগুলো প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করা হয়। ফলে তৃতীয় খণ্ডের কাজ একেবারে থমকে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ না হওয়ার বেদনায় আর অন্য কাজের ব্যস্ততায় ‘আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে’র তৃতীয় খণ্ড সমাপ্ত করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। কালেভদ্রে তৃতীয় খণ্ড নিয়ে বসলেও কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। যদিও অধিকাংশ কাজ ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছিল। এভাবে দিন-সপ্তাহ-মাস-বছর গড়িয়ে যেতে থাকে।

অবশেষে ২০১৫ সালে ডিসেম্বর মাসে প্রকাশনা জগতে ‘পয়গাম প্রকাশন’ আত্মপ্রকাশ করলে কিছু গ্রন্থ প্রস্তুত করার দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত হয়। এই সুযোগে ‘আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতের তৃতীয় খণ্ডের কাজ সমাপ্ত করার তাগাদা অনুভব করি এবং যথা সময়ে তৃতীয় খণ্ডের কাজ সমাপ্ত হয়। কিন্তু পয়গাম প্রকাশন’ খণ্ড খণ্ড রূপে উপন্যাসটি প্রকাশ করতে চায় না, বরং সম্পূর্ণ উপন্যাসটি এক সঙ্গে এক মলাটের ভিতরে প্রকাশ করতে চায়। এতে করে প্রকাশকের যেমন ব্যয়-সংকোচন হবে, তেমনি পাঠককেও অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে না। তার উপর এক সঙ্গে সম্পূর্ণ উপন্যাস পড়ার আনন্দ পাঠকের জন্য ‘উপরি পাওনা’ থাকবে।

প্রকাশকের খরচ কমল, আর পাঠকের সাশ্রয় হল, কিন্তু অনুবাদক হিসেবে সব ভার এসে পড়ল আমার কাঁধে। আগাগোড়া সম্পূর্ণ উপন্যাস দেখতে গিয়ে অনেক অসঙ্গতি দৃষ্টিগোচর হল। বিশেষ করে উর্দু ভার্সনে স্থানসমূহের যে নাম ব্যবহার হয়েছে, সেগুলোর সাথে আমাদের দেশে প্রচলিত নামের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যেমন, উর্দু ভার্সনে আছে ‘গোয়াডিলেট। এটি একটি নদীর নাম। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা এই নদীকে চিনি ‘গুইডেল কুইভার’ নামে। ব্যক্তি ও স্থানের নামের ব্যাপারে এমন অসংখ্য অমিল আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তারপরও যেহেতু উর্দু থেকে গ্রন্থটি অনুবাদ করা হয়েছে, সেহেতু উর্দু ভার্সনে যেমনটি লেখা আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটিই বহাল রেখেছি। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে আমরা পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় যে কৈফিয়তটি পাঠকের সামনে আমাকে দিতে হবে, তা হল অনুবাদকের নাম নিয়ে। ‘আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতের ১ম খণ্ড যখন প্রকাশিত হয় তখন অনুবাদকের নাম ছিল আদনান আজাদ। মূলত এটি আমার একটি ছদ্মনাম। নামের এই ছদ্মাবরণে আমি আর থাকতে চাই না। তাই স্বনামে পাঠকের সামনে উপস্থিত হলাম। আশা করি, প্রিয় পাঠক আমার এই ‘লুকোচুরি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাযত করুন। আমীন!

–অনুবাদক

.

তারিক বিন যিয়াদ কর্তৃক স্পেনের সদ্রসৈকতে রনতরী জ্বালিয়ে দেওয়ার ঈমানদীপ্ত দাস্তান
আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

০১.

৯৭ হিজরী মোতাবেক ৭১৫ খ্রিস্টাব্দের কথা। প্রতি বছরের মতো এ বছরও হজ্জের মৌসুমে মক্কা শরীফে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটেছে। শহর ও শহরের আশপাশে, অলিগলিতে, রাস্তাঘাটে হাটবাজারে সর্বত্রই শুধু মানুষ, আর মানুষ। যেন সুদূর বিস্তৃত উপচে পড়া এক জনসমুদ্র।

এই বিশাল জনসমুদ্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, তাঁদের সকলের লেবাস এক। ডান বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে টাখনু পর্যন্ত নেমে আসা সফেদ চাদর। মুণ্ডানো মাথা, আর নাঙ্গা পা। তাঁদের সকলের দৃষ্টির লক্ষ্যস্থল, আর আশা-আকাক্ষার কেন্দ্রবিন্দু এক। তাদের অন্তর, আর অন্তরলোকের দীপাধার একমাত্র খানায়ে কাবা।

তাঁদের লেবাস যেমন এক, তেমনি তাদের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মবিশ্বাসও এক। তাঁদের মুখে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর গুঞ্জন-ধ্বনি, আর বুকে ঈমান সংরক্ষণের শপথবাণী। তাঁরা সকলেই হলেন হাজি। হজ্জ আদায়ের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছেন।

গোটা মক্কা শহর ছোট বড় তাবুতে ভরে গেছে। তাবুতে ঘেরা এই ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় নারী-পুরুষ আছেন, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েও আছে।

এই বিপুল জনসমুদ্রের লেবাস এক। কিন্তু গায়ের রং ভিন্ন। তাদের মাঝে গৌরবর্ণের মানুষ যেমন আছে, তেমনি চাঁদহীন অন্ধকার রাতের ন্যায় কালো চেহারার মানুষও আছে। বাদামী রং-এর মানুষ যেমন আছে, তেমনি গোলাপী চেহারার মানুষও আছে। আছে কমজোর ও দুর্বল মানুষ। সিপাহী আছে, আছেন সিপাহসালার। মনিব আছেন, আছে গোলামও।

মনে হচ্ছে, সকলেই যেন একই গোত্রের মানুষ। তাদের চাল-চলন এক। স্বরবে ও নীরবে তারা এক। তাঁদের বাচনভঙ্গি এক। তারা কোন এক মুলুক থেকে আসেননি; এসেছেন বিভিন্ন মুলুক থেকে। তাদের মধ্যে কেউ এসেছেন আফ্রিকা। থেকে, কেউ আবার চীন থেকে। কেউ এসেছেন ইরান থেকে, কেউ আবার তুরান, থেকে। মোটকথা, যেখানেই ইসলামের নূর পৌঁছেছে, ঈমানের আলো ফুটেছে সেখান থেকেই মুসলমানগণ হজ্জ উপলক্ষে মক্কা শরীফ চলে এসেছেন।

তারা একজন অন্যজনের ভাষা বুঝেন না, কিন্তু তাদের সকলের হৃদয় একই সুতার বাঁধনে বাঁধা। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে হৃদয় দিয়ে অনুভব করছেন। একজনের আবাস-ভূমি অন্যজনের আবাস ভূমি থেকে যোজন যোজন মাইল দূর, কিন্তু তাদের হৃদয়-ভূমির মাঝে নেই কোন দূরত্ব। সকলের মাঝেই এমন সজ্জনভাব যে, কেউ কাউকে আজনবী মনে করেন না। মনে করেন না পরদেশী।

সফেদ এহরাম পরিহিত এই বিশাল জনসমুদ্রের সকলের অনুভূতিও সফেদ। তাদের অবচেতন মনের অনুভূতি হল–এটাই তাদের প্রিয় ভূমি। এটাই তাদের জীবন-সফরের আখেরী মনযিল। আস্থা ও বিশ্বাসের পবিত্র অনুভূতি তাদের চেহারায় এক অভূতপূর্ব উজ্বল্য এনে দিয়েছে।

মক্কা শরীফের আকাশে-বাতাসে মৃদুমন্দ ছন্দে সুরের ঝঙ্কার তুলে সকলের মুখ থেকে বের হয়ে আসছে :

“লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নালহামদা ওয়াননে’মাতা লাকা ওয়ালমুল লা-শারিকা লাক্।”

মোহনীয় এই পবিত্র সুরের মূর্ঘনায় চতুর্দিকে এক নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রাজা-বাদশাহদের গর্ভিত মস্তকও বিনয়াবনত হয়ে পড়ছে। হৃদয়ের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে আল্লাহ প্রেমের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভাষা-বর্ণ, উঁচু-নীচুর বিভেদ ভুলে সকলেই যেন আল্লাহর রঙ্গে নিজেকে রাঙ্গিয়ে তুলছে।

হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনও কয়েকদিন বাকি। দূরদরাজ থেকে এখনও হাজিগণ আসছেন। বিস্তৃত প্রান্তর জোড়ে তাঁবুর বসতি গড়ে উঠছে। দিন দিন উট আর দুম্বার আওয়াজ বেড়ে চলছে।

***

এই বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে কিছু লোক ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসে আছে। তাদের একটি হাত সামনের দিকে প্রসারিত। কেউ কেউ তাদের সামনে এক খণ্ড কাপড় বিছিয়ে রেখেছে। কারো কারো হাত কাপড়ের থলির মধ্যে। তারা সকলেই ভিখারী। তাদের কেউ কেউ আবার অঙ্গহীন। তারা সকলেই মরু বেদুইন।

হজ্জের দিনগুলোতে তারা মক্কা শরীফ চলে আসে। ভালো আয়-রোজগার করে হজ্জ শেষ হলে চলে যায়।

এই ভিখারিদের মাঝে একজন বৃদ্ধ ভিখারিও আছেন। এই ভিখারির মাঝে বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য নেই। অন্যান্য ভিখারির মতো তার লোবাসও ছিন্নভিন্ন। হাত পায়ে ময়লা। চেহারা ধূলিধূসরিত। দাঁড়িতে লেগে থাকা বালুকণা রোদের আলোতে চিকচিক করছে।

অন্যান্য ভিখারি ও তার মাঝে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ ও কমজোর। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। চোখে পড়ার মতো আরেকটি বিষয়ও তার আছে, যে কারণে লোকেরা তার দিকে কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার পা বেড়ি দিয়ে বাঁধা। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি একজন কয়েদি। বিশেষ অনুগ্রহে তাকে ভিক্ষাবৃত্তির অনুমতি দেয়া হয়েছে।

‘তুমি কয়েদি নাকি?’ প্রথম দিনই একজন হাজি সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন।

বৃদ্ধ সম্মতিসূচক মাথা উপরে নিচে করলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।

‘তুমি কি চুরি করেছ?” আরেকজন হাজি সাহেব জানতে চাইলেন।

‘চুরি করলে তো আমার হাত কেটে দেওয়া হত।‘ বৃদ্ধ তাঁর বলিষ্ঠ দুটি বাহু সামনের দিকে প্রসারিত করে উত্তর দিলেন।

‘কোন মেয়েলোকের সাথে ধরা পড়েছিলে নাকি?’ অন্য আরেকজন হাজি সাহেব জিজ্ঞস করলেন।

‘তাহলে তো আমি যিন্দা থাকতাম না। বৃদ্ধ কাঁপা কাঁপা আওয়াজে বললেন। ‘তাহলে তো আমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হত।

‘তাহলে কী অন্যায় করেছ তুমি?’ প্রথমজন জানতে চাইলেন। ‘ভাগ্য আমার সাথে প্রতারণা করেছে।’ বৃদ্ধ উত্তর দিলেন।

‘অপরাধীদের ভাগ্য এমনই প্রতারণা করে থাকে। দ্বিতীয়জন ফোড়ন কেটে বললেন।

বৃদ্ধ ভিখারির দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য জ্বলসে উঠল। তিনি তাঁর আশ-পাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে রইলেন।

‘অপরাধী তার অপরাধের কথা কখনও স্বীকার করে না। তৃতীয়জন দার্শনিকের ন্যায় মন্তব্য করলেন।

‘আমার অপরাধ হল, খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক ইন্তেকাল করেছেন। বৃদ্ধ ভিখারি বললেন। আর তার স্থানে তাঁর ভাই সুলায়মান বিন আবদুল মালেক খলীফা নিযুক্ত হয়েছেন। দামেস্কের কয়েদখানায় গিয়ে দেখ, আমার মতো বহু কয়েদি বিনা অপরাধে সেখানে শাস্তি ভোগ করছে।

অন্য একজন হাজি বললেন, “তুমি কে? তোমার নাম কি? কোন কবিতার সাথে তোমার সম্পর্ক?

‘আমার কোন নাম নেই। বৃদ্ধ ভিখারি বললেন। কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার নামই অবশিষ্ট থাকবে। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন। কেবলমাত্র আল্লাহর নামই অবশিষ্ট থাকবে…। যদি কিছু দাও তাহলে আল্লাহকে দেবে…। আল্লাহ তোমাদের হজ্জ কবুল করবেন। আমি আমার অপরাধের কথা বলতে পারব না। যদি বলি, তাহলে সেটাও আমার অপরাধ হবে। “ওয়া তুইঙ্গু মান তাশাউ ওয়া তুযিল্প মান তাশাউ…।” তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন, যাকে ইচ্ছা বেইজ্জত করেন…।’

হাজিগণ কিছু পয়সা নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। বৃদ্ধ ভিখারী তার পায়ে বাধা বেড়ি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। এই বেড়ি দেখে মানুষের মনে যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়, তার উত্তর তার জানা আছে, কিন্তু সে উত্তর দেওয়ার সাহস তার নেই। তিনি খলীফা সুলাইমান বিন আবদুল মালেকের সাথে দামেস্ক থেকে এসেছেন। খলীফার কাফেলার সাথে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। তার শাস্তি এটাই নিধারিত হয়েছে যে, তিনি মক্কা এসে ভিক্ষা চাইবেন।

তিনি হাত প্রসারিত করে চুপচাপ বসে থাকতেন। হাজিগণ তাঁকে বয়োবৃদ্ধ মনে করে অন্যদের তুলনায় সামান্য বেশিই দান করতেন। কিন্তু তিনি তাতে খুশী হতে পারতেন না।

এশার নামাযের পর হাজিগণ নিজ নিজ তাঁবুতে চলে গেলে তিনি উঠে সামান্য খাদ্য কিনে খেয়ে নিতেন। তারপর সারাদিনের সঞ্চয় গুনতে বসতেন। গুনা শেষ হলে তাঁর মন দমে যেত। তিনি আরো বেশী দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তেন। হজ্জের এই কয়েকটি দিনে তাকে দুই লাখ দিনার সগ্রহ করতে হবে। অল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সগ্রহ করা তাঁর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না।

তাঁর মনে হতো, তিনি চুপচাপ বসে থাকেন বলেই পয়সা কম পান। অগত্যা তিনি পয়সা চাইতে শুরু করলেন। কিন্তু অন্যান্য ভিখারিদের মতো দরদ মেশানো আওয়াজে ভিক্ষা চাইতে পারতেন না। তাদের মতো ক্ষুধার্ত শিশু-সন্তানের নাম করে কাঁদতে পারতেন না। তিনি একটিমাত্র কথাই বলতেন, তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন, যাকে ইচ্ছা বেইজ্জত করেন।

***

বৃদ্ধ ভিখারি ভিক্ষা চাচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার পিছন দিক থেকে এসে পা দিয়ে তাঁকে খোঁচা মারল। বৃদ্ধ ঘুরে তার দিকে তাকালে সে বলল, ‘বুড়ো, পালানোর চিন্তা করছ নাকি?

‘কখনও শুনেছ, আন্দলুসিয়ার জিহাদী ময়দান থেকে কোন মুজাহিদ পালিয়ে গেছে? বৃদ্ধ বললেন। আমি পালিয়ে যেতে চাইলে তো…।

‘এখনও তোমার দেমাগ থেকে আন্দালুসিয়ার খোয়াব দূর হয়নি? লোকটি তাকে আরেকবার আঘাত করে বলল।

“তোমার খলীফাকে বলে দিও, তার হুকুমত অতিসত্বর খতম হয়ে যাবে।’ বৃদ্ধ ভিখারি বললেন। মুহাম্মদ বিন কাসেমের হত্যাকারীকে আমার এই পয়গাম পৌঁছে দিও। আর তুমি আমাকে যে দুটি আঘাত করেছ, তার জবাব কেয়ামতের দিন দেব।’

আঘাতকারী তাচ্ছিল্যভরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেল।

আরেক দিনের ঘটনা। আফ্রিকা থেকে আগত দু’জন হাজি সাহেব বৃদ্ধ ভিখারির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ বলছিলেন, ‘আল্লাহ যাকে চান ইজ্জত দান করেন, যাকে চান বেইজ্জত করেন।

এই বৃদ্ধকে তো বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।’ একজন আফ্রিকান বললেন।

‘হ্যাঁ, অন্যান্য ভিখারিদের মতো নিজের অক্ষমতার কথা বলে না। নাকি-কান্না কাঁদেনা। দ্বিতীয়জন বললেন।

উভয়েই নিজ নিজ থলিতে হাত ঢুকিয়ে পয়সা বের করে আনলেন। ভিখারি মাটিতে বসে মুখ উঁচু করে তাদের দেখছিলেন। এক আফ্রিকান তাঁকে পয়সা দিতে গিয়ে চমকে উঠলেন। তিনি ভিখারির সামনে বসে পড়লেন। বৃদ্ধ ভিখারির চিবুক ছেয়ে চেহারা উঁচু করে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নাম কি?

‘আমার কোন নাম নেই। বৃদ্ধ বললেন। আমি আল্লাহ তাআলার এই ফরমানের বাস্তব নিদর্শন–তিনি যাকে চান ইজ্জত দান করেন, যাকে চান বেইজ্জত করেন।

আফ্রিকান আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন। আল্লাহর কসম, আপনি মুসা, মুসা বিন নুসাইর। আফ্রিকার সম্মানিত আমীর।

‘আন্দালুসিয়ার বিজেতা মুসা বিন নুসাইর! দ্বিতীয়জন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

বৃদ্ধ ভিখারির চোখ থেকে অশ্রুধারা নেমে এল।

‘এ কোন অপরাধের শাস্তি আপনি ভোগ করছেন? প্রথমজন জানতে চাইলেন।

‘কিছু না। বৃদ্ধ আসমানের দিকে ইশারা করে বললেন। তিনি আবেগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে ছিলেন।

‘আমরা শুনে ছিলাম, আপনি খলীফার রোশানলে পড়েছেন। দ্বিতীয়জন বললেন।

‘আমরা তো কখনও কল্পনাও করতে পারিনি যে, আপনি ভিখারি হয়ে গেছেন। প্রথমজন বললেন।

‘আমাকে ভিখারি বানানো হয়েছে।’ মুসা বিন নুসাইর তার পায়ের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দিয়ে বললেন। আমি খলীফার কয়েদি। দামেস্কের সেই কয়েদখানায় আমি ছিলাম, যেখানে খলীফা সিন্ধু-বিজেতা মুহাম্মদ বিন কাসেমকে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন।

খলীফা সুলায়মান হজ্জ আদায়ের জন্য মক্কা শরীফ এসেছেন। আমাকেও সাথে করে নিয়ে এসেছেন। ভিক্ষা করে আমি যেন তাকে দুই লাখ দিনার আদায় করে দেই। অন্যথায় এমনিভাবে পায়ে বেড়ি বাঁধা অবস্থায় আমাকে আজীবন ভিক্ষা চাইতে হবে।

‘দুই লাখ দিনার!’ প্রথমজন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। এটা কি আন্দালুসিয়া বিজয়ের জরিমানাস্বরূপ আদায় করতে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল। সম্ভবত মুসা বিন নুসাইরের দীর্ঘ সময় কথা বলার মতো হিম্মত ছিল না, কিংবা তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি প্রশ্নকারীর চেহারার প্রতি এক মুহূর্ত চেয়ে থেকে এমন ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে দিলেন, যেন তার ঘুম পেয়েছে।

তাঁর বয়স প্রায় আশি বছর হয়েছিল। তাঁর যিন্দেগীর ষাটটি বসন্ত অতিবাহিত হয়েগেছে জেহাদের ময়দানে ঘোড়ার পিঠে শাহসওয়ারী করে। কয়েকটি যুদ্ধে তিনি বেশ জখমী হয়ে ছিলেন। তাঁর শরীরে এমন কোন স্থান নেই যেখানে জখমের কোন চিহ্ন নেই। তার ক্ষত বিক্ষত শরীর ছিল একটি চলমান ইতিহাস। সেই ইতিহাস ইসলামের গৌরবের; গর্বের ইতিহাস। জ্ঞানে-গুণে, বিদ্যা-বুদ্ধিতে তার অবস্থান ছিল অনেক উর্ধ্বে।

এই দুই আগন্তক ছিলেন আফ্রিকান। জাতিতে তারা ছিলেন বার্বার। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিবাসী। আজ জুলুম ও নির্যাতনের চরম অবস্থা বুঝানোর জন্য যে ‘বর্বর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাও এই বার্বার জাতির প্রতি ইঙ্গিত করেই বলা হয়। তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-হানাহানি, আর লুটতরাজের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। যুদ্ধনীতি সম্পর্কে তাদের তেমন কোন ধারণা ছিল না। কিন্তু তাদের দুঃসাহস আর হিংস্রতা শক্তিশালী দুশমনকেও ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলত। মোটকথা, তারা ছিল হিংস্র ও জিঘাংসা পরায়ন এক জাতি।

তারা কয়েকবারই শক্রর হাতে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু কোন শক্তিই তাদেরকে বেশি দিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি। অবশেষে আরব মুজাহিদগণ তাদের দেশ আক্রমণ করেন। এই মুজাহিদ লস্করের সিপাহসালার ছিলেন, উতবাহ বিন নাফে ফেস্ত্রী। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তিনি এই বার্বারদের উপর বিজয় লাভ করতে সক্ষম হন।

বার্বার জাতি কিছু দিন পর্যন্ত পরাজয় মেনে না নিয়ে লড়াই করতে থাকে। তারা অপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। আর সিপাহসালারগণ তাদেরকে বাহুবলে দাবিয়ে রাখার পরিবর্তে ইসলামের সুমহান শিক্ষার মাধ্যমে বশীভূত করে ফেলেন।

বার্বারদের নিজস্ব একটি ধর্ম ছিল, কিন্তু তার কোন ভিত্তি ছিল না। বিজয়ী মুসলমানগণ তাদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরলে তারা দ্রুত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। তাদেরকে ফৌজ ও প্রশাসনের বড় বড় পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের উপর বিভিন্ন যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ফলে তাদের মাঝে শৃঙ্খলাবোধ জন্ম নেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে তারা ইসলামের পক্ষে এক বিশাল সামরিক শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

***

মুসা বিন নুসাইর যখন আফ্রিকার আমীর ছিলেন তখন তিনি বার্বারদের বিদ্রোহের সর্বশেষ ফুলিঙ্গকে নির্বাপিত করে দেন। যে মুসা বিন নুসাইর যুদ্ধের ময়দানে কাফেরদের জন্য ছিলেন আপাদমস্তক গজব, সেই মুসাই বিদ্রোহী বার্বারদের জন্য ছিলেন রেশমের চেয়েও কোমল, আর মধুর চেয়েও মিষ্ট। মূলত তাঁর এই বন্ধুসুলভ আচরণই সমগ্র বার্বার জাতি, বিশেষ করে বাবার সরদারদেরকে ইসলামের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য করে। তাদেরকে ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বানিয়ে দেয়।

হজ্জ করতে আসা বার্বার সেই দুই সরদারও প্রকৃত মুসলমান হিসেবে মুসা বিন নুসাইরের হাতে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদেরকে প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গড়ে তুলে ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন, ইউসুফ বিন হারেছ। অন্যজন খিযির বিন গিয়াস। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁদের এই নাম রাখা হয়। তারা উভয়ে মুসাকে ভিখারি রূপে দেখা সত্তেও আগের মতোই সম্মান ও তাজীম প্রদর্শন করছিলেন।

‘আফ্রিকার সম্মানিত আমীর!’ ইউসুফ বিন হারেছ বললেন। আপনি বলুন, আমরা আপনার কী মদদ করতে পারি?

‘কিছুই না।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে আমার কোন গুনাহের শাস্তি দিচ্ছেন।

‘কিছু একটা বলুন, ইবনে নুসাইর! আপনি চাইলে আমরা খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করব।’ খিযির বিন গিয়াস বললেন।

ইউসুফ বিন হারেছ মুসার কানে কানে বললেন, ‘আমরা সুলায়মান বিন আবদুল মালেককে হত্যা পর্যন্ত করতে পারি। তিনি হজ্জ আদায়ের জন্য এসেছেন, কিন্তু লাশ হয়ে দামেস্ক ফিরে যাবেন।

তারপর কি হবে?’ মুসা বিন নুসাইর জিজ্ঞেস করলেন।

‘নতুন খলীফা আপনাকে এই শাস্তি থেকে অব্যহতি দেবেন।’ ইউসুফ বললেন। আমরা বুঝতে পারছি, আপনি সুলায়মান বিন আবদুল মালেকের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছেন।’

‘আমি যদি তাকে হত্যা করাই তাহলে আমিও আল্লাহর দরবারে ব্যক্তিগত হিংসা চরিতার্থকারী হিসাবে অপরাধী সাব্যস্ত হব। মুসা বিন নুসাইর বললেন। আমি নিজেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারতাম, কিন্তু বন্ধু আমার! আপন প্রাণের চেয়েও ইসলামের আজমত আমার নিকট অনেক বেশি প্রিয়। আমি এবং আমার পূর্ববর্তী আমীরগণ আফ্রিকায় তোমাদের জাতিগত বিদ্রোহ কেন দমন করে ছিলাম? তোমাদেরকে গোলাম বানানোর জন্য নয়; বরং মুসলমানদের মাঝে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য। কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য।’

‘আমি আর কদিন বাঁচব? আমার জীবন-আকাশে আর কটা চাঁদ উদিত হবে? সুলায়মানও চিরকাল বেঁচে থাকবে না। তাকেও একদিন মরতে হবে। একমাত্র দ্বীন-ইসলামই যিলা থাকবে। একবার যদি খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় তাহলে এই বিদ্রোহের আগুন সে সকল মুলুককেও আক্রান্ত করবে, যেখানে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাকে তো কেবল নিজেকে বাঁচালে চলবে না। প্রাণপ্রিয় ধর্ম ইসলামকেও বাঁচাতে হবে।

এই দুই বার্বার সরদার যখন মুসা বিন নুসাইরের নিকট খলীফা সুলায়মানকে হত্যা করার পরিকল্পনা পেশ করছিলেন আর তার খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কথা বলছিলেন, সেই মুহূর্তে এক হাজি সাহেব তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। সে আগ্রহ নিয়ে তাঁদের কথা শুনতে লাগল। ইউসুফ তার দিকে তাকিয়ে বললেন।

‘তুমি কি এই বৃদ্ধ ভিখারির তামাশা দেখছ? তাঁকে কিছু দিতে হলে আল্লাহর নামে দিয়ে চলে যাও।’

‘আমার আফ্রিকান ভাই।’ লোকটি বলল। আমি তোমাদের কথা শুনছিলাম। এই বৃদ্ধের দুঃখের কথা শুনে আমার অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! এই বুযুর্গ যদি আমাকে নির্দেশ দেন তাহলে আমি জীবনবাজি রেখে খলীফাকে হত্যা পর্যন্ত করতে পারব। এই মহান ব্যক্তিকে যে চিনতে পারবে, সে এই কথাই বলবে, যা তোমরা বলছ, আর আমি বলছি।’

‘তুমি কে? খিযির তাকে জিজ্ঞেস করলেন। কথার টানে তোমাকে শামের অধিবাসী বলে মনে হচ্ছে।’

‘হা’, লোকটি বলল। তোমরা ঠিকই বুঝতে পেরেছ। আমি শামের অধিবাসী।

লোকটি তার থলি খোলে দুটি দিনার বের করে মুসা বিন নুসাইরের কোলের উপর নিক্ষেপ করে বলল, ‘আমি অতিসত্বর তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করব এবং কোন ভালো সংবাদ নিয়ে ফিরে আসব।’ এই বলে লোকটি চলে গেল।

“যে ব্যক্তি আপনাকে চিনতে পারবে সেই আপনার মুক্তির জন্য জীবনবাজি রাখতে প্রস্তুত হয়ে যাবে।’ খিযির বললেন।

‘কিন্তু নিজের জন্য আমি অন্যকে বিপদে ফেলতে পারি না।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। আমি কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই মুক্তি কামনা করি।’

‘আপনার মুক্তিপণের দুই লাখ দিনার আমরা আদায় করে দেব।’ ইউসুফ বললেন। তবে আফ্রিকা ফিরে যাওয়ার পর তা সম্ভব হবে। এখন তো আমরা শুধুমাত্র পথের পাথেয় নিয়ে এসেছি।’

‘আমার কবিতা আপনার কথা শুনলে দেরহাম-দিনারের স্তূপ লাগিয়ে দেবে। খিযির বললেন।

এই দুই বার্বার সরদার মুসা বিন নুসাইরের সামনে থেকে উঠার নামই নিচ্ছিলেন না। তাঁদের মনের মাঝে মুসার প্রতি ভক্তি ও আবেগের এমন এক ঝর্নাধারা বয়ে চলছিল যে, তাঁরা চাচ্ছিলেন, মুসাকে এখান থেকে উঠিয়ে নিজেদের সাথে নিয়ে যাবেন।

‘তোমরা চলে যাও।’ মুসা বিন নুসাইর তাঁদেরকে বললেন। আমি খলীফার কয়েদী। তিনি আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে ভুলে যাননি। অবশ্যয় লোক পাঠিয়ে আমার উপর নরদারী করছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, আমি যাদের আমীর ছিলাম, তাদের নিকট আমার মান-সম্মান নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তারা আমাকে এই যিল্লতির মাঝে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে যে কোন প্রকারের আঘাত হেনে বসতে পারে।’

কথা শেষ করে উভয় সরদার যখন উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন তখন চার-পাঁচ জন সিপাহী নাঙ্গা তরবারী নিয়ে তাদেরকে ঘিরে ফেলল। সিপাহীদের একজন বলল, ‘খলীফা তেমাদের দু’জনকে তলব করছেন।’

‘আমাদের কাছে খলীফার কী প্রয়োজন?’ ইউসুফ জিজ্ঞেস করলেন।

এর জবাব শুধু খলীফাই দিতে পারেন। আমরা হুকুমের গোলাম মাত্র। এক্ষুণি চল।’ সেই সিপাহীটি বলল।

‘যদি আমরা না যাই তাহলে…।’ খিযির জানতে চাইলেন।

‘তাহলে তোমাদেরকে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে টেনেহেঁছড়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’ সিপাহীটি বলল। এটাও খলীফার হুকুম। বুদ্ধিমানের কাজ হল, তার আগেই তোমরা আমাদের সাথে রওনা হবে।’

‘খলীফার নির্দেশ তোমরা এড়িয়ে যেতে পার না বন্ধু!’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তাদের সাথে চলে যাও। অপমান হওয়া থেকে বাঁচ। আল্লাহ তোমাদের হেফাযত করুন।

সিপাহীরা তাঁদেরকে নিয়ে চলে গেল। মুসা বিন নুসাইরের চোখ থেকে কফুটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

***

হাজিদের তাঁবু থেকে সামান্য দূরে সারিবদ্ধ কয়েকটি তাঁবুর বসতি গড়ে উঠেছে। এ সকল তাঁবুর মাঝে একটি তাঁবু অনেক বড়। দেখতে তাঁবু মনে হলেও সেটি একটি শাহীকামরা। কামরার চতুর্পাশে বহু মূল্যবান রঙ্গিন রেশমী কাপড়ের পর্দা ঝুলছে। সূক্ষ্ম কারুকাজ করা শামিয়ানা কামরার উপর অংশে শুভা পাচ্ছে। শামিয়ানার চার পাশে সোনালী জরির নকশা করা ঝালর লাগানো হয়েছে।

তাঁবুর মধ্যখানে রয়েছে একটি বড় পালঙ্ক। পালঙ্কের উপর রেশমী সুতা দিয়ে বোনা মশারি পালঙ্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। নিচে মহামূল্যবান গালিচা বিছানো। পালঙ্কের অনতি দূরে গদি লাগানো ছোট্ট একটি কুরসি। কুরসির সামনে সুন্দর নকশা করা একটি জলচৌকি। জলচৌকিটি দামি মখমলের কাপড়ে ঢাকা। কুরসিতে আসন গ্রহণকারী সেই জলচৌকিতে পা রাখেন।

সেই সুশোভিত নরম কুরসীতে একজন লোক বসে আছেন। তার চাকচিক্যময় আর জৌলুসপূর্ণ পোশাক দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে, নিশ্চয় তিনি কোন মুলুকের বাদশাহ হবেন।

এই জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসবহুল কামরায় একজন সিপাহী এসে প্রবেশ করল। সিপাহী তার মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করে বলল। খলীফাতুল মুসলিমিন! তাদের দু’জনকে নিয়ে আসা হয়েছে।

‘তাদের সাথে কি কোন অস্ত্র আছে?’ খলীফা জিজ্ঞেস করলেন।

“না, জাঁহাপনা! তারা হজ্জের জন্য এহরাম বাধা অবস্থায় রয়েছে। তারা নিরস্ত্র। তাদের শরীরে তল্লাশী নেওয়া হয়েছে। সিপাহীটি বলল।

খলীফা সুলায়মান বিন আবদুল মালেক রাজকীয় ভঙ্গিতে মাথা সামন্য কুঁকালেন। সিপাহীটি উল্টাপদে কামরা থেকে বের হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর ইউসুফ বিন হারেছ এবং খিযির বিন গিয়াস কামরায় প্রবেশ করলেন। তারা এক সাথে বলে উঠলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন! আসোলামু আলাইকুম।

‘বার্বারদের সম্পর্কে আমি যা শুনেছি, তা ভুল শুনিনি।’ খলীফা বললেন।

‘সম্মানিত খলীফা বার্বারদের সম্পর্কে কী শুনেছেন? খিযির জানতে চাইলেন।

‘শুনেছি বার্বাররা শিষ্টাচার বিবর্জিত অসভ্য, হিংস্র। তোমাদের চেয়ে গ্রাম্য বেদুইনরা অনেক ভালো। তারা আদব-কায়দা সম্পর্কে গাফেল নয়।’

ইউসুফ ও খিযির বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন। খলীফা রাজকীয় গাম্ভির্যের সাথে ধমকে উঠে বললেন।

‘আমার দিকে তাকাও, একে অপরের দিকে কী দেখছ? তোমাদের কোন কসুর নেই। তোমাদেরকে দরবারে খেলাফতের আদব শিখানো হয়নি, তাই তোমরা জান না যে, খলীফার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করতে হয়?

‘আমীরুল মুমিনীন!’ ইউছুফ বললেন। আমরা শুধু সেই দরবারে মাথা কুঁকাতে শিখেছি, এতদূর থেকে যেখানে হাজিরি দিতে এসেছি। মহান আল্লাহর সেই দরবারে আমরা শুধু মাথাই ঝুকাই না; বরং পরম ভক্তিভরে সেজদায় লুঠিয়ে পড়ি। ইসলাম আমাদেরকে এই আদবই শিক্ষা দিয়েছে।

এই মুহূর্তে তোমরা খলীফাতুল মুসলিমীনের দরবারে রয়েছ, এখানেও ঝুঁকে সালাম করা আবশ্যক। খলীফা রাগতস্বরে বললেন।

‘খলীফাতুল মুসলিমীন!’ ইউসুফ বললেন। আমরা এ জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলাম যে, ইসলামের রীতি-নীতি আমাদের কাছে ভালো লেগেছিল। ইসলামের হুকুম হল, মানুষ মানুষের সামনে মাথা ঝুঁকাবে না। একমাত্র আল্লাহর সামনে মাথা ঝুঁকাবে। আপনি যদি আমাদেরকে আপনার সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম করার হুকুম দেন তাহলে আমরা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে আমাদের পূর্বের ধর্মে ফিরে যেতে বাধ্য হব।’

‘আমি ইসলামেরই খলীফা। আমাকে ইসলামের হুকুম-আহকাম শিখাতে এসো না। তোমাদের মতো অসভ্য, জংলী, হিংস্র বার্বার আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান দেবে, এটা আমি বরদাশত করব না।’

‘খলীফা!’ খিযির উত্তেজিত হয়ে বললেন। আপনি যদি বার্বারদের সভ্যতা আর চারিত্রিক সৌন্দর্য দেখতে চান, তাহলে আন্দালুসিয়ায় গিয়ে দেখুন। আপনার হয়তো জানা নেই যে, আন্দালুসিয়া বিজয়ের জন্য বার্বাররা তাদের মাথার নাযরানা পেশ করেছিল।

‘তারিক বিন যিয়াদও বার্বার। ইউসুফ বললেন। খলীফা আজ আপনি যাদেরকে হিংস্র, জংলী আর অসভ্য বলছেন, তারাই একদিন আন্দালুসিয়ার কাফেরদের হৃদয়-রাজ্য জয় করে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিল।

‘খলীফাতুল মুসলিমীন!’ খিযির বললেন। আপনি আন্দালুসিয়ার বিজেতাদের ডেকে এনেছেন। তাঁরা আন্দালুসিয়ার মাটিতে বিজয় পতাকা নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে ফৌজ নামিয়ে দিয়ে যুদ্ধ জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যেন পালিয়ে যাওয়ার কোন রাস্তা না থাকে। কিন্তু যখন তিনি আন্দালুসিয়া জয় করে সামনে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা করছিলেন তখন আপনি তাকে দামেস্ক ডেকে আনেন। আপনি তাঁর গর্বিত মস্তক মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছেন। আপনি চান, ইতিহাসের গহ্বরে তাঁর নাম যেন হারিয়ে যায়।

আন্দালুসিয়ার আরেক বিজেতা, আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের পায়ে বেড়ি বেঁধে আপনি তাঁকে ভিখারি বানিয়েছেন। আন্দালুসিয়া গিয়ে দেখুন, আজ এই বার্বাররাই সেখানে ইসলামের ঝাণ্ডা উঁচু রেখেছে।

‘শুনেছি, মুসার এই অপমান আর লাঞ্ছনার প্রতিশোধ তোমরা আমার থেকে নিতে চাও। খলীফা বললেন। “তোমাদের এত বড় দুঃসাহস যে, তোমরা আমাকে হত্যা করতে চাও? আমার খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেও তোমাদের কোন দ্বিধা নেই?

‘মুসা বিন নুসাইয়ের সাথে আমাদের যে কথা হয়েছে, আপনার গুপ্তচর যদি সে কথা আপনার কাছে পৌঁছিয়ে থাকে তাহলে আমরা তা অস্বীকার কবর না। ইউসুফ বললেন।

‘খলীফা, আপনি মুসার কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। খিযির বললেন। তিনি আমাদেরকে বিদ্রোহ করা থেকে নিবৃত করেছেন। তাঁর কথা কি আপনার কানে এসে পৌঁছেনি? তিনি বলেছেন, বিদ্রোহের নামও নিও না। অন্যথায় ইসলামী সালতানাত কমজোর হয়ে যাবে। অথচ আপনি ইসলামের শিকড় কাটার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।

খলীফা রাগে-গোসায় উন্মাদ হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, এই কে আছ, এই বদযবান জংলীদের এখান থেকে নিয়ে যাও। এদেরকে দামেস্কের কয়েদখানায় পাঠিয়ে দাও। এটাই এদের শেষ ঠিকানা।

তৎক্ষণাৎ ছয়-সাত জন সিপাহী কামরায় এসে প্রবেশ করল। তাদের উন্মুক্ত তরবারীর অগ্রভাগ ইউসুফ ও খিযিরের শরীর স্পর্শ করল। সিপাহীরা তাদেরকে টেনেহেঁছড়ে কামরার বাহিরে নিয়ে গেল।

ইউসুফ ও খিযির খলীফার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে লাগলেন। হজ্জ আদায়ে বাঁধা দানকারী জালেম। তোমার বাদশাহীর দিন শেষ হয়ে এসেছে।

তাদের চিৎকার-চেঁচামেচি ক্ষীণ হতে হতে হাজিগণের আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনির মাঝে হারিয়ে গেল। তার পর এই দুই সরদারের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

***

খলীফা সুলাইমান বিন আবদুল মালেক হলেন ওলিদ বিন আবদুল মালেকের ভাই। সুলাইমানের পূর্বে ওলিদ খলীফা ছিলেন। ওলিদের ইচ্ছা ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর খলীফা হবেন তার ছেলে। কিন্তু আকস্মিকভাবে তিনি এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরেন যে, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। খলীফা হিসেবে ছেলের নাম পেশ করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে সুলায়মান খেলাফতের মসনদ দখল করে বসেন।

ওলিদ ও সুলায়মান দুই ভাই। কিন্তু তাঁদের উভয়ের মাঝে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। ওলিদ মুহাম্মদ বিন কাসেমকে হিন্দুস্তান আক্রমণ করার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি তাকে ফৌজ প্রেরণসহ সবধরনের সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন। একই সময়ে তিনি উত্তর আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের সেই ঐতিহাসিক পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন, যে পরিকল্পনা অনুযায়ী বার্বার বংশোদ্ভূত সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসিয়ায় আক্রমণ করা হয়েছিল। ওলিদ শুধু আন্দালুসিয়া আক্রমণের অনুমতিই দেননি; বরং আক্রমণ পরিচালনার জন্য যত ধরনের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, সব কিছুই তিনি আঞ্জাম দিয়েছিলেন।

ওলিদের ভাই সুলায়মান যখন খলীফা নিযুক্ত হন তখন হিন্দুস্তানে মুহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু পর্যন্ত ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন। নতুন নতুন এলাকা বিজিত করার জন্য তিনি দুর্বার গতিতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন। অপর দিকে মুসা বিন নুসাইর, আর তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার শহর-নগর-বন্দর জয় করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সামনে এগিয়ে চলছিলেন।

সুলায়মান খলীফা নিযুক্ত হয়েই হিন্দুস্তান থেকে মুহাম্মাদ বিন কাসেমকে একজন অপরাধী হিসেবে ফিরিয়ে আনেন। তিনি তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেন। সেই সাথে তিনি আন্দালুসিয়ার বিজয় অভিযানও মুলতবী করার নির্দেশ জারি করেন। তিনি মুসা বিন নুসাইর ও তারিক বিন যিয়াদকে দামেস্কে ডেকে এনে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

ওলিদের ছেলে যদি খলীফা হতেন এবং বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন তাহলে ইউরোপ আর হিন্দুস্তানের ইতিহাস আজ অন্য রকম লেখা হত। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, হিন্দুস্তান এবং ইউরোপে মুসলিম সৈন্যবাহিনী প্রেরণের ব্যাপারে কুতায়বা বিন মুসলিমের বিরাট ভূমিকা ছিল। কুতায়বা সে সময় চীন দেশে জিহাদ পরিচালনা করছিলেন। সুলায়মান তাকেও দামেস্ক ডেকে এনে জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

***

মুসা বিন নুসাইর হজ্জের দিনগুলোতে মক্কার অলিগলিতে ভিক্ষা চেয়ে ফিরছিলেন। সারা দিন ভিক্ষা করে যে পয়সা জমা হত, তিনি তা খলীফা সুলায়মানকে দিয়ে দিতেন। মুসা খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতেন। তাঁর জন্য একজন পাহারাদার নিযুক্ত করা ছিল। তাকে কোন প্রকার খাদ্যদ্রব্য দেওয়া হত না। তিনি ভিক্ষা করা পয়সা থেকে খানা কিনে খেয়ে নিতেন। দীর্ঘ এক বছর যাবৎ তিনি এই নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন। খলীফা সুলায়মানের নিকট তাঁর আজীবনের বিজয়-কীর্তির কোন মূল্যায়ন ছিল না। উপরন্তু তাঁর বার্ধক্যের প্রতিও তিনি কোন ভ্রূক্ষেপ করেননি।

মুসা বিন নুসাইর এখন তাঁর জীবন সফরের আখেরী মনযিলে এসে উপনীত হয়েছেন। খলীফা সুলায়মান ব্যক্তিগত বিদ্বেষবসত তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অমানবিক নির্যাতন করে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত করে

দিয়েছিলেন। প্রচণ্ড রোদের মাঝে উত্তপ্ত বালুর উপর তাঁকে ঘন্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হত। উত্তপ্ত বালু আর তীব্র রোদ্রের দহনজ্বালা সহ্য করতে না পেরে তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে যেতেন। তাঁকে জীবিত রাখার জন্য কয়েক টুক পানি, আর সামান্য খাবার দেওয়া হত।

মুসা বিন নুসাইরকে খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক বিশেষ এক উদ্দেশ্যে আন্দালুসিয়া থেকে দামেস্ক ডেকে এনেছিলেন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্যই বলতে হয়, যখন তিনি এসে পৌঁছলেন তখন ওলিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিলেন।

ফলে সুলায়মান মুসার নাগাল পেয়ে যান। তিনি তাঁর উপর অন্যায় অপবাদ আরোপ করে নির্মম নির্যাতন চালান। সুলায়মান তার উপর দুই লাখ দিনার জরিমানা ধার্য করেন এবং তাঁকে মক্কা নিয়ে এসে জরিমানা আদায়ের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য করেন।

***

খলীফা সুলায়মানের ইঙ্গিতে ইউসুফ ও খিযিরকে টেনেহেঁচড়ে কামরার বাহিরে নিয়ে যাওয়ার পর কামরার এক পার্শ্বের পর্দা সরিয়ে একটি রূপসী, ষোড়শী মেয়ে কামরায় এসে প্রবেশ করলো। মেয়েটি দামেস্কের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ছিল। সে সুলায়মানের পিছনে এসে দাঁড়াল। সে তার দুটি হাত সুলায়মানের কাঁধের উপর রেখে তার গলায় আঙ্গুলের আলতো পরশ বুলিয়ে দিতে লাগল। সুলায়মান তার হাত উঁচু করে মেয়েটির হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিলেন।

‘কুলসুম সুলায়মান নিচু স্বরে বললেন। যুবতী মেয়েটি সামনে এসে সুলায়মানের রানের উপর বসে পড়ল। তুমি শুনেছ, আমি কী করেছি?

‘হ্যাঁ, আমীরুল মুমিনীন! কুলসুম সুলায়মানের ঘন মোটের উপর আঙ্গুলের আলতো পরশ বুলিয়ে দিতে দিতে বলল। আমি পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে সব শুনেছি।

সুলায়মান এক হাত দিয়ে কুলসুমের সরু কোমর জড়িয়ে ধরে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, বদনসীব বাবার কোথাকার! আফ্রিকা থেকে এত দূরে আমার হুকুমে মরতে এসেছে। এদের কত বড় সাহস, মুসাকে বাঁচানোর জন্য বিদ্রোহের কথা বলে।

‘আপনি কি নিশ্চিত হয়ে গেছেন, আপনার হুকুমতে আর কেউ বিদ্রোহের কথা বলবে না? কুলসুম জিজ্ঞেস করল।

‘যে বিদ্রোহ করবে তারও এই পরিণতি হবে। সুলায়মান বললেন। মানুষ আমাকে জালেম বলবে, ঐতিহাসিকগণ আমাকে রক্তপিপাসু শ্বৈরাচার লিখবে; কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম এ কথা শুনবে না যে, আমার শাসনামলে কোন রাজ্যে বিদ্রোহ হয়েছে।

‘আমিরুল মুমিনীন! এটা কী আপনার ভ্রান্ত ধারণা নয়?’ কুলসুম বলল। শুধুমাত্র দু’জন বার্বার সরদারকে হত্যা করে বিদ্রোহের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

কুলসুম খলীফার সাথে আবেগঘন চিত্তাকর্ষক অঙ্গ-ভঙ্গি করে বলল। আপনি মুসাকে কয়েদ করে অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছেন।

সুলায়মানের অর্ধনিমীলিত মুগ্ধ দৃষ্টি কুলসুমের চেহারার উপর স্থির হয়ে রইল। তার দেহ-মন যেন কোন এক অজানা জাদুর আবেশে অবশ হয়ে আসছিল।

‘আপনি ভেবে দেখেছেন কি, মুসা তার ছেলে আবদুল আযীযকে আন্দালুসিয়ার আমীর নিযুক্ত করে এসেছে। কুলসুম বলল। হয়তো আবদুল আযীযের নিকট এ খবর পৌঁছে গেছে যে, তার বাবাকে নির্যাতন করে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদকে আপনি নযরবন্দী করে রেখেছেন, যেন সে দামেস্কের বাইরে যেতে না পারে। আবদুল আযীয আর তারিক একই আদর্শের অনুসারী। আন্দালুসিয়ার তামাম ফৌজ মুসা, তারিক বিন যিয়াদ আর আবদুল আযীযকে পীরের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করে।

‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ, আবদুল আযীয আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে?

‘কেন নয়, সে তার বাবার বেইজ্জ্বতীর প্রতিশোধ অবশ্যই নিতে চাইবে। সে আযাদীর এলানও করে বসতে পারে। বিশাল এক সেনাবাহিনী রয়েছে তার। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, অর্ধেকের চেয়ে বেশী ফৌজ বার্বার। বার্বাররা আইনত এ দাবি করতে পারে যে, তারাই আন্দালুসিয়ার বিজেতা। আজ আপনি দুজন বার্বার সরদারকে শাস্তি দিয়েছেন। অন্য যে বার্বাররা হজ্জ করতে এসেছে তারা নিশ্চয় তাদের সরদার দুজনকে তালাশ করবে। যেভাবেই হোক তারা জানতে পারবে, আপনি তাদের সাথে কী আচরণ করেছেন।’

‘থামো, আমি তো আবদুল আযীয বিন মুসা সম্পর্কে কোন চিন্তাই করিনি। আমাকে কিছুক্ষণ ভাবতে দাও।’ সুলায়মান বললেন।

***

খলীফা সুলায়মান বিন আবদুল মালেকের চিন্তা-চেতনায় আত্মঅহমিকা আর ক্ষমতার দাপট জেঁকে বসেছিল। কুলসুমের রূপ-সৌন্দর্য আর মোহনীয় অঙ্গ-ভঙ্গি তার নেশার মোহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

খলীফার মসনদে বসার কয়েক মাস পূর্বে তার হেরেমে কুলসুমের আগমন ঘটে। সুলায়মানের এক বন্ধুর তোহফা ছিল কুলসুম। সে তার জাদুর ছোঁয়ায় যে কোন পুরুষকে ইশারায় নাচানোর মতো প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সে এসেই সুলায়মানের দেহ-মন জয় করে নিলো। আর হেরেমের অন্য সকল মেয়েদেরকে তার হুকুমের দাসী বানিয়ে ফেলল।

কুলসুমের রূপে ও অঙ্গ-ভঙ্গিতে জাদু ছিল কি ছিল না, কুলসুম জাদুবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল কি ছিল না–এটা বড় কথা নয়; বড় কথা হল, সুলায়মান বিন আবদুল মালেকের ঈমান ছিল কমজোর। তিনি ছিলেন নারী ও মদের নেশায় বিভোর। উম্মতে মুহাম্মদীর দুর্ভাগ্য যে, তার মতো ব্যক্তি খলীফা নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খেলাফতকে রাজতন্ত্রে পরিণত করেন। তিনি অন্যান্য রাজা-বাদশাহদের ন্যায় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন।

ইতিহাস সাক্ষী যখন কোন পুরুষ তার ধমনীর উপর নারীর প্রভুত্ব স্বীকার করে নেয় তখন সে পুরুষ শুধু নিজেই ধ্বংস হয় না; বরং সে যদি কোন খান্দানের কাণ্ডারি হয় তাহলে সেই খান্দানেরও ভরাডুবি করে। আর যদি কোন রাজ্যের বাদশাহ হয়, তাহলে সেই রাজ্যকে ধ্বংস ও বরবাদ করে ছাড়ে।

কুলসুম সুলায়মানের স্ত্রী ছিল নাকি হেরেমের রক্ষিতা ছিল–এ ব্যাপারে সঠিক কোন তত্ব পাওয়া যায় না। তবে ইতিহাসে এমন বেশুমার ঘটনা বর্ণিত আছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুলায়মান ছিলেন নারীলোভী, একনায়কতন্ত্রী, রক্তপিপাসু, স্বৈরচার এক বাদশাহ।

তার হুকুমত ছিল মূলত খেলাফতের নামে মোড়া রাজতন্ত্র। বাহ্যত তিনি হজ্জ আদায় করতে এসে ছিলেন, কিন্তু প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে জাকজমকের কোন কমতি ছিল না। তার সাথে ছিল হেরেমের শোভা কুলসুম ও অসংখ্য দাস দাসী, আর ছিল রক্ষীবাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনী। তিনি আল্লাহর দরবারকে নিজের দরবার বানিয়ে নিয়েছিলেন।

সন্ধ্যায় দুই বার্বার সরদারকে শাস্তির নির্দেশ দিয়ে রাতের আঁধারে খলীফা তার প্রাসাদসম তাঁবু থেকে বের হয়ে এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছলেন যেখানে মুসা বিন নুসাইর রাত্রি যাপন করতেন। খলীফার সাথে ছিল দুজন সিপাহী ও দু’জন মশালধারী। মুসা বিন নুসাইর সারা দিনের ক্লান্ত শরীর মাটিতে এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন।

সুলায়মান মুসা বিন নুসাইরের পাঁজরে পা দিয়ে খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘উঠ বুড়ো।

দুর্বল বয়োবৃদ্ধ মুসা বিন নুসাইর বহু কষ্টে উঠে বসে চোখ মেলে তাকালেন।

‘মনে হচ্ছে, তুমি বোধশক্তি ফিরে পাচ্ছ।’ সুলায়মান বললেন। ঐ দুই বার্বার তোমার সাথে বিদ্রোহের কথা বলছিল, আর তুমি তাদের বাধা দিচ্ছিলে।’

‘তোর ভয়ে নয়, সুলায়মান। মুসা বিন নুসাইর আসমানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন। আল্লাহর ভয়ে। আমি তোর খেলাফতের কোন পরওয়াই করি না। তোকে মোটেই ভয় পাই না।

‘বদবত! তুই কি মনে করি, আমার অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই।’ সুলায়মান বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন।

‘না, তোর অন্তরে মোটেই আল্লাহর ভয় নেই। মুসা বললেন। “তুই তো আল্লাহর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। কুরআন খোলে দেখ, আল্লাহর তা’আলার হুকুম হল, “তোমরা হজ্জ করতে এসে নিজ স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক। মন্দ কাজ থেকে বিরত থাক। লড়াই-ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ো না। তোমরা যে নেক কাজ করবে আল্লাহ তা জানতে পারবেন। হজ্জের সফরে সাথে পাথেয় রাখ। মনে রাখবে, সর্বোত্তম পাথেয় হল, (সর্ব বিষয়ে) সংযম প্রদর্শন করা। সুতরাং হে বিবেকবান লোক সকল! তোমরা আমার নাফরমানী করো না।” সুলায়মান, তুই কি আল্লাহর এই হুকুম মেনে চলিস?’

খলীফা সুলায়মান মুসা বিন নুসাইরের প্রতি অবজ্ঞাভরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন।

***

হজ্জ শেষ হয়ে গেছে। হাজিগণ নিজ নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। খলীফা সুলায়মানের কাফেলাও দামেস্কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। মুসা বিন নুসাইরকেও কাফেলার সাথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সামান্য সময়ের জন্য তাঁকে উটে আরোহণ করানো হত, আর সারা দিন তিনি পায়ে হেঁটে চলতেন। তিনি ভিক্ষা করে যা কিছু জমা করে ছিলেন, খলীফা তা নিয়ে নিয়েছেন।

দেড়-দুই মাস পর কাফেলা দামেস্ক এসে পৌঁছলে মুসা বিন নুসাইরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হল। দামেস্ক পৌঁছার পর প্রথম রাতেই কুলসুম খলীফাকে স্মরণ করিয়ে দিল যে, আন্দালুসিয়ার আমীর এখন মুসার ছেলে। সে তার বাবার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যে কোন সময় আন্দালুসিয়ার স্বাধীন শাসক হিসেবে বিদ্রোহ করতে পারে।

‘কুলসুম!’ সুলায়মান বললেন। আমি মুসলমানদের খলীফা। মুসলমানগণ এক নতুন রাজ্য জয় করেছেন। সেখানে নতুন নিয়ম-কানুন আরোপ করা হচ্ছে। এখনও খণ্ড খণ্ড লড়াই চলছে। খলীফা হিসেবে আমার কি সেখানে যাওয়া উচিত নয়? আমি যদি সেখানে যাই তাহলে সর্বসাধারণের নিকট আমার গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে।

‘না, খলীফাতুল মুসলিমীন!’ কুলসুম বললআমার ভয় হয়, যারা আপনার সাথে যাবে তাদের মধ্যে কেউ যদি বলে দেয়, মুসা বিন নুসাইর এখন কারাগারে, তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, তাহলে সেখান থেকে যিন্দা ফিরে আসা আপনার পক্ষে অব হয়ে পড়বে।’

‘কিন্তু সেখানের অবস্থা সম্পর্কে আমার অবগত হওয়া উচিত। সুলায়মান। বললেন। বিদ্রোহের সামান্য আভাস পেলেও আমি আবদুল আযীযকে তার আসল ঠিকানায় পৌঁছে দেব।’

পরের দিন খলীফা সুলায়মান সর্বাগ্রে একজন দূতকে দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়ায় সওয়ার করিয়ে আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলেন। তাকে বলে দেওয়া হল, সেখানকার সাঠিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করে অতিদ্রুত দামেস্ক ফিরে আসতে।

খলীফা তাকে বললেন, কেউ যেন জানতে না পারে যে, তুমি আমার প্রেরিত দূত। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, আন্দালুসিয়া এসেছি, এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায় কিনা দেখতে।

***

আন্দালুসিয়ার যাবতীয় সংবাদ সংগ্রহ করে যথা সম্ভব দ্রুত ফিরে আসতে দূতের দেড় মাস লেগে গেল। এই দেড়মাস মুসা বিন নুসাইরের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি যেন খুব ভোরে কারাগার থেকে বের হয়ে শহরে ভিক্ষাবৃত্তি করেন, আর সন্ধ্যার পূর্বেই ফিরে এসে কারা-রক্ষকের নিকট সংগৃহীত টাকা জমা করে দেন।

বার্তাবাহক আন্দালুসিয়া থেকে ফিরে সরাসারি খলীফা সুলায়মানের সাথে সাক্ষাৎ করল। সে খলীফাকে সেখানকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলল, ‘খলীফাতুল মুসলিমিন! আন্দালুসিয়ার মতো সুন্দর, সবুজ-শ্যামল দেশ সম্ভবত দুনিয়াতে দ্বিতীয়টি নেই।’

‘আমি কোন দেশের ভৌগলিক বিবরণ শুনতে চাইনি। সুলায়মান বললেন। ‘আমাকে শুধু এই সংবাদ দাও, আমীর আবদুল আযীয কী করছে? সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ তার সম্পর্কে কিরূপ ধারণা পোষণ করে?’

‘সেনাবাহিনী ও জনসাধারণের নিকট আন্দালুসিয়ার আমীর আবদুল আযীয অত্যন্ত সম্মানিত ব্যাক্তি।’ বার্তাবাহক বলল। তিনি খোদাভীরু ও দুনিয়াবিমুখ আলেমেদ্বীন। আরব ও বার্বাররা তো তাকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করেই খ্রিস্টানরা পর্যন্ত তাঁর প্রশংসা করে।

আবদুল আযীয আন্দালুসিয়ার জনসাধারনের জন্য কল্যাণকর ও উন্নয়ণমূলক যে কাজ করে যাচ্ছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে বার্তাবাহক বলল, ‘আন্দালুসিয়ার আমীর আবদুল আযীয সেখানকার লোকদের ভাগ্য পাল্টে দিয়েছেন। সেখানে বিত্তশালী খ্রিস্টানরা বিত্তহীনদের উপর জুলুম-নির্যাতন করত।

যারা স্বর্ণ, মুদ্রা ও ধন-সম্পদের মালিক ছিল, তারাই যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাস-বৈভবের একচ্ছত্র অধিকারী ছিল।

আমীর আবদুল আযীয গরীব জনসাধারণকে এমন এক জীবনের সন্ধান দিয়েছেন যে, তারা এখন শুধু পেট ভরে খানাই খায় না; বরং মানুষ হিসেবে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাও হয়।

‘বাবার সম্প্রদায় আবদুল আযীয সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করে? খলীফা বার্তাবাহককে জিজ্ঞেস করলেন।

‘খলীফাতুল মুসলিমিন নিশ্চয় অবগত আছেন, তারিক বিন যিয়াদ যে সকল সৈন্য নিয়ে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করে ছিলেন তাদের সকলেই ছিল বার্বার। মালে গনিমত হিসেবে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বার্বারদের হস্তগত হয়েছিল, তা তারা স্বপ্নেও কখনও দেখেনি। আমীর আবদুল আযীয বার্বারদের অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন। মুসা বিন নুসাইর দীর্ঘকাল আফ্রিকার আমীর ছিলেন। বার্বারদের উপর তার অনুগ্রহ এত বেশি যে, বার্বাররা তাকে পীর-মুরশেদ মনে করে। এ কারণেই বার্বাররা আবদুল আযীযের জন্য নিজেদের জান-মাল কোরবান করতে সদা প্রস্তুত থাকে।

‘ওখানে কি কেউ আমাদের প্রশংসাও করে?’ সুলায়মান জিজ্ঞেস করলেন।

‘খলীফা অভয় দিলে এ ব্যাপারে অধমের কিছু কথা আছে।’ বার্তাবাহক বলল।

‘নির্ভয়ে বল।’ খলীফার পরিবর্তে কুলসুম বলে উঠল। সে খলীফার শরীরের সাথে লেগে বসেছিল।

‘খলীফাতুল মুসলিমীন!’ বার্তাবাহক বলল। আমি অনেক সরাইখানায় গিয়েছি, সেখানে আমি মুসলমান, খ্রিস্টান এমন কি বার্বার মুসলমানদের সাথেও কথা বলেছি, কিন্তু কেউ দামেস্কের খেলাফতের নাম পর্যন্ত নেয় না। সেখানকার নতুন নির্মিত মসজিদেও আমি গিয়েছি, সেখানেও খলীফার নাম নেওয়া হয় না। লোকদের মুখে মুখে শুধু আমীর আবদুল আযীযেরই নাম।

‘মুসা বিন নুসাইর ও তারিক বিন যিয়াদ সম্পর্কে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি।’ সুলায়মান জানতে চাইলেন।

‘আমি অনেককেই দেখেছি, তারা একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করে, মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন যিয়াদ কোথায় গেছেন? বার্তাবাহক বলল। ‘খলীফাতুল মুসলিমীন! যে ব্যক্তিই জানতে পেরেছে যে, আমি দামেস্ক থেকে এসেছি, সেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, মুসা বিন নুসাইর এবং তারিক বিন যিয়া কি দামেস্কে আছেন? তাঁরা কবে ফিরবেন? ইত্যাদি। আমি দেখেছি, দারুল খেলাফতের সাথে আন্দালুসিয়ার কোন সম্পর্কই নেই। খলীফাতুল মুসলিমীন। আপনার সেখানে যাওয়া উচিত।’

‘হ্যাঁ, আমার সেখানে যাওয়া উচিত। আমি যদি সেখানে না যাই তাহলে একদিন খোতবা থেকেও আমার নাম মুছে যাবে।’ সুলায়মান বললেন।

‘তুমি এখন যেতে পার।’ কুলসুম বার্তাবাহককে বলল।

বার্তাবাহক চলে গেলে কুলসুম সুলায়মানকে বলল, ‘আপনি আন্দালুসিয়া যাবেন। আপনি কি বার্তাবাহকের এমন সুস্পষ্ট কথা থেকেও বুঝতে পারেননি যে, আন্দালুসিয়া একদিন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে? আপনি কি চান, উমাইয়া বংশের হাত থেকে খেলাফতের বাগডোর অন্যের হাতে চলে যাক? আপনি কি মুসার খান্দানকে খেলাফতের মসনদে বসাতে চান?

‘না, কুলসুম! কক্ষণও না।’ সুলায়মান বললেন। আমি মুসার বংশ নির্বংশ করে তবেই ক্ষান্ত হব।

‘মুসা এই অধিকার কোত্থেকে পেল যে, সে নিজের ছেলেকে একটি বিজিত এলাকার আমীর বানিয়ে দিয়েছে। কুলসুম বলল। শুধু মুসাকে খতম করলেই হবে না। তার গোটা বংশকেই খতম করে দিতে হবে।’

‘এখনই আবু হানিফকে ডাক। খলীফার কথা শুনে কুলসুম উঠে দাঁড়াল। খলীফা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ? প্রহরীকে পাঠাও।’

‘আবু হানিফকে ডাকার জন্য আমারই যাওয়া উচিত।’ কুলসুম বলল। সে তো আপনার হুকুমের অপেক্ষায় এখানেই বসে আছে।’

কুলসুম খলীফার কামরা থেকে বের হয়ে দুটি কামরা অতিক্রম করে তৃতীয় একটি কামরায় প্রবেশ করল। কামরাটি অত্যন্ত সুন্দর ও সাজানো-গুছানো। সেখানে মধ্য বয়সী বলিস্ট চেহারার সুদর্শন এক পুরুষ বসেছিল। কুলসুমকে দেখামাত্র সে দাঁড়িয়ে তার দুই বাহু প্রসারিত করে ধরল। কুলসুম সোজা তার বাহুবন্ধনে আশ্রয় নিল। এ লোকটিই হল, আবু হানিফ।

কুলসুম তাকে একটি কুরসীতে বসিয়ে নিজে একটি কুরসী টেনে বসে বলল, “তিনি আন্দালুসিয়া যাওয়ার খোয়ব দেখছেন। তুমি হলে তার প্রধান পরামর্শদাতা, তার পরামর্শদাতা তো আরো অনেকেই আছে, কিন্তু আমি তোমাকে তার মনের মাঝে স্থান করে দিয়েছি।’

‘এটা কোন নতুন কথা নয়।’ আবু হানিফ বলল। নতুন কথা বল, বার্তাবাহক কি সংবাদ এনেছে, আর সুলায়মানই বা কি বলেছে?

কুলসুম আবু হানিফকে বার্তাবাহকের সব কথা শুনাল। বার্তাবাহকের কথা শুনে সুলায়মানের কী প্রিতিক্রিয়া হয়েছিল এবং সে নিজে সুলায়মানকে কী পরামর্শ দিয়েছে তাও শুনাল।

‘আমিও তাকে এই পরামর্শই দেব।’ আবু হানিফ বলল। সুলায়মানের সালতানাত যত দিন স্থায়ী হবে তত দিন আমাদের ভাগ্যও সুপ্রসন্ন থাকবে। কিন্তু মনে রেখো কুলসুম, মুসা বিন নুসাইর আন্দালুসিয়ার যে সকল দাসী-বান্দি তোহফা স্বরূপ খলীফা ওলিদের নিকট পাঠিয়ে ছিল, তাদের প্রত্যেকেই অত্যন্ত রূপসী ও লাস্যময়ী রূপে-গুণে তাদের কোন তুলনা হয় না। এ সকল খ্রিস্টান মেয়েদের বিবেক-বুদ্ধি অত্যন্ত প্রখর। আমি ভালো করেই জানি, এ সকল মেয়েরা সেখানে দাসী-বান্দি ছিল না। তারা সকলেই শাহীখান্দানের মেয়ে। তাদের কেউ যেন তোমাকে পিছনে ফেলে সুলায়মানের হৃদয়-মন্দিরে জায়গা করে না নেয়।

‘এ বিষয়ে পরেও কথা বলা যাবে।’ কুলসুম বলল। এখন সুলায়মান তোমাকে ডাকছে, সে আন্দালুসিয়ার আমীর আবদুল আযীযের ব্যাপারে তোমার। সাথে পরামর্শ করতে চায়।’

‘তাকে কী পরামর্শ দেব?’ আবু হানিফ জানতে চাইল।

কুলসুম তার ডান হাত ছুরির মতো করে গর্দান স্পর্শ করে বলল, জলদি যাও। সুলায়মান তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তাকে আন্দালুসিয়া যাওয়ার পরামর্শ দিও না।

আবু হানিফ দ্রুত সুলায়মানের কামরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। সে কামরায় প্রবেশ করতেই সুলায়মান তাকে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসলেন।

***

সেদিন আপরাহ্নে দামেস্ক থেকে একজন বার্তাবাহক আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। তার সাথে ছিল একটি লিখিত পয়গাম। লিখিত পয়গামটি একটি চামড়ার থলিতে ভরে আবু হানিফ সুলায়মানের সামনে মোহর অঙ্কিত করল। সুলায়মান আবু হানিফকে দিয়ে পয়গামটি লিখিয়ে ছিলেন।

ইতিহাসে বার্তাবাহকের নাম লেখা আছে আবু নসর। এই বার্তাবাহককেই পূর্ববর্তী খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক পাঠিয়ে ছিলেন মুসা বিন নুসাইরকে আন্দালুসিয়া থেকে ডেকে আনার জন্য।

আবু নসর ছিল রাজকর্মচারীদের মাঝে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। সুলায়মান আবু নসরকে লিখিত পয়গামটি দিয়ে বললেন, তুমি ভালো করেই জান, আমার বড় ভাই ওলিদ তোমার উপর কতটা আস্থা রাখতেন। শাহীমহলে তোমার প্রতি সেই আস্থা এখনও অটুট আছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়গাম। কোন অবস্থাতেই যেন রাস্তায় এই পয়গাম ভোলা না হয়। কোন কারণে যদি এই পয়গাম হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, তাহলে মোহর ভেঙ্গে থলি থেকে পয়গাম বের করে জ্বালিয়ে দেবে অথবা গিলে ফেলবে। এই পয়গাম কোনভাবেই যেন অন্যের হাতে না পৌঁছে।’

‘আমীরুল মুমিনীন, এমনই হবে।’ আবু নসর বলল।

‘আরেকবার ভালো করে শুনে নাও।’ সুলায়মান বললেন। পয়গাম হাবীৰ বিন উবায়দার হাতে পৌঁছাবে। কেউ যেন জানতে না পারে যে, তুমি কোন পয়গাম নিয়ে গিয়েছ। তাছাড়া আর সব কিছুই তো তোমাকে বলে দেওয়া হয়েছে।

আবু নসর সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।

***

আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডো। আমীর আবদুল আযীয টলেডোতেই অবস্থান করছিলেন। আবু নসর রাতের বেলা টলেডোর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছলো। সন্ধ্যায় শহর রক্ষা প্রাচীরের ফটক বন্দ হয়ে যাওয়াতে শহরের বাইরেই তাকে রাত যাপন করতে হয়েছে। ফটক খোলা হলে সে শহরে প্রবেশ করল।

পূর্বেই সে তার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছিল। সে এমন লেবাস পরেছিল যে, তাকে আরব বরে মনে হচ্ছিলো না। পূর্বেও সে এখানে এসেছে, তাই এখানের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। সে জানত, হাবীব বিন উবায়দা কোথায় থাকে।

ঐতিহাসিকদের মতে হাবীব বিন উবায়দা ছিল ফৌজের উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকতা। সম্ভবত এ কারণেই তার নামের সাথে আমীর শব্দটি লেখা হত।

আবু নসর হাবীবের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। এ সময় হাবীবের এক দোস্ত–যায়েদ বিন নাবাহ সেখানে উপস্থিত ছিল। খাদেম এসে বলল, একজন মুসাফির আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।’

হাবীব বাইরে এসে আগন্তুকের দিকে এক দৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল। তুমি আবু নসর নও? কারো জন্য খলীফার পয়গাম নিয়ে এসেছ নাকি?

‘আপনার জন্যই পয়গাম এনেছি।’ আবু নসর বলল। খলীফার বিশেষ গোপন পয়গাম। তার নির্দেশ হল, কেউ যেন এই পয়গামের ব্যাপারে জানতে না পারে। এই নিন পয়গাম। আর আমাকে আত্মগোপন করে থাকার ব্যবস্থা করে দিন। জবাব নিয়ে আমি ফিরে যাব।’

হাবীব তার থেকে পয়গামের থলি নিয়ে খাদেমকে বলল, এই মুসাফিরের জন্য আলাদা কামরার ব্যবস্থা কর এবং তার খাওয়া-দাওয়ার প্রতি বিশেষ খেয়াল রেখো।

বৈঠকখানায় এসে হাবীব দোস্ত যায়েদের সামনে থলি খোলে পয়গাম বের করে পড়তে লাগল। পয়গাম খুব দীর্ঘ ছিল না। পয়গাম পড়তে গিয়ে হবীব বিন উবায়দার হাত কাঁপতে শুরু করল। তার হাত এতটা সজোরে কাঁপছিল যে, পয়গাম তার হাত থেকে পড়ে গেলো, আর চোখ থেকে কান্নার দমকে তপ্ত অশ্রু বের হয়ে এলো। পড়ে যাওয়া পয়গমটি উঠিয়ে নিয়ে যায়েদ পড়তে লাগল…।

‘আন্দালুসিয়ার আমীর আবদুল আযীযকে হত্যা করে তার মস্তক দামেস্ক পাঠিয়ে দাও। কেউ যেন জানতে না পারে।’

‘যায়েদ, তুমি তো জান, মুসা বিন নুসাইরের সাথে আমার বন্ধুত্ব কতটা গভীর হাবীব বলল। আমি তার ছেলের মস্তক কাটার নির্দেশ দিতে পারি না। এ কাজ আমার দ্বারা কিছুতেই হবে না।’

‘তাহলে নিজেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। যায়েদ বলল। খলীফার নির্দেশ না মানলে সে তোমার পরিবারের প্রত্যেকটি শিশু-সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করে ছাড়বে। হত্যা করার পূর্বে তোমাকে কয়েদখানায় বন্দী করে এমন নির্মম নির্যাতন। করবে যে, দিন-রাতে অসংখ্যবার তুমি মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যাবে।

‘তুমি কি এ ব্যপারে আমাকে সাহায্য করবে?’ হাবিব যায়েদকে জিজ্ঞেস করল।

‘তুমি বললে অবশ্যই সাহায্য করব। যায়েদ বলল। খলীফার এই নির্দেশ পালন করা ছাড়া তোমার কোন উপায় নেই।’

****

ইউরোপিয়ান ও মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রায় সকলেই লেখেছেন যে, হাবীব বিন উবায়দা এবং মুসা বিন নুসাইরের সাথে অত্যন্ত গভীর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু মরহুম খলীফা ওলিদ এবং তাঁর ভাই সুলায়মানের পক্ষ থেকে হাবীবের খান্দানের উপর এমন অজস্র অনুগ্রহ ছিল, যা অস্বীকার করা হবীবের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। তাছাড়া সুলায়মানের প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাবের কারণেও এই নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব ছিল না।

অনেক চেষ্টার পর হাবীব পাঁচজন ফৌজি অফিসারকে নিজের মতের সাথে একাত্ম করতে সক্ষম হল। এই পাঁচজন ফৌজি অফিসারই ছিল উমাইয়া বংশের। তারা আমীর আবদুল আযীযকে হত্যা করার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছল।

কিন্তু সমস্যা হল, আমীর আবদুল আযীয জনকল্যাণমূলক কাজে ও সামাজিক উন্নয়নকল্পে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, কখনও তিনি এক জায়গায় স্থির থাকতে পারেন না। আন্দালুসিয়ার কয়েকটি জায়গায় তখনো লড়াই চলছিল। খ্রিস্টানরা মুসলমানদেরকে আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত করতে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যে সকল অঞ্চল তখনো মুসলমানদের করতলগত হয়নি সেগুলো রক্ষার জন্য খ্রিস্টানরা প্রাণপণ লড়াই করছিল। আমীর আবদুল আযীয কখনও কখনও আকস্মিকভাবে যুদ্ধ ক্ষেত্রে চলে যেতেন।

আমীর আবদুল আযীযকে হত্যা করার জন্য গুপ্তঘাতকদের লেলিয়ে দেওয়া হল। তারা কয়েকবারই চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য চেষ্টা করল; কিন্তু তাদের প্রতিটি প্রচেষ্টাই চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল। আবদুল আযীয নিজেও আঁচ করতে পারেননি যে, কেউ তাঁকে হত্যা করার জন্য ছায়ার মতো তার পিছনে লেগে আছে।

অবশেষে হাবীব বিন উবায়দা এক বিকৃত মস্তিষ্ক গুপ্তঘাতকের সন্ধান পেল। সে অত্যন্ত সাহসী ও ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন ছিল। সে ছায়ার মতো আমীর আবদুল আযীযের পিছনে লেগে থাকত। আমীর আবদুল আযীয সর্বদা দেহরক্ষী বেষ্টিত হয়ে থাকতেন। তাঁর পর্যন্ত একটি তীর পৌঁছাও ছিল অসম্ভব।

এই গুপ্তঘাতকের নাম কোন ঐতিহাসিকই উল্লেখ করেননি। গুপ্তঘাতক একটি মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় ছিল। তখনকার যুগে যিনি সিপাহসালার হতেন তিনিই ইমামতের দায়িত্ব পালন করতেন। জামে মসজিদের ইমামতের দায়িত্ব তাঁর উপরই ন্যস্ত থাকত।

একদিন আমীর আবদুল আযীয ফজরের নামাযের ইমামতের জন্য দাঁড়িয়েছেন। তিনি সূরা ফাতেহা তিলাওয়াত করে সুরা ওয়াকিয়া শুরু করেছেন মাত্র। এমন সময় এক ব্যক্তি বিদ্যুৎগতিতে প্রথম কাতার থেকে বের হয়ে, চোখের পলকে তলোয়ারের এক আঘাতে আমীর আবদুল আযীযের শরীর থেকে মস্তক আলাদা করে ফেলল। নামাযীগণ কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই গুপ্তঘাতক মস্তক নিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।

গুপ্তঘাতক আমীর আবদুল আযীযের কর্তিত মস্তক কাপড়ে পেঁচিয়ে হাবীব বিন উবায়দার ঘরে এসে পৌঁছল। হাবীব তার অপেক্ষায় ছিল। সে চামড়ার একটি থলি বানিয়ে রেখেছিল। কর্তিক মস্তক সেই থলিতে রেখে সেলাই করে আরেকটি মখমলের থলিতে ভরে বার্তাবাহক আবু নসরকে দিয়ে বলল, এটা খলীফা সুলায়মান বিন আবদুল মালেকের নিকট পৌঁছে দাও।’

‘কি আছে এর মধ্যে? বার্তাবাহক জিজ্ঞেস করল।

‘খলীফার পয়গামের উত্তর। হাবীব বলল। এখনই রওনা হয়ে যাও।’

আবু নসর তৎক্ষণাৎ বের হয়ে পড়ল। সে প্রায় বিশ দিন লাগাতার সফর করে দামেস্ক এসে পৌঁছল। দামেস্ক পৌঁছেই সে খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করল। হাবীব খলীফার পয়গামের উত্তর হিসেবে যে থলি তাকে দিয়ে ছিল, সেই থলি সে খলীফার সামনে পেশ করল।

খলীফা সুলায়মান থলির মধ্যে আমীর আবদুল আযীযের কর্তিত মস্তক দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তিনি চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন, ‘আন্দালুসিয়ার আমীরের কর্তিত মস্তক কয়েদখানায় তার বাবার সামনে রেখে এসো।’

সাথে সাথে তার নির্দেশ পালন করা হল। আমীর আবদুল আযীযের কর্তিত মস্তক মুসা বিন নুসাইরের সামনে পেশ করা হল।

মুসা বিন নুসাইর প্রথম থেকেই অসহনীয় দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত ছিলেন। নিত্য নতুন নির্যাতন, আর অনাহারে-অর্ধাহারে তাঁর শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। শারীরিক ও মানসিক আর কোন প্রকার দুঃখ সহ্য করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এমন সময় প্রিয় পুত্রসন্তানের কর্তিত মস্তক দেখে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। হুঁশ ফিরে এলে দেখেন, মস্তক সেখানে নেই।

প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্টে আক্ষেপ করে মুসা বিন নুসাইর বলে উঠলেন। তারা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, যে দিনের আলোতে ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আত্মবিস্মৃত হয়ে থাকত। আর নিঝুম রাতের আঁধারে আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে থাকত। সে ছিল আধার রাতের এবাদতগুজার, আর যুদ্ধদিনের সিপাহী শাহসওয়ার। সে দিনে রোজা রাখত, আর রাতে জায়নামাযে বিনিদ্র রজনী কাটাত।

মুসা বিন নুসাইর যে কারাগারে পুত্র শোকের অসহ্য যন্ত্রণা বুকে নিয় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই একই কারাগারে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সিন্ধু বিজয়ী বীরপুরুষ মুহাম্মদ বিন কাসেম। খলীফা সুলায়মানের নির্দেশে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। নির্মম অত্যাচারের অসহ্য যাতনা সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন।

“তোমরা এমন এক যুবককে হত্যা করে ফেলছ, যে আর দশটা যুবকের মতো নয়।’

আরেক সিংহপুরুষের হৃদয় বিদারক আর্তচিৎকারেও এই কারাপ্রাচীরের ইট-পাথরগুলো প্রকম্পিত হয়েছিল। খলীফা সুলায়মানের নির্দেশে তাকেও হত্যা করা হয়। সেই মহান মুজাহিদ হলেন, সমরকন্দ বিজেতা কুতায়বা বিন মুসলিম। মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিস্তদ্ধ কারাপ্রাচীরের মধ্যে চিৎকার করে বলেছিলেন :

হে রাসূলে আরাবীর উম্মত! আমি তো তোমাদের উন্নতি আর মঙ্গলের জন্য সচেষ্ট ছিলাম। সেই আমাকেই তোমরা বাঁচতে দিলে না। আজ তোমাদের উপর যে অধঃপতন, আর ধ্বংস নেমে এসেছে, তা থেকে তোমাদেরকে কে বাঁচাবে?

আন্দালুসিয়ার আমীর আবদুল আযীয শহীদ হওয়ার পর মুসা বিন নুসাইর বেশি দিন বাঁচেননি। তার এক-দেড় বছর পর সুলায়মান বিন আবদুল মালেকও মৃত্যুবরণ করেন।

এটা কোন কল্পকাহিনী নয়। এটা এমন এক ঈমানদীপ্ত উপাখ্যানের শেষ পরিণতি, যার শুরু হয়েছে পাঁচই রজব ৯২ হিজরী মোতাবেক ৯ই জুলাই ৭১১ খ্রিস্টাব্দে। যখন একজন খ্রিস্টান প্রশাসক মিসর ও আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের দরবারে এসে ফরিয়াদ করেন, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক তার কুমারী মেয়ের শ্লীলতাহানী করেছে। সে এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে চায়। মুসলমানদের মদদ ছাড়া তার একার পক্ষে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। সেই খ্রিস্টান প্রশাসককে সাহায্য করার জন্য মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদকে ডেকে পাঠান।

২. দামেস্কের কারাগারে

০২.

দামেস্কের কারাগারের একটি ছোট্ট অন্ধকার কুঠরী। সারা দিনের ভিক্ষাবৃত্তি শেষে মুসা বিন নুসাইরকে এই অন্ধকার কুঠরীতেই রাত্রি অতিবাহিত করতে হয়। তিনি যখন তাঁর ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহটি সেই ছোট্ট অন্ধকার কুঠরীতে এলিয়ে দিতেন তখন তাঁর বিগত জীবনের একেকটি ঘটনা ছবির মতো তাঁর মনের পর্দায় ভেসে উঠত। স্মৃতিগুলো একে একে চোখের সামনে এসে জড়ো হত।

অতীত দিনের কোন ঘটনাই তিনি মনে করতে চাইতেন না। অতীতের প্রতিটি স্মৃতি তাঁর হৃদয়-স্পন্দন বাড়িয়ে দিত। হৃদয়ের এই স্পন্দন তাঁর নিকট মৃত্যুযন্ত্রণার মতো মনে হত। তিনি বুক ভরা ব্যাথা নিয়ে পরাজিত ও বঞ্চিত জীবনের শেষ দিনটির অপেক্ষা করছিলেন।

তাঁর মনে কোন আফসোস নেই। নেই কোন অতৃপ্তি। তাঁর অশান্ত মনের একমাত্র প্রশান্তি এই যে, তিনি আল্লাহর দ্বীনের পয়গাম আটলান্টিক মহাসগরের পাদদেশ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন।

অপরাধ না করেও তিনি যে অপরাধের শাস্তি ভোগছেন, এ জন্য আল্লাহর কাছে তিনি কোন অনুযোগ করেননি। তিনি ভালো করেই জানেন, আল্লাহ তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট নন। পার্থিব সকল বন্ধন থেকে তিনি মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। মানসিকভাবে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এই কারাগারেই তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর অজ্ঞাত কোন স্থানে তাকে দাফন করে দেওয়া হবে। হয়তো বা তাঁর জানাযার নামাযও পড়া হবে না।

তিনি ভাবতেও পারছিলেন না যে, ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে থাকবেন। যত দিন সূর্যের উত্তাপে পৃথিবী সজীব থাকবে, চাঁদ-সেতারা রাতের আকাশ আলোকিত করবে, তত দিন ইতিহাসের বুকে মুসা বিন নুসাইরের নাম থাকবে। তাঁর বিজয়গাথা মানব হৃদয়ে ঈমানের দ্যুতি ছাড়াবে।

তিনি জানতেন না, তারিক বিন যিয়াদ এখন কোথায়? খলীফা দুজনকেই দামেস্ক ডেকে এনেছিলেন। তারিক বিন যিয়াদের কথা চিন্তা করে মুসা বিন নুসাইরের আফসোস হচ্ছিল। আন্দালুসিয়া-বিজয়ী নওজোয়ান এই সিপাহসালারের সাথেও হয়তো এমনই আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বোধ হয়, এই কারাগারের কোন অন্ধকার কুঠরীতে বন্দী হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।

মৃত্যুপথযাত্রী মুসা বিন নুসাইয়ের মন আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। লাঞ্ছনা-গঞ্জনার ভারে ন্যুজ। অতীত দিনের স্মৃতিগুলো অবচেতন মনে বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠে।

এই তো সে দিনের কথা। উত্তর আফ্রিকার ছোট্ট একটি রাজ্য সিউটার গভর্নর জুলিয়ান তাঁর নিকট এলো। সে দিনের পুরো দৃশ্যটাই তাঁর চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠল। ঐদিন তিনি উত্তর আফ্রিকার একটি শহর তানজানিয়ায় অবস্থান করছিলেন।

তিনি মিসর ও আফ্রিকার আমীর নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও নিশ্চিন্তে কোথাও বসে থাকতেন না। কখনও একাই শত্রুর মোকবেলায় জেহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কখনও সৈন্য পরিচালনায় শাহসওয়ারের ভূমিকা পালন করতেন। আবার কখনও সুদক্ষ সমাজ সংস্কারকের ন্যায় সংস্কারকর্মে আত্মনিয়োগ করতেন। কখনও শহরে-গঞ্জে কখনও গ্রামে-বন্দরে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের সঠিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন।

এমনই ব্যস্ততার মাঝে যখন তাঁকে সংবাদ দেওয়া হল, সিউটার গভর্নর জুলিয়ান তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। তখন তিনি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। ‘জুলিয়ান! কী উদ্দেশ্যে সে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়?

যে লোকটি জুলিয়ানের আগমনের সংবাদ নিয়ে এসেছিল সে বলল, ‘জুলিয়ান একা আসেনি, তার সাথে আরো লোকজনও আছে। তাদেরকে উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা বা শাহীখান্দানের লোক বলে মনে হচ্ছে। তারা বেশ কিছু উপহার-উপঢৌকনও সাথে এনেছে।’

‘আল্লাহর কসম! আমার বিশ্বাস হয় না’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। কেউ কি বিশ্বাস করবে, যাদের সাথে আমাদের লড়াই চলছে, যারা আমাদের জানের দুশমন, আচানক তারা আমাদের দোস্ত হয়ে গেছে? অসম্ভব, কিছুতেই হতে পারে না। তারা হয়তো সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। আমি তাদের সন্ধির প্রস্তাব কিছুতেই গ্রহণ করব না।’

‘মুহতারাম আমীর!’ একজন সভাসদ আরয করলেন। তারা এতটা দূর থেকে এসেছেন, তাদেরকে সাক্ষাতের সুযোগ প্রদান করা হোক।

***

সিউটা রোম সাগরের পাড়ে অবস্থিত আফ্রিকার সীমান্তবর্তী একটি ছোট্ট রাজ্য। তার বিপরীত দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জাবালুতারিক বা জেব্রেলটার প্রণালী। সিউটা ও জাবালুতারিকের মধ্যখান দিয়ে যে সাগর বয়ে গেছে তার বিস্তৃতি প্রায় বার মাইল।

সিউটা হল আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের করদ-রাজ্য। সিউটার নিজস্ব সৈন্যবাহিনী আছে। তা সত্ত্বেও রডারিক নিজের কিছু সৈন্য সেখানে মোতায়েন করে রেখেছে।

আন্দালুসিয়ার মতো শক্তিশালী রাজ্যের মদদপুষ্ট হওয়ার কারণে জুলিয়ান সর্বদা শক্তি প্রয়োগ করে আশ-পাশের অঞ্চল দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করত। জুলিয়ানের ঔদ্ধত্য দমন করার জন্য মুসা বিন নুসাইর প্রায়ই ফৌজ প্রেরণ করতেন। জুলিয়ান বাহিনীর সাথে তাদের কয়েকবার লড়াইও হয়েছে।

মুসা বিন নুসাইর সিউটা দখল করে নেওয়ার জন্য দুই-তিনবার রীতিমত আক্রমণ পরিচালনা করেন। কিন্তু সিউটার দুর্গ এতটাই মজবুত যে, কিছুতেই তা পদানত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানবাহিনীকে দুর্গের মধ্যে বন্দী করে রাখার জন্য বাবার ফৌজের মাধ্যমে দুর্গ অবরোধ করেও রাখেন।

তিনি এই ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন যে, জুলিয়ানের অত্যাচার চিরতরে বন্ধ করার জন্য অতিসত্বর সিউটার উপর কঠিন হামলা চালাবেন। প্রয়োজন হলে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখবেন, যেন ক্ষুধ-পিপাসায় কাতর হয়ে দুর্গের লোকেরা অস্ত্র সমর্পণ করতে জুলিয়ানকে বাধ্য করে। তবে তিনি এই আশঙ্কাও করতেন যে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ বড়ারিক জুলিয়ানের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে। মুসা বিন নুসাইর একে একে দুইবার দূত মারফত জুলিয়ানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি জুলিয়ানকে এই মর্মে পত্রও লেখেছিলেন যে,

‘জুলিয়ান! নিজে শান্তিতে থাকুন, অন্যকেও শান্তিতে থাকতে দিন। অন্যথায় আপনাকে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।’

জুলিয়ান প্রতিউত্তরে স্বৈরাচারী মনোভাব ও ঔদ্ধতের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিউত্তরে লেখেছিলেন,

‘সালতানাতে ইসলামিয়ার আমীর! সিউটা অবরোধ করার আগে আন্দালুসিয়ার ফৌজি শক্তি সম্পর্কে আপনার ধারণা থাকা উচিত। যেন পরবর্তীতে পিছু হটার লাঞ্ছনা পেতে না হয়।

মুসা বিন নুসাইর মনে মনে ভাবলেন, সেই জুলিয়ানের মতো স্বেচ্ছাচারী ও অবাধ্য দুশমন এসেছে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে! তিনি কিছুটা আশ্চার্য হয়ে বার্তাবাহককে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘জুলিয়ানকে ভিতরে নিয়ে এসো।’

***

শাহীলেবাস পরিহিত জুলিয়ান রাজকীয় গাম্ভির্যের সাথে দরবারে প্রবেশ করল। সে সময় দরবারে মুসা বিন নুসাইরের সামনে দুই-তিনজন উপদেষ্টা ও কয়েকজন সালার বসাছিলেন। জুলিয়ানকে দেখে মুসা বিন নুসাইর উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ঠোঁটের কোনে মুচকিহাসির রেখা টেনে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। জুলিয়ান সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন,

‘আমি শান্তি ও নিরাপত্তার বাণী নিয়ে এসেছি, শান্তি ও নিরাপত্তার বাণী নিয়ে ফিরে যেতে চাই। দোস্তীর পয়গাম নিয়ে এসেছি, দোস্তীর সওগাত নিয়ে ফিরে যেতে চাই।’

জুলিয়ানের দোভাষী বার্বার ভাষায় জুলিয়ানের কথা তরজমা করে গুনাল।

মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের সাথে কোলাকুলি করলেন। তিনি তাকে ডানবাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে কুরসির দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, আমাদের ঘরে ভয়ঙ্কর কোন দুশমন এসে উপস্থিত হলে আমরা তাকে দোস্তই মনে করি। আপনার মনে যত মারাত্মক দুরভিসন্ধিই থাক না কেন, এ মুহূর্তে আমরা আপনাকে দোস্ত মনে করব।’

দোভাষী উভয়ের কথা তরজমা করে শুনাচ্ছিল।

জুলিয়ানের সাথে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহিত চৌকস দুজন দেহরক্ষী দরবারে প্রবেশ করল। তারা উভয়ে দরজায় দু’পাশে ফলা বিশিষ্ট বল্লম উঁচিয়ে নিশ্চল পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। তাদের দৃষ্টি ছিল সতর্ক ও অন্তর্ভেদী।

তারা উভয়ে জুলিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল। জুলিয়ান মাথা নেড়ে ইঙ্গিত করল। তারা দুজন যন্ত্রচালিতের ন্যায় সম্মান প্রদর্শনের জন্য মাথা ঝুকাল। তারপর সোজা হয়ে উল্টো পায়ে দরবার থেকে বের হয়ে গেল।

তারা বের হয়ে যাওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরে কৃষ্ণকায় দু’জন লোক দরবারে প্রবেশ করল। তাদের মাথায় সফেদ টুপি। আর নিম্নাঙ্গে ঝলমলে রেশমী কাপরের লুঙ্গি।

তারা বড়সড় একটি বাক্স ধরাধরি করে দরবারে প্রশে করল। বাক্সটি মুসা বিন নুসাইরের সামনে রেখে ঢাকনা খালে দিল। তারপর উভয়ে মুসার সামনে দু’জানু হয়ে কুর্নিশ করল। কুর্নিশ শেষে মাথা নিচু করে উল্টো পায়ে বাইরে চলে গেল।

তারা চলে যাওয়ার পর আরো দু’জন হাবশী গোলাম আরেকটি বাক্স নিয়ে দরবারে প্রবেশ করল।

“সিউটার সম্মানিত রাজা! মুসা বিন নুসাইর বলে উঠলেন। আপনার লোকদের বলে দিন, তারা যেন আমাকে কুর্নিশ না করে। আমার সামনে মাথা না ঝুঁকায়।

ইসলামী সালতানাতের আমীর!’ জুলিয়ান বলল। এরা গোলাম, শাহীখান্দানের লোক নয়। এদের কুর্নিশ করতে বাধা দেবেন না।’

‘আমরা সকলেই গোলাম।’ মুসা আসমানের দিকে ইশারা করে বললেন। ‘আমরা কেবল এক বাদশাহকেই কুর্নিশ করি। তাঁর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে সেজদাবনত হই। সে বাদশাহ হলেন, মহান আল্লাহ। সম্মান প্রদর্শনের এই পদ্ধতি আপনি আপনার দরবারে পালন করুন, আমাদের কোন আপত্তি নেই। এ মুহূর্তে আমরা আল্লাহর দরবারে বসে আছি।’

মুসা বিন নুসাইর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কখনও মুসলমানদেরকে একত্রিত হয়ে নামায পড়তে দেখেননি?”

‘আফ্রিকার মহামান্য আমীর! আমি দেখেছি।’ জুলিয়ান বলল। আপনার ফৌজ যখন সিউটা অবরোধ করে তখন এক সন্ধ্যায় আমি দুর্গ প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে দেখেছি, আপনার ফৌজ একজন ব্যক্তির পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিল।

‘এ দৃশ্য দেখে আপনার মনে কী অনুভূতি জন্মেছিল? আপনি কি দেখেননি, সেখানে একজন সাধারণ সিপাহী ও সিপাহসালার, সাদা ও কালো, আমীর ও গরীব সকলে এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল? সেখানে এমন কোন নিয়ম ছিল না যে, আমীর প্রথম সারিতে দাঁড়াবে, আর গরীব পিছনের সারিতে দাঁড়াবে। ইসলামে গোলাম ও মনিবের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে সকলে সমান হয়ে যায়। মানুষের সামনে মানুষের মাথা ঝুঁকিয়ে সেজদা করা হারাম, গুনাহের কাজ।

তিনটি বড় বড় বাক্স দরবারে আনা হল। মুসা বিন নুসাইরের নিষেধসত্ত্বেও বাক্স বয়ে নিয়ে আসা গোলামরা মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করে যাচ্ছিল, আর জুলিয়ান না বুঝার ভান করে মুচকি-মুচকি হাসছিলেন। তিনটি বাক্সই মহামূল্যবান হাদিয়া-তোহফায় ভরা ছিল। জুলিয়ান এগুলো মুসা বিন নুসাইরের জন্য এনেছিলেন।

‘আফ্রিকার আমীরের জন্য একটি ঘোড়াও এনেছি।’ জুলিয়ান বললেন। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আন্দালুসিয়ার জঙ্গী ঘোড়া। এত তীব্র বেগে ছুটে যে, মনে হয়, দৌড়াচ্ছে না; উড়ে চলছে। একমাত্র শাহসওয়ারকেই সে তার পিঠে আরোহণের সুযোগ দেয়। যেখানেই লাগাম টেনে ধরা হয় সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে। এই ঘোড়া বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এটি শাহী আস্তাবলের সেরা ঘোড়া।’

‘আমি নিজের পক্ষ থেকে এবং খলীফাতুল মুসলিমীনের পক্ষ থেকে আপনার শোকরিয়া আদায় করছি।’ মুসা বিন নুসাই বললেন। এখন বলুন, আপনার আগমনের উদ্দেশ্য কি?

***

‘আফ্রিকা ও মিসরের সম্মানিত আমীর!’ জুলিয়ান বললেন। আমি আপনার জন্য অরেকটি তোহফা এনেছি, এ তোহফা খোদ আপনাকে অগ্রসর হয়ে গ্রহণ করতে হবে। আমিও আপনার সফরসঙ্গী হব। চলার পথে কৃষ্ণসাগরের অথৈ জলরাশী বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আমি আমার নৌবহর ও নাবিক আপনাকে দেব। তারা আপনার হুকুমে কাজ করবে।’

‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের অন্তরের গোপন কথা জানেন।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। প্রথমত আপনার আগমনের উদ্দেশ্যই আমার নিকট স্পষ্ট নয়। তার উপর আপনি যে তোহফার কথা বলছেন, সেটা এতটাই রহস্যপূর্ণ যে, তা বুঝার মতো যোগ্যতা আমার নেই। আপনি আপনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করলে আমার মতো সল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের পক্ষে বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হবে।

‘আমি যে তোহফার কথা বলছি, সেই তোহফার নাম, আন্দালুসিয়া। জুলিয়ান বললেন। ‘আন্দালুসিয়া যে এক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দেশ। এ ব্যাপারে আপনি ভালোভাবেই অবগত আছেন। আপনি চাইলে এই রাজ্যকে ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। আন্দালুসিয়ার পর ফ্রান্স। আন্দালুসিয়ায় আপনি আপনার রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করে ফ্রান্স আক্রমণ করতে পারবেন।

‘ইসলামী সালতানাতের সাথে আপনার এই আন্তরিকতা প্রদর্শনের কী কারণ থাকতে পারে? মুসা বিন নুসাইর বললেন। তাছাড়া আপনার স্বজাতি বাদশাহ রডারিকের সাথে আপনার এই হঠাৎ দুশমনিইবা কি কারণ ঘটতে পারে?

আপনার হয়তো জানা আছে, আমি বাদশাহ রডারিকের করদ-রাজা। জুলিয়ান বললেন। সে আমাকে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। সে সর্বদা এই আশঙ্কা করে যে, আরব মুসলমানগণ অপরাজেয় এক সামরিক শক্তিরূপে যেভাবে আত্মপ্রকাশ করছে, মনে হয় তারা অতিসত্বর আন্দালুসিয়াকে পদানত করে ইউরোপে প্রবেশ করবে। তারা সময়ের সামান্য ব্যবধানে রোম-পারস্যের ন্যায় মহাশক্তিধর দুটি সাম্রাজ্যকে তছনছ করে দিয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য জয় করতে করতে উত্তর আফ্রিকার সীমান্ত সৈকতে এসে পৌঁছেছে। অল্প সময়ের মধ্যে আফ্রিকার হিংস্র জাতি বাবার সম্প্রদায়কে ইসলাম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে সুসংবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল এক সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে। আর এসব কিছুই হল রডারিকের ভয়ের কারণ। তাই আপনি যেন কখনও আন্দালুসিয়া আক্রমণ করতে না পারেন, সে জন্য রডারিক আমাকে আপনার পথেরাঁটা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।’

‘তাহলে কি আপনি আন্দালুসিয়া ও আমাদের মাঝে একজন স্বাধীন রাজা হয়ে থাকতে চান?’ মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন।

‘আপনার এই প্রশ্নের উত্তর পরেও দেওয়া যাবে। জুলিয়ান বললেন। আগে আপনি আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিন। আন্দালুসিয়ার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেভরা সুজলা-সুফলা রাজ্যকে আপনার বিশাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার কোন চিন্তা কি আপনার আছে?

‘না.. আন্দালুসিয়ার উপর হামলা করার মতো সৈন্যবাহিনী আমার নেই।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তাছাড়া আন্দালুসিয়ার বিশাল সৈন্যবাহিনীর সাথে। লড়াই করার জন্য রসদ সংগ্রহ করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।

এটা ছিল মুসা বিন নুসাইরের একটি কুটনৈতিক চাল। তিনি প্রতিপক্ষকে তার ইচ্ছা ও শক্তি সম্পর্কে বেখবর রাখতে চাচ্ছিলেন। তিনি কথার প্যাঁচে ফেলে জুলিয়ানের আগমন-রহস্য উদ্ধার করতে চাচ্ছিলেন।

প্রকৃত সত্য হল, মুসা বিন নুসাইর কয়েকবারই সমুদ্র অতিক্রম করে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি তার অভিজ্ঞ সালারদের সাথে পরামর্শও করেছেন। খলীফার ইজাযতের জন্য চেষ্টাও চালিয়েছিলেন।

খলীফার ইজাযত নেওয়া তাঁর পক্ষে কোন কঠিন কাজ ছিল না। কারণ, খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক অমুসলিম রাজ্যে আক্রমণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি মুহাম্মদ বিন কাসেমকে হিন্দুস্তান আক্রমণের জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। তথাপি মুসা বিন নুসাইরের মনে সামান্য দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। কারণ, তিনি জানতেন আরবদের এখনও সরাসরি কোন নৌযুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয়নি। আরব মুজাহিদগণ কিস্তি চালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ঠিক; কিন্তু স্থলযুদ্ধের তুলনায় নৌযুদ্ধের কলা-কৌশল অনেকটা ভিন্ন হয়ে থাকে। সে ব্যাপারে আরব মুজাহিদদের এখনও পর্যন্ত কোন প্রত্যক্ষ ধারণা জন্মেনি।

আফ্রিকা থেকে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করতে হলে একমাত্র সমুদ্রপথেই অগ্রসর হতে হবে। এই সমুদ্রপথে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করা হলে আন্দালুসিয়ার বিশাল নৌবহর নিশ্চিতরূপে বাধা প্রদান করবে। এই বাধা অতিক্রম করা মুসলমানদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।

মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, আন্দালুসিয়া আক্রমণ করার আদৌ কোন ইচ্ছা তার নেই। তিনি সন্দেহ করছিলেন, হয়তো জুলিয়ান এ জন্য এসেছে যে, মুসলমানগণ আন্দালুসিয়ার ব্যাপারে কী ধরনের চিন্তা-ভাবনা করছেন, তা জানার জন্য। তাঁর মনে এই সন্দেহও উঁকি দিচ্ছিল যে, জুলিয়ান হয়তো দেখতে এসেছেন, মুসলমানগণ কী করছে? তারা যদি বিলাসপ্রবণ হয়ে যুদ্ধ থেকে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে অতর্কিত হামলার মাধ্যমে মিসর ও আফ্রিকা থেকে চিরতরে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে।

এসব কথা চিন্তা করেই মুসা বিন নুসাইর এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন মুসলমানদের পরিকল্পনা ও শক্তি-সামর্থ সম্পর্কে জুলিয়ান কোন ধরনের ধারণা অর্জন করতে সক্ষম না হয়।

অপরদিকে জুলিয়ানের আগমনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, মুসা বিন নুসাইরকে আন্দালুসিয়া আক্রমণের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা। তাই তিনি আন্দালুসিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী ভাষার মাধ্যমে তুলে ধরছিলেন।

‘সম্মানিত আমীর! আপনি হয়তো জানেন না, আন্দালুসিয়া কুদরতের অপূর্ব সৃষ্টি-শৈলীর এক আশ্চর্য নিদর্শন। সবুজ পাহাড় আর মনোমুগ্ধকর উপত্যকায় ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক মুলুক। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ। দিগন্ত বিস্তৃত শস্যের সবুজ আভায় উদ্ভাসিত ফসলের মাঠ। পত্র-পুষ্পে আচ্ছাদিত ঘন বৃক্ষরাজির চোখ জোড়ানো দৃশ্য, আর সবুজের বুক চিরে কুলকুল তানে বয়ে চলা অসংখ্য নদ-নদী। মাটির উপর মাঠ ভরা সোনালী ফসল, আর মাটির নিচে থরে থরে সাজানো অসংখ্য খনিজ সম্পদ।

আপনি একবার সেখানে গেলে আর কখনও আরবের বালুকাময় মরুর দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা করবেন না। ফিরে আসতে চাইবেন না আফ্রিকার এই কঙ্করময় মরু ভূমিতেও।

সেখানের মানুষ সুন্দর। সেখানের মেয়েরা পাগলকরা রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারিনী। আপনি জান্নাতের হুর-পরীদের সৌন্দর্যের কথা শুনেছেন, যা শুধু মৃত্যুর পরই দেখা যাবে। জানা নেই, কে সেই সৌন্দর্য ভোগ করতে পারবে, আর কে পারবে না। কিন্তু আন্দালুসিয়া গেলে আপনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে বাধ্য হবেন। এই সেই জান্নাত, আল্লাহ যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

জুলিয়ান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মুসা বিন নুসাইরকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আফ্রিকার আমীর, আপনি কী ভাবছেন? আন্দালুসিয়ার প্রবেশদারের চাবি আমার হাতে, আমি সেই চাবি আপনার হাতে তুলে দেব।

জুলিয়ান আন্দালুসিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এমনি হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরছিলেন যে, মুসা বিন নুসাইর আন্দালুসিয়ার সৌন্দর্যে মোহবিষ্ট হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি। ইহুদি-নাসারাদের জাদুময়ী বাক-চাতুর্য ও চিত্তাকর্ষক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই অবগত ছিলেন।

তিনি ইঙ্গিতে নিজের লোকদের এবং জুলিয়ানের সাথে আগত মেহমানদেরকে দরবারকক্ষ থেকে বাইরে যেতে বললেন। দরবারকক্ষে থাকলেন শুধু মুসা বিন নুসাইর, জুলিয়ান আর দোভাষী।

***

‘জুলিয়ান! তুমি আমার জন্য অত্যন্ত সুন্দর একটি ফাঁদ পেতেছ।’ মুসা বললেন। “তোমার বিবেক-বুদ্ধি কি এতটাই লোপ পেয়েছে যে, তুমি এ কথা ভাবার প্রয়োজনই অনুভব করোনি, যাকে তুমি কথার জাদুতে ভুলাতে এসেছ, সে সাধারণ কোন ব্যক্তি নয়। জীবন-যুদ্ধের এক লড়াকু সৈনিক সে। তাঁর তীক্ষ্মদৃষ্টি মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা গোপন কথাও বলে দিতে পারে।’

‘এতে কোনই সন্দেহ নেই, আমীর মুসা! জুলিয়ান বললেন। আমি এসব কিছু চিন্তা করে তবেই এসেছি, সেই সাথে আমি আপনার শোকরিয়া আদায় করছি যে, আপনি আমাকে ছোট ভাই মনে করে তুমি বলে সম্ভোধন করেছেন।

জুলিয়ান তার দুটি হাত মুসা বিন নুসাইরের প্রতি প্রসারিত করে বললেন, ‘আমার দোস্তী কবুল করুন এবং আমার মনের মাঝে যে কথা গোপন আছে, সে কথা শ্রবণ করুন।

মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের হাত দুটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর জুলিয়ান নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং দ্রুত হাতে তরবারী কোষ মুক্ত করলেন। তার চেয়েও বেশি দ্রুত মুসার হাত তলোয়ারের বাট স্পর্শ করল। কিন্তু জুলিয়ানের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল আশ্চর্যজনক। তিনি তলোয়ার হাতের তালুতে তুলে দু’কদম অগ্রসর হলেন। অতঃপর হাটু গেড়ে বসে মুসা বিন নুসাইরের পদতলে রেখে দিলেন। তারপর এক পা পিছে সরে এসে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

‘আমীর মুসা! জুলিয়ান আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন। এই তলোয়ার কখনও কারো সামনে আত্মসমর্পণ করেনি। এই তলোয়ার অনেক শক্তিধর দুশমনের উদ্ধত মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করেছে। মুসা আমার কথায় মনে কষ্ট নিও না। আমাকে দাম্ভিক ও অহংকারী মনে করবেন না। এটা সেই তলোয়ার যাকে স্বয়ং আপনিও পরাস্ত করতে পারেননি। আপনার বার্বার ফৌজ পর্যন্ত এই তলোয়ারের ঝলক দেখে সিউটা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

সেই তলোয়ার আজ আপনার পদতলে রাখা। কোন বাদশাহ বা কোন সিপাহী এতো সহজে নিজের তলোয়ার দুশমনের পদতলে সমর্পণ করে না। কিন্তু আজ আমি আপনাকে আর দুশমন মনে করি না, ভাই মনে করি; দোস্ত মনে করি। আজ এক দোস্ত তার দুঃখের কথা অপর দোস্তকে শোনাতে এসেছে। মুসা! শোনবেন তার দুঃখের কথা? হবেন কি তার দুঃখের ভাগী?

মুসা বিন নুসাইর ঝুঁকে তলোয়ার উঠিয়ে হাতের তালুতে রেখে জুলিয়ানের সামনে পেশ করে বললেন, ‘আমি আনন্দ অনুভব করছি এ জন্য যে, তুমি আমাকে একজন বিশ্বস্ত দোস্ত, আর স্নেহশীল ভাই মনে করছ। আমি তোমার তলোয়ারের কদর করি।

মুসা নিজ হাতে জুলিয়ানের কোমরে ঝুলন্ত কোষে তলোয়ার রেখে দিয়ে বললেন। এখন কি আমার দোস্ত আমাকে তার দুঃখের কথা শোনাবে?’

‘হ্যাঁ, যে কথা শোনাতে এসেছি, তা শোনিয়ে তবেই ফিরে যাব। জুলিয়ান বললেন। আমি আমীর মুসাকে জিজ্ঞেস করছি, কেউ যদি তার মেয়ের ইজ্জত ছিনিয়ে নেয়, তাহলে তিনি তাকে কি শাস্তি দেবেন?

‘অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা হবে। মুসা বিন নুসাইর বললেন।

‘অপরাধী যদি কোন রাজ্যের বাদশাহ হয়?’ জুলিয়ান জানতে চাইলেন।

‘তাহলে মুসা তার বাদশাহী মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। সেই বাদশাহর শাহী হেরেমের মেয়েদেরকে দাসী-বান্দির মতো বন্দী করে সাথে নিয়ে আসবে।

সেই নির্যাতিতা মেয়েটি যদি আপনার কোন দুশমনের হয়।

‘সেই মজলুম মেয়ে এবং তার বাবা যদি ফরিয়াদি হয়ে আসে তাহলে মুসা তারও প্রতিশোধ নিবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবে যে, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার সালতানাত যেন কোন হুমকির সম্মুখীন না হয়ে পড়ে।

‘না, মুসা! আপনার সালতানাত কোন হুমকির সম্মুখীন হবে না; বরং আপনার সালতানাত আরো বিস্তৃতি লাভ করবে।’

‘মুসা বিন নুসাইর! সেই মজলুম বাবা স্বয়ং আমি, আর লঞ্ছনার শিকার আমারই মেয়ে।

‘তাহলে তোমার তলোয়ার এখনও কোষবদ্ধ কেন? আমার পদতলেই বা কেন তা সমর্পণ করছ?

‘এ জন্য যে, অপরাধী আমার চেয়েও বেশী শক্তিশালী। সে আন্দালুসিয়ার বাদশাহ। মানুষরূপী শয়তান রডারিক।

‘তোমার মেয়েকে রডারিক পেল কীভাবে?

‘দোস্ত মুসা! এখন আমি রডারিকের করদ-রাজা ঠিক; কিন্তু আমার সম্পর্ক আন্দালুসিয়ার শাহীখান্দানের সাথে। এক সময় আমার রাজ্য আজাদ ছিল। সময়ের পালাবদলে সিউটার প্রতিরক্ষার দায়ভার আন্দালুসিয়ার বাদশাহ নিজ হাতে তুলে নেয়। এভাবেই সিউটা আন্দালুসিয়ার করদরাজ্যে পরিণত হয়। আমি রাজা থেকে গভর্নর হয়ে যাই।

আমাদের শাহীখান্দানের নিয়ম হল, কোন মেয়ে পনের-ষোল বছরে উপনীত হলে, তাকে আন্দালুসিয়ার শাহীমহলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে সে শাহী আদব-কায়দা, কথাবার্তা ও চাল-চলন সম্পর্কে অবগত হতে পারে। শাহীখান্দানের লোকেরা কখনও কখনও তাদের দশ-বারো বছরের মেয়েকেও শাহীমহলে পাঠিয়ে দেয়।

আমিও আমার মেয়ে ফ্লোরিডাকে শাহীখান্দানের নিয়ম অনুযায়ী রডারিকের শাহীমহলে পঠিয়ে দিয়েছিলাম। তখন তার বয়স সতেরো বছরের চেয়ে কিছু কম ছিল। যেহেতু আসল উদ্দেশ্য ছিল শাহী আখলাক এবং শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া, সেহেতু বিভিন্ন খান্দান থেকে আগত উঠতি বয়সের মেয়েদেরকে শাহীখান্দানের মহিলাদের তত্ত্বাবধানেই রাখা হত। পুরুষদের সাথে তাদের কোন রকম সম্পর্ক থাকতো না। কিন্তু আমার মেয়ে আমাকে জানিয়েছে, রডারিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তার ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে।

‘তোমার মেয়ে এখন কোথায়? মুসা বিন নুসাইর জানতে চাইলেন।

‘আমি তাকে আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডো থেকে নিয়ে এসেছি। সে এখন সিউটাতে আছে। আপনি ইচ্ছে করলে তাকে এখানে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

মুসা বিন নুসাইর! আমি আমার বেইজ্জতীর প্রতিশোধ নিতে চাই। আর এর একমাত্র রাস্তা হল, রডারিককে হত্যা করা। কিন্তু তা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ সে সব সময় দেহরক্ষীদের নিচ্ছিদ্র বেষ্টনীর মধ্যে থাকে। একা কখনই বাইরে বের হয় না।

এজন্য বিকল্প যে চিন্তা নিয়ে আমি আপনার নিকট এসেছি, তা হল আপনি আন্দালুসিয়ার উপর আক্রমণ করবেন। আমি আপনাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করব। তবে আমি দৃশ্যপটে উপস্থিত হব না।

আন্দালুসিয়ার ফৌজ বেশুমার। তাদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি তাকালে আপনাদের পক্ষে তাদের মোকাবেলা করা অসম্ভব মনে হবে, কিন্তু আপনার ফৌজের মাঝে আত্মোৎসর্গের যে জযবা, আর সামরিক ডিসিপ্লেন আমি দেখেছি, তা রডারিকের বাহিনীতে মোটেও নেই।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পরে করা যাবে। এই মুহূর্তে আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনার বাহিনী রডারিকের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে।

আমার মনে প্রতিশোধের যে আগুন জ্বলছে রডারিককে হত্য না করা পর্যন্ত সে আগুন কখনও নির্বাপিত হবে না। আমি তার বাদশাহীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চাই।

বন্ধু, আমার মনের এই আকাক্ষা একমাত্র আপনিই পূর্ণ করতে পার। ওয়াদা করছি, এই লড়াইয়ের যাবতীয় সুফল একমাত্র আপনিই ভোগ করবেন। আমাকে শুধু এতটুকু আশ্বাস দিতে হবে যে, সিউটার উপর আপনি কোন রকম হস্তক্ষেপ করবেন না। সিউটাকে একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।

***

জুলিয়ানের দুটি মেয়ে। একজনের নাম ফ্লোরিডা, অন্য জনের নাম মেরী। ফ্লোরিডা যতই বড় হচ্ছিল তার সৌন্দর্যের দ্যুতি ততই ছড়িয়ে পড়ছিল। তার মা সখিদের বলতো, “দিনে দিনে মেয়ে আমার যেভাবে রূপের-রানী হয়ে উঠছে, তাতে করে ওর জন্য ওমন রূপের-রাজা কোথায় যে তালাশ করে পাব?

ফ্লোরিডার মার জানা ছিল না যে, তার রূপে-রানী মেয়ে চৌদ্দ বছর বয়সেই তার মনের রাজাকে খুঁজে পেয়েছে। রাজ কুমারীর এই মনের মানুষটি কোন রাজপুত্র ছিল না। সে ছিল তাদেরই শাহী আস্তাবলের শাহসওয়ারের ছেলে।

শাহসওয়ার শাহীখান্দান ও ফৌজী অফিসারদের ছেলে-মেয়েদেরকে ঘোড়সওয়ারী ও তীরন্দাজীর প্রশিক্ষণ দিত। সে সুবাদে শাহীমহলে তার যথেষ্ট মান-সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। হেনরি ছিল তার একমাত্র নওজোয়ান ছেলে।

ফ্লোরিডার বয়স যখন তের-চৌদ্দ বছর তখন হেনরির বয়স সতেরো কি আঠারো। বাবার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে বালক বয়সেই হেনরি শাহসওয়ার হয়ে গিয়েছিল। তীরন্দাজীতেও সে যথেষ্ট দক্ষ ছিল।

ফ্লোরিডার চৌদ্দ বছর বয়স হলে জুলিয়ানের নির্দেশে হেনরির বাবা তাকে সকাল-সন্ধ্যা ঘোড়সওয়ারীর প্রশিক্ষণ দিতে লাগল। একদিন জুলিয়ান হেনরির বাবাকে ডেকে এনে বললেন,

‘আমার মেয়েকে সাধারণ কোন মেয়ে মনে করো না। তুমি জান, আমার কোন ছেলে নেই। এই মেয়েই আমার ছেলের অভাব পূরণ করবে। পুরুষ মনে করে তাকে ঘোড়সওয়ারী ও তীরন্দাজীর প্রশিক্ষণ দেবে, যেন সে দ্রুতগতি সম্পন্ন ঘোড়ার পিঠে চড়ে তলোয়ার চালনা করতে পারে। ঘোড়ার পিঠে চড়েই যেন তীর নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়।’

দেড়-দুই মাসে ফ্লোরিডা ঘোড়সওয়ারীতে এতটাই পারদর্শী হয়ে উঠল যে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে সে অনায়াসেই বড়সড় খানাখন্দ ও উর্দু উর্দু ঝোঁপঝাড় টপকে যেতে পারত।

তার উস্তাদ তাকে দূরে কোথাও যেতে দিত না। কিন্তু ফ্লোরিডা ছিল রাজকন্যা। অন্য সকল রাজকন্যার মতো সেও উস্তাদের নির্দেশের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে ঘোড়া নিয়ে বহু দূর চলে যেত। ফ্লোরিডার এই ঔদ্ধত্যে তার উস্তাদ চিন্তিত হয়ে পড়ত। তার ভয় হত, মেয়েটি যেমন একরোখা তাতে করে কোন ঝোঁপঝাড় পেরোতে গিয়ে ছোট ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে পারে। তাছাড়া তাল সামলাতে না পেরে ঘোড়াই যদি হোছট খেয়ে পড়ে যায়, আর ফ্লোরিডার কোন ক্ষতি হয়, তাহলে তার উপর মহাবিপদ নেমে আসবে।

ফ্লোরিডার উস্তাদ এসব কথা চিন্তা করে অনাগত বিপদ থেকে তাকে উদ্ধারের জন্য একটি প্রতিকার বের করল। ফ্লোরিডা যখন ঘোড়া নিয়ে জঙ্গলের দিকে ছোটে যেতো তখন তার প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্য সে তার ছেলে হেনরিকে ঘোড়ায় চড়ে তার অনুসরণ করতে বলে দিল।

একদিন ফ্লোরিডা দেখতে পেল, হেনরি কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাকে অনুসরণ করছে। সে যেখানেই যায় হেনরি তার পিছু নেয়। ফ্লোরিডা তখন এনিয়ে কোন আপত্তি তুলেনি। একদিন ফ্লোরিডা গভীর জঙ্গলে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল। হেনরি ফ্লোরিডাকে লাগাম টেনে ধরতে দেখে সামান্য দূরে ঘোড়া থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ফ্লোরিডা পিছন ফিরে হেনরির দিকে তাকিয়ে মুচকি-মুচকি হাসতে লাগল।

হেনরি ছিল পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্যের অধিকারী। তার দেহের গঠনশৈলীই বলে দিতো, সে একজন সুপুরুষ। তাকে দেখলে বুঝা যেত, তার বাহুতে আছে শত্রুকে ধরাশায়ী করার মতো অসীম শক্তি। আর চোখে আছে যে কোন মেয়েকে পাগল করার করার মতো দৃষ্টি।

ফ্লোরিডা ঠোঁটে মিষ্টি হাসির রেখা টেনে বলে উঠল, ‘হেনরি আমাকে ঘোড়া থেকে নামাও। এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি যে, নিচে নামা সম্ভব হচ্ছে না।’

শাহজাদী ফ্লোরিডার নির্দেশ শোনামাত্র হেনরি দৌড়ে তার ঘোড়ার নিকট চলে এলো। সে ফ্লোরিডাকে নিচে নামানোর জন্য ঘোড়ার জিনের সাথে লাগানো রেকাবে হাত রাখল। কিন্তু ফ্লোরিডা তার বাহু প্রসারিত করে হেনরির গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ল।

হেনরি তাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে পিছে সরে আসতে চাইল। কিন্তু শাহজাদী তাকে নিজ বাহুবন্ধন থেকে বের হতে দিল না। সে হেনরিকে বলল, “চলে যেয়ো না হেনরি, তোমাকে আমার ভালো লাগে। অনেক ভালো লাগে।’

শাহজাদী, আমি তোমার সামান্য এক নওকরের ছেলে।’ হেনরি ভয়ে ভয়ে বলল। কাউন্ট জুলিয়ান যদি জানতে পারেন…।’

হেনরির কথা শেষ না হতেই ফ্লোরিডা বলে উঠল, ‘আমাকে ভুল বোঝ না হেনরি, আমি অবশ্যই মেয়েমানুষ; কিন্তু আমার স্বভাব অন্যান্য মেয়েদের মতো নয়। আমি শুধুমাত্র তোমার দেহ চাই না। আমি চাই এমন ভালোবাসা, যে ভালোবাসা অন্তরের মাটিতে অঙ্কুরিত হয়, আর তার দীপ্তি অন্তরলোকে ছড়িয়ে পড়ে। তুমি কি এমন ভালোবাসা সম্পর্কে অবগত নও?

“না, শাহজাদী।’ হেনরি স্বসংকোচে উত্তর দিল।

‘আমাকে শাহজাদী বলো না। আমি তোমাকে হুকুম দিচ্ছি না যে, তুমি আমাকে ভালোবাস। আমার শুধু এতটুকু অনুরোধ, আমাকে ফ্লোরা বলে ডেকো।

***

এই ঘটনার পর অনেক দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। হেনরি এখন শাহজাদীকে ফ্লোরা বলেই ডাকে। সবার সামনে হেনরি শাহজাদীর গোলাম হয়েই থাকে; কিন্তু দুর্গ থেকে বের হয়ে দূরে কোথাও গেলে সে হয়ে উঠে শাহজাদীর মনের মানুষ; প্রাণের পুরুষ।

ফ্লোরিডা প্রথম দিন হেনরিকে বলেছিল, আমি শুধুমাত্র তোমার দেহ চাই না, আমি চাই সত্যিকার ভালোবাসা; চাই একটা মনের মতো মন।

ফ্লোরিডা তার কথা রেখেছিল। হেনরির প্রতি তার ভালোবাসা শুধু দেহসর্বস্ব ছিল না। সে দেহ-মন দিয়ে একান্তরূপে হেনরিকে ভালোবেসে ছিল। তার ভালোবাসার বীজ অন্তরের মটিতে অঙ্কুরিত হয়ে ছিল, আর তার শাখা-প্রশাখা অন্তরলোকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

হেনরির সরাসরি তত্ত্বাবধানে ফ্লোরিডা শাহসওয়ারী, তীরন্দাজী ও অসি চালনার প্রশিক্ষণ নিতে লাগল। ফ্লোরিডার বাবা-মার মনে এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহও জন্ম নেয়নি যে, তাদের মেয়ে তার জীবনসাথী খুঁজে পেয়েছে।

ফ্লোরিডা ও হেনরি কখনও এ কথা চিন্তাও করেনি যে, তাদের বিয়ে হওয়া সম্ভব নয়। তারা ভেবেও দেখেনি যে, জুলিয়ান কখনই মখমলের চাদরের ছিন্ন অংশে চটের জোড়া লাগাবেন না।

এসব কিছু চিন্তা করা তো দূরের কথা, তারা প্রেমের নেশায় আর আবেগের টানে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে, তারা শুধু নিজেদের অবস্থানের কথাই ভুলে যায়নি; বরং গোটা পৃথিবী সম্পর্কেই বেখবর হয়ে পড়েছিল।

এমনি করেই সময় বয়ে চলছিল। দেখতে দেখতে দু’টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। একদিন ফ্লোরিডার মা ফ্লোরিডাকে কাছে ডেকে বললেন,

‘তোমার বাবা তোমাকে টলেডো নিয়ে যাবেন। আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের শাহীমহলে তোমাকে এক বছর থাকতে হবে।’

‘কেন? ফ্লোরিডা তার মাকে জিজ্ঞেস করল।

‘কী আশ্চর্য! তার মা বললেন। “তুমি কি জান না, শাহীখান্দানের মেয়েদেরকে শাহী আচার-আচরণ, আর শিষ্টাচার শিখার জন্য সেখানে গিয়ে থাকতে হয়?

‘আমি কি গ্রাম্য বুদ্ধ নাকি যে, শাহী আদব-কায়দা সম্পর্কে কিছুই জানি না।’ ফ্লোরিডা বলল। আমার মাঝে কিসের অভাব দেখেছেন আপনি? আমি সেখানে যাব না। সেখানের অনেক অপ্রীতিকর কথা আমি শুনেছি। সেখানে যে ধরনের আদব-কায়দা, আর শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়, তার অনেক কাহিনীই আমার জানা আছে।

মা অনেক বুঝালেন, কিন্তু ফ্লোরিডা গোঁ ধরে রইল। তার একই কথা, এ সকল বাদশাহদের কোন চরিত্র নেই। তাদের কোন আদর্শ নেই। অবশেষে তার বাবা যখন তাকে অনেকটা আদেশের সুরে আন্দালুসিয়া যেতে বললেন, তখন সেই আদেশ উপেক্ষা করার সাহস তার হল না। সে ভালো করেই জানত, তার বাবা কতটা নির্দয়, আর পাষাণ।

জুলিয়ান ও তার স্ত্রী ফ্লোরিডাকে সাথে নিয়ে আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর তারা ফ্লোরিডাকে রডারিকের শাহীমহলে রেখে সিউটা ফিরে এলেন।

টলেডো অবস্থানকালে একদিন তারা রডারিকের সাথে ফ্লোরিডার পরিচয় করিয়ে দেন। রডারিক ফ্লোরিডার উপচে পড়া যৌবন, আর চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়ল। সে অবচেতন মনে বলে উঠল, বাহ! কী সুন্দর! তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

‘জুলিয়ান, তোমার এই মেয়েকে কোন নামমাত্র শাহজাদার সাথে বিয়ে দিয়ে ওর জীবনটা নষ্ট করে দিও না।

‘এ আমার মেয়ে নয়; আমার ছেলে। জুলিয়ান মুচকি হেসে বললেন।

এমনি আরো অনেক কথার পর ফ্লোরিডাকে রডারিকের শাহীমহলে রেখে যখন তার বাবা-মা চলে আসছিলেন তখন তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিল।

***

ফ্লোরিডা টলেডো গেছে আট-দশ দিন হয়। ইতিমধ্যে তার বাবা-মা টলেডো থেকে সিউটা ফিরে এসেছেন।

একদিন হেনরির বাবা জুলিয়ানের নিকট এসে বলল, হেনরিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

জুলিয়ানের নির্দেশে হেনরির খুঁজে পাহাড়-জঙ্গল, মরুভূমি সবত্র চষে ফেলা হল, কিন্তু কোথাও তার কোন হদিস মিলল না।

সিউটায় থাকলে তো তাকে পাওয়া যাবে? সে সিউটার সীমানা পেরিয়ে কয়েক দিনের কষ্টকর সফর শেষে টলেডো চরে গিয়েছিল। ফ্লোরিডার বিরহবেদনা সে সইতে পারছিল না। তাই পালিয়ে টলেডো চলে গিয়েছিল।

সেখানে পৌঁছে সে শাহী আস্তাবলে উপস্থিত হয়ে সেখানের দায়িত্বশীল অফিসারের নিকট চাকরির দরখাস্ত পেশ করল। অফিসার ঠাট্টার ছলে তার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি অত্যন্ত বেয়াড়া ঘোড়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘চাকরি চাচ্ছ? ঠিক আছে, তাহলে এই ঘোড়ায় সওয়ারী করে দেখাও।’

ঘোড়াটি ছিল অত্যন্ত বেয়াড়া, সহজে কারো বশ্যতা স্বীকার করত না। হেনরি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘোড়র দিকে এগিয়ে গেল। সে অল্প সময়ের মধ্যে জিন লাগিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল। আস্তাবলের কর্মচারীরা এসে জড় হতে লাগল। তারা হেনরির ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি উপভোগ করার জন্য কৌতূহলী চোখে অপেক্ষা করতে লাগল।

দেখতে দেখতে ঘোড়া অবাধ্য হয়ে উঠল। সওয়ারীর বশ্যতা স্বীকার করতে সে মোটেই প্রস্তুত নয়। কিন্তু হেনরি হল পাকা ঘোড়সওয়ার। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে এই অবাধ্য, বেয়াড়া ঘোড়াকে তার বশে নিয়ে এলো। সে দ্রুতবেগে ময়দানের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়ে একের পর এক ব্যারিকেট টপকে যেতে লাগল।

যারা তামাশা দেখার জন্য জড় হয়েছিল তারা অভিভূতের ন্যায় ছুটন্ত ঘোড়ার দিকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে হেনরি তীরন্দাজী ও বর্শা নিক্ষেপের পারঙ্গমতা প্রদর্শন করল। ফলে সে আস্তাবলে ভালো একটি চাকরি পেয়ে গেল। হেনরি শুধু চাকরি চাচ্ছিল না; সে ফ্লোরিডার সাথে দেখা করতে চাচ্ছিল। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সে জেনে নিল, ফ্লোরিডা কোথায় থাকে।

ফ্লোরিডার সাথে দেখা করতে তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হল না। একদিন পাঁচ-ছয়জন শাহজাদী ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর জন্য আস্তাবলে এলো। তাদের মাঝে ফ্লোরিডাও ছিল। ফ্লোরিডার মতো এ সকল শাহজাদীরাও শাহী শিষ্টাচার, আদব-কায়দা ও বাদশাহী চাল-চলনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছিল। ঘোড়সওয়ারীও তাদের প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ফ্লোরিডা হেনরিকে দেখে অবাক হয়ে গেল। সে সোজা হেনরির নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কি? সে স্বাভাবিক আওয়াজেই জিজ্ঞেস করল, যেমনিভাবে শাহজাদীগণ অন্যান্য কর্মচারীদের নাম জিজ্ঞেস করে থাকে। আওয়াজের মধ্যে যেন তার অস্থিরতা প্রকাশ না পায়, সেদিকে তার খেয়াল ছিল।

‘আগাস্টা।’ হেনরি তার ছদ্মনাম বলল। এখানে সে সকলের নিকট এই নামই বলেছিল।

‘কোথাও যেন আমি তোমাকে দেখেছি।’ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফ্লোরিডা বলল।

হয়তো দেখেছেন, আমি অনেক জায়গাতেই থেকেছি।’ হেনরি আত্মসংবরণ করে বিনীতস্বরে বলল।

অন্যান্য শাহজাদীরাও হাসতে হাসতে তাদের পাশে এসে জড় হল।

‘আস্তাবলে তুমি কি কাজ কর?’ ফ্লোরিডা জিজ্ঞেস করল।

শাহজাদী! এ বহুত আচ্ছা শাহসওয়ার।’ আস্তাবলের অফিসার নিকটেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে শাহজাদীদের সাথে কথা বলার সুযোগ খেজছিল, এবার মওকা পেয়ে বলে উঠল।

‘আজ একেই আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। আমি দেখতে চাই সে কত বড় শাহসওয়ার।’ ফ্লোরিডা অফিসারকে লক্ষ্য করে বলল।

অফিসার হেনরিকে তাদের সাথে পাঠিয়ে দিল। শাহীমহল থেকে বের হয়ে ফ্লোরিডা সঙ্গী শাহজাদীদের বলল, আমি এই শাহসওয়ারের সাথে ঘোড়া দৌড়িয়ে দেখতে চাই, ঘোড়দৌড়ে সে কতটা দক্ষ।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্লোরিডা ও হেনরির ঘোড়া ঊর্ধ্বশ্বাসে পাশা-পাশি ছুটতে লাগল। তারা সবুজ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বহুদূর এগিয়ে গেল। যখন তারা ফিরে এলো তখন নিজেদের সব কথাই তারা বলে নিয়েছিল। হেনরি ফ্লোরিডাকে বলল, সে কাউকে কিছু না বলেই সিউটা থেকে চলে এসেছে।

‘এখনই ফিরে যাও। ফ্লোরিডা উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠল। আব্বা যদি জানতে পারেন, তুমি এখানে তাহলে তিনি প্রথম সন্দেহ এটাই করবেন যে, তুমি আমার জন্যই এখানে এসেছ। সিউটার শাহীচাকরি ছেড়ে এতদূর এসে চাকরি করার অন্য কোন অযুহাত দাঁড় করিয়ে তুমি কাউকেই আশ্বস্ত করতে পারবে না।’

‘আরো কয়েকটা দিন থাকতে দাও ফ্লোরা!’ হেনরি আবেগভরা কণ্ঠে বলল। দু-একবার তোমার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ করে দাও। তারপর আমি চলে যাব। গিয়ে বাবাকে বলব, সিউটায় থেকে থেকে হাপিয়ে উঠে ছিলাম, তাই কয়েক দিনের জন্য আন্দালুসিয়া থেকে ঘুরে এলাম।’

***

শাহীমহলের চতুপাশে ঘন বৃক্ষরাজির বাগান। গোটা বাগান জোড়ে ফল আর ফুল বৃক্ষের সমাহার। কোন কোন জায়গা পত্র-পুস্পে একেবারে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। ফ্লোরিডা হেনরিকে এমনি একটি জায়গার কথা বলল। সেখানে পৌঁছার রাস্তাও দেখিয়ে দিল। তবে সতর্ক করে দিল যে, অর্ধেক রাতের পরই শুধু এখানে আসা সম্ভব, অন্যথায় টহলদার সিপাহীদের হাতে ধরা পড়তে হবে।

হেনরি সব বিপদ উপেক্ষা করে পত্র-গুল্মে আচ্ছাদিত বাগানের সেই গোপনস্থানে একে একে দুইবার এসে ফ্লোরিডার সাথে সাক্ষাৎ করল। ফ্লোরিডাকেও এখানে আসার জন্য অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো।

শাহীরেওয়াজ শেখার জন্য যে সকল শাহজাদী এখানে আসত সব সময় তাদেরকে চোখে চোখে রাখা হত। তা সত্ত্বেও ফ্লোরিডা প্রহরীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে তার কামরা থেকে বের হয়ে পা টিপে টিপে বাগানে এসে উপস্থিত হতো।

দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সময় ফ্লোরিডা হেনরিকে তিন রাত পর দেখা করতে বলল।

হেনরির যেদিন বাগানে আসার কথা সে দিনই রডারিক চার-পাঁচ দিনের সফর শেষে শাহীমহলে ফিরে এলো। আন্দালুসিয়ার দূরবর্তী কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্রোহীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। বিদ্রোহ দমনের জন্য রডারিক সেখানে গিয়েছিল।

সেই অঞ্চলের তিন বিদ্রোহী নেতাকে হত্যা করে ঐদিন সন্ধ্যায় রডারিক ফিরে এলো। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি আর বিদ্রোহ দমনের আনন্দ তার মনে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

বিদ্রোহ দমনের আনন্দে রডারিক সন্ধ্যার পর শরাবের আসর জমিয়ে বসল। সে আনন্দ আর উল্লাসে ফেটে পড়ল। বুঝতে পারছিল না, আনন্দের এই মুহূর্ত সে কীভাবে উদ্যাপন করবে!

রাজা-বাদশাহরা আনন্দ-ফুর্তির সময় মদ আর নারী নিয়েই মেতে থাকতে পছন্দ করে। রডারিকের শাহীমহলেও এই দুটি বস্তুর কোন অভাব ছিল না। শরাবের আসরে দু-একজন দরবারীও রডারিকের সাথে নিজেদের পারঙ্গমত প্রদর্শন করছিল।

সুশ্রী ও চমৎকার দেহের অধিকারিনী একটি অল্পবয়স্কা মেয়ে রডারিকের পানপাত্র ভরে দিচ্ছিল। রডারিক মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “কোন ফুল আছে, ফুল?

তারপর সামন্য সময়ের জন্য রডারিকের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে বলল, “না, আজ আমার প্রয়োজন কোন কলির বা আধফুটা কলির।’

একজন দরবারী মুচকি হেসে বলল, এই তো সেই ফুল–যা শাহানশাহে আন্দালুসিয়ার নিদমহলে সুরভি ছড়িয়ে থাকে।’

‘না, আজ কোন নতুন কলি চাই। রডারিক নেশার ঘোরে বলে উঠল।

সে সামান্য সময়ের জন্য কি যেন চিন্তা করে চুটকী বাজিয়ে বলল। “হা… হা… পেয়েছি, ফ্লোরিডা… জুলিয়ানের মেয়ে ফ্লোরিডা…।’

‘শাহানশাহে আন্দালুসিয়া! একজন উপদেষ্টা বলে উঠল। বাহির থেকে আসা শাহজাদীগণ আমাদের নিকট পবিত্র আমানত। তারা এখানে আদব-আখলাক শেখার জন্য এসেছে। আজ পর্যন্ত কোন শাহজাদীর সাথেই কোন প্রকার অভদ্র আচরণ করা হয়নি। সুতরাং এই রেওয়াজ যেন নষ্ট না করা হয়।

‘আমি তাকে আন্দালুসিয়ার রানী বানাব। নেশার ঘোরে রডারিকের কথা জড়িয়ে আসছিল। তোমরা সকলে চলে যাও, আর ফ্লোরিডাকে এখানে পাঠিয়ে দাও।

‘মহামান্য শাহানশা!’ সেই উপদেষ্টা আবার বলল। “বিপদ সম্পর্কে আপনাকে সতর্ক করা আমার কর্তব্য। এই কর্তব্য আদায়ে আমাকে জীবন দিতে হলেও আমি রাজী আছি। হয়তো আপনারই তলোয়ার দেহ থেকে আমার গর্দান আলাদা করে ফেলবে। তবুও আমার আত্মা এই মনে করে প্রশান্তি লাভ করবে যে, আমি আমার কর্তব্য পলনে অবহেলা করেনি।

‘কিসের বিপদ?’ রডারিক তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। ‘জুলিয়ানের পক্ষ থেকে আমার কী এমন বিপদ হতে পারে? প্রথম কথা হল, তার মেয়ে ফ্লোরিডা শাহানশাহে আন্দালুসিয়ার নিদমহলে রাত্রি যাপন করাকে নিজের জন্য বিরাট সম্মান মনে করবে। দ্বিতীয় কথা, সে যদি আমাকে গ্রহণ না করে এবং তার বাবার কাছে অভিযোগ করে তাহলে জুলিয়ান আমার কী-বা ক্ষতি করতে পারবে।

সে তো মাত্র দুই ইঞ্চি জমিনের মালিক। আমাদের বিশজন শাহসওয়ারের সাথে লড়াই করার ক্ষমতাও সে রাখে না। আমরাই তার শক্তি। অবশ্য সে আরব আর বাবার বাহিনীকে সিউটা অতিক্রম করে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করতে দিচ্ছে না। কিন্তু তার একমাত্র কারণ হল, তার পিঠে আমাদের হাত রয়েছে। আমরা যদি তার উপর থেকে আমাদের হাত সরিয়ে নেই তাহলে বার্বার মুসলমানরা তার দুর্গের একেকটি ইট-সুরকি পর্যন্ত খুলে নিবে, আর তার দুই মেয়েকে দাসী বানিয়ে নিয়ে যাবে।

‘আমি যদি কিছু সময়ের জন্য তার মেয়েকে আমার নিদমহলে ডেকে আনি তাহলে তো তার খুশী হওয়া উচিত। তাছাড়া আমি তার মেয়েকে আমার রানীও বানাতে পারি।’

‘মহামান্য শাহানশা!’ সেই উপদেষ্টা পুনরায় বলল। আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি যে, আমাদের উচিত অন্যকে বন্ধু বানানো। বন্ধুকে শত্রু বানানো কিছুতেই ঠিক হবে না।’

‘তুমি নির্বোধের মতো কথা বলছ।’ রডারিক হুঙ্কার ছেড়ে বলল। এখন যাও, ফ্লোরিডাকে এখানে পাঠিয়ে দাও।

ক্ষমতার দম্ভ ও রাজত্বের গরিমা, আর শরাবের নেশা ও নারীর লিলা রডারিককে উন্মাদ বানিয়ে দিয়েছিল। কোন কিছুই সে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারছিল না।

কিছুক্ষণ পর ফ্লোরিডা তার কামরায় এসে উপস্থিত হল। তার চেহারায় ছিল আনন্দের উচ্ছ্বাস। ছোট মেয়েকে বাবা ডাকলে সে যেমন আনন্দে উল্লসিত হয়ে বাবার কাছে দৌড়ে যায়, ফ্লোরিডাও শাহানশাহে আন্দালুসিয়ার আহ্বানকে নিজের জন্য এক অনাকাক্ষিত সম্মান মনে করে উত্যু হয়ে ছুটে এসেছিল। কামরায় প্রবেশ করতেই রডারিক তাকে মজবুত বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়।

ফ্লোরিডা এমন পরিস্থিতির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে রডারিকের কুমতলব বুঝতে পেরে নিজেকে মুক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু চরিত্রহীন উন্মাদ রডারিকের পেশীবহুল বাহুর শক্ত বেষ্টনী থেকে মুক্ত হওয়া তার পক্ষে ছিল একেবারেই অসম্ভব। রডারিকের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য সে অনেক কান্নাকাটি করল।

রডারিকের ধারণাও ছিল না যে, কোন মেয়ে তাকে এমনি তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। রডারিক তাকে রানী বানানোর লোভ দেখাল। কিন্তু সে সতীত্ব হারিয়ে রানী হতে রাজি হল না।

রডারিক তাকে ভয় দেখাল, সে যদি তার প্রস্তাবে রাজি না হয় তাহলে সিউটার উপর আক্রমণ করা হবে এবং তার বাবা-মা ও গোটা পরিবারকে টলেডোর অলিগলিতে ভিক্ষা চাইতে বাধ্য করা হবে।

ফ্লোরিডা রডারিককে বলল, ‘আসমান-জমিন জ্বালিয়ে ভস্ম করে দাও, তবুও আমি আমার সতীত্ব, আমার কুমারীত্ব বিসর্জন দেব না।’

আন্দালুসিয়ার ইতিহাস রচয়িতাদের সকলেই এ কথা লেখেছেন যে, ফ্লোরিডা রডারিকের কোন প্রলোভন বা হুমকির সামনে আত্মসমর্পণ করেনি। সে বারবার তার সতীত্ব আর কুমারীত্বের দোহায় দিচ্ছিল, কিন্তু ক্ষমতার দাপট আর মদের নেশা তখন রডারিককে হিংস্র পশু বানিয়ে দিয়েছিল, ফলে মোল বছর বয়স্কা এক অবলা মেয়ে তার সতীত্ব আর কুমারীত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হল না।

***

রাতের অর্ধপ্রহর অতিবাহিত হয়েছে। নিঝুম নিশুতি রাত। কোথাও কোন সারা-শব্দ নেই। ঘন বৃক্ষরাজিতে আচ্ছাদিত অন্ধকার এক জায়গা দিয়ে দেয়াল টপকে হেনরি বাগানে প্রবেশ করল। এর আগেও সে এই জায়গা দিয়ে দুইবার বাগানে প্রবেশ করেছে। সে দেয়াল ঘেঁষে মাথা নিচু করে সেই স্থানে এসে পৌঁছল যেখানে ফ্লোরিডার সাথে তার সাক্ষাৎ হত। ফ্লোরিডা এখনও এসে পৌঁছেনি।

তাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সে দেখতে পেল, একটি ছায়া ধীরে ধীরে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আরো কাছে আসার পর স্পষ্ট হল, ছায়াটি একটি মেয়ের। হেনরি বরাবরের ন্যায় দুই-তিন পা অগ্রসর হয়ে ফ্লোরিডাকে লক্ষ্য করে দুই বাহু প্রসারিত করে ধরল। কিন্তু ফ্লোরিডাকে আজ একেবারেই স্থবির ও নিস্তেজ মনে হচ্ছিল। তার মাঝে প্রেমাস্পদের সাথে অভিসারের কোন উত্তেজনা ছিল না। সে হেনরির বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে তার হাত সরিয়ে দিলো। তারপর একদিকে ঝুঁকে ঘাসের উপর বসে পড়ল। তাকে খুব অসুস্থ দেখাচ্ছিল।

‘কি হয়েছে, ফ্লোরিডা?’ হেনরি তার পাশে বসতে বসতে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘আমার থেকে দূরে থাক, হেনরি!’ ফ্লোরিডা কাঁদতে কাঁদতে বলল। আমার এই অপবিত্র দেহ তুমি ছোঁয়ো না। এখন আমি আর তোমার যোগ্য নই। আমি আমার আত্মমর্যাদাশীল, বাহাদুর বাবাকে মুখ দেখাতে পারব না। এখন আমি আমার নিজেকেই অভিসম্পাত করছি।’

‘ফ্লোরা কি হয়েছে, বলবে তো?’ হেনরি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ফ্লোরিডা তাকে পুরো ঘটনা শুনিয়ে বলল, ‘আমার সতীত্ব ছিল আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।’ ফ্লোরিডা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আর বলছিল। আমি নিজেকে কখনও শাহজাদী মনে করিনি। যদি আমার রানী হওয়ার ইচ্ছা থাকত তাহলে আমার বাবার অধীন এক কর্মচারীর ছেলেকে আমি কখনই ভালোবাসতাম না।’

‘ফ্লোরা!’ হেনরি উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে তার কাপড়ের নিচে রাখা খঞ্জর বের করে বলল। আমি এই চরিত্রহীন বাদশাহকে হত্যা করে তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ নেব। তাকে হত্যা করে মহল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করব। যদি ধরা পড়ি তাহলেও কোন পরোয়া করি না। তোমার ইজ্জতের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমি হাসি মুখে জীবন দিতেও রাজি আছি।’

‘না, হেনরি, না।’ ফ্লোরিডা দাঁড়িয়ে তার সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বলল। “তুমি ঐ শয়তানের কাছেও পৌঁছতে পারবে না। তার আগেই ধরা পড়ে যাবে। আমি তোমাকে লক্ষ্যহীন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না। তুমি এক কাজ কর, সকালে শহরের ফটক খোলার সাথে সাথে শহর থেকে বের হয়ে পড়বে। যে কোন অযুহাতেই হোক সবচেয়ে উত্তম ঘোড়া নিবে। তারপর যতটা দ্রুত সম্ভব সিউটা পৌঁছে আমার বাবার কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলবে।

তাঁকে বলবে, তিনি যেন কোন বাহানায় আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। রডারিককে যেন কিছুতেই বুঝতে না দেন যে, তিনি এ ঘটনা সম্পর্কে জানেন। তিনি যদি রডারিকের সামনে সামান্য অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করেন তাহলে এই অসচ্চরিত্র বাদশাহ তাকে খুন করে ফেলবে। আর আজীবনের জন্য আমাকে তার মহলে বন্দী করে রাখবে। রডারিক আমাকে অত্যন্ত ভয়াবহ ধমকি দিয়েছে। বাবাকে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে বলবে। অন্যথায় সিউটা তাঁর হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর আমাদের পরিবারের পরিণতি হবে খুবই ভয়ঙ্কর।

***

ভোর হতেই হেনরি আস্তাবলের সেরা ঘোড়ার পিঠে জিন লাগিয়ে নিল। প্রতিদিনের রুটিনওয়ার্ক হিসেবে ঘোড়ার পরিচর্যার অযুহাতে সে দুর্গ থেকে বের হয়ে এলো।

শহর রক্ষা প্রাচীরের ফটক কিছুক্ষণ হল খুলে দেওয়া হয়েছে। দুর্গ থেকে বের হয়েই সে ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিল। যত দ্রুত সম্ভব তাকে এখন জেলেটার পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে জাহাজ ধরে সমুদ্র পথে সিউটা যেতে হবে।

টলেডো থেকে জেত্রেলটার দূরত্ব হল পাঁচশ মাইল। একটি মাত্র ঘোড়া নিয়ে এই দূরত্ব অতিক্রম করা একেবারেই অসম্ভব। হেনরি ভাবল, তার ফিরে আসতে দেরী হচ্ছে দেখে, দুর্গ থেকে তার খুঁজে লোকজন বের হয়ে পড়তে পারে। তাই সে বিদ্যুৎগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বেশ কিছু দূর অগ্রসর হয়ে সে একটি নদীর কিনারে ঘোড়া থামিয়ে তাকে পানি পান করাল। তারপর পুনরায় সফর শুরু করল।

সে অবিরাম ছুটে চলছিল। রাতের বেলাও সফর অব্যাহত রাখত। খুব অল্প সময়ের জন্য আরাম করত। আর বেশির ভাগ সময়ই সফর করত। বিরামহীনভাবে চলতে চলতে সে চারদিনে পাঁচশ মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করে জেলেটার বন্দরে এসে পৌঁছল।

জেলেটার সমুদ্র বন্দর। সিউটা যাওয়ার জন্য কোন জাহাজই তখন তৈরী নেই। দুই-তিন দিনের মধ্যে কোন জাহাজ সিউটার উদ্দেশ্যে রওনাও হবে না। একটি পাল তোলা নৌকা নদীর পারে নোঙর করা ছিল। নৌকার মাঝি-মাল্লারা একা হেনরিকে পার করে দেওয়ার জন্য এতো বেশি পয়সা চাচ্ছিল যে, হেনরির কাছে এই পরিমাণ পয়সা ছিল না। হেনরি নৌকার মাঝিদের বলল,

‘এই ঘোড়া তোমাদের নৌকার চেয়েও মূল্যবান। এটা তোমাদের হয়ে যাবে, আমাকে সিউটার সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে দাও।’

‘আমরা নৌকার সামান্য মাঝি, ঘোড়া দিয়ে আমরা কী করব?’ মাঝিরা বলল। এমনিতেই আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে পেট ভরে দু’বেলা খেতে পাই না, ঘোড়াকে কোত্থেকে খাওয়াব?”

‘তোমরা ঘোড়াটি বিক্রি করেও তোমাদের পাওনা উসুল করে নিতে পার।

‘আমরা ঘোড়র দর-দাম সম্পর্কে কিছুই জানি না।’

‘তাহলে তোমরা আমাকে বিশ্বাস কর।’ হেনরি নিরাশ হয়ে বলল। সিউটা পৌঁছে আমি তোমাদের ভাড়া মিটিয়ে দেব এবং তোমাদেরকে পুরস্কৃত করব।’

মাঝিরা তার চেহারা-সুরত, লেবাস-পোশাক ও শাহীঘোড়া দেখে তাকে বড় কোন অফিসার মনে করছিল। তারা ঘোড়াসহ তাকে নৌকায় উঠিয়ে নিল।

মাঝিরা নোঙর খুলে পাল তোলে দিল। তীর-তীর করে নৌকা চলতে শুরু করল।

সমুদ্র পথের এই দূরত্ব ছিল মাত্র বার মাইল। নৌকা যখন সিউটার সমুদ্র বন্দরে এসে পৌঁছল তখন সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হেনরি মাঝিদেরকে সাথে নিয়ে সোজা জুলিয়ানের মহলে গিয়ে উঠল। সে প্রহরীদের বলল,

‘কাউন্ট জুলিয়ানকে এখনই আমার আগমনের সংবাদ দাও। আমি টলেডো থেকে শাহজাদী ফ্লোরিডার অত্যন্ত জরুরী পয়গাম নিয়ে এসেছি।’

জুলিয়ান তৎক্ষণাৎ তাকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। সে তার মেয়ের সংবাদ জানার জন্য অস্থির হয়ে ছিলেন।

‘তুমি ফ্রেডরিকের ছেলে হেনরি না?’ জুলিয়ান বললেন।

‘হ্যাঁ, কাউন্ট!’ হেনরি বলল।

‘তুমি কি টলেডো থেকে আসছ? বাবাকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলে বুঝি?

‘হ্যাঁ, কাউন্ট! এখানে ভালো লাগছিল না, তাই আন্দালুসিয়া সফর করার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়েছিলাম। সম্মানিত কাউন্ট! আমার হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া, আর হঠাৎ আগমন করা আপনার জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমি যে পয়গাম নিয়ে এসেছি, তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথমে ছোট্ট একটি আবেদন, আমি যে নৌকায় এসেছি, তার ভাড়া পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। মাঝি আমার সাথেই এসেছে। তাদের ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। আমি তাদেরকে পুরস্কৃত করব বলে ওয়াদা করেছি।’

জুলিয়ান ভাড়া ও পুরস্কার উসুল করার নির্দেশ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তার মেয়ে কী পয়গাম পাঠিয়েছে?

হেনরি ফ্লোরিডার পয়গাম শোনানের সাথে সাথে জুলিয়ান বিদ্যুতাড়িতের ন্যায় উঠে দাঁড়ালেন। তার শরীরের সমস্ত রক্ত চেহারায় আর চোখে জমা হতে লাগল। রাগে-দুঃখে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি কামরার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত পায়চারী করতে লাগলেন।

শাহজাদীর সাথে ঘটনাক্রমে আমার দেখা হয়েছিল। হেনরি বলল। সে আমাকে এ ঘটনা শুনালে আমি রডারিককে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু শাহজাদী আমাকে এই বলে বাধা দেয় যে, আমি রডারিক পর্যন্ত পৌঁছতে পারব না; বরং তার পূর্বেই ধরা পড়ে যাব। আমি সেখানের শাহী আস্তাবল থেকে ঘোড়া চুরি করে এখানে পৌঁছেছি।’

‘শাহজাদী ঠিকই বলেছে। জুলিয়ান বললেন। ঐ দুরাচার শয়তানকে হত্যা করা এতো সহজ নয়। আমি অবশ্যই এর প্রতিশোধ নেব। তুমি এখন যেতে পার।’

জুলিয়ান হলেন এই এলাকার বাদশাহ। তাই তিনি এমন একটি নাযুক বিষয়ে সামান্য একজন কর্মচারীর সামনে কোন প্রকার মন্তব্য প্রকাশ করা সমীচীন মনে করছিলেন না। তিনি হেনরিকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন।

‘না, কাউন্ট! এই পুরস্কার আমি কোন সাফল্যের বিনিময়ে গ্রহণ করব? হেনরি বলল। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি আন্দালুসিয়া গিয়ে রডারিককে হত্যা করার সুযোগ তৈরি করে নিব।

***

জুলিয়ান অল্প সময়ের মধ্যে কিছু উপহার-উপঢৌকন নিয়ে টলেডো এসে উপস্থিত হলেন। তিনি রডারিকের সাথে এতোটাই আন্তরিকতার পরিচয় দিলেন যে, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, তার মেয়ের সাথে রডারিকের অশালীন আচরণ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। যে কেউ তাকে দেখলে ধারণা করবে, তিনি আন্দালুসিয়ার বাদশাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য শুভেচ্ছার সওগাত নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।

বাদশাহ রডারিক যখন দেখল, জুলিয়ান কিছুই জানে না তখন সে জুলিয়ানের প্রতি অন্যান্য করদ-রাজাদের তুলনায় অনেক বেশি আতিথেয়তা ও সম্মান প্রদর্শন করল। রডারিক তার সম্মানে রাজকীয় ভোজের আয়োজন করল। ভোজসভায় গান-বাজনার ব্যবস্থাও করা হল। ফ্লোরিডা ভোজসভায় তার বাবার পাশেই বসা ছিল। সে রডারিকের আচরণ সম্পর্ক তার বাবাকে সব কিছু খুলে বলল। রডারিক তাকে যে ধমকি দিয়েছে সে কথাও বলল।

‘আমাদের আস্তাবলের প্রধান ফ্রেডরিকের ছেলে হেনরি আমাকে সব কিছু বলেছে।’ জুলিয়ান বললেন। আমি রডারিকের সামনে অজ্ঞ বনে বসে আছি। আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি। তার পর এমন প্রতিশোধ নেব যে, ওর বাদশাহী মাটির সাথে মিশে যাবে।

পরদিন বাদশাহ রডারিক জুলিয়ানের সাথে একান্ত বৈঠকে মিলিত হল। সে জুলিয়ানের সাথে সিউটার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিনিময় করল। রডারিক জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করল, “ইতিমধ্যে নিশ্চয় মুসলমানরা সিউটা আক্রমণের সাহস করেনি?

‘না, তারা সিউটার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সাথে মাথা ঠোকরিয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে।’ জুলিয়ান বললেন। তারা বুঝতে পেরেছে যে, সিউটার উপর আন্দালুসিয়ার মতো দুর্বিনীত শক্তির ছায়া রয়েছে। আরব ও বার্বার মুসলমানরা সিউটার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও সাহস করে না।’

‘তোমার মেয়ে ফ্লোরিডা শুধু সৌন্দর্যের প্রতিমাই নয়, বুদ্ধিমতি এবং বাহাদুরও বটে। তাকে কোন সাধারণ ব্যক্তির হাতে তুলে দিও না; আমি তার তরবিয়তের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহ বোধ করছি।’

জুলিয়ান অনুগত গোলামের মতোই বললেন, ‘এটা আমার সৌভাগ্য। আমি কিছু দিনের জন্য ফ্লোরিডাকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাই।

‘না নিয়ে গেলেই ভালো হয়। রডারিক বলল।

‘তার মা খুব বেশি অসুস্থ। জুলিয়ান মিথ্যে বানিয়ে বললেন। তার মা’ই আমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দু-একদিনের জন্য ফ্লোরিডাকে নিয়ে এসো। আমি তার মা’র আবেগে আঘাত দিতে পারি না। দু-একদিন পরই আমি মেয়েকে পাঠিয়ে দেব।’

রডারিক প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘তাকে পাঠিয়ে দেবে? তাহলে নিয়ে যাও।

জুলিয়ান আরেকটি মিথ্যা কথা বললেন, ফ্লোরিডা বলেছে, সে খুব শীঘ্রই ফিরে আসতে চায়।’

‘তোমার মেয়ে অবশ্যই ফিরে আসতে চাইবে।’ রডারিক বলল। আচ্ছা জুলিয়ান! শুনেছি, তোমাদের এলাকায় উন্নত প্রজাতির বাজপাখি পাওয়া যায়? আমার একটি শিকারী বাজপাখি প্রয়োজন।’

‘হ্যাঁ, শাহানশাহে আন্দালুসিয়া! আমি আপনার জন্য এমন শিকারী বাজপাখি পাঠাবো, যা কখনও আপনি দেখেননি। সে শিকারের উপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে, তাকে বাঁচার সুযোগ পর্যন্ত দেয় না।

জুলিয়ান ফ্লোরিডাকে সিউটা নিয়ে আসার পরের দিনই মুসা বিন নুসাইরের সাথে সাক্ষাতের জন্য বেরিয়ে পড়লেন।

***

মুসা বিন নুসাইর অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সর্বদা সতর্কতা অবলম্বনকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, একজন খ্রিস্টানের পক্ষে কীভাবে সম্ভব মুসলমানদের মাধ্যমে আরেকজন খ্রিস্টানের উপর আক্রমণ করানো। তিনি ভাবছিলেন, এটা খ্রিস্টানদের কোন ষড়যন্ত্র নয় তো! তাই তিনি হুট করে জুলিয়ানকে কোন আশ্বাসও দিতে পারছিলেন না।

‘আপনি যদি আমার কথা বিশ্বাস না কর তাহলে আমি আমার কন্যা ফ্লোরিডাকে এখানে ডেকে আনছি, আপনি তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। জুলিয়ান মুসা বিন নুসাইরকে বললেন।

‘আমি হেনরির সাথে কথা বলতে চাই।’ মুসা বললেন। আমার বার্তাবাহক তাকে নিয়ে আসবে। সে না আসা পর্যন্ত তুমি এবং তোমার সাথে আগত ব্যক্তিগণ আমার এখানে মেহমান হিসেবে থাকবে।’

হেনরিকে আনার জন্য তখনই একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে দেওয়া হল। এই অবকাশে জুলিয়ান মুসা বিন নুসাইরের নিকট আন্দালুসিয়া ও রডারিক সম্পর্কে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উপস্থাপন করলেন, যা আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়ে আছে।

‘মুসা বিন নুসাইর!’ জুলিয়ান বললেন। রডারিকের প্রতি আমার এই আক্রোশ নতুন কোন বিষয় নয়। এক পুরনো শত্রুতার জের ধরে আমি তার প্রতি এই আক্রোশ পোষণ করে আসছি। আপনি হয়তো জানেন যে, এক সময় আন্দালুসিয়ার শাসন ক্ষমতা ছিল গোথ বংশের হাতে। সে সময় রডারিক আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনীর একজন জেনারেল ছিল। অর্টিজা নামক গোথবংশীয় এক ব্যক্তি তখন আন্দালুসিয়ার বাদশাহ ছিলেন। স্বভাবগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ।

অর্টিজার ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে পাদ্রিরা ধর্মের ছত্রছায়ায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। তারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করত। গির্জাগুলো পাপপুরীতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। সে সময় পোপের নির্দেশই ছিল শেষ কথা। পাদ্রিরী যা ইচ্ছা তাই করত। কারণ, তারা ছিল ধর্মীয় অনুসৃত ব্যক্তি। জনসাধারণ ও সৈন্যবাহিনী তাদেরকে সম্মান করত। স্বয়ং বাদশাহও তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস করতেন না।

সামাজিক পরিস্থিতি এই পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, একদিকে সম্পদশালীরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছিল, আর অন্য দিকে সম্পদহীন ব্যক্তিরা কপর্দক শূন্য হতে হতে পথের ভিখারিতে পরিণত হচ্ছিল। প্রজা সাধারণ মূলত রাজবংশের দাসানুদাস ছিল। লোকদেরকে বেগার খাটানো হতো। তাদেরকে খুব সামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। অতি সামান্য ও তুচ্ছ বিষয়ে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালানো হত। বিভিন্ন কর ও টেক্স আদায় করতে করতেই জনগণের নাভিশ্বাস উঠত। তারা অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করত। অপর দিকে শাহী কোষাগারের পরিধি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। রাজবংশের লোকেরা আরাম-আয়েশ আর বিলাসিতার জীবন যাপন করছিল। এমনি পরিস্থিতিতে অর্টিজা শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আমার স্ত্রী হলেন তাঁরই কন্যা। অর্টিজার অন্তরে ধর্মের প্রতি সম্মান ও জনসাধারণের প্রতি ভালোবাসা ছিল। তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করার সাথে সাথে গির্জা ও। পাদ্রিদের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং গির্জাসমূহ থেকে পাপের পঙ্কিলতা বিদূরিত করেন। এরপর তিনি সে সকল বিত্তশালীদের প্রতি মনোনিবেশ করেন, যারা জনগণের রক্ত চুষে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিল। অর্টিজা জনসাধারণের উপর থেকে ট্যাক্স তুলে নিয়ে বিত্তশালীদের উপর ট্যাক্স আরোপ করেন। সম্পদশালীদের সম্পদের হিসাব-নিকাশ করে তাদের উপর পৃথক পৃথকভাবে কর ধার্য করেন। ফলে জনসাধারণের অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকে।

কিন্তু ধর্মীয় স্বার্থবাদী এবং বিশাল-বিপুল সম্পদের অধিকারী কায়েমী স্বার্থবাদী ব্যক্তিরা কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিল না। তারা ভুখা নাজা জনসাধারণের রক্ত চুষে সম্পদের যে পাহাড় গড়ে তুলেছিল, সে সম্পদ পুনরায় তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে রাজি হল না। ভোগবাদী, স্বার্থপর পাদ্রিরা ধর্মের ধুয়া তুলে সেনাবাহিনীকে এই বলে অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ইন্ধন যোগাল যে, অর্টিজা ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে ধর্মীয় ব্যক্তিদেরকে তার গোলাম বানাতে চায়।

ভোগবাদী ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেনাবাহিনী বাদশাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তখন এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় রডারিক। অর্টিজার আস্থাভাজন সৈন্যদের সংখ্যা অনেক কম ছিল। তারা বিদ্রোহীদের সাথে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি। বিদ্রোহীরা বিজয়ী হলে সকল পাদ্রি মিলে রডারিককে বাদশাহ নিযুক্ত করে।

রডারিক বাদশাহ হওয়ার পর সর্বপ্রথম যে নির্দেশ জারি করে তা হল, অর্টিজাকে হত্যা করা হোক। অর্টিজার হত্যাকাণ্ড সম্পাদন হওয়ার পর পরই নেতৃবর্গ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শাহীখান্দানের লোকজন, কায়েমী স্বার্থবাদী ব্যক্তিবর্গ ও ভোগবাদী পাদ্রিরা পুনরায় ভোগ-বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়।

মুসা বিন নুসাইর, আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, আপনি আন্দালুসিয়া আক্রমণ করলে, সেখানের জনসাধারণ অত্যাচারী ও বিলাসী বাদশাহ এবং তার জেনারেলদের পক্ষ ত্যাগ করবে। সৈন্যবাহিনীও বিগড়ে যেতে পারে। আপনার সেনাবাহিনী যদি শৌর্য-বীর্যের সাথে লড়াই করে তাহলে আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনী ময়দান ত্যাগ করতে বাধ্য হবে।’

জুলিয়ানের সর্বপ্রকার উৎসাহ প্রদান সত্ত্বেও মুসা বিন নুসাইর তাকে কোন ধরনের আশ্বাসবাণী শুনানো থেকে বিরত রইলেন।

***

চার-পাঁচ দিন পর হেনরি মুসা বিন নুসাইরের বার্তাবাহকের সাথে সিউটা থেকে তানজানিয়া এসে পৌঁছল। অন্যান্য মেহমানদের মতোই তাকে আদর আপ্যায়ন করা হল। অতঃপর তাকে মুসার নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হল।

হেনরি জুলিয়ান থেকে এ কথা গোপন রেখেছিল যে, সে ফ্লোরিডাকে ভালোবাসে এবং তারা গোপনে একজন আরেকজনের সাথে মিলিত হতো। সে ফ্লোরিডার বিরহবেদনা সইতে না পেরে টলেডো চলে গিয়েছিল। অথচ জুলিয়ানের নিকট সে বলেছিল, সিউটায় তার মন হাঁপিয়ে উঠেছিল। তাই সে মনোরঞ্জনের জন্য টলেডো ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল।

মুসা বিন নুসাইরের নিকট সে স্বীকার করে যে, ফ্লোরিডার সাথে তার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। ফ্লোরিডার সাথে সাক্ষাতের জন্যই সে টলেডো ভ্রমণ করে। সেখানে কীভাবে তাদের উভয়ের দেখা-সাক্ষাৎ হয়, কীভাবে তারা পরস্পর মিলিত হয়, কীভাবে রডারিক ফ্লোরিডার শ্লীলতা হরণ করে–এসব ঘটনা সবিস্তারে মুসা বিন নুসাইরের নিকট বর্ণনা করে।

মুসা বিন নুসাইর হেনরিকে আনুষঙ্গিক আরো কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন করেন। হেনরি যথাসম্ভব সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রশ্ন করে করে মুসা বিন নুসাইর তার মনের সন্দেহ দূর করে নেন এবং হেনরিকে মেহমান খানায় পাঠিয়ে দেন। অতঃপর জুলিয়ানকে নিজের কাছে ডেকে পাঠান।

‘ভাই জুলিয়ান!’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। ‘আমি তোমার প্রতিটি কথা এবং বন্ধুত্বের প্রস্তাবের ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি, আমি আমার উপদেষ্টাবৃন্দের সাথেও সলাপরামর্শ করেছি। ভাই জুলিয়ান! আমি তোমার কথায় পূর্ণাঙ্গরূপে আস্থা স্থাপন করেছি, তবে আমি একা এভো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি না। তাছাড়া আন্দালুসিয়াও ছোটখাট কোন রাজ্য নয়। তার সৈন্যবাহিনীও কোন মামুলী বাহিনী নয়।

আমি খলীফার নির্দেশের অপেক্ষা করছি, আজই আমি খলীফার নিকট পয়গাম লেখে দামেস্কের উদ্দেশ্যে আমার বার্তাবাহক পাঠাচ্ছি। উত্তরের জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। বার্তাবাহক যেন অত্যন্ত দ্রুত পৌঁছতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে। তারপরও বার্তাবাহকের ফিরে আসতে প্রায় একমাস লেগে যাবে। তুমি এখন চলে যাও। পঁচিশ-ছাব্বিশ দিন পর এসো। আর না হয়, আমিই তোমাকে সংবাদ দিয়ে ডেকে পাঠাব।’

মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানকে বিদায় দিয়ে বার্তাবাহককে ডেকে আনেন। তিনি বার্তাবাহককে দিয়ে খলীফার নামে এক দীর্ঘ পয়গাম লেখান, যে পয়গামে তিনি জুলিয়ানের ঘটনার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন।

সে সময় খলীফা ছিলেন ওলিদ বিন আবদুল মালেক। তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন মর্দেমুমিন ছিলেন। তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান এই ছিল যে, কীভাবে ইসলামের পয়গাম পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া যায়।

যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সে সময় খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অনুরাধে মুহাম্মদ বিন কাসেমকে হিন্দুস্থান বিজয়ের জন্য পাঠিয়ে ছিলেন।

মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করার পর লেখেন :

‘ঘটনাচক্রে জুলিয়ান আজ এক বিরাট বৃক্ষের খণ্ডিত শাখার ন্যায় আমাদের করায়ত্ত হয়েছে। সম্মানিত খলীফার দরবারে আমি আমার ইচ্ছার কথা এভাবে প্রকাশ করছি, বহু দিন থেকেই আমার দৃষ্টি আন্দালুসিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য উন্মোখি হয়ে আছে। ইসলামের পয়গাম মিসর ও আফ্রিকার সমুদ্রসৈকতে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আমি কয়েকবারই তানজানিয়ার সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আন্দালুসিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। প্রতিবারই আমি  সমুদ্রের বুক চিরে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করার পরিকল্পনা এঁটেছি। এখন একজন খ্রিস্টান রাজা সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছে। তাই সকল দিক বিবেচনা করে আমাকে আন্দালুসিয়া আক্রমণ করার অনুমতি প্রদান করুন।

আমি আরেকটি দিকেও মহামান্য খলীফার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তা হল আমার নিকট যে সৈন্যবাহিনী আছে, তাদের বেশিরভাগই বার্বার। বার্বার হিংস্র ও হানাহানী প্রিয় এক সম্প্রদায়। আমি তাদেরকে নিয়ম-শৃঙ্খলার অনুগত করেছি। কিন্তু তারা বেশি দিন শান্তিতে বসে থাকার লোক নয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ এদের স্বভাবজাত বিষয়। তারা সর্বদা অবাধ্যতা ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য প্রস্তুত থাকে। দীর্ঘদিন তাদেরকে নিয়ম-শৃঙ্খলার অনুগত করে রাখা সম্ভব নয়। আর কিছু দিন তাদেরকে এমন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে কর্মহীন করে আবদ্ধ রাখলে তারা নিজেরাই নিজেদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পড়বে এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার অবাধ্য হয়ে যাবে। এমনকি তারা ইসলামের ব্যাপারেও বিমুখ হয়ে যেতে পারে।

খলীফাতুল মুসলেমীন! আমি এতো দিন তাদেরকে সিউটা আক্রমণ করা ও অবরোধ করার মাঝেই ব্যস্ত রাখতাম, কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবত এই কাজটিও বন্ধ হয়ে আছে। এখন এই বার্বার সৈন্যবাহিনীকে কোন না কোন জিহাদী ময়দানের সন্ধান দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে; যেন তারা দুশমনের খুন প্রবাহের নেশা পূর্ণ করতে পারে।

রক্ত প্রবাহের এই নেশা চরিতার্থ করা ছাড়া তাদেরকে প্রকৃত মুমিন ও মুজাহিদ বানানোর জন্যও আন্দালুসিয়া অভিমুখে জিহাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো উচিত। কাফেরদের রাজ্যে গিয়ে তাদের সাথে জিহাদ করে যখন তারা বিজয় লাভ করবে এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য কাজ করবে তখন তাদের চিন্তা-চেতনায় ইসলামের জন্য মহব্বত সৃষ্টি হবে।‘

***

বার্তাবাহক বেশ কয়েকদিন পর খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের পয়গাম নিয়ে উপস্থিত হল। খলীফার পয়গাম উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। তবে খলীফা সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে খুব বেশি তাকিদ দিয়ে লেখেন :

সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যারা দ্বীন-ইসলাম থেকে বিমুখ তাদের উপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করা উচিত হবে না। সতর্কতাস্বরূপ জুলিয়ানকে কোন না কোনভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে। সিউটার করদ-রাজা জুলিয়ান যদি পরীক্ষায় পুরোপুরি উত্তীর্ণ হয়, তাহলে দামেস্ককে অবহিত করলে এখান থেকে যুদ্ধ-রসদ ও জরুরি সামান-পত্ৰ অতি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

মুসা বিন নুসাইর ভার উপদেষ্টা পরিষদকে খলীফার পয়গাম পড়ে শোনান। তিনি সকলের নিকট সুচিন্তিত পরামর্শ তলব করেন। আরবদের বিবেক-বুদ্ধি অত্যন্ত প্রখর ছিল। তারা অল্প কিছুক্ষণ মত-বিনিময়ের পর জুলিয়ানকে পরীক্ষা করার পন্থা বের করতে সক্ষম হল।

মুসা বিন নুসাইর তৎক্ষণাৎ একজন রাজদূতকে এই বলে সিউটা পাঠিয়ে দিলেন যে, পয়গাম পাওয়ামাত্রই যেন জুলিয়ান মুসা বিন নুসাইরের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

জুলিয়ান এই সংবাদের অপেক্ষায়ই ছিলেন, সংবাদ পাওয়ামাত্রই তিনি তৈরি হয়ে নিলেন। তিনি তার সাথে আন্দালুসিয়ার ক্ষমতাচ্যুত বাদশাহ অর্টিজার ভাই আউপাস ও উচ্চপদস্থ একজন সেনা-অফিসারসহ একশত বিচক্ষণ রক্ষীসেনা নিয়ে রওনা হলেন।

এই রাজকীয় কাফেলা আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ান’ এসে পৌঁছার সাথে সাথে জুলিয়ান মুসার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। ঐতিহাসিকদের মতে এই সাক্ষাতে অর্টিজার ভাই আউটপাস এবং জুলিয়ানের উচ্চপদস্থ সেনা-কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিল। এই সাক্ষাতের মাধ্যমেই মুসলমানদের জন্য আন্দালুসিয়ার দরজা খুলে গিয়েছিল।

‘ভাই জুলিয়ান, দামেস্ক থেকে অনুমতি পাওয়া গেছে।’ মুসা বিন নুসাইর বললেন। তবে শর্ত হল, তোমাকে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিককে তুমি এমনই এক দুশমন মনে কর যে, পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলেও তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে না।’

‘এই প্রমাণ পেশ করার কী পদ্ধতি হতে পারে–আপনিই বলুন?’ জুলিয়ান বললেন। আমি তো শুধুই প্রহর গুণছি, সেই সময় কখন আসবে যখন আমি নরাধম রডারিক থেকে আপন কন্যার ইজ্জতের প্রতিশোধ নিতে পারব।’

‘মুহতারাম আমীর!’ আউপাস বলল। আমার সেই ভাইয়ের আত্মা আমাকে রাত্রে ঘুমোতে দেয় না, যার বিরুদ্ধে রডারিক বিদ্রোহ করে ছিল এবং যাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে বাদশাহ হওয়ার পর তাকে হত্যা পর্যন্ত করেছিল। এখন সে আমাদের খান্দানের উপর এমন এক আঘাত হেনেছে, যদি আপনি আমাদের স্থানে হতেন তাহলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একদিনও অপেক্ষা করা বরদাশত করতেন না। আপনার সৈন্যবাহিনীর মতো সৈন্যবাহিনী যদি আমাদের থাকত তাহলে আমরা সাহায্য ভিক্ষা চাওয়ার জন্য আপনার দরজায় এসে দাঁড়াতাম না।’

‘এখন আর অপেক্ষা করব না। মুসা বিন নুসাইর বললেন। জুলিয়ান! এক কাজ কর, তোমরা তোমাদের সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাতের অন্ধকারে সদ্র পার হয়ে আন্দালুসিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী কোন অঞ্চলে আক্রমণ করো। তবে আন্দাসুলিয়ার ফৌজ টের পাওয়ার আগেই তোমরা তোমাদের ফৌজ ফিরিয়ে আনবে। এই আক্রমণই একটা প্রমাণ হিসেবে থাকবে যে, তোমরা রডারিককে নিজেদের দুশমন মনে কর। আমি তোমাদের প্রতিশোধ স্পৃহার প্রচণ্ডতা অনুমান করতে চাই।’

‘আমার ফৌজ যদি সেখানে কোন কারণে আটকা পড়ে যায়? জুলিয়ান জানতে চাইলেন। কিংবা আমার ফৌজের তুলনায় অধিক সংখ্যক ফৌজের সাথে যদি মোকাবেলা করতে হয় তাহলে আমার পরিণতি কী হবে?’

‘তোমাকে মন্দ পরিণতির সম্মুখীন হতে দেব না। মুসা বিন নুসাইর বললেন। ‘আমার ফৌজ সমুদ্রসৈকতে উপস্থিত থাকবে। আমি সংবাদ প্রেরণের এমন ব্যবস্থা করব যে, তোমার বাহিনী কোন প্রকার বিপদের সম্মুখীন হলে তৎক্ষণাৎ আমাকে অবহিত করা হবে এবং আমার ফৌজ তোমার সাহায্যার্থে সেখানে উপস্থিত হবে।’

***

জুলিয়ান ও আইপাস তৎক্ষণাৎ তাদের সম্মতি প্রকাশ করলেন। মুসা বিন নুসাইরের সাথে মিলে তারা আন্দালুসিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী একটি এলাকায় আক্রমণের প্রান তৈরি করলেন। অতঃপর জুলিয়ান ও আউলাস সিউটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন।

মুসা বিন নুসাইর তার কিছু সংখ্যক সৈন্যকে সেনাপতি আবু যুর’আ তুরাইফ বিন মালেক আল-মু’আফেরীর নেতৃত্বে পাঠিয়ে দিলেন। মুসা বিন নুসাইর তাকে বলে দিলেন, তিনি যেন সিউটার পার্শ্ববর্তী কোন অঞ্চলে পৌঁছে তাঁবু গেড়ে অপেক্ষা করেন। জুলিয়ান যখন তার সৈন্যবাহিনী আন্দালুসিয়া অভিমুখে পাঠাবে তখন তুরাইফ তার বাহিনীকে সিউটার উপকূলে এনে উপস্থিত করবে।

তুরাইফ তার বাহিনী নিয়ে সিউটার উপকূলে এসে পৌঁছলে জুলিয়ান শাহীমহল থেকে বের হয়ে এসে তাকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি তুরাইফকে বললেন, ‘শাহীমহলে চলুন, সেখানে এক শাহীকামরায় আপনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

‘কাউন্ট জুলিয়ান!’ সেনাপতি তুরাইফ বললেন। আমাদের সেনাপতি তার আয়ত্তাধীন কোন সিপাহীর তুলনায় নিজেকে উত্তম ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী মনে করে না। তাই সে অন্যদের থেকে পৃথক ও উন্নত ব্যবস্থাকে নিজের জন্য অসমীচীন মনে করে। যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি ও সিপাহী একই মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। আমাদের ধর্ম মানুষের উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ সমর্থন করে না। আপনি যদি আমাদেরকে নামায পড়তে দেখেন তাহলে আপনি পার্থক্য করতে পারবেন না, কাতারে কাতারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো মুসলমানদের মাঝে কে উচ্চপদস্থ ফৌজী, আর কে সাধারণ সিপাহী? কখনও এমনও হয় যে, আমাদের অধীন সাধারণ কর্মচারী সামনের কাতারে দাঁড়ায়, আর আমরা পিছনের কাতারে দাঁড়াই। সেনাপতির সৌভাগ্য শুধু এই যে, তিনি ইমামতির দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে থাকেন।

‘আপনারাই আন্দালুসিয়া বিজিত কতে সক্ষম হবেন। জুলিয়ান উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন। এটাই হল ইসলামের শক্তির সেই উৎস, যা আপনি বর্ণনা করলেন, অথচ আমাদের সেনাপতি তার অধীন সিপাহীকে ব্যক্তিগত চাকর মনে করে। তারপরও আমি বলব, আমার মহলের দরজা আপনার জন্য সর্বদা উন্মুক্ত থাকবে।’

কয়েক দিন পরের কথা। এক রাতের আঁধারে জুলিয়ানের ফৌজ এবং তুরাইফের নেতৃত্বাধীন সৈন্যবাহিনী পালতোলা রণতরীতে আরোহণ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রণতরী আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে সিউটার সমুদ্রসৈকত ত্যাগ করবে।

জুলিয়ান তার স্ত্রী ও দুই কন্যা–ফ্লোরিডা ও মেরীকে সাথে নিয়ে সৈন্যদেরকে বিদায় জানানোর জন্য এসেছিলেন। তারা রণতরী থেকে নেমে তীরে উঠে এলো। ফৌজ রওনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফ্লোরিডা তার বাবার জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। সে চাচ্ছিল, পুরুষালী পোশাক পরিধান করে সৈন্যদের সাথে আন্দালুসিয়া আক্রমণে অংশ গ্রহণ করবে। সে তার বাবার যুদ্ধবর্ম ও ঢাল-তলোয়ার বের করে এনেছিল। কিন্তু জুলিয়ান তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না। তার মাও তাকে বাধা দিচ্ছিল।

ফ্লোরিডা চিৎকার করে বলছিল, আমি কি শাহসওয়ার নই? আমি কি ঢাল-তলোয়ার চালনা করতে জানি না? আমি কি বর্ষা নিক্ষেপ করতে পারি না? আমার ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর কি কখনও নিশানা দে করতে ব্যর্থ হয়েছে?’

বাবা-মা উভয়ে তাকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যে, তারা সবকিছুই জানেন, কিন্তু দুশমন যখন ঢাল-তলোয়ার আর বর্ষা নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয় তখন আত্মরক্ষা করে চতুর্দিকে খেয়াল রেখে, দুশমনের আঘাত প্রতিহত করা এবং তাকে প্রতিঘাত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে দক্ষ তীরন্দাজের ধনুক থেকে নির্গত তীরও নিশানা ভেদ করতে ব্যর্থ হয়। লড়াই করে মৃত্যুবরণ করা পুরুষের কাজ; মেয়েদের কাজ নয়।

‘শ্লীলতাহানী আমার হয়েছে, ফ্লোরিডা চিৎকার করে বলল। “অত্রব আন্দালুসিয়ার উপর প্রতিশোধমূলক প্রথম আঘাত আমাকেই হানতে হবে।’

ফ্লোরিডা যখন কারো কথাই শুনছিল না তখন জুলিয়ান তাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষান্ত করেন যে, মুসলমানরা যখন রডারিককে পরাজিত করবে তখন আমি মুসা বিন নুসাইরের নিকট আবেদন করব, তিনি যেন রডারিককে জীবিত গ্রেফতার করে তোমার হাতে সোপর্দ করে। তখন তুমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করতে পারবে।’

বাবার প্রতিশ্রুতি পেয়ে ফ্লোরিডা কিছুটা শান্ত হল। অবশেষে জুলিয়ান মুসলিম সেনাপতি আবু যারুআ তুরাইফ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। সেখানে তিনি মুসলিম সেনাপতির সাথে ফ্লোরিডাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন ফ্লোরিডা শেষ সুযোগ মনে করে তুরাইফকে এই বলে বারবার অনুরোধ করতে লাগল, যেন তিনি তার বাবার কাছ থেকে তার যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে অনুমতি আদায় করে দেন।

“তোমার বাবা হয়তো তোমাকে অনুমতি দিয়ে দেবেন, সেনাপতি তুরাইফ বললেন। কিন্তু আমি তোমাকে কিছুতেই অনুমতি দেব না। কারণ, আমরা এমন এক জাতি, যারা আপন স্ত্রী-কন্যার ইজ্জত ও সম্মানের জন্য হাসি মুখে জীবন উৎসর্গ করতে পারে। সুতরাং তোমার মতো একজন নারীকে যুদ্ধের ময়দানে দুশমনের সামনে পাঠানো আমাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হবে?

সেনাপতি তুরাইফের কথা শুনে ফ্লোরিডার যুদ্ধে যাওয়ার শেষ আশাটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেল।

সমুদ্রপথের দূরত্ব ছিল মাত্র বার মাইল। জুলিয়ানের রণতরীর নাবিকরা ছিল অত্যন্ত দক্ষ ও চৌকস। সমুদ্র ছিল প্রশান্ত, আর বাতাস ছিল অনুকূলে। বাতাসের আনুকূল্য পেয়ে পালোলা রণতরী পানিতে ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তুলে সুতীব্র বেগে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। নাবিকরা কাঙ্ক্ষিত সময়ের পূর্বেই জুলিয়ানের সৈন্যবাহিনীকে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে পৌঁছে দিল। সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব ছিল আউপাসের হাতে।

***

রাতের অর্ধ প্রহর। যুদ্ধ সাজে সজ্জিত রণতরী আন্দালুসিয়ার দক্ষিণ দিক একটি ছোট্ট শহর মেয়দিনস্পনুর বন্দরে নিঃশব্দে নোঙর ফেলল। শহরের বাসিন্দারা তখন গভীর ঘুমে অচেতন। সমুদ্র সন্নিকটবর্তী ফৌজি চৌকিগুলোতে সৈন্যরা অনেকক্ষণ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। যে সকল সৈন্যের পাহারার দায়িত্ব ছিল তারা কোথাও বসে কোথাও দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে। তাদের কোন ভয় ছিল না। তারা জানত, সিউটা হল আন্দালুসিয়ার প্রবেশ মুখ। আর সেই প্রবেশ মুখে আছে বড় মজবুত দুর্গ। আর আছে জুলিয়ানের অতন্দ্র প্রহরী সৈন্যবাহিনী।

কেবলমাত্র মুসলমানদের পক্ষ থেকেই ভয় ছিল। এই সম্ভাবনাও ছিল যে, তারা সিউটার রাস্তা ত্যাগ করে বহু দূরের সমুদ্র তীর ঘুরে এসে আক্রমণ করতে পারে কিন্তু আরবদের ব্যাপারে এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, তারা রণতরী পরিচালনায় অনভিজ্ঞ। সামুদ্রিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই। বাস্তবতাও ছিল তাই। আরবদের তখন পর্যন্ত নৌযুদ্ধের কোন সুযোগই আসেনি। এটাই ইসলামের প্রথম নৌযুদ্ধের ঘটনা।

আন্দালুসিয়ায় সীমান্তরক্ষীবাহিনী শত্রুর আক্রমণ সম্পর্ক একেবারেই বেখবর ছিল। তারা সব ধরনের বিপদ থেকে নিশ্চিন্ত ছিল। পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী জুলিয়ানের সৈন্যবাহিনী নিঃশব্দে রণতরী থেকে নেমে তীরে উঠে এলো। কমান্ডার আউপাস আগে থেকেই জানত, কোথায় কোথায় সীমান্তরক্ষা চৌকী আছে। সে তার অধীনস্থ বাহিনীকে সেসকল চৌকিতে দ্রুত আক্রমণের নির্দেশ দিল।

নৈশ প্রহরীরা শুধু দেখতে পেল, কিছু ছায়ামূর্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ব্যাস, এ পর্যন্তই। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের উপর কেয়ামত সংঘটিত হয়েগেল। চৌকিতে গভীর ঘুমে অচেতন সিপাহীদের জাগ্রত হওয়ার সুযোগই হল না। তারা বেঘোরে মারা পড়ল।

প্রতিরক্ষা চৌকীগুলো একটির চেয়ে আরেকটি বেশ দূরে অবস্থিত ছিল। সুবহে সাদেক উদিত হওয়ার পূর্বেই প্রতিটি চৌকিতে আক্রমণ করে সিপাহীদের হত্যা করা হল। তাদের মাঝে এমন কেউ ছিল না, যে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে কোন বড় শহরে পৌঁছে এই সংবাদ দেবে যে, আন্দালুসিয়া শত্রুসেনা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।

ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে জুলিয়ানের বাহিনী আশ-পাশের আরো দুই-তিনটি শহরে আক্রমণ করে বসল। তারা সেখানে লুটতরাজ, খুন-খারাবী ও ত্রাস সৃষ্টি করল। সৈন্যদের প্রতি জুলিয়ানের নির্দেশ ছিল–কোন গির্জা যেন অক্ষত না থাকে। তার নির্দেশ অনুযায়ী সৈন্যরা কয়েকটি গির্জা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিল। আর কয়েকটিতে আগুন লাগিয়ে দিল।

সন্ধ্যা পর্যন্ত সিউটার সৈন্যবাহিনী এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রাখল। তাদের সামনে কোন সুন্দরী যুবতী মেয়ে এসে পড়লে তাকেও তারা উঠিয়ে নিত। জুলিয়ান তাদেরকে আরো নির্দেশ দিয়েছিল যে, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের সময় এই ঘোষণা করতে হবে যে, এটা সিউটার বাহিনী। তাই হানাদার বাহিনী নিজেদেরকে সিউটার বাহিনী বলে পরিচয় দিচ্ছিল, আর রক্তের হোলী খেলায় মেতে উঠছিল।

সিউটার হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী কয়েকটি শহর একেবারে বিপর্যস্ত ও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। সারা দিনের লুটতরাজ আর হত্যাযজ্ঞ শেষে সিউটা-বাহিনী যেমন আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে ছিল তেমনি আকস্মিকভাবে রণতরীতে চেপে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকত ত্যাগ করে সিউটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।

হানাদার বাহিনী সিউটায় ফিরে এলে জুলিয়ান মুসলিম সেনাপতি তুরাইফকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কি আপনাদের এই সন্দেহ দূর হয়েছে যে, আমি রডারিককে জানের দুশমন মনে করি?

জুলিয়ান মুসলিম সেনাপতিকে বললেন, হে মুসলিম সেনাপতি! অবশ্যই আপনি বুঝতে পারছেন, আমি নিজের জন্য এক বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছি। এখন রডারিক সিউটায় পাল্টা হামলা করবে।’

‘তার হামলা করা উচিত। সেনাপতি তুরাইফ বললেন। সে এটা কীভাবে বরদাশত করবে যে, তার অধীন সামান্য এক করদ-রাজা তার রাজ্যে এসে তার বাহিনীর নওজোয়ানদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তার অধীনস্থ প্রজাদের ঘর লুণ্ঠন করেছে, গ্রামের পর গ্রাম ভস্মিভূত করেছে।

তবে কাউন্ট জুলিয়ান, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমরা কখনই আপনাকে একা ছেড়ে দেব না। আমার এই বাহিনী এখন থেকে এখানেই থাকবে। তারা সদা সতর্ক থাকবে। আপনি এখনই আমাদের আমীর মুসা বিন নুসাইরের নিকট চলে যান। আপনি তার সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি করুন। আর এই চুক্তির সংবাদ আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের নিকট পৌঁছে দিন।’

মুসলিম সেনাপতির পরামর্শ অনুযায়ী সেই দিনই জুলিয়ান মুসার সাথে বন্ধুত্বের চুক্তি সম্পাদন করার জন্য রওনা হয়ে গেলেন।

***

প্রথম থেকেই মুসার এই ধারণা ছিল যে, জুলিয়ান তাঁকে ধোকা দিচ্ছে না। তথাপি তিনি তার এই ধারণাকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি সম্মিলিত বাহিনীর মাধ্যমে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী আরেকটি দ্বীপশহর–এগোসিস আক্রমণের প্লান তৈরি করেন। এই সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ দ্বারা মুসা বিন নুসাইর বুঝতে চেষ্টা করছিলেন, জুলিয়ান ও তার বাহিনীর উপর কতটা নির্ভর করা যায়। সেই সাথে তিনি এটাও পরখ করতে চাচ্ছিলেন, আন্দালুসিয়ার বাহিনী কতটা রণ-নিপুন। তাদের কমান্ডারইবা কতটা যুদ্ধ-পারদর্শী।

মুসা বিন নুসাইর আবু যারু’আ তুরাইফ বিন মালেক আল-মু’আফেরীকে সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেন। বাহিনী রওনা হওয়ার পূর্বে মুসা বিন নুসাইর সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘ইবনে মালেক, খুব সতর্ক থেকো, চারদিকে চোখ-কান খোলা রেখো। তোমার অধীনস্থ সালারদেকেও সতর্ক থাকতে বললো। তোমরা জুলিয়ানের বাহিনীর কমান্ডারদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। লক্ষ্য করবে, তারা আমাদেরকে ধোঁকা তো দিচ্ছে না? এটাও খেয়াল করতে হবে যে, তারা সাহসী না ভীরু।

আমি জুলিয়ানকে বলতে শুনেছি, সে তার কমান্ডারদেরকে বলছিল, “তোমরা মুসলমানদেরকে এ কথা বলার সুযোগ দেবে না যে, জুলিয়ানের বাহিনী ভীরু, কাপুরুষ। তোমরা এমন কোন আচরণও করবে না, যার কারণে মুসলমানদের এই সন্দেহ হয় যে, আমরা তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছি। মুসলমানদের আমীরের মনে এখনও আমাদের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বাস জন্মেনি।

মনে রেখো! আপন ইজ্জতের জন্য বীরপুরুষ নিজের জান কুরবান করতে পারে, কিন্তু অন্যকে ধোকা দিতে পারে না। তোমরা একজন ধোকাবাজ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যাচ্ছ। সেই ধোঁকাবাজ হল, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক। তোমাদেরকে প্রথমেই বলা হয়েছে, রডারিক হল আমাদের দুশমন। তোমরা তার উপর একবার আক্রমণ করেছ। আমি তোমাদেরকে শুধু একটি কথার উপরই বেশি গুরুত্ব দিতে বলব, তা হল মুসলমানরা যেন এটা মনে না করে যে, তোমরা ভীরু, কাপুরুষ। তোমরা ধোকাবাজ।”

***

জুলাই ৭১০ খ্রিস্টাব্দের কোন এক রাত্রির শেষ প্রহর। সুবহে সাদেকের আলো-আঁধারে মুসা বিন নুসাইর ও জুলিয়ানের সম্মিলিত বাহিনী কয়েকটি বিশাল আকৃতির রণতরীতে আরোহণ করল। ঐতিহাসিক সন্ধিপত্রে জুলিয়ানের বাহিনীর কোন সংখ্যা লেখা হয়নি, তবে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল, চারশ পদাতিক, আর একশ অশ্বারোহী।

এগোসিরাস আয়তনের দিক থেকে ছোট্ট একটি দ্বীপ। গুপ্তচরের মাধ্যমে পূর্বেই সেখানকার যাবতীয় সামরিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে আন্দালুসিয়ার সৈন্যসংখ্যা কত? কোথায় কোথায় প্রতিরক্ষা চৌকি আছে–এসব সম্পর্কে সম্মিলিত বাহিনী পূর্ব থেকেই অবহিত ছিল।

সম্মিলিত বাহিনী এমন এক স্থানে তাদের যুদ্ধ-জাহাজ নোঙর করল, যে স্থানটি গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। তার চতুর্পাশে বহু দূর পর্যন্ত বড় বড় পাথরের টিলা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব উঁচু উঁচু টিলার কারণে সেনাচৌকি থেকে সমুদ্র তীরের এই স্থানটি ভালো করে দেখা যায় না। এই স্থানটিতেই সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যরা অবতরণ করল।

সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সম্মিলিত বাহিনী তাদের অবস্থান গোপন রাখতে সক্ষম হল না। সম্মিলিত বাহিনীর রণতরীগুলো যখন যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে খোলা সমুদ্রে দ্বীপটির দিকে এগিয়ে আসছিল তখন বহু দূর থেকেই সেই দৃশ্য দ্বীপবাসীদের দৃষ্টি গোচর হয়েছিল।

রণতরী সমুদ্র তীরে নোঙর করার সাথে সাথে ঘোড়াগুলো নিচে নামানো হল। পদাতিক বাহিনীও নিচে নেমে এলো; কিন্তু অশ্বারোহীরা তখনও ঘোড়ায় চড়ে বসেনি। পদাতিক বাহিনীও সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোন রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। এমন সময় আচমকা টিলার পিছন থেকে তাদেরকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি তীর বৃষ্টি শুরু হল।

আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজ বাহিনী পূর্ব থেকেই গাছের পিছনে ও ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে ওঁত পেতে ছিল। মাত্র কয়েকদিন আগে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী একটি এলাকা জুলিয়ানের বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। একারণে সীমান্ত এলাকা ও সমুদ্রতীরবর্তী দ্বীপাঞ্চলগুলোতে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। টহলদার বাহিনী পূর্ব থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল।

তীরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য যে সকল অশ্বারোহী এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছিল। সেনাপতি তুরাই তাদেরকে হুকুম দিলেন, তারা যেন তীরবৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করে চতুর্দিক থেকে টিলাগুলো ঘিরে ফেলে।

পদাতিক বাহিনী প্রথমেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। অধিকাংশ সৈন্য পিছে হটে সমুদ্রের দিকে চলে এসেছিল। অনেকে রণতরীতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। সম্মুখভাগে শুধু আহত সৈনিকরাই প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছিল।

জুলিয়ান-বাহিনীর কমান্ডার আউপাস এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করে নিজ বাহিনীকে একত্রিত করে নির্দেশ দিচ্ছিল। তার সিপাহীরা নির্দেশ পাওয়ামাত্র টিলা লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল।

আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজরা সমুদ্রতীরের হানাদার সিপাহীদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি তীর নিক্ষেপ করছিল। আউপাসের সৈন্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিল। তারা ডানে-বাঁয়ে ও পিছনে ছড়িয়ে পড়ে টিলা, গাছপালা ও ঝোঁপঝাড়ের আড়াল খুঁজতে লাগল। ফলে তীরন্দাজদের তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে লাগল।

আউপাস পিছন দিক থেকে সিপাহীদেরকে উত্তেজিত করছিল। সিপাহীরাও অসম সাহসিকতার সাথে তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে টিলার উপর চড়তে শুরু করল।

সেনাপতি তুরাইফ আউপাসের সিপাহীদের নির্ভীক সাহসিকতা দেখে নিজ বাহিনীর তীরন্দাজদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন টিলার নিচের গাছগুলোতে আরোহণ করে প্রতিপক্ষের তীরন্দাজদের নিশানা বানায়। নির্দেশমতো গাছে আরোহণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের তীরের আঘাতে কয়েকজন মুসলিম তীরন্দাজ আহত হলেও অন্যরা গাছে আরোহণ করতে সক্ষম হল। তারা গাছে আরোহণ করে টিলার পিছনে অবস্থানরত আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজদের লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে লাগল। উপায়ন্তর না দেখে আন্দালুসিয়ার তীরন্দাজরা পিছে হটতে বাধ্য হল।

মুসলিম অশ্বারোহীরা টিলাগুলো পূর্বেই ঘেরাও করে নিয়েছিল। প্রতিপক্ষের কোন তীরন্দাজই সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারল না। আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা আক্রমণকারী সৈন্যদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরে সেনাপতি তুরাইফ তার অশ্বারোহীদেরকে টিলার পিছনে আত্মগোপন করে থাকতে বললেন। তিনি কমান্ডারদেরকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন।

উভয় বাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। আন্দালুসিয়ার বাহিনী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পিঠটান দিতে বাধ্য হল। সেনাপতি তুরাইফ আত্মগোপন করে থাকা অশ্বারোহীদেরকে পলায়মান সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করার ইঙ্গিত দিলেন। অশ্বারোহীরা টিলার পিছন থেকে বের হয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে পলায়নরত বাহিনীকে ধরে ফেলল। আন্দালুসিয়ার বাহিনী এমন হঠাৎ আক্রমণের আশঙ্কা করেনি। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে শুরু করল। মুসলিম বাহিনী তাদের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে লাগল। শত্রুপক্ষ ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের শিকার হল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। বিজিত বাহিনী এই দ্বীপের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখল আল-খাযরা বা সবুজ দ্বীপ।

***

সবুজ দ্বীপ থেকে ফিরে সেনাপতি তুরাইফ মুসা বিন নুসাইরের নিকট যুদ্ধ জয়ের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জুলিয়ান ও তার সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস জুলিয়ান আমাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে না। তার বাহিনীও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে।’ তিনি আরো বলেন। ‘আন্দালুসিয়ার সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধ করার স্পৃহা খুবই কম। তাদের নেতৃত্ব দানকারী কমান্ডারদের মাঝেও এমন কোন বিশেষত্ব নেই, যা আমাদেরকে পেরেশান করতে পারে।

মুসা বিন নুসাইর যুদ্ধ জয়ের রিপোর্ট শুনে আন্দালুসিয়ার চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য পরিপূর্ণ প্লান তৈরি করতে মনোনিবেশ করেন। এই সময় জুলিয়ান মুগীস আর-রুমী নামক এক নওমুসলিমকে সাথে নিয়ে মুসা বিন নুসাইরের সাথে। সাক্ষাৎ করতে আসেন।

জুলিয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে আন্দালুসিয়া যাওয়ার ইচ্ছায় এসেছিল। সে মুগীস আর-রুমীকেও সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু মুসা বিন নুসাইর অনুমতি দিতে ইতস্তত করছিলেন।

জুলিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে অনুযোগের স্বরে বললেন, ‘মুসা! এখনও কি আমার প্রতি আপনার বিশ্বাস জন্মেনি? আমি এমনটিই সন্দেহ করছিলাম। আপনাদের আস্থা অর্জন করার জন্য আমি আরেকটি উপায় সাথে করে এনেছি।’

এ কথা বলেই জুলিয়ান দরবার থেকে বের হয়ে গেলেন। সিউটা থেকে তার বেশ বড় একটি কাফেলা এসেছিল। সেই কাফেলায় তার অধীনস্থ কর্মচারী, দেহরক্ষী সেনাকর্মকর্তা ও উপদেষ্টাবৃন্দ ছিলেন। তাদের সাথে রাজবংশের মহিলারাও ছিল।

জুলিয়ান পুনরায় যখন দরবারে প্রবেশ করলেন তখন তার সাথে অনিন্দ্য সুন্দর দু’টি মেয়ে ছিল। তারা ছিল অসাধারণ রূপসী, আর মোহনীয় দেহ-সৌষ্ঠবের অধিকারিনী।

জুলিয়ান দরবারে প্রবেশ করেই বললেন, এরা আমার মেয়ে। এই হল ফ্লোরিডা, আর এ হল তার বোন মেরী। মুসা! আমি এই দুজনকে আপনার নিকট পণবন্দী হিসেবে অর্পণ করতে চাই। এরাই হল আমার মান ও সম্মান। ফ্লোরিডা আমার সেই মেয়ে, যার জন্য আমি আমার এক ক্ষমতাধর পুরাতন দোস্তকে দুশমন, আর এক পুরাতন দুশমনকে দোস্ত বানিয়েছি।

আপনি দেখেছন, আমি আমার আত্মমর্যাদা হারিয়ে কতটা উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম। বিরাট ক্ষমতাধর এক বাদশাহর রাজত্বে আক্রমণ করে আমি নিজের জন্য কত বড় বিপদ ডেকে এনেছি। তারপরও আমি ক্ষান্ত হয়নি। তোমার বাহিনীর সাথে আমার নিজের বাহিনীকে পাঠিয়ে ছিলাম তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দখল করার জন্য। মুসা বিন নুসাইর! আজ আমি আমার সেই ইজ্জত আপনার হাতে পণ হিসেবে তুলে দিচ্ছি। আমি অথবা মুগীস যদি আপনাদেরকে সামান্য ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে আমার মেয়েদেরকে দাসী বানিয়ে নিবেন অথবা হিংস্র বার্বারদের হাতে ছেড়ে দেবেন।’

কোন ঐতিহাসিকই এই বিষয়টি স্পষ্ট করে লেখেননি যে, মুসা বিন নুসাইর জুলিয়ানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নাকি তাদের মাঝে অন্য কোন কথা হয়েছিল? ঐতিহাসিকগণ শুধু এতটুকুই লেখেছেন যে, জুলিয়ান পণ হিসেবে তার দুই মেয়েকে মুসলমানদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। হয়তো মুসা বিন নুসাইর তার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

জুলিয়ান দ্বিতীয় যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা হল সে তার পূর্ণ বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সাথে আন্দালুসিয়া পাঠাবেন। মুসা বিন নুসাইর তার এই প্রস্তাব দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি জুলিয়ানের নিকট এতটুকু সহযোগিতার আশা পোষণ করেন যে, মুসলিম বাহিনীর কাছে যুদ্ধ-রসদ প্রেরণ করার ক্ষেত্রে সিউটা ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করবে। সেই সাথে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়া যাওয়া-আসার পথে সিউটার দুর্গে থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবে।

সবশেষে জুলিয়ানের নিকট এই প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য রণতরীর ব্যবস্থা যেন জুলিয়ান করে দেন।

জুলিয়ান সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি এই আশ্বাসও দেন যে, তার বাহিনী সর্বদা সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকবে।

মুসা বিন নুসাইর সেই দিনই খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের নামে একটি পয়গাম লেখে একজন কাসেদকে দামেস্ক পাঠিয়ে দেন। খলীফা পূর্বেই আন্দালুসিয়া আক্রমণের অনুমতি দিয়েছিলেন; কিন্তু মুসা বিন নুসাইর ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি উল্লেখ করার পর লেখেন :

‘আন্দালুসিয়া আক্রমণের জন্য পুনরায় অনুমতি নেওয়া আমার নিকট সময়ের অপচয় ব্যতীত আর কিছুই মনে হয় না, কিন্তু আপনি হিন্দুস্তানে সৈন্য প্রেরণ করেছেন। তাদের প্রয়োজন হয়তো এমন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যার কারণে আপনি আমাকে আন্দালুসিয়ার মিশন মুলতবী করার নির্দেশ দিতে পারেন। অথবা উভয় রণাঙ্গনে সমানতালে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে, উভয় রণক্ষেত্রেই মুসলিম বাহিনী দুর্বল হয়ে যেতে পারে অথবা একটিতে দুর্বল হয়ে যেতে পারে…। তাই অধীনের পক্ষ থেকে আরয এই যে, মহামান্য খলীফা বিষয়টির গভীরতা চিন্তা করে দেখবেন।’ খলীফার পক্ষ থেকে অত্যন্ত উৎসাহব্যাঞ্জক উত্তর আসে। তিনি লেখেন :

‘আল্লাহর নাম নিয়ে সকল প্রস্তুতি পূর্ণ করো এবং যথা সম্ভব দ্রুত রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে সৈন্য পাঠিয়ে দাও। তবে খুব ভেবে-চিন্তে সেনাপতি নির্বাচন করবে।’

***

সেনাপতি নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বেশ কয়েকটি কারণে মুসা বিন নুসাইর সেনাপতি তুরাইফকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করতে চাচ্ছিলেন না। তন্মধ্যে একটি কারণ হল, বাহিনীর প্রায় একশ ভাগ সৈন্যই হল বার্বার। তাই মুসা বিন নুসাইরও চাচ্ছিলেন, প্রধান সেনাপতিও হবে বাবার সম্প্রদায়ভুক্ত। আরব সেনাপতি তার অধীনস্থ হবেন।

সে সময় বাবার সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে এমন কয়েকজন ব্যক্তির উন্মেষ ঘটেছিল, যারা রণাঙ্গণে নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা রাখতেন। তারা সকলেই নিজ

নিজ যোগ্যতা বলে কমান্ডারের পদবী অর্জন করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন। ছিলেন, তারিক বিন যিয়াদ।

প্রধান সেনাপতি নিযুক্তির ব্যাপারে মুসা বিন নুসাইর তন্ময় হয়ে ভাবছিলেন। তাঁর স্মৃতির পর্দায় অতীত দিনের ঘটনাগুলো মূর্ত হয়ে উঠছিল। তিনি যেন সবকিছু দেখতে পাচ্ছিলেন।

এই তো সে দিনের কথা। তখনও বেশিরভাগ বার্বার ইসলাম গ্রহণ করেনি। তারা আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। এই বার্বারদের সাথেই মুসা বিন নুসাইরকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। তিনি তাদের অন্তরে যেমন যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিলেন, তেমনি প্রেম-ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুভূতিও সৃষ্টি করে ছিলেন। তিনি এক দিকে তাদের উপর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন, অপর দিকে বন্ধুত্বের সুনিবিড় বন্ধনে তাদেরকে আবদ্ধ করেছেন।

সে সময় অনেক বার্বারই মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তাদের অনেককেই উচ্চপদস্থ মুসলিম কর্মকর্তাগণ গোলাম বা কর্মচারী হিসেবে নিজেদের কাছে রেখে দেন। মুসা বিন নুসাইরও এক বার্বার নওজোয়ানকে পছন্দ করেন। তিনি সেই নওজোয়ানকে নিজের কাছে রেখে দেন। সেই নওজোয়ান মুসা বিন নুসাইরের নিকট একজন গোলামের মতোই ছিল।

সেই গোলামের কথা শুনে, তার কাজ দেখে, মুসা বিন নুসাইরের মনে হল, এই গোলাম কোন মামুলী বংশের হতে পারে না। তার মাথার চুল ঈষৎ লাল। চেহারায় এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য। এক দিন মুসা বিন নুসাইর তাকে তার বাব-দাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, সে ভাণ্ডাল’ বংশোদ্ভূত।

ভাণ্ডাল বংশ বার্বারদের মাঝে অন্যান্য বংশের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। বংশগত কারণেই হয়তো এই গোলাম অত্যন্ত বিচক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত ও অনন্য গুণাবলীর অধিকারী ছিল। ফৌজী কলা-কৌশল রপ্ত করার প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক ছিল। ঘোড়সওয়ারিতেও সে ছিল অত্যন্ত দক্ষ। তীরন্দাজী ও তরবারী চালনায় তার কোন সমকক্ষ ছিল না। বার্বারদের বিদ্রোহী গোত্রগুলোকে দমন করার জন্য মুসা বিন নুসাইর যখন বের হতেন তখন সেও তার সাথে বের হতো। সিউটা অবরোধের সময়ও সে মুসার সাথে গিয়েছিল।

মুসা বিন নুসাইর লক্ষ্য করতেন, এই গোলাম শুধু তাঁর সেবাই করে না, বরং কখনও কখনও কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল সম্পর্কেও সঠিক পরামর্শ দিয়ে থাকে। আরবী ভাষা সে আপন মাতৃভাষার মতোই শিখে নিয়েছিল।

রণ-পটুতার কারণে মুসা বিন নুসাইর মুসলিম ফৌজের মাঝে তাকে এক বিশেষ পদ প্রদান করেন। তার মাঝে নেতৃত্ব প্রদানের মতো তেজোদ্দীপ্ত কিছু গুণাবলী ছিল। মুসা বিন নুসাইর তাকে কোন এক রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন। সে পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে মুসা তার প্রতি খুশী হয়ে তাকে একটি বাহিনীর কমান্ডার বানিয়ে দেন। এর পর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সে আপন যোগ্যতা বলে সহকারী সেনাপতি পদে পদোন্নতি লাভ করে।

এই পর্যায়ে পৌঁছার অনেক পূর্বেই সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মুসা তার নাম রাখেন তারিক, আর তার বাবার নাম যিয়াদ। তারিক বিন যিয়াদ।

তারিক বিন যিয়াদ এখন মুসলিম বাহিনীর এক সম্মানিত সেনাপতি। আন্দালুসিয়া আক্রমণের নেতৃত্ব প্রদান করার জন্য সেনাপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিলে বারবার মুসার দৃষ্টি এই আযাদকৃত গোলাম তারিক বিন যিয়াদের উপরই নিবদ্ধ হতে লাগল।

তাঁকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করার জন্য মুসা তার মাঝে যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা হল তাঁর আপোষহীন নেতৃত্ব। তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনে শুধু সামনে এগিয়ে যেতেই অভ্যস্ত ছিলেন। পশ্চাৎপসারণ জাতীয় কোন শব্দের সাথে তাঁর কোন পরিচয় ছিল না।

***

হঠাৎ এক দিন মুসা তারিক বিন যিয়াদকে ডেকে বললেন, আন্দালুসিয়া আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে। মুসা তারিক বিন যিয়াদকে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর সামনে আন্দালুসিয়ার ম্যাপ রেখে বললেন, এই হল আন্দালুসিয়া, তুমি কীভাবে এই রাজ্য আক্রমণ করবে, আমাকে বুঝিয়ে বল? মনে রেখো, তোমার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা বেশির চেয়ে বেশি সাত হাজার হবে। কমও হতে পারে, তবে বেশি হবে না।’

তারিক বিন যিয়াদ ম্যাপ ভাঁজ করে এক পার্শ্বে রেখে দিয়ে বললেন, ‘সম্মানিত আমীর! আমি এমন এক প্রতিশ্রুতি এবং এমন এক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে সৈন্যবাহিনীকে অবতীর্ন হতে বলব যে, তারা শুধু সামনেই অগ্রসর হবে, পিছে হটার কথা কেউ চিন্তাও করবে না। ‘বাঁচলে গাজী মরলে শহীদ’ এই হবে তাদের মূলমন্ত্র।

তারিক বিন যিয়াদের কথা শুনে মুসার বার্ধক্য পীড়িত অভিজ্ঞ ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা ফুটে উঠল।

মিসর ও আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ান। সেনাপতি নিযুক্ত হওয়ার সাথে সাথে রাজধানী কায়রোয়ানের অলিগলিতে তীর-ধনুক-বর্শাসহ নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরির হিড়িক পড়ে গেল। সবচেয়ে বেশি বানানো হল, তীর ও হাতে নিক্ষেপযোগ্য বর্শা।

মুসা বিন নুসাইর নির্দেশ দিলেন, ‘তীর ও হাতে নিক্ষেপযোগ্য বর্শার এত বিপুল পরিমাণ মওজুদ গড়ে তুলো, যেন আন্দালুসিয়া থেকে এই পয়গাম না আসে–তীর ও বর্শা শেষ হয়ে গেছে। কারণ, আন্দালুসিয়া যেতে হলে সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। শত্রুপক্ষ আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে রসদ সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেবে। তখন কিছুতেই যুদ্ধাস্ত্র সরবাহ করা সম্ভব হবে না।’

তারিক বিন যিয়াদ তার অধীনস্থ সৈন্যদেরকে কঠোর ট্রেনিং-এর মাধ্যমে প্রস্তুত করতে লাগলেন। আন্দালুসিয়ার যে এলাকায় যুদ্ধ হবে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি জুলিয়ানের নিকট জানতে চাইলেন। জুলিয়ান তাঁকে সেখানকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে সবিস্তারে অবহিত করলেন।

ভৌগোলিক দিক থেকে আন্দালুসিয়া উত্তর আফ্রিকার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন রকম। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজের সমারোহ, আর সবুজ চাদরে ঢাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি, খরস্রোতা নদী আর পাহাড়ী ঝর্নার নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আন্দালুসিয়া।

জুলিয়ানের তথ্য অনুযায়ী তারিক তার বাহিনীকে আন্দালুসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থার অনুপাতে ট্রেনিং দিতে লাগলেন। অবশেষে এক দিন যুদ্ধে যাওয়ার দিনক্ষণ উপস্থিত হল। তারিক বিন যিয়াদকে যে বাহিনী দেওয়া হয়েছিল তার সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র সাত হাজার। তাদের মধ্যে কয়েকশ অশ্বারোহীও ছিল। সাত হাজারের এই বাহিনীর সকল সদস্যই ছিল বার্বার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।

জুলিয়ান মুসলিম বাহিনীকে চারটি বড় বড় রণতরী প্রদান করেছিলেন। রণতরীর নাবিক ও ক্যাপ্টেনও তিনিই দিয়েছিলেন। এই রণতরীগুলো এত বড় ছিল যে, সাত হাজার সৈন্য, কয়েকশ ঘোড়া ও অন্যান্য যুদ্ধ-সামগ্রী অনায়াসেই তাতে বহন করা সম্ভব হয়েছিল।

রণাঙ্গনে রওনা হওয়ার পূর্বে তারিক বিন যিয়াদ বিদায়ী সাক্ষাতের জন্য মুসা বিন নুসাইরের নিকট এসে তাঁকে বললেন, ‘মুহতারাম আমীর! আপনার নিকট শুধু বিজয়ের সুসংবাদ পৌঁছবে।

‘ইবনে যিয়াদ! মুসা বললেন। ভুলে যেয়োনা শক্ৰসংখ্যা এক লক্ষেরও অধিক হতে পারে।’

‘আমাদের শক্ৰসংখ্যা যুদ্ধের ময়দান সর্বদা বেশিই হয়ে থাকে। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমি আপনাকে একটি সুসংবাদ দিতে চাই, আমি গতরাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি আমাকে এই বলে সুসংবাদ দিয়েছেন, “হিম্মতহারা হয়ো না, নিজের প্রতি আস্থা রেখো, দায়িত্ব পালনে অবিচল থেকো; বিজয় তোমারদেরই হবে।”

তারিক বিন যিয়াদের এই স্বপ্নের কথা খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণও লেখেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, এটা কোন মুসলিম ঐতিহাসিকের উর্বর মস্তিষ্ক প্রসূত কাল্পনিক কোন আবিষ্কার নয়।

***

৭১১ খ্রিস্টাব্দের ৯ই জুলাই-এর এক সুন্দর বিকাল। রণতরী রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। সকল সৈনিক রণতরীতে উঠে নিজ নিজ অবস্থান বুঝে নিয়েছে। মুসলিম বাহিনীকে বিদায় জানাতে শত-সহস্র নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সমুদ্রসৈকতে সমবেত হয়েছে। সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে তারা সকলে হাত উঠিয়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয় কামনা করে দু’আ করে। দু’আ শেষে তারা তাকবির ধনীর মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে বিদায়সম্ভাষণ জানায়।

তাদের মুহুর্মুহু তাকবির ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। নিস্তরঙ্গ জলৰাশিতেও যেন উচ্ছ্বাসের ঢেউ লাগে। মুজাহিদগণ তাকবির বলতে বলতে ধীরে ধীরে নোঙর তুলে নেন। রণতরীর মাস্তুলে হাওয়া লেগে পাল ফুলে উঠে। ধীরে ধীরে জাহাজগুলো সমুদ্রসৈকত থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।

মুসলিম বাহিনীকে বিদায় জানাতে আসা নর-নারীদের চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। তাদের মধ্যে কেউ হলেন সৈন্যদের মা-বাবা, কেউ স্ত্রী-কন্যা, আর কেউ আদরের ছোট ভাই-বোন।

এই সাত হাজার মুজাহিদের মধ্য থেকে কেউ হয়তো আর কোন দিন আন্দালুসিয়া থেকে ফিরে আসবেন না। আল্লাহর পয়গামকে সমুদ্রের ওপারে পৌঁছানোর জন্য জানের নাযরানা দিতে আজ তারা রওনা হয়েছেন, হয়তো তাঁরা আজীবনের জন্য দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবেন। তাদের সাথে আর কোন দিন হয়তো আপনজনের দেখাও হবে না।

***

মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ-জাহাজ ‘ক্যাপেল’ নামক স্থানে সমুদ্র-তীরবর্তী একটি অঞ্চলে নোঙর করল। মুসলিম বাহিনী সেখানে অবতরণ করার পর সেই স্থানের নাম রাখা হল, জেলেটার বা জাবালুতারিক। সেই স্থানের নাম আজও অপরিবর্তীত আছে।

সকল সৈন্য জাহাজ থেকে নেমে আসলে তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে সামরিক শৃঙ্খলার সাথে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি জাহাজের নাবিকদেরকে পৃথকভাবে দাঁড়াতে বলেন। তিনি একটি উঁচু স্থানে ঘোড়র উপর বসে ছিলেন। ঘোড়র উপর বসে থেকেই তিনি নাবিকদেরকে বললেন, ‘চারটি জাহাজের সব কটিতেই আগুন লাগিয়ে দাও।

নাবিকরা আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি পুনরায় চিৎকার করে বললেন, ‘যুদ্ধজাহাজ থেকে সকল সৈন্য নেমে এসেছে। যুদ্ধ-রসদও নামিয়ে আনা হয়েছে। এখন আমাদের জাহাজের আর কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং তাতে আগুন লাগিয়ে দাও।’

এমন নির্দেশ একমাত্র সেই সেনাপতিই দিতে পারেন, যার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে। নাবিকরা অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইল।

এবার তারিক আরেকটু উঁচু আওয়াজে তাঁর বাবার সৈন্যদের লক্ষ্য করে বললেন, হে বার্বার ভাইসকল, তোমরা জাহাজে আগুন লাগিয়ে দাও। আমরা এখান থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে চাই না।’

বাবার সিপাহীরা তার নির্দেশমতো সবগুলো জাহাজে আগুন লাগিয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখা অতি দ্রুত সবগুলো জাহাজে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জাহাজের পাল, মাস্তুল, কড়িকাঠ ও পাটাতন আগুনের গ্রীসে পরিণত হল। জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ডগুলো সমুদ্রে ছিটকে পড়তে লাগল। ধোঁয়ায় আন্দালুসিয়ার আকাশ-সীমা আচ্ছাদিত হয়ে গেল।

তারিক বিন যিয়াদ জলদগম্ভীর কণ্ঠে লুঙ্কার দিলেন। গোটা বাহিনী তার প্রতি মনোনিবেশ করল। তিনি সকলকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও জ্বালাময়ী এক বক্তৃতা প্রদান করলেন। তার কণ্ঠ থেকে শব্দগুলো যেন বিদ্যুত্তরঙ্গের ন্যায় মর্মভেদী আওয়াজ তুলে ছিটকে পড়ছিল, আর সৈন্যদের মর্মমূলে আঘাত হেনে চলছিল।

তারিক বিন যিয়াদ নিজে ছিলেন বাবার বংশীয়, গোটা বাহিনীও ছিল বার্বার বংশোদ্ভূত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মাতৃভাষার পরিবর্তে আরবী ভাষায় এক ঐতিহাসিক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর সেই ভাষণ ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে; কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে।

তারিক বিন যিয়াদ তার ভাষণে বলেন :

‘প্রিয় নওজোয়ান বন্ধুগণ! এখন পিছে হটার বা রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। তোমাদের সামনে রয়েছে তোমাদের জানের দুশমন, আর তোমাদের পিছনে রয়েছে কূল-কিনারাহীন অথৈ সমুদ্র। সামনের দিকেও তোমাদের পালানোর কোন পথ নেই, পিছনের দিকেও কোন পথ নেই। এখন বাঁচতে হলে তোমাদের করণীয় হল, ধৈর্য, হিম্মত, আর অবিচলতার পরিচয় দেওয়া।

এই রাজ্যে তোমাদের দৃষ্টান্ত হল, কৃপণের দুয়ারে অনাথের আগমনের ন্যায়। এখানে কেউই তোমাদের সাহায্য করবে না। তোমাদের সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর কাপুরুষতা তোমাদের নাম-নিশানা পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তোমাদের শক্ত সংখ্যা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের যুদ্ধাস্ত্র তোমাদের যুদ্ধাস্ত্রের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।

শত্রুপক্ষের নিকট যুদ্ধ-রসদ পৌঁছার অনেক উপায় রয়েছে। আর তোমাদের যুদ্ধ-রসদ ফুরিয়ে গেলে নতুন যুদ্ধ-রসদ পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই।

যদি তোমরা সাহসিকতার পরিচয় না দাও তাহলে তোমাদের মান-সম্মান মাটির সাথে মিশে যাবে। তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ভূলুণ্ঠিত হবে। তোমাদের মান-সম্মান তোমাদেরকেই অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তোমাদের শৌর্য-বীর্য তোমাদেরকেই বজায় রাখতে হবে। শত্রুপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে হবে। তাদের শক্তির ভিত্তিমূল ধসিয়ে দিতে হবে। প্রথম আঘাতেই তাদেরকে বিপর্যস্ত ও লণ্ডভণ্ড করে দিতে হবে।

আমি তোমাদেরকে এমন কোন বিষয় সম্পর্কে ভয় দেখাচ্ছি না, স্বয়ং আমি যার সম্মুখীন হবো না। তোমাদেরকে এমন কোন স্থানে লড়াই করার জন্যও উদ্বুদ্ধ করছি না, স্বয়ং আমি যেখানে লড়াই করব না। আমি সার্বক্ষণিক তোমাদের সাথেই থাকব। যদি তোমরা অটল-অবিচল থাকো তাহলে এই রাজ্যের ধন-দৌলত, মান-সম্মান তোমাদের পদচুম্বন করবে। যদি তোমরা সাময়িক কষ্টকে বরদাস্ত করো তাহলে এই রাজ্যের প্রতিটি বস্তু তোমাদের হবে।

আমিরুল মুমিনীন ওলিদ বিন আবদুল মালেক তোমাদের মতো নওজোয়ান বীরপুরুষদেরকে এক মহান কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন। যদি তোমরা এই কাজে সফল হতে পার তাহলে তোমরা এখানের রাজ-রাজাদের জামাতা হতে পারবে। এখানকার অপরূপ রূপসী নারীদের স্বামী হতে পারবে। যদি তোমরা এই রাজ্যের শাহসওয়ারদেরকে রাজিত করতে পার তাহলে আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলের আদর্শ এখানেও সমাদৃত হবে।

মনে রেখো, আমার কথা ভালোভাবে বুঝতে চেষ্টা করো, আমি তোমাদেরকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছি, সেদিকে গমনকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি আমি নিজেই। যুদ্ধের ময়দানে সর্বপ্রথম আমার তরবারিই কোষমুক্ত হবে।

এই যুদ্ধে আমি যদি শাহাদাত বরণ করি তাহলে তোমরা তোমাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী কাউকে সিপাহসালার বানিয়ে নিবে। তবে কোন পরিস্থিতিতেই আল্লাহর রাস্তায় জীবন কুরবান করা থেকে বিমুখ হবে না। যত দিন পর্যন্ত এই রাজ্য বিজিত না হবে তত দিন পর্যন্ত তোমরা হিম্মত হারা হয়ে দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে বসে থেকো না।’

৩. তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশ

০৩.

তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশে চারটি জাহাজের সবকটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। প্রতিটি জাহাজই ছিল বিশাল আকৃতির। এ সকল জাহাজের মাধ্যমে সাত হাজার সৈন্য, বিপুল পরিমাণ যুদ্ধ-রসদ ও কয়েকশ’ ঘোড়া বহন করে নিয়ে আসা হয়েছিল।

এই বিশাল আকৃতির জাহাজগুলোতে আগুন লাগানোর সাথে সাথে আগুনের শিখা দাউ দাউ করে উপরে উঠতে লাগল। ধোঁয়ায় গোটা সীমান্ত আচ্ছন্ন হয়ে গেল।

যে স্থানটিতে যুদ্ধ-জাহাজগুলো জ্বলছিল তার অনতিদূরেই জেলেদের একটি গ্রাম ছিল। সমুদ্রসৈকতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠতে দেখে জেলেদের বসতিতে হৈচৈ পড়ে গেল, তারা একজন আরেকজনকে চিৎকার করে বলতে লাগল, ঐ দেখো, কোন বিদেশী বণিকের জাহাজে হয়তো আগুন লেগেছে। জলদি চলে, সবকিছু জ্বলে যাওয়ার পূর্বেই আমরা নিজেদের জন্য কিছু নিয়ে আসি।

বসতির নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সকলে মিলে আগুন লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। যে স্থানটিতে আগুন লেগে জাহাজগুলো জ্বলছিল, উৎসুক নারী-পুরুষ যখন সেখানে এসে পৌঁছলো তখন তারা স্বশস্ত্র সৈন্যদেরকে দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ তখন সৈন্যদেরকে লক্ষ্য করে ভাষণ দিচ্ছিলেন।

আগুন দেখতে আসা উৎসুক লোকেরা যে জায়গায় ভিড় করছিল সেখানে মুগীস আর-রুমী তার বাহিনী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুগীস আর-রুমী তাঁর অশ্বারোহীদেরকে নির্দেশ দিলেন,

‘কৌতূহলী ও উৎসুক এই লোকদেরকে ঘিরে ফেলল। একটি শিশুও যেন পালিয়ে যেতে না পারে।’

অশ্বারোহী সৈন্যরা তৎক্ষণাৎ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কৌতূহলী লোকদের মধ্যে উঠতি বয়সের কিশোরী ও যুবতী মেয়েও ছিল। তারা হৈচৈ করে পালানোর চেষ্টা করল। শিশুরাও ভয়ে চিৎকার করতে লাগল। পুরুষরা নারী ও শিশুদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করল। অশ্বারোহী সৈন্যরা তাদের সকলকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এক পার্শ্বে নিয়ে একত্রিত করলো।

তারিক বিন যিয়াদের ভাষণ শেষ হলে মুগীস আর-রুমী ঘোড়া ছুটিয়ে তার নিকট এসে দাঁড়াল।

‘আমি জানি, তুমি তাদেরকে কেন আটকে রেখেছ। তারিক বিন যিয়াদ মুগীসকে বললেন। তাদেরকে ফিরে যেতে দিলে আন্দালুসিয়ার অধিবাসীরা আমাদের আগমন সম্পর্কে জেনে যাবে, কিন্তু আমরা তাদেরকে অজ্ঞতার মাঝে রাখতে চাই। তারা যেন আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে। তাদেরকে এখানেই আটকে রাখো। আমরা এই স্থান ছেড়ে অনেক দূর চলে যাওয়ার পর তাদেরকে ছাড়বে। শুন মুগীস, ভালোভাবে লক্ষ্য রাখবে, কোন নারীর সাথে যেন অসদাচরণ করা না হয়।’

‘ঠিক আছে, ইবনে যিয়াদ! মুগীস বললেন। তবে আমাদের সম্পর্কে এই গরীব-অসহায় লোকদের অন্তরে যে ভীতি জন্মেছে তা এখনই বিদূরিত করতে হবে। আপনি হয়তো জানেন না, এরা আন্দালুসিয়ায় কত বড় জুলুমের শিকার। আমি তাদের সাথে এমন আচরণ করব যে, তারা আমাদের সাহায্যকারী হয়ে যাবে। আমি তাদের থেকে জেনে নিতে পারব, এখানে আন্দালুসিয়ার বাহিনী কোথায় অবস্থান করছে।

মুগীস আর-রুমী একজন নওমুসলিম ছিলেন। তাঁর বাবা-মা ছিল ইহুদি। কয়েক বছর পূর্বে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার স্বভাব-প্রকৃতি ইহুদিদের মতো ছিল না। ফেত্না সৃষ্টি করা, ষড়যন্ত্র পাকানো, ইবলিসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই হল ইহুদি স্বভাব-প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

মুগীস আর-রুমী হয়তো এজন্যই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁর বিবেক ইহুদিবাদকে মেনে নিতে পারছিল না। তিনি মুসা বিন নুসাইরের ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার মাঝে নেতৃত্ব প্রদানের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ থেকে জানা যায়, মুগীস আন্দালুসিয়ার অধিবাসী ছিলেন। সে সূত্রে জুলিয়ানের সাথে তার পরিচয় ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সিউটা এসে বসবাস করতে থাকেন।

আগুন দেখতে আসা কৌতূহলী লোকদেরকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, মুগীস সেখানে ফিরে আসেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে জেলেপাড়ার এক বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হল। বার্ধক্যজনিত রোগে বৃদ্ধের মাথা ও হাত কাঁপছিল।

বৃদ্ধ মুগীসের ঘোড়ার নিকটে এসে বলল, “হে ফৌজীদের সরদার, তোমরা যেই হওনা কেন, আর যেখান থেকেই আসনা কেন, আমাকে বলো, তোমরাও কি গরীবদের মান-সম্মানকে এতটাই তুচ্ছ মনে করো যেমন এদেশের ধনীরা তুচ্ছ মনে করে? আমি জানি, এখন তুমি নির্দেশ দেবে, পুরুষদেরকে বন্দী করতে, আর মেয়েদেরকে তাদের থেকে পৃথক করতে। তোমরা কি আমাদের উপর অনুগ্রহ করবে না? আমরা তো এজন্য দৌড়ে এসেছিলাম যে, তোমাদের জাহাজে আগুন লেগেছে, তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন।’

‘ভয় পেয়ো না, হে বৃদ্ধ! মুগীস বললেন। আমাদের জাহাজে আগুন লাগেনি, আমরা নিজেরাই আমাদের জাহাজে আগুন লাগিয়েছি।

‘তাহলে তো তোমাদেরকে আরো বেশি ভয় করা উচিত। বৃদ্ধ বলল। ‘তোমরা নিশ্চয় ডাকাত বা লুটেরা, অন্যের জাহাজ ডাকাতি করে এনে তাতে আগুন দিয়েছ। নিজেদের জাহাজে কি কখনও কেউ আগুন দেয়?

‘আমাদেরকে ডাকাত-লুটেরা, যা ইচ্ছা তাই বলতে পার।’ মুগীস বললেন। ‘কিন্তু আমি তোমাকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমাদের কেউ তোমাদের মেয়েদের শরীরে হাত লাগাবে না।’

‘তোমাদের কথা আমরা বিশ্বাস করলাম। বৃদ্ধ বলল। কিন্তু আমরা এতটাই ভাগ্যহত যে, আমাদের ভাগ্য-বিড়ম্বনার কথা শুনলে হয়তো তোমরা আমাদের প্রতি অনুকম্পা দেখাবে। তাই বলছি, আমাদের মান-ইজ্জতের হেফাতকারী ফৌজই হল, আমাদের মান-ইজ্জত লুণ্ঠনকারী। আমাদের নিজ দেশের ফৌজ যখন এদিকে আসে তখন আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে জোর-জবরদস্তী উঠিয়ে নিয়ে যায়। পরের দিন তাদেরকে ফিরত পাঠায়।

মুগীস আর-রুমী তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন। এখন থেকে তোমাদের মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা হবে।’

‘তাহলে অশ্বারোহীরা আমাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে কেন?’ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করল।

‘তোমরা যেন তোমাদের ফৌজকে এই সংবাদ দিতে না পার যে, অন্য দেশের ফৌজ তোমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। তাই তোমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। মুগীস বললেন। আমরা বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলে তোমরা তোমাদের বাড়ি-ঘরে চলে যেও। নিকটে কোথাও তোমাদের ফৌজ আছে কি?

বৃদ্ধের নিকট আরো কয়েকজন জেলে ও মাঝি এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্য থেকে আরেক বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হয়ে বলল, তোমাকে এই নৌসেনাদের সরদার মনে হচ্ছে, তোমরা আমাদের ইজ্জত রক্ষা করার ওয়াদা করেছ, তাই আমরাও তোমাদেরকে স্থানীয় সৈন্যদের হাত থেকে রক্ষা করার ওয়াদা করছি। তোমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে, কেননা আমাদের ফৌজ এখান থেকে বেশি দূরে নয়।

বৃদ্ধ মুগীস আর-রুমীকে বলল, এই এলাকায় কয়েক জায়গায়ই ফৌজী চৌকী রয়েছে। সবচেয়ে নিকটতম চৌকী এখান থেকে ছয় মাইল দূরে। এটাই এখানকার জেনারেলের হেডকোয়াটার। এই এলাকার সকল চৌকী মিলে সৈন্যসংখ্যা আট-দশ হাজার হবে। এখানকার জেনারেলের নাম হল, থিয়োডুমির।

ঐতিহাসিকদের মতে এই জেনারেল ছিল অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ।

***

তারিক বিন যিয়াদ মনে করেছিলেন, আন্দালুসিয়ার বাহিনী তাদের আগমন সম্পর্কে অবগত হওয়ার পূর্বেই তিনি আচমকা তাদের উপর আক্রমণ করে তাদেরকে পর্যুদস্ত করে দেবেন। কিন্তু এটা ছিল তার একটা ভুল ধারণা। মুগীস যখন জেলে ও মাঝিদেরকে এই বলে সান্তনা-বাক্য শুনাচ্ছিলেন যে, তাদের নারীদের ইজ্জতের উপর হামলা করা হবে না, সেই সময় আন্দলুসিয়ার এক ফৌজী গুপ্তচর হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের জেনারেল থিয়োডুমিরের নিকট এসে পৌঁছল। সে তাকে অত্যন্ত হতভম্ব কণ্ঠে সংবাদ দিল :

এইমাত্র আমি দেখে এসেছি, আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতে চারটি বিশাল রণতরী থেকে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী অবতরণ করেছে।

মুসলিম বাহিনীর জাহাজগুলো যখন সমুদ্রসৈকতে নোঙর করে তখন এক গুপ্তচর ক্যাপেলো নামক স্থানে এক পাহাড়ী চূড়ায় পাহারারত ছিল। এই গুপ্তচর থিয়োডুমিরের নিকট বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করল।

সে তাকে বলল, আমি দেখলাম, সিউটার দিক থেকে চারটি বিশাল রণতরী আমাদের সমুদ্রসৈকতে এসে নোঙর ফেলল। তারপর সৈন্য-সামন্ত, যুদ্ধ-রসদ ও ঘোড়া নামানো হলে তারা নিজেরাই নিজেদের রণতরীগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিলো।

‘আগুন লাগিয়ে দিয়েছে?’ থিয়োডুমির হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘আমি নিজ চোখে জাহাজগুলো জ্বলতে দেখেছি।’ গুপ্তচর বলল। তারা সকলেই সৈনিক। তাদের সংখ্যা দশ হাজারের চেয়ে কিছু কম হবে।’

‘তাহলে তো তারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সৈনিক।’ থিয়োডুমির হতভম্ব হয়ে বলল। ‘মনে হয়, এই সৈনিকদের সকলেই উন্মাদ। একমাত্র উন্মাদরাই নিজেদের জাহাজে আগুন দিতে পারে।’

থিয়োডুমির তৎক্ষণাৎ কয়েকজন ঘোড়সওয়ারকে এই নির্দেশ দিয়ে চৌকীগুলোর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিলো, যেন পদাতিক ও অশ্বারোহীসহ সকল বাহিনী তাদের যুদ্ধ-সামগ্রী ও রসদপত্র নিয়ে অতিসত্বর হেডকোয়ার্টারে একত্রিত হয়।

***

অল্প সময়ের মধ্যেই সকল বাহিনী হেডকোয়ার্টারে এসে একত্রিত হল। এদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় পনের হাজার। যুদ্ধ-রসদ ও অস্ত্রসস্ত্রের বিবেচনায় এই বাহিনী তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।

আন্দালুসিয়ার বাহিনীর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, তারা আপন দেশে অবস্থান করছে। সব সময় তাদের নিকট যুদ্ধ-রসদ ও সাহায্য পৌঁছা সম্ভব। তাছাড়া তাদের সকলের উর্ধাঙ্গ কঠিন লৌহবর্মে আবৃত ছিল।

তারিক বিন যিয়াদের সৈন্যসংখ্যা হল মাত্র সাত হাজার। অশ্বারোহী মাত্র তিনশ’। তাদের কেউই লৌহবর্ম পরিহিত নয়। তারিক বাহিনীর অস্ত্রসস্ত্রও হল পুরনো ও অনুন্নত। তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, তারা শত্রুভূমিতে অবস্থান করছে, যেখানের প্রতিটি ধূলিকণা, আকাশ-বাতাস, এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও তাদের শত্রু। কোথাও থেকে যুদ্ধ-রসদ পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও তাদের নেই। সেনাসাহায্য পৌঁছাও অনেকটা অসম্ভব। কারণ, তাদের পিছনে বার মাইল বিস্তৃত সুবিশাল উত্তাল সমুদ্র।

তারিক বিন যিয়াদের সাথে অর্টিজার ভাই আউপাস এবং জুলিয়ানও এসেছিলেন। তারা উভয়েই গাইডের কাজ করছিলেন। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি অলিগলি ছিল তাদের নখদর্পণে।

তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে নিকটে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নিচ্ছিলেন আন্দালুসিয়ার কোথায় কী আছে? কোথায় কোথায় দুর্গ আছে? এখান থেকে শহর কত দূর? এক শহর থেকে আরেক শহরের দূরত্ব কেমন? ইত্যাদি। আউপাস ও জুলিয়ান তাঁর প্রতিটি প্রশ্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ উত্তর দিচ্ছিলেন।

‘আমাদের প্রথম সংঘর্ষ হবে সমুদ্রসৈকতের নৌসেনাদের সাথে। জুলিয়ান বললেন। আমাদের আক্রমণের পূর্বেই এই সৈনিকরা যদি সংঘবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশি; তাদের অস্ত্রসস্ত্রও উন্নত। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা আমাদের আগমনের সংবাদ পায়নি। আশা করি, আমরা প্রতিটি প্রতিরক্ষা চৌকী পৃথক পৃথকভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হব।’

মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ-জাহাজ থেকে অবতরণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম গোছগাছ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তাদেরকে বললেন, ‘এখানে অল্প সময়ের জন্য আমরা অবস্থান করব। তাঁবু টনানো হবে না।’

এমন সময় একজন অশ্বারোহী ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল। আগন্তুক দ্রুতপদে ঘোড়া থেকে নেমে তারিককে লক্ষ্য করে বলল,

‘এখনই প্রস্তুত হয়ে নিন। আগন্তক হাঁপাতে হাঁপাতে উচ্চস্বরে বলল। ‘আন্দালুসিয়ার বাহিনী আমাদের আগমন সম্পর্কে জেনে গেছে। প্রতিরক্ষা চৌকীগুলোর সৈন্যরা একত্রিত হচ্ছে, তারা আমাদের থেকে বেশি দূরে নয়, এখনই এখানে পৌঁছে যাবে।

কে এই ব্যক্তির তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন। কোন বার্বার সৈনিক তো মনে হচ্ছে না।’

‘এ আমার লোক। জুলিয়ান বললেন। তার নাম হেনরি।

জুলিয়ান হেনরিকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি এখানে কীভাবে এলে? ‘আমি আপনাদের সাথে আসতে চাচ্ছিলাম, তাই মুসলমানদের পোশাক পরিধান করে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। হেনরি বলল। পদাতিক বাহিনী ও অশ্বারোহীরা যখন জাহাজে আরোহণ করছিল তখন আমি সুযোগ বুঝে অশ্বারোহীদের জাহাজে উঠে পড়ি।

এখানে পৌঁছে দেখি, সৈনিকরা যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে আছে। এখানকার ফৌজ যে আমাদের পথ আগলে বসে আছে, সেদিকে কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। এই এলাকা আমার পরিচিত। আমি এক পাহাড়ী ঝোঁপের আড়ালে আমার ঘোড়া রেখে সামনে অগ্রসর হই। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পরই এখানকার ফৌজ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। আমি এটা দেখতে চাচ্ছিলাম যে, এখানকার বাহিনী আমাদের আগমন সম্পর্কে অবগত আছে কি না?

***

এ বিষয়টি তারিক বিন যিয়াদের মতো জাদরেল সেনাপতির দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তিনিও এখানকার বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি এই এলাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তত্ত্ব সংগ্রহ করছিলেন। কিছুক্ষণ পূর্বেই মুগীস আর-রুমী জেলে ও মাঝিদের থেকে এই অঞ্চলের নৌবাহিনী সম্পর্কে যে তত্ত্ব পেয়েছিল, তা তারিক বিন যিয়াদকে অবহিত করা হয়েছিল। তিনি হেনরির তত্ত্ব শুনে অত্যন্ত খুশি হয়ে তাকে মোবারকবাদ জানান।

এই সেই হেনরি যাকে ফ্লোরিডা মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। সেও ফ্লোরিডাকে নিজের প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসত। ফ্লোরিডার বিরহ-বেদনা সইতে না পেরে সে টলেডো চলে গিয়েছিল। আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক ফ্লোরিডার শ্লীলতাহানী করলে হেনরি শাহী আস্তাবলের ঘোড়া চুরি করে টুলেডো থেকে পালিয়ে যায়। তারপর সিউটা পৌঁছে ফ্লোরিডার বাবা জুলিয়ানকে সবকিছু খুলে বলে।

এই ঘটনার পর জুলিয়ানের আহ্বানে যৌথবাহিনী যখন আন্দালুসিয়ার মাটিতে পরীক্ষামূলক আক্রমণ চালায় তখন ফ্লোরিডাও সেই বাহিনীতে অংশগ্রহণ করে নিজ হাতে আপন শ্লীলতাহানীর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু জুলিয়ান তাকে অনুমতি দেয়নি। এরপর যখন তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসিয়া আক্রমণের জন্য মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করা হয় তখন জুলিয়ান ও আউপাস মুসলিম বাহিনীর সাথে রওনা হন।

ফ্লোরিডা ভালো করেই জানত যে, জুলিয়ান কিছুতেই তাকে সাথে নিবেন না। উপায়ন্তর না দেখে সে হেনরিকে বলল, আমি মুসলিম বাহিনীর সাথে যেতে চাই।’

হেনরিকেও মুসলিম বাহিনীর সাথে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই যুদ্ধে জুলিয়ানের বাহিনীর অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকলে হেনরিকে অনুমতি দেওয়া হতো। কারণ, তার বাবা ছিল শাহী আস্তাবলের বড় অফিসার।

‘তুমি আমাকে মুসলিম বাহিনীর পোশাক এনে দাও।’ ফ্লোরিডা হেনরিকে বলল। আমি সেই পোশাক পরে জাহাজে আরোহণ করব। আমি নিজ হাতে রডারিক থেকে প্রতিশোধ নেব।’

হেনরি তাকে বুঝাতে চেষ্টা করল, কিন্তু সে আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠল। হেনরি প্রমাদ গণলো। তার ধারণা হল, এই মেয়ে যা বলছে, তা করেই ছাড়বে।

‘ফ্লোরা!’ হেনরি তাকে বলল। উত্তেজিত হয়ো না। আমি তোমার মনের কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমি একরোখা চিন্তা করছ। অন্য দিকটি এখনও ভেবে দেখনি। তুমি কীভাবে মনে করলে যে, তুমি রডারিক পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে এবং নিজ হাতে তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে?’

‘আমি মুসলিম সেনাদের পোশাক পরে থাকব।’ ফ্লোরিডা বলল।

‘আবেগ নয়; বিবেক দিয়ে চিন্তা কর, ফ্লোরা! হেনরি বলল। তুমি কি ভেবে দেখেছ, যুদ্ধের ময়দানে তুমি আহত হতে পার, এমন কি নিহতও হতে পার। আর যদি তুমি জীবিত গ্রেফতার হও তাহলে তুমি নিজেই ভেবে দেখ, রডারিকের ফৌজ তোমার সাথে কী আচরণ করবে? তারাও তোমার সাথে রডারিকের মতোই আচরণ করবে। তখন তুমি কয়জন থেকে তোমার শ্লীলতাহানীর প্রতিশোধ নিবে?

ফ্লোরিডা কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে চুপ হয়ে গেল। মনে হল, সে বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।

‘তা হলে এক কাজ কর হেনরি, তুমি নিজ হাতে রডারিককে হত্যা কর। আমি তোমার আমানত ছিলাম। সে তোমার আমানতের খেয়ানত করেছে। আমার সতীত্ব, আমার দেহ-মনের একমাত্র অধিকারী তুমি। চরিত্রহীন রডারিক আমার এই দেহকে অপবিত্র করেছে। আমার মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। বল হেনরি! তুমি আমার অশান্ত আত্মাকে শান্ত করবে?

‘হ্যাঁ করব, আমি তোমার মনের শান্তি ফিরিয়ে আনব ফ্লোরা, আমি অবশ্যই তোমার ইজ্জতের বদলা নেব।’

হেনরি ফ্লোরিডার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে গভীরভাবে চুমো খেল। তারপর নিজের বুকের উপর ফ্লোরিডার হাত দুটি রেখে বলল। ‘তোমার ভালোবাসার কসম, রডারিকের মৃত্যু আমার হাতেই হবে।

‘কথা দাও, আমার জন্য আরেকটা কাজ করবে?’ ফ্লোরিডা মিনতিভরা কণ্ঠে বলল। “তুমি রডারিকের মাথা কেটে এখানে নিয়ে আসবে। আমি তার মাথা পাগলা কুকুরের সামনে নিক্ষেপ করব।’

‘কথা দিলাম, রডারিকের মাথা নিয়েই আমি ফিরে আসব।’ হেনরি বলল।

***

হায়রে প্রেম! হায়রে ভালোবাসা! রূপের রানী ফ্লোরিডা নির্দ্বিধায় এক শক্তিধর বাদশাহর প্রেম-প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করল। অপর দিকে তারই আস্তাবলের এক সাধারণ কর্মচারীকে তার হৃদয়মন্দিরে সাদরে গ্রহণ করল।

একেই বলে ভালোবাসা! একেই বলে প্রেম! সেই প্রেমের দাবি পূরণ করার জন্য হেনরি জীবনবাজি রাখতেও প্রস্তুত হয়ে গেল। সেই প্রেমের বলে বলিয়ান হয়ে সে তার প্রেমিকাকে কথা দিল, তার শ্লীলতা হরণকারী এক প্রতাপশালী বাদশাহর মাথা কেটে এনে তার পদতলে রাখবে।

হেনরি তার প্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এক মুসলিম সৈনিকের বেশে জাহাজে চড়ে আন্দালুসিয়া এসে পৌঁছল। মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়া পৌঁছার পর যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম বাঁধাঘাদার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে সে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে সরে পড়ে। তারপর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সামনে অগ্রসর হয়।

তারিক বিন যিয়াদের বাহিনী রওনা হওয়ার পর থেকে ফ্লোরিডা প্রতিদিন নিয়মিত উপাসনালয়ে যেত, আর উপাসনা শেষে শুধু এই প্রার্থনাই করত, হে ঈশ্বর! মুসলমানরা যেন বিজয়ী হয়, আর হেনরি যেন রডারিকের কর্তিত মস্তক নিয়ে জীবিত ফিরে আসে।

***

আন্দালুসিয়ার বাহিনী একত্রিত হওয়ার সংবাদ পাওয়ামাত্রই তারিক বিন যিয়াদ তৎক্ষণাৎ তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি নিজে জাবালুতারিকের একটি উঁচু টিলার উপর উঠে গভীর দৃষ্টিতে চতুর্দিক পর্যবেক্ষণ করেন। সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি তড়িগতিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিল।

তাঁর সাথে মুগীস আর-রুমী এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি আবু যারু’আ তুরাইফ বিন মালেকও উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেদের পছন্দনীয় যুদ্ধ ক্ষেত্র নির্বাচনে ব্যস্ত ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ এমন একটি স্থানের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যে স্থানটি উঁচু উঁচু টিলা এবং সবুজ গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত ছিল।

‘সকল অশ্বারোহীকে টিলা ও গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত ঐস্থানটিতে পাঠিয়ে দাও। তারিক তার অধীনস্থ সেনাপতিদেরকে বললেন। অশ্বারোহীদের কমান্ডারকে বলে দাও, সে যেন অশ্বারোহীদেরকে নিয়ে ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকে।

তারিক তাঁর সেনাপতিদেরকে নিজ নিজ বাহিনী বিন্যস্ত করার নির্দেশনা দিয়ে নিচে চলে এলেন। যে সকল জেলে ও মাঝিদেরকে আটকে রাখা হয়েছিল তাদেরকে এই বলে ছেড়ে দেওয়া হল যে, তোমরা নিজ নিজ গৃহে চলে যাও, সেখান থেকে বের হয়ো না।’

তীরন্দাজ বাহিনীর কমান্ডারকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হল। ইতিমধ্যেই সংবাদ এলো, আন্দালুসিয়ার বাহিনী এসে গেছে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সাথে কয়েক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন।

কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর থিয়োডুমিরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল। নিরাপত্তারক্ষীরা থিয়োডুমিরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখে ছিল। তারা উন্নতমানের রণপটু ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল।

‘তোমরা কারা? কোত্থেকে এসেছো?’ থিয়োডুমির বুলন্দ আওয়াজে জানতে চাইল। এখানে কি জন্য এসেছ?

‘এই লোক কি বলছে?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

‘থামুন, ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদকে বললেন। আমিই তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।’

জুলিয়ান তার ঘোড়া সামনে অগ্রসর করে বুলন্দ আওয়াজে বললেন, ‘জানতে চাচ্ছ, আমরা কে, কোত্থেকে এসেছি, আর কেন এসেছি? শুনে রাখ, আমরা আন্দালুসিয়া দখল করার জন্য এসেছি।’

‘নিমক হারাম!’ থিয়োডুমির হুঙ্কার ছেড়ে বলল। ‘তুই আমাদের করদ-রাজা হয়ে আমাদের রাজ্যে হামলা করতে এসেছিস। তুই কাদেরকে তোর সাথে করে এনেছিস। এরা তোর বাহিনী নয়। তুই ইতিপূর্বে এখানে এসে লুটতরাজ করেছিস। তাই তোর সাহস বেড়ে গেছে। ভেবেছিস, এবারও জান নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবি। এখনও সুযোগ আছে, তোর এই নির্বোধ সৈন্যদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যা। আমার বাহিনীর দিকে তাকিয়ে দেখ, তোর কাছে তো দেখছি, কোন অশ্বারোহীও নেই। আমার বাহিনী তোর বাহিনীর চেয়েও সংখ্যায় দ্বিগুণ।

তারিক বিন যিয়াদকে দোভাষীর মাধ্যমে জুলিয়ান ও থিয়োডুমিরের কথোপকথন তরজমা করে ওনানো হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজাতে বললেন। যুদ্ধের ডঙ্কা বাজার সাথে সাথে তারিক তার বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দিলেন।

থিয়োডুমির এই আত্মপ্রশান্তিতে নিমগ্ন ছিল যে, তার নিকট মুসলিম বাহিনীর তুলনায় দ্বিগুণ সৈন্য ও এক হাজার অশ্বারোহী আছে। মুসলিম পদাতিক বাহিনী নারায়ে তাকবীর বলে সামনে অগ্রসর হল।

থিয়োডুমির তার রক্ষী বাহিনীর সাথে পিছে হটে এলো। তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। তার বিশ্বাস ছিল, বিজয় তার বাহিনীরই হবে। অপর দিকে তারিক বিন যিয়াদ আক্রমণকারী বাহিনীর সর্বাগ্রে ছিলেন। থিয়োডুমির তার এক হাজার অশ্বারোহীকে পদাতিক বাহিনীর পিছনে রেখে দিল।

উভয় বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত হল। মুসলিম বাহিনীর জানা ছিল, এই যুদ্ধে তাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ফিরে যাওয়ার কোন উপায়ই তাদের নেই। তারা নিজ হাতে তাদের রণতরীগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের জ্বালাময়ী ভাষণ তাদের প্রাণে নতুন এক আশার সঞ্চার করেছিল। সৈন্যদের সকলেই ছিল উদ্দীপ্ত ও উৎসর্গিতপ্রাণ।

তারিক বিন যিয়াদ অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে প্রচণ্ড বিক্রমে শত্রুপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পিছু হটতে বাধ্য হলেন। তার অধীনস্থ কমান্ডারগণও পিছু হটতে লাগলেন।

‘এদেরকে জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে দিওনা।’ ঢাল-তলোয়ারের বিকট আওয়াজ আর আহত সৈনিকদের মর্মবেদী আর্তনাদ ছাপিয়ে থিয়োডুমির হুঙ্কার ছেড়ে বলতে লাগল। এরা পালিয়ে যাচ্ছে, এরা যেন কিছুতেই পালাতে না পারে। এদের পিছু ধাওয়া কর। প্রত্যেককে টুকরো টুকরো করে ফেল।’

তারিক বিন যিয়াদ আরো ক্ষিপ্রগতিতে তার বাহিনী পিছে সরিয়ে আনলেন। শত্রুবাহিনীও ততোধিক ক্ষিপ্রগতিতে পিছু ধাওয়া করে সামনে অগ্রসর হতে লাগল।

তারিক তার বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে ছিলেন। মধ্যভাগের কমান্ড ছিল তাঁর নিজের হাতে। এই অংশের সৈন্যদের দিয়েই তিনি আক্রমণ রচনা করে ছিলেন। এদেরকে নিয়েই তিনি পিছু হটে আসছিলেন। সৈন্যরা দ্রুত পিছু হটে আসছিল। তাদের মুখের ‘নারায়ে তাকবীর’ ধ্বনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে হটতে এমন এক স্থানে এসে পৌঁছল, যেখানে গাছগাছালির আধিক্য ছিল। আর অপর দিকে ছিল উঁচু উঁচু পাহাড়ী টিলার সারি।

আন্দালুসিয়ার বাহিনী যখন মুসলিম বাহিনীকে পিছু ধাওয়া করতে করতে সেই গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত স্থানে এসে পৌঁছল তখন গাছের আড়াল থেকে তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হল। টিলার পিছনেও মুসলিম তীরন্দাজরা আত্মগোপন করেছিল। তারাও শত্রুবাহিনীর উপরে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল।

আন্দালুসিয়ার এই বাহিনীতে পদাতিক সৈন্যদের সাথে অশ্বারোহীও ছিল। তীরন্দাজ বাহিনী একেবারে নিকট থেকে তীর নিক্ষেপ করছিল। তাই তাদের কোন তীরই লক্ষ্য ভ্রষ্ট হচ্ছিল না। প্রতিটি তীরই উদ্দিষ্ট শত্রুর বুকে সমূলে বিদ্ধ হচ্ছিল।

আন্দালুসিয়ার বাহিনীর আগমনের সংবাদ শুনে তারিক বিন যিয়াদ তীরন্দাজ বাহিনীকে যে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন–এটাই হল তার নিগুঢ় রহস্য। তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশমতো তীরন্দাজ বাহিনীর সদস্যগণ পূর্ব থেকে গাছের আড়ালে, টিলার পিছনে ওঁতপেতে ছিল।

তারিক বিন যিয়াদের পিছু হটার উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুবাহিনীকে তীরন্দাজদের তীরের নিশানার মধ্যে নিয়ে আসা। তার এই কৌশল সফল হল। পিছু ধাওয়া করে আসা সৈনিকদের সকলেই বেঘোরে মারা পড়ল।

‘ঘোষণা করে দাও, ঘোড়াগুলোকে যেন নিশানা বানানো না হয়। তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। আমাদের ঘোড়ার প্রয়োজন আছে। তবে একজন সওয়ারীও যেন জীবন নিয়ে ফিরে যেতে না পারে।

সুউচ্চ আওয়াজে তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশ ঘোষিত হল। থিয়োডুমির তার পদাতিক ও অশ্বারোহীদের করুণ পরিণতি নিজ চোখে অবলোকন করল। তার নিকট তখনও অনেক সৈন্য ছিল।

এদিকে মুসলিম বাহিনীর অন্য দুই অংশের একটি ডাইনে ও অপরটি বায়ে দাঁড়িয়ে ছিল। থিয়োডুমির একই সাথে তিন বাহিনীর উপর আক্রমণের নির্দেশ দিল। তারিক বিন যিয়াদের পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী ডান পার্শ্ব ও বাম পার্শ্বের বাহিনী আরো পিছু হটে এলো। উদ্দেশ্য হল, রণাঙ্গন যেন প্রশস্ত হয় এবং শত্রুপক্ষ যেন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বার্বার জাতি ছিল রক্তপিপাসু যোদ্ধা। প্রতিপক্ষের রক্ত ঝড়ানোই ছিল তাদের নেশা। ইসলাম তাদেরকে লড়াই করার জন্য নতুন মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। তাদের সামনে তুলে ধরে ছিল জীবনের এক নতুন উদ্দেশ্য। ফলে তাদের লড়াই করার ভঙ্গিই পাল্টে গিয়েছিল। খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন :

‘আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে লড়াই করার সেই উদ্যম আর উদ্দিপনা ছিল না, যে উদ্যম আর উদ্দিপনা মুসলিম বাহিনীর মাঝে ছিল। আন্দালুসিয়ার সৈনিকরা বাদশাহর অধীনস্থ চাকর ছিল। তারা বেতন পেয়ে লড়ত, আর বেতন পাওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে চাইতো। তাদের বড় বড় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও পাদ্রিরা রাজা-বাদশাহ ও আমীর-উমারাদের মতো বিলাসবহুল জীবন যাপন করত।

আন্দালুসিয়ায় ইহুদি সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক বসবাস করত। কিন্তু খ্রিস্টানরা তাদেরকে গোলাম বানিয়ে রেখেছিল। ইহুদি নারীদের মান-ইজ্জতের কোন নিরাপত্তা ছিল না। কোন রূপসী ইহুদি মেয়ের প্রতি পাদ্রির কুদৃষ্টি পড়লে তাকে গির্জার সম্পত্তি গণ্য করা হতো। বলা হতো, এই মেয়েকে গির্জার ‘নান বানানো হবে, কিন্তু বাস্তবে তাকে পাদ্রির রক্ষিতা করে রাখা হতো।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ধর্মগুরুদের স্বভাব-আচরণ সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও মন্দ প্রভাব বিস্তার করেছিল। জেলে ও মাঝিরা একারণেই মুগীস আর-রুমীকে বলেছিল, তাদের রাজ্যের সৈন্যরা কোন সুশ্রী যুবতী মেয়েকে দেখলে জবরদস্তি তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতো।’

মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মোকাবেলা করছিল। তারা সংখ্যায় ছিল অল্প, কিন্তু সুশৃঙ্খল রণকৌশল, আর অসম সাহসিকতার কারণে তারা শত্রুপক্ষের নিকট মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

থিয়োডুমিরের ধারণা ছিল, তার বিশাল বাহিনী অল্প সংখ্যক মুসলিম সৈন্যদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেবে; কিন্তু পিছন দিকের অতর্কিত হামলা থিয়োডুমির বাহিনীর মাঝে কেয়ামতের বিভীষিকা ছড়িয়ে দিল।

তারিক বিন যিয়াদ পূর্বেই এর ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তিনি অশ্বারোহী বাহিনীকে শত্রুপক্ষের পিছনে অবস্থিত টিলাসমূহের মাঝে আত্মগোপন করে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে যে সকল সৈনিক রণাঙ্গন থেকে পিছু হটে এসেছিল, তিনি তাদেরকে ঘুরপথে টিলার আড়ালে অপেক্ষারত অশ্বারোহী বাহিনীর নিকট নিয়ে এলেন। অশ্বারোহী বাহিনীর সদস্য ছিল মাত্র তিনশ’। তিনি পদাতিক ও অশ্বারোহী উভয় বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন, তারা যেন অতি ক্ষিপ্রগতিতে টিলার আড়াল থেকে বের হয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর পিছনের অংশে আক্রমণ চালায়।

তারিক বিন যিয়াদের এই যুদ্ধ-কৌশল থিয়োডুমিরের ধারণার অতীত ছিল। তার ধারণা ছিল, তার পিছন দিক নিরাপদ। এই হামলার নেতৃত্ব তারিক বিন যিয়াদ নিজেই দিচ্ছিলেন। তাঁর অন্য দুই সেনাপতি মুগীস আর-রুমী, আর আবু যারু’আ তুরাইফ সম্মুখভাগে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মোকাবেলা করছিলেন। তারা পিছন দিক থেকে তারিকের আক্রমণের অপেক্ষা করছিলেন।

তারিক বিন যিয়াদ তিনশ’ অশ্বারোহী আর প্রায় দুই হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে পিছন দিক থেকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এই আচানক বিপদ সম্পর্কে থিয়োডুমির অবগত হওয়ার পূর্বেই তার বাহিনীর প্রায় দুই হাজার যোদ্ধা মৃত্যুর শিকারে পরিণত হল। আর যারা আহত হল, তাদের ভয়ঙ্কর চিৎকার, আর মর্মভেদী আর্তনাদ অন্যান্য সৈনিকদেরকে হতবিহ্বল করে তুলল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই আন্দালুসিয়ার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তারা উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটোছুটি করতে শুরু করল। তারিক বিন যিয়াদের প্লান অনুযায়ী মুগীস আর-রুমী, আর আবু যারু’আ তুরাই তাদের বাহিনীকে পূর্বের চেয়ে অধিক বিক্রমে আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন।

আক্রমণের তীব্রতায় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনী রণাঙ্গন ছেড়ে ভাগতে লাগল। অশ্বারোহীরা আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলে আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করল।

এ সময় তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন, ‘শত্রুপক্ষের ঘোড়াগুলোর যেন কোন ক্ষতি না হয়। ঘোড়াগুলোকে অক্ষত অবস্থায় ধরতে হবে। এগুলো পরবর্তীতে আমাদের কাজে লাগবে।’

মুহুর্মুহু রণহুঙ্কার আর ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানিতে ভীতসন্ত্রস্ত ঘোড়াগুলো এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি করছিল। ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের আঘাতে অনেক পদাতিক সৈন্য নিহত হল।

তারিক বিন যিয়াদের তীরন্দাজ বাহিনী আন্দালুসিয়ার সৈন্যদের জন্য মৃত্যুদূত হয়ে আবির্ভূত হল। তারা এক গাছ থেকে নেমে অন্য গাছে আরোহণ করত, আর একেবারে কাছ থেকে তীর নিক্ষেপ করত।

থিয়োডুমির বাহিনীর শৃঙ্খলা একেবারেই তছনছ হয়ে গেল। সৈনিকরা একজন একজন করে রণাঙ্গন ছেড়ে ভাগতে শুরু করল। কোন সৈনিকই থিয়োডুমিরের নির্দেশের প্রতি ক্ষেপও করল না। তার বাহিনীর প্রায় অর্ধেক সৈন্য মারা পড়ল। কোন সৈনিক যদি আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যেতো তাহলে সেও পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করত।

***

‘মুগীস!’ জুলিয়ান ও আউপাস হন্তদন্ত হয়ে মুগীস আর-রুমীর নিকট এসে বললেন। কয়েকজন জানবাজ যযাদ্ধাকে নির্দেশ দাও, তারা যেন থিয়োর্ভুমিরকে জীবিত গ্রেফতার করে।’

‘রণাঙ্গনের পরিস্থিতি দেখছেন?’ মুগীস বলল। এই পরিস্থিতিতে তার নিকট পৌঁছা সম্ভব নয়।’

‘পাঁচ-ছয়জন বার্বার যোদ্ধা আমাকে দাও।’ আউপাস বলল।

‘আমি আপনাকে আমার বাহিনীর চারজন অশ্বারোহী দিচ্ছি।’ মুগীস আউপাসকে বললেন।

আউপাস চারজন অশ্বারোহী যোদ্ধাকে সাথে নিয়ে চলে গেল।

আন্দালুসিয়ার সেনাবাহিনীর এক সহকারী সেনাপতি থিয়োডুমিরকে লক্ষ্য করে বলল, “থিয়োডুমির, আপনি কি শক্রর হাতে নিহত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন? আমাদের আর কী করার আছে?

‘তুমি কি আমাকে রণাঙ্গন থেকে পলায়নের পরামর্শ দিচ্ছ?’ থিয়োডুমির তার সহকারীকে বলল।

‘এখনই পতাকা গুটিয়ে এখান থেকে সরে পড়ন। সহকারী সালার বলল। ‘আমাদের অর্ধেক সৈন্য নিহত হয়েছে। অন্যরা রণাঙ্গন ছেড়ে পলায়ন করছে।

থিয়োডুমির সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিল। মুসলমানদের প্রবল বিক্রম আর শৌর্য-বীর্যও সে স্বচক্ষে অবলোকন করছিল। সে খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছিল, কীভাবে মুসলমানরা তাদের তুলনায় দ্বিগুণ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর উপর আতঙ্ক ছড়িয়ে তাদেরকে অবলিলায় হত্যা করে চলছে।

থিয়োডুমির নিজেও ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিল। তার বাঁচার একটি মাত্র উপায়ই অবশিষ্ট ছিল, আর তা হল রণাঙ্গন ছেড়ে পলায়ন করা। সে পরিস্থিতির নাযুকতা মেনে নিয়ে পতাকা বাহককে নির্দেশ দিল, পতাকা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ, উত্তোলিত পতাকা শত্রুপক্ষের নিকট তার অবস্থান চিহ্নিত করছিল।

পতাকা গুটিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে থিয়োডুমিরের অবশিষ্ট সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলল। তারা তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল। দেখতে দেখতে গোটা রণাঙ্গন লাশের স্তূপে পরিণত হল। যারা আহত হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তারা কোন রকমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। আবার পরক্ষণেই মাটিতে আছড়ে পড়ছিল। যারা উঠে দাঁড়াতে পারছিল না, তারা হামাগুড়ি দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। আন্দালুসীয়দের আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো সেই ভয়ানক দৃশ্য থেকে উদাসী হয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছিল, আর খড়কুটা কুড়িয়ে খাচ্ছিল।

‘ঘোড়াগুলো ধরে নিয়ে এসো। তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। আর গনিমতের সম্পদ একত্রিত কর।

আন্দালুসিয়ার অভিজ্ঞ জেনারেল থিয়োডুমির রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হল।

***

কয়েকদিন পরের কথা। আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক জেনারেল থিয়োডুমিরের পলায়নের সংবাদ শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। রডারিক সে সময় রাজধানী টলেডোতে ছিল না। সে তখন পাম্পালুনা শহরে অবস্থান করছিল। পাম্পালুনা রাজধানী টলেডো থেকে কয়েক দিনের দূরত্বে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহর। সেখানে জার্মান বংশোদ্ভূত কিছু লোক বসবাস করত। তারা স্থানীয় লোকদের উপর প্রভাব বিস্তার করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, ফলে সেখানকার পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিল।

রডারিক বিলাসপ্রবণ ও চরিত্রহীন হলেও যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের জন্য ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। শক্তিধর শত্রুর উপরও সে বজ্রের ন্যায় হুঙ্কার ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তার শাহী গাম্ভির্য বিনষ্ট হয় এমন কোন আচরণ সে বরদাস্ত করতে পারত না। বিদ্রোহীদের জন্য সে ছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। পাম্পালুনায় বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে কোন জেনারেলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ না দিয়ে সে নিজেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল।

বিদ্রোহীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ঠিকই, কিন্তু রডারিকের বিক্রম আর প্রতাপের সামনে তারা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ল। যুদ্ধে পরাজিত একজন বিদ্রোহীকেও রডারিক প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে দিল না।

বিদ্রোহীদের লিডারকে গ্রেফতার করা হল। সে আন্দালুসিয়ার অধিবাসী ছিল না। তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথীকেও গ্রেফতার করা হল। গ্রেফতারের পর তাদের উপর যে গজব নেমে এসেছিল, তা থেকে তাদের ঘরের নারীরাও বাঁচতে পারেনি। বন্দী বিদ্রোহীদের উপর এমন নির্মম নির্যাতন চালানো হতো যে, তাদের বেঁচে থাকার কোন আশা করা যেতো না। কিন্তু তাদেরকে মরতেও দেওয়া হতো না।

রডারিক তাদেরকে নির্যাতন করে আধমরা করে রাখত। বিদ্রোহীরা যখন রডারিকের অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেহুঁশ হয়ে পড়ত তখন তাদেরকে এক উন্মুক্ত প্রান্তরে নিক্ষেপ করা হতো। তার পর শহরের অধিবাসীদের সেখানে একত্রিত করে একজন ঘোষকের মাধ্যমে ঘোষণা করা হতো,

এরা রাষ্ট্রদ্রোহী, এরা গাদ্দার, আন্দালুসিয়ার মহামান্য বাদশাহর শৌর্য-বীর্য সম্পর্কে এরা অবগত ছিল না। প্রতিদিন এসে এদের করুণ পরিণতি দেখে যেয়ো। এদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এরা রাষ্ট্রদ্রোহী এরা গাদ্দার …।

এসকল বিদ্রোহীদের স্ত্রী-কন্যাদের সাথে অত্যন্ত লজ্জাজনক আচরণ করা হতো। রাতের অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে এ সকল নারীদেরকে উলঙ্গ করে রডারিকের সাধারণ মজলিসে নাচতে বাধ্য করা হতো। সামান্য অবাধ্য হলে তাদেরকে চাবুকের আঘাত সহ্য করতে হতো।

রডারিক স্বয়ং সেই মজলিসে উপস্থিত থাকত। সেখানে সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও সেনা অফিসাররাও উপস্থিত থাকত। এ সকল লোকেরা নির্যাতিতা মহিলাদের সাথে অশোভন আচরণ করত, আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত। অবশেষে মদ খেয়ে উন্মাদ হয়ে সকল অফিসারই একজন করে মহিলাকে ধরে নিয়ে যেতো।

ঐতিহাসিক ওয়েলম্যাকার ‘উসতোরিয়া নামক এক অল্প বয়স্কা বালিকার ঘটনা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি লেখেছেন,

‘উসতোরিয়ার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনের হবে। সে ছিল বিদ্রোহীদের সরদারের কন্যা। এই অল্প বয়স্কা বালিকাকে রডারিক নিজের জন্য রেখে দিয়েছিল। সে তার সাথে এমন পাশবিক আচরণ করত যে, বনের পশুরাও লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিত। পাম্পালুনার যে স্থানটিতে সে ছাউনি গেড়ে ছিল সেখান থেকে প্রায়ই সেই অল্প বয়স্কা বালিকার মরণচিত্তার শুনা যেতো।

***

কিছুক্ষণ হয় সূর্য অস্ত গেছে। রাতের অন্ধকার অতিদ্রুত যুদ্ধ বিধ্বস্ত পালুনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। রোজকার মতো আজও সাধারণ মজলিসের আয়োজন জমকালোরূপ ধারণ করছিল। বিদ্রোহীদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় নাচতে বাধ্য করা হচ্ছিল। অল্প বয়স্কা উসতোরিয়াকে রডারিক তার কোলে বসিয়ে রেখেছিল। উপস্থিত সকলের হাতেই ছিল পানপাত্র। দাস-দাসীরা সূরাহী হাতে শরাব পরিবেশন করছিল। এমন সময় রডারিককে সংবাদ দেওয়া হল, টলেডো থেকে থিয়োডুমিরের বার্তাবাহক এসেছে। সে এখনই রডারিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়।

রডারিকের ইঙ্গিতে বার্তাবাহককে তার সামনে এনে দাঁড় করানো হল। বার্তাবাহক লিখিত ফরমান তার নিকট সোপর্দ করল। সে তার এক সভাসদকে বলল, বার্তাটি পড়ে শুনানোর জন্য। আর অন্যদের লক্ষ্য করে সে তালি বাজাল। সাথে সাথে সেখানে এমন পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল যে, মনে হল সেখানে কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই।

সভাসদ বার্তাটি পড়তে লাগল, ‘আন্দালুসিয়ার মহামান্য শাহানশাহের দরবারে শত সহস্র ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, মহানুভবের এই অধম গোলাম আজীবন শাহীখান্দানের মান-মর্যাদা ও রাজত্বের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। এই অধম সকল যুদ্ধেই বিজয়ের মালা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সভাসদ কিছুটা উচ্চ আওয়াজে বার্তাটি পড়ে শুনাচ্ছিল।

‘যেখানেই বিদ্রোহীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, শাহীখান্দানের এই আজ্ঞাবাহী গোলাম সেখানেই মৃত্যুদূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সে বিদ্রোহীদেরকে জীবনের পরপারে পৌঁছে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়েছে। অতিবড় নিন্দুকও বলতে পারবে না যে, থিয়োডুমির কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তারা হয়তো কোন জিন-ভূত হবে। তারা আমার অর্ধেক সৈন্যকে হত্যা করেছে, আর বাকি অর্ধেক তাদের ভয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

‘তুমি ঠিক পড়ছ তো? রডারিক তার কোলে বসিয়ে রাখা মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো। অর্ধেক সৈন্য নিহত হয়েছে, আর অন্যরা পালিয়ে গেছে, কী আবোল-তাবোল পড়ছ? তারা জিন-ভূত ছিল! ভালো করে পড়।’

সভাসদ পুনরায় পড়তে শুরু করল,

‘তারা চারটি বিশাল আকৃতির রণতরীতে করে এসেছিল। সমুদ্রসৈকতে অবতরণ করামাত্রই তারা সেগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ আমাকে সংবাদ দেওয়া হয়। আমি আমার সকল সৈন্য নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। শত্রুবাহিনীর সংখ্যা আমার বাহিনীর অর্ধেক ছিল। সংখ্যাধিক্যের কথা বিবেচনা করলে আমার সৈন্যদের উচিত ছিল, তাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা। কিন্তু তারা এমন সুশৃঙ্খলভাবে লড়াই করছিল যে, আমার সৈন্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

তারা গাছের আড়াল থেকে, পাথরের আড়াল থেকে অনরবত তীর নিক্ষেপ করে চলছিল। তাদের একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল না। তাদের একজন অশ্বারোহী দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না; কিন্তু হঠাৎ পিছন দিক থেকে তাদের অশ্বারোহীরা আমার বাহিনীর উপর আক্রমণ করে বসে। তারা আমাদের উপর এমন চূড়ান্ত আঘাত হানে যে, আমরা তাদের আঘাত প্রতিহত করে পিছু হটে আসার মতো কোন অবকাশই পাইনি।’

বিয়োডুমির তার এই পত্রে পরাজয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার পর এমন একটি তথ্য উল্লেখ করে, যা আজও ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত হয়ে আছে। সে লেখেছে :

‘এটা জানা সম্ভব হয়নি যে, এরা কারা? আর কোথা থেকেই বা এসেছে? তারা যেই হোক, আর যেখান থেকেই আসুক, বাস্তব সত্য হল, তারা অত্যন্ত রক্তপিপাসু ও ভয়ঙ্কর এক জাতি। হতে পারে তারা দস্যুবাহিনী, লুটতরাজ করাই তাদের কাজ। লুটতরাজ শেষে হয়তো তারা তাদের রাজ্যে ফিরে যাবে; কিন্তু এখানেই তাদেরকে নিঃশেষ করে দেওয়া উচিত। আমার সৈন্যসংখ্যা তাদের দ্বিগুণ ছিল। এখন আমার আরো বেশি সৈন্যের প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, আমাদের করদ-রাজা সিউটার জুলিয়ান, আর অর্টিজার ভাই আউপাসও এই অদ্ভুত বাহিনীর সাথে আছে।

‘জুলিয়ান! রডারিক অবাক হয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বলল। উপাস! মৃত্যু তাদেরকে এখানে টেনে এনেছে। আমি বুঝতে পেরেছি।

রডারিক রাগে-গোসায় লম্বা লম্বা পা ফেলে কামরার এক কোণ থেকে আরেক কোণে পায়চারী শুরু করল।

‘থিয়োডুমির কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে। রডারিক দাঁত কিড়মিড় করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। আক্রমণকারী কারা–এটা দেখার মতো হুঁশও তার ছিল না। জুলিয়ান আর আউপাস আমার থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এসেছে। তাদের নিজস্ব বাহিনীর সাথে তারা বার্বারদেরকেও হয়তো নিয়ে এসেছে। থিয়োড়িমিরের সাহায্যে সেখানে আমি আর কোন সৈন্য পাঠাব না। আমি নিজেই ওখানে যাব। জুলিয়ানের মেয়ে ফ্লোরিডারকে আমার মহলে নিয়ে আসব। এসব বদনসিবদের জানা নেই, আমি গাদ্দারীর কী শাস্তি দিয়ে থাকি?’

রডারিক হঠাৎ নীরব হয়ে বিদ্রোহীদের উলঙ্গ স্ত্রী-কন্যাদের দিকে ফিরে তাকাল। তারপর কঠিনম্বরে নির্দেশ দিল, ভোর হওয়ার সাথে সাথে এ সকল বিদ্রোহীদেরকে ময়দানে জড়ো করে তাদের উপর ঘোড়া ছুটিয়ে দাও। ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে এদেরকে মেরে ফেল। আর মেয়েদেরকে এখানকার গির্জার পাদ্রির নিকট সোপর্দ কর।’

রডারিকের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে সকল মেয়েরা আহাজারী শুরু করে দিল। দুই-তিনজন রডারিকের পা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল। আপনি আমাদেরকে অনেক শাস্তি দিয়েছেন। এবারের জন্য আমাদেরকে মাফ করেদিন।’

‘বাদশাহ সালামত। আমার বাবার অপরাধের শাস্তি আমাকে কেন দিচ্ছেন? একটি যুবতী মেয়ে মিনতিভরা কণ্ঠে বলল। আমার বাবার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি তো কিছুই জানতাম না। আমাকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে মেরে ফেলুন, তবুও আমাকে পাদ্রিদের হাতে সোপর্দ করবেন না।’

আরেকটি মেয়ে বলল, ‘আমার ভাইকে ছেড়ে দাও, তার পরিবর্তে আমাকে মেরে ফেলো।

রডারিক সকলকে লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দিল।

‘আন্দালুসিয়ার বাদশাহ! আমাদের উপর আরও বেশি করে জুলুম কর।’ অল্প বয়স্কা উসতোরিয়া চিৎকার করে বলল। তোমার পাপের বোঝা আরো রি করে নাও। আমাদের লোকদের উপর ঘোড়া ছুটিয়ে দাও। তোমার যা ইচ্ছা তুমি তাই করে নাও। তবে এক অসহায় মেয়ের আর্তনাদ শুনে রাখো, তোমার এই বাদশাহীর উপরও একদিন ঘোড়া দৌড়ানো হবে। তোমার নাম-নিশানাও সেদিন অবশিষ্ট থাকবে না। তোমার আর তোমার বাদশাহীর দিন শেষ হয়ে এসেছে।

‘সাব্বাস!’ রডারিক অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল। আমি তোমার সাহসিকতার প্রশংসা করছি। তুমি এক বিশাল সাম্রাজ্যের বাদশাহকে ভয় পাওনি। কাছে এসো মেয়ে! আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।’

মেয়েটি রডারিকের সামনে এসে দাঁড়ালো।

‘লোকদের দিকে মুখ ফিরাও। রডারিক বলল। সকলেই দেখুক, এই মেয়ে কতটা সাহসী?

মেয়েটি রডারিকের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালো। রডারিকের সভাসদবর্গ তাকে দেখতে পাচ্ছিল। রডারিকের তরবারী তার শাহীকুরসির পাশেই রাখা ছিল। সে হঠাৎ তরবারী কোষমুক্ত করে পিছন দিক থেকে এক আঘাতে মেয়েটির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।

মুণ্ডহীন দেহটি কিছুক্ষণ ছটফট করতে থাকল। তার পর চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পরদিন সকালে বিদ্রোহীদেরকে ময়দানে এনে একত্রিত করা হল। তাদের বিপরীত দিকে পঞ্চাশ-ষাটজন ঘোড়সওয়ার দাঁড়িয়ে ছিল। ইঙ্গিত পাওয়ার সাথে সাথে অশ্বারোহীরা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। বিদ্রোহীরা আত্মরক্ষার জন্য এদিক-সেদিক দৌড়াতে লাগল। অশ্বারোহীরাও তাদের পিছু নিয়ে ঘোড়ার গতি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাদেরকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে হত্যা করে ফেলল।

***

উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ান। মিসরের আমির মুসা বিন নুসাইর তাঁর পরিষদবর্গকে নিয়ে কায়রোয়ানে এক জরুরি মিটিংয়ে বসেছেন। তিনি তারিক বিন যিয়াদের পয়গাম পাঠ করে তাদেরকে শুনাচ্ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদ প্রথম যুদ্ধ জয়ের কথা উল্লেখ করে লেখেছেন :

‘আল-হামদুলিল্লাহ্! আমরা আমাদের চেয়েও দ্বিগুণ সৈন্যবাহিনীর উপর প্রথম যুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের তিনশ অশ্বারোহীর মোকাবেলায় তাদের এক হাজার অশ্বারোহী ছিল। আন্দালুসিয়ার প্রতিটি সৈন্যের মাথায় লৌহনির্মিত শিরস্ত্রান ছিল। তাদের অস্ত্রসস্ত্র আমাদের হাতিয়ারের তুলনায় অনেক উন্নত ছিল। আল্লাহ তাআলার প্রত্যক্ষ মদদে আমরা বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছি।

আমি তীরন্দাজ বাহিনীকে গাছগাছালি ও পাহাড়ের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকার নির্দেশ দেই। আর অশ্বারোহীদেরকে পাহাড়ী টিলার পিছনে পালিয়ে থাকতে বলি। অতঃপর পশ্চাৎপসারণের ছলে শক্র বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিয়ে তাদেরকে মরণফাঁদের দিকে টেনে নিয়ে আসি। তারা আমাদের ফাঁদে পা দেওয়ার সাথে সাথে আমাদের তীরন্দাজ বাহিনী তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু করে দেয়। তীরন্দাজ বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতায় শত্রুবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

এমন সময় ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’র মতো আমাদের আত্মগোপন করে থাকা অশ্বারোহী বাহিনী পিছন দিক থেকে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনি সুপরিকল্পিত আক্রমণের ফলে সাত হাজার মৰ্দেমুজাহিদ পনের হাজার কাফেরের উপর বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়।

রণাঙ্গনের যে বিজয়-দৃশ্য আমি দেখেছি, সম্মানিত আমীর সে দৃশ্য দেখলে আপনি আনন্দিত হতেন। খলীফাতুল মুসলিমীন ওলিদ বিন আবদুল মালেক সে দৃশ্য দেখলে অভিভূত হতেন। শত্রু পক্ষের এতো অধিক সংখ্যক যোদ্ধা মারা পড়েছে যে, তাদের লাশ গুনে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। যুদ্ধবন্দীরা সেসব লাশ উঠিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করছে। খানা-খন্দকগুলো লাশে পরিপূর্ণ করে তার উপর মাটি ফেলে সমতল করা হয়েছে। তারপরও লাশের সংখ্যা কমছে না। চতুর্দিকে শুধু লাশ আর লাশ। যুদ্ধলব্ধ ছয়শত ঘোড়া আমাদের হস্তগত হয়েছে। নিহত শত্রু সেনাদের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসস্ত্রও আমরা জমা করেছি।

এখন সামরিক সাহায্যই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমার নিকট সংবাদ পৌঁছেছে যে, আন্দালুসিয়ার সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশি। সামনের প্রতিটি শহরই দুৰ্গসদৃশ। আমি সামনে অগ্রসর হচ্ছি, তবে সেনা-সাহায্যের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সফলতার জন্য দুআ করবেন। আমরা যদি পরাজিত হই তাহলে আর ফিরে আসব না। কেননা, ফিরে আসার কোন উপায়ই আমাদের নিকট অবশিষ্ট নেই। যে চারটি রণতরীতে আরোহণ করে আমরা এসেছিলাম, সেগুলো আমি আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি।’

‘সাব্বাস! মুসা বিন নুসাইর অবচেতন মনে বলে উঠলেন। এই ব্যক্তিকে কোন শক্তিই পরাস্ত করতে পারবে না।’

মুসা বিন নুসাইর তৎক্ষণাৎ খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেকের উদ্দেশ্যে একটি পয়গাম লেখান, তাতে তিনি তারিক বিন যিয়াদের প্রথম সফলতার পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন এবং সেনাসাহায্য পাঠানোর অনুরোধ করেন।

.

***

পাম্পালুনায় রডারিকের নির্দেশে ঘোষণা করা হল যে, আন্দালুসিয়ায় একটি ভিনজাতি অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এতটাই হিংস্র ও রক্তপিপাসু যে, তারা তাদের থেকে দ্বিগুণ সৈন্যবাহিনীকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে।

রডারিক স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে বহিঃশত্রু সম্পর্কে ভীতি ছড়ানোর নির্দেশ দেয়। সে জনসাধারণকে এই বলে সতর্ক করে দিতে বলে যে; এই লুটেরা বাহিনী তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের কন্যা সন্তানদেরকে নিয়ে যাবে। আর তোমাদেরকে হত্যা করে তোমাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেবে।’

নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে সরকারি বার্তাবাহকরা গ্রাম-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে সর্বত্র এই সংবাদ পৌঁছে দিতে লাগল। রাজধানী টলেডোতেও এই সংবাদ এসে পৌঁছল। প্রত্যেক গির্জায়, প্রতিটি জনসমাগম স্থলে এবং সকল চায়ের আসরে এই একই বার্তা ঘোষিত হতে লাগল।

‘হে লোক সকল! অজানা এক রাজ্য থেকে লুণ্ঠনকারী ও হত্যাকারীদের বিশাল এক বাহিনী আমাদের রাজ্যে অনুপ্রবেশ করেছে। তারা আমাদের এক বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছে। প্রলয়ঙ্করি ঝড়ের ন্যায় তারা সম্মুখ দিকে অগ্রসর হয়ে চলছে। তারা জবরদস্তি ঘরে প্রবেশ করে স্বর্ণ-অলঙ্কার-টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিচ্ছে। যুবতী মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। হত্যা ও লুণ্ঠনের পর ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। উপাসনালয় ধ্বংস করে ফেলছে। তারা এতটাই নিষ্ঠুর যে, নিষ্পাপ শিশুদেরকে বর্ষাবিদ্ধ করে উদ্দাম নৃত্য করে, আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।’

আন্দালুসিয়ার মহামান্য বাদশাহ এই ভয়ঙ্কর বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধে রওনা হয়েছেন। বাদশাহ রডারিক বলেছেন, যে ব্যক্তি তীর ও বর্ষা নিক্ষেপ করতে পারে এবং তরবারী চালাতে পারে, সে যেন সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করে। যে সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করবে তাকে বেতন-ভাতা দেওয়া হবে। তাকে লুটেরাদের থেকে উদ্ধারকৃত সম্পদের অংশীদার করা হবে। সবচেয়ে বড় পাওনা হল, আমাদের জান-মাল ও ঘর-বাড়ি নিরাপদ থাকবে এবং আমাদের স্ত্রী-কন্যাদের সতীত্ব সংরক্ষিত হবে।

হে লোক সকল! তোমরা প্রস্তুত হয়ে যাও, অস্ত্র ধর, তোমাদের ধন-সম্পদ লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা কর। আর যদি তোমরা এজন্য প্রস্তুত না হও তাহলে আজই বাল-বাচ্চা নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাও। দুর্বল পশুর ন্যায় পালিয়ে পালিয়ে দিন অতিবাহিত কর। পরে যখন ফিরে আসবে তখন তোমাদের ঘর-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

যুবক শ্রেণী ও মধ্যবয়স্ক পুরুষরা ভিনদেশী শত্রুদের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। তাদেরকে বলা হল, বাদশাহ রডারিক পাম্পালুনা থেকে অমুক রাস্তা দিয়ে টলেডো যাচ্ছেন। সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক লোকেরা যেন সেই রাস্তায় বাদশাহর আগমনের অপেক্ষা করে।

***

কোন কোন উপাসনালয় থেকে এ জাতীয় কোন ঘোষণাই প্রচার করা হল। এগুলো ছিল ইহুদিদের উপাসনালয়। এ সকল উপাসনালয়ের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। আন্দালুসিয়ায় ইহুদিরা ছিল সবচেয়ে নির্যাতিত। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কারিগরি বিদ্যায় ইহুদিদের একচেটিয়া প্রভাব ছিল। কিন্তু কোন অর্থ-সম্পদ তাদের ছিল না। তাদের থেকে এত বেশি টেক্স ও রাজস্য আদায় করা হতো যে, পেট ভরে খাওয়ার জন্য তাদের নিকট খুব সামান্য উপার্জনই অবশিষ্ট থাকত। আন্দালুসিয়ায় ইহুদিদেরকে অশ্বাস্য মনে করা হতো।

অর্টিজা যখন আন্দালুসিয়ার বাদশাহ ছিলেন তখন ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সমান মর্যাদার অধিকারী ছিল। তিনি ইহুদিদের টেক্স কমিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তার এক আদেশের মাধ্যমে এই কালো আইনও নিষিদ্ধ করে দেন যে, জবরদস্তি ইহুদি সুন্দরী মেয়েদেরকে গির্জায় সোপর্দ করা যাবে। শুধু ইহুদিদের জন্যই নয়, বরং জনসাধারণের জন্যও অর্টিজা জীবন যাপনের মান অনেক উন্নত করেছিলেন।

অর্টিজার এই সংস্কারনীতি ও জনসাধারণের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভূতিই তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও পাদ্রিদের সহায়তায় রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সে আন্দালুসিয়ার সিংহাসন দখল করে বাদশাহ বনে বসে। রডারিক বাদশাহ হওয়ার সাথে সাথে অর্টিজাকে হত্যার নির্দেশ দেয়।

ভিনদেশী শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ফলে যখন প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় ঘোষণা করা হচ্ছিল, ভিনদেশী হানাদার বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান করুন তখন ইহুদি উপাসনালয়গুলোতে ভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা চলছিল। একদিন ইহুদিদের পাঁচ-ছয়জন ধর্মগুরু এক উপাসনালয়ে একত্রিত হয়ে ভাবতে লাগল, কীভাবে ইহুদিদেরকে সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যায়। তারা যে কোন মূল্যে রডারিককে সহায়তা করা থেকে বিরত থাকতে চাচ্ছিল।

‘রডারিকের বাহিনীতে শামিল হওয়াই প্রধান সমস্যা নয়। ইহুদিদের এক ধর্মগুরু বললেন। বরং এ ব্যাপারে চিন্তা করা উচিত যে, কীভাবে আমরা রডারিকের ক্ষতিসাধন করতে পারি।’

‘সেনাবাহিনীতে তো পূর্ব থেকেই ইহুদি সৈন্য রয়েছে। অন্য জন বললেন। ‘তাদেরকে সেনাবাহিনী থেকে কীভাবে বের করা যায়–এ ব্যাপারে চিন্তা করা হোক।

‘আমি ভিন্ন কিছু চিন্তা করছি।’ আরেকজন বলল। ইহুদি সৈনিকদেরকে সেনাবাহিনীতেই থাকতে দেওয়া হোক এবং তাদেরকে রডারিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হোক।

‘এটা কি জানা গিয়েছে যে, আক্রমণকারী কারা? ধর্মগুরুদের মধ্যে অন্য আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন।

‘এটা এখনও কেউ বলতে পারছে না। তাদের একজন উত্তর দিলেন।

প্রশ্নকারী পুনরায় বললেন, ‘আক্রমণকারীদের পরিচয় জানা গেলে আমি তাদের সাথে মিলে বড় সুন্দর একটা নীলনকশা তৈরি করতে পারতাম।

ইহুদি মস্তিষ্ক ষড়যন্ত্র পাকানোর জন্য অতি উর্বর ক্ষেত্র। পর্দার অন্তরালে থেকে আঘাত হানতে তারা এতটাই পারঙ্গম যে, অন্য কোন সম্প্রদায়ের পক্ষে সেই পারঙ্গমতা প্রদর্শন করা একেবারেই অসম্ভব।

সমবেত এই ধর্মগুরুগণ–যাদেরকে রব্বানী বলা হতো–এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রত্যেক ইহুদির ঘরে এই সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হবে, যেন কোন ইহুদি রডারিকের বাহিনীতে যোগদান না করে।

এই সিন্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা নিয়ে সেদিনের মতো ধর্মগুরুদের পরামর্শসভা মুলতবি ঘোষণা করা হল।

***

মেরিনা এক মধ্যবয়সী নারী। তার যৌবনে ভাটার টান ধরেছে, কিন্তু তার লম্বা শারীরিক গঠন আর অতুলনীয় দেহ-সৌষ্ঠব অনেক নারীর জন্য ঈর্ষার কারণ ছিল। তার চেহারার আকর্ষণীয় রূপ-লাবন্যের মাঝে তখনও এমন জাদুকরী প্রভাব ছিল যে, তার চোখের রহস্যময় চাহনি যে কোন পুরুষের মন কেড়ে নিতো।

মেরিনা কোন সাধারণ মেয়ে মানুষ নয়। সে শাহীমহলের একজন বেগম হিসেবে পরিগণিত হতো। সে রডারিকের স্ত্রী ছিল না, ছিল রক্ষিতা। সেই ছিল একমাত্র রক্ষিতা, যে মধ্যবয়স্কা হওয়া সত্ত্বেও শাহীমহলেই অবস্থান করত।

শাহীমহলের যে সকল রক্ষিতার বয়স ত্রিশ বছরের নিকটবর্তী হতে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হতো অথবা কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হতো।

মেরিনা ছিল ইহুদি। অন্যান্য ইহুদিদের মতো তার মস্তিষ্কও ছিল ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। সে ছিল অতুলনীয় রূপের অধিকারিনী, আর তীক্ষ্ণ মেধা ও সূক্ষ্ম বিবেক-বুদ্ধির মালিক। এ কারণে শাহীমহলে সে এক বিশেষ সম্মানের অধিকারিনী ছিল। রানী না হয়েও সে রাজরানীর মতো সম্মানের পাত্রী ছিল। সে তার চোখের চাহনি, আর ঠোঁটের দুই হাসিতে রডারিককে তার অনুরাগী করে রেখেছিল।

টলেডোর শাহীমহল থেকে এক-দেড় মাইল দূরে একটি ঝিল ছিল। সেই ঝিলের চতুর্দিকে ছিল ঘন বৃক্ষরাজি। ঝিলের এক পার্শ্বে সজুজ পত্র-গুলো আচ্ছাদিত একটি টিলাও আছে। কোন পুরুষের এই ঝিলের নিকটবর্তী হওয়ার অনুমতি ছিল না। এটি শাহীমহলের প্রমোদবালাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। সাঁঝের বেলায় তারা সেখানে জলকেলি খেলতে ও নৃত্য-গীত করতো।

একদিন সাঁঝের বেলা। তখনও সূৰ্য্য অস্ত যায়নি। পঁচিশ-ত্রিশজন অপরূপ রূপসী রমণী ঝিলের মধ্যে জলকেলি খেলছিল, আর হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের শরীরে গড়িয়ে পড়ছিল। তাদের মধ্যে যুবতী মেয়েও আছে, মধ্যবয়স্ক নারীও আছে। এটাই হল এখানকার সাধারণ চিত্র। এ সকল রমণীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল মেরিনার উপর। সেই সন্ধ্যায় মেরিনাও সেখানে উপস্থিত ছিল।

ঝিল থেকে সামান্য দূরে ঘন বৃক্ষরাজির আড়ালে রমণীদের ঘোড়াগাড়ি রাখা আছে। কোচোয়ানদের সকলেই পুরুষ। একজন কোচোয়ান দেখতে পেল বাগানবাড়ির সীমানায় একজন অপরিচিত লোক প্রবেশ করেছে। কোচোয়ান তাকে ইঙ্গিতে সামনে অগ্রসর হতে নিষেধ করল। কিন্তু লোকটি বাধা উপেক্ষা করে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। কোচোয়ান তাকে বাধা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। সে রাস্তা পরিবর্তন করে ঝিলের দিকে তার গতি বাড়িয়ে দিল। কোচোয়ান তার নিকট পৌঁছার আগেই সে ঝিলের নিকট পৌঁছে গেল। কোচোয়ান দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।

আগন্তুক তার মুখমণ্ডল চাদর দ্বারা ঢেকে রেখেছিল। শুধু চোখ দেখা যাচ্ছিল। সে চটের দ্বারা তৈরি লম্বা জুব্বা পরে ছিল। কোচোয়নি তাকে ধরার সাথে সাথে সে চিৎকার করতে শুরু করল। অদূরে জলকেলিরত রমণীদের কানে চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছলেও তারা সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ করল না। তারা আনন্দ-ফুর্তি আর উচ্ছলতায় বিভোর হয়ে রইল।

মেরিনার দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হল। সে কাপড় পাল্টিয়ে আওয়াজ লক্ষ্য করে অগ্রসর হল। অগ্রসর হয়ে সে দেখতে পেল, কয়েকজন কোচোয়ান পাগল মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সে ব্যক্তি অদ্ভুতভাবে চিৎকার করছে।

মেরিনাকে দেখতে পেয়ে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর ঐ তো রানী এসে গেছে বলে সজোরে কোচোয়ানদেরকে ধাক্কা মেরে মেরিনার দিকে দৌড়ে গেল। কোচোয়ানরা তার পিছনে দৌড় লাগাল। সে অতি দ্রুতগতিতে মেরিনার নিকট পৌঁছে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। মেরিনা দু-এক পা পিছে সরে এলো।

‘মেরিনা!’ আগন্তুক মাথা উঠিয়ে বলল। আমি আউপাস, তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি।’

ইতিমধ্যে কোচোয়ানরা সেখানে পৌঁছে গেল। তারা তাকে টেনেহেঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল।

থামো, মেরিনা কোচোয়ানদেরকে লক্ষ্য করে বলল। বেচারা পাগল মানুষ, কারো কোন ক্ষতি করবে না; তোমরা চলে যাও।’

‘আমি পাগল নই, রানী! আউপাস করুণ কণ্ঠে বলল। আমি মাজলুম, ফরিয়াদি হয়ে আপনার নিকট এসেছি।’

***

রডারিক যখন বিদ্রোহের মাধ্যমে বাদশাহ অর্টিজাকে সিংহাসনচ্যুত করে হত্যা করে তখন অর্টিজার ভাই আউপাসের বয়স ছিল সতের বা আঠার। আর মেরিনার বয়স ছিল ষোল।

মেরিনা এক ইহুদি ব্যবসায়ীর মেয়ে। আউপাস তাকে এক পলকের জন্য দেখেই তার হৃদয়-মন্দিরে ঠাই দিয়েছিল। কিন্তু মেরিনা নিজেকে আউপাসের যোগ্য মনে করত না। সে তার ভালোবাসা গ্রহণ করতে ভয় পেতো। তাই সে একদিন আউপসিকে বলেছিল,

‘ক্ষণিকের এই মোহকে ভালোবাসা বলছ কেন? আমি এক ইহুদি কন্যা, তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত শাহীখান্দানের সুলোপ দৃষ্টি থেকে কীভাবে বেঁচে আছি–তা আমি নিজেও জানি না। তুমি তোমার গোলামদেরকে হুকুম করলেই তো পার। তারা আমাকে জবরদস্তি তোমার স্বপ্নপুরিতে পৌঁছে দেবে। তুমি রাজপুত্র, তুমি বর্তমান বাদশাহর ভাই; ভবিষ্যৎ বাদশাহ। তোমাকে বাঁধা দেয়–এমন ক্ষমতা কার আছে?

‘কেন, তুমি কি জান না? শাহীখান্দানের লুলোপ দৃষ্টি থেকে তুমি কেন এখনও বেঁচে আছ?’ আউস বলল। “তোমার কি জানা নেই, আমার ভাই সিংহাসনে আরোহণ করার পরই এ নির্দেশ জারি করেছেন যে, ইহুদি কোন কন্যাকে জবরদস্তি কোন গির্জায় বা শাহীখান্দানের কোন সদস্যের গৃহে অর্পণ করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ নির্দেশ অমান্যকারীদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।

আমি তোমাকে এ জন্য শাহীমহলে নিয়ে যাব না যে, আমি বাদশাহর ভাই, আর তুমি একজন সাধারণ ইহুদির কন্যা। আমি সেদিনই তোমাকে শাহীমহলে নিয়ে যাব যেদিন আমি তোমাকে পবিত্র গির্জায় নিয়ে গিয়ে বিবাহ করতে পারব। মেরিনা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। যত দিন আমার এ স্বপ্ন পূরণ না হবে তত দিন শাহীমহলের বাহিরে আমি তোমার সাথে সাক্ষাৎ করব।’

মেরিনার হৃদয়েও আউপাসের জন্য ভালোবাসা জন্মেছিল। এর পর থেকে তারা দুজন শাহীমহলের বাহিরে দেখা-সাক্ষাৎ করতো। একদিন আউপাসের ভাই বাদশাহ অর্টিজা তাদের এ দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে জানতে পারলেন। তিনি আউপাসকে ডেকে বললেন,

‘তোমার কি এতটুকু অনুভূতিও নেই যে, তুমি শাহীখান্দানের একজন সদস্য? কে সেই মেয়ে, যার সাথে তুমি প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ কর।

সে এক ইহুদির মেয়ে। আউপাস বিনীত স্বরে বলল। আমাদের এ সম্পর্ক দৈহিক নয়। আমি যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করি তখন আমি নিজেকে বাদশাহর ভাই মনে করি না।’

‘না, তুমি কেবল সেই মেয়ের সাথেই মেলামেশা করবে, যার সাথে আমরা তোমাকে বিবাহ দেব বলে স্থির করেছি।’ অর্টিজা বললেন। আর তুমি ভালোভাবেই জান, আমরা কার সাথে তোমার বিবাহ ঠিক করেছি।’

‘যে মেয়ের সাথে আপনারা আমার বিবাহ ঠিক করেছেন, আমি সেই মেয়ের সাথে মেলামেশা করব না। আউপাস বিনীত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলল। আমি সেই ইহুদি মেয়েকেই বিবাহ করব।’

‘তা হলে তুমি এই শাহীমুকুট, আর এই শাহীসিংহাসন থেকে বঞ্চিত হবে। অর্টিজা ক্রুদ্ধস্বরে বললেন। তুমি হয়তো ভুলে গেছ, আমার পর তুমিই হবে এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তোমার রানী হবে গোথ বংশীয়া। সে কোন ইহুদি-কন্যা হতে পারবে না।’

‘আমি রাজমুকুট ও রাজসিংহাসনের দাবি পরিত্যাগ করব।’ আউপাস অবিচল কণ্ঠে বলল। ‘তবুও আমি মেরিনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।’

অর্টিজা হলেন বড় ভাই। তিনি বাদশাহও ছিলেন। তাই বংশীয় মান-মর্যাদা ও শাহীদরবারের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা বিবেচনা করে তিনি আউপাসকে নির্দেশ দিলেন, আইপাস যেন মেরিনার সাথে মেলামেশা না করে। তার নির্দেশ অমান্য করে সে যদি মেরিনার সাথে মেলামেশা করে তাহলে তাকে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখা হবে। কিন্তু আউলাস বড় ভাইয়ের হুমকির কোন পরোয়া না করে সে তার শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল। সে বলল, ‘আমি মেরিনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।

এ ঘটনার কয়েকদিন পর আউপাসের সাথে মেরিনার সাক্ষাৎ হলে মেরিনা আউপাসকে বলল, ‘শহীদরবারের এক লোক বাবাকে বলেছে, বাবা যেন আমাকে শাহীখান্দানের কোন ব্যক্তির সাথে দেখা করতে না দেয়। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে যেন বিয়ে দেওয়া হয়।

অর্টিজা ছিলেন বাদশাহ। সামান্য এক ইহুদি-কন্যা তার শাহী সম্ভ্রমবোধে আঘাত হানবে–এমন মেয়েকে শেষ করে দেওয়া তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু অর্টিজা ছিলেন এক মহানুভব বাদশাহ। সকল মানুষই তার নিকট সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি তার স্বভাব-বিরুদ্ধ কোন পদক্ষেপ নেওয়া পছন্দ কতেন না।

বাদশাহর নির্দেশমতো মেরিনার বাবা তাকে গৃহবন্দী করে রাখল। কিন্তু আউপাসকে বাধা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আউপাস রাতের অন্ধকারে মেরিনার সাথে দেখা করার জন্য চলে আসতো। মেরিনার বাবা তাড়াহুড়া করে এক জায়গায় মেরিনার বিবাহ ঠিক করে। কিন্তু মেরিনা অন্য কোথাও বিয়ে বসতে অস্বীকার করে।

বাদশাহ অর্টিজা তাঁর ভাই ও মেরিনার সব খবরই রাখতেন। তিনি তাঁর স্বভাবসূলভ উদারতার কারণে মেরিনার ব্যাপারে কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি মেরিনার বাবার ব্যাপারেও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি তার ভাই আউপাসকে অনেক কঠিন শাস্তি দেন। তারপরও আউপাস মেরিনাকে ভুলে যেতে অস্বীকার করে।

একবার আউপাস ও মেরিনা রাজ্য ছেড়ে পালাতে চেয়েও পালাতে পারেনি। পথিমধ্যেই ধরা পড়ে যায়। সেদিন থেকে অর্টিজা ছোট ভাই আউলাসের উপর নজরদারী আরোপ করেন, যেন সে শাহীমহল থেকে বের হতে না পারে।

আউপাস তার ভাই অর্টিজার জন্য, আর মেরিনা তার বাবার জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের প্রেমকাহিনী গোটা টলেডোতে মশহুর হয়ে পড়ে। এমনিভাবে দুই বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। হটাৎ একদিন শাহীমহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সংবাদ পৌঁছে, সেনাবাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার রডারিক।

অর্টিজা তার রক্ষীবাহিনী ও টলেডোর রিজার্ত বাহিনীকে নিয়ে বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য বের হয়ে পড়েন। তার ধারণা ছিল, তিনি বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে পারবেন। তাদেরকে সমূলে বিনাশ করতে সক্ষম হবেন; কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তার ধারণার চেয়ে ভিন্ন ছিল। তার জানাই ছিল না যে, তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও গির্জাসমূহে এ প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়েছে, তিনি দেশ ও জাতির দুশমন। তিনি অন্য রাজার কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন।

অর্টিজা ছিলেন জনদরদি বাদশাহ। তিনি ইহুদিদেরকে সম্মানজনক জীবন যাপনের অধিকার প্রদান করেছিলেন। এ কারণে রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উযির-নাযির, জাগিরদার ও ধনী শ্রেণীর লোকেরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পাদ্রিরা তার প্রতি একটু বেশিই অসন্তুষ্ট ছিল। কারণ, তারা গির্জায় বসে সুন্দর সুন্দর ইহুদি মেয়েদেরকে ভোগ করতে পারত। অর্টিজা তাদের এই ভোগ-বিলাসের পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

বিত্তশালী ও ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়, ফলে তাঁর পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্টিজার বাদশাহী এমনই এক পরিস্থিতির শিকার হয়ে পড়ে যে, অর্টিজা যে বাহিনী নিয়ে টলেডো থেকে বের হয়েছিলেন, সে বাহিনীকে তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ত মনে করতেন; কিন্তু বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হয়ে তাঁর এই বিশ্বস্ত বাহিনীই তার সাথে প্রতারণা করে বসে। তারা বিদ্রোহীদের সাথে হাত মিলায়। যার ফলে তিনি রডারিকের হাতে বন্দী হয়ে নিহত হন।

অর্টিজার বান্দানের কিছু লোক জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। তারা সমুদ্র পার হয়ে সিউটা গিয়ে পৌঁছে। জুলিয়ান তাদেরকে সেখানে আশ্রয় দেন। জুলিয়ান হলেন অর্টিজার মেয়ের জামাই। অন্যথায় তারা এখানেও কোন আশ্রয় পেতে না। কারণ, জুলিয়ান হলেন আন্দালুসিয়ার একজন সাধারণ করদ-রাজা।

***

প্রায় বিশ বছর পর মেরিনা ও আইপাস একজন আরেকজনকে সামনে থেকে দেখছে। মেরিনার নির্দেশে কোচোয়ানরা যার যার গাড়ির নিকট চলে গেল। মেরিনা আউপাসকে নিয়ে টিলার পিছনে এক নির্জন স্থানে চলে এলো। তাদের কারো পক্ষেই হৃদয়ের আবেগ-উচ্ছ্বাস গোপন রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তাদের চোখে ছলকে উঠা তপ্ত আঁস্ অনেক্ষণ পর্যন্ত তাদের হৃদয়াবেগের ধারাভাষ্য দিচ্ছিল। আবেগের আতিশয্যে তারা পারস্পরকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেরিনাই প্রথমে নীরবতা ভাঙ্গল। সে আউপাসকে জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি কীভাবে জানলে যে, আমি টলেডোতে আছি?

‘আমি তোমার সম্পর্কে সব খবরই রাখি। আউপসি বলল। ‘জুলিয়ানের লোকজন তোমাদের এখানে প্রায়ই আসা-যাওয়া করে। তাদের একজন আমাকে বলেছে, যে মেরিনার জন্য তুমি আপন বড় ভাইকে অসন্তুষ্ট করেছিলে, যার জন্য তুমি রাজমুকুট আর রাজসিংহাসন ত্যাগ করতে চেয়েছিলে, সেই মেরিনা এখন রডারিকের বাগানবাড়ির শুভা বর্ধন করছে। তোমার ব্যাপারে সব খবরই আমার নিকট পৌঁছত।

মেরিনা, এখানে বোধহয় আমাদের বেশিক্ষণ কথা বলা ঠিক হবে না। এতে করে আমাদের উভয়েরই বিপদ হতে পারে।

‘হ্যাঁ, আউপাস! মেরিনা বলল। দ্রুত আমাদের পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত। তোমাকে দেখে মনে হয়, তুমি একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচর। তুমি তো জানই এ সময় আমি ঝিলে অবস্থান করি।’

‘না, মেরিনা, আমি ঠিক গুপ্তচর নই। আউপাস বলল। আমি এ অঞ্চলের একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচরের সন্ধান পেয়েছি। সে সোথ সম্প্রদায়ের লোক। সেই আমাকে বলেছে, তুমি শাহীমহলেই অবস্থান কর। দুই-তিন দিন পর পর চিত্তবিনোদনের জন্য ঝিলে এসে থাক। তোমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গত পরশু থেকে এই বেশে আমি উভ্রান্তের ন্যায় ঘোরাফেরা করছি। আজই আমার গুপ্তচর আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, তুমি মেয়েদের নিয়ে ঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছ।

মেরিনা, প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। আমি কিসের প্রতিশোধ নিতে চাই তুমি তা জান। সেই নরাধম, চরিত্রহীন রডারিক থেকে তোমারও তো প্রতিশোধ নেওয়া উচিত। যৌবনের প্রারম্ভে সে তোমাকে যৌনদাসী বানিয়ে তোমার জিন্দেগী বরবাদ করে দিয়েছে। আমি তো বিয়ে-শাদী করে সংসারী হয়েছি। আমার ছেলেমেয়েও আছে। আর তুমি…, তোমার সকল স্বপ্ন-সাধ সে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।’

‘ঠিকই বলেছ, আউপাস!’ মেরিনা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল। আমাকেও প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি তো তোমার জীবন-সঙ্গিনী হতেই পরিনি, অন্য কারো স্ত্রীও হতে পারিনি। ছেলে-সন্তান নিয়ে সুখের ঘরও বাঁধতে পারিনি; বরং আমি সাক্ষাৎ শয়তানে পরিণত হয়েছি। নিকৃষ্ট স্বভাব-চরিত্র আমার মাঝে জন্ম নিয়েছে। নারীলিন্দু পুরুষদেরকে আমি চোখের ইশারায় নাচিয়ে বেড়াই। শাহীমহলের কর্মচারী-কর্মকর্তা ও রাজ্যের আমীর-উমারাগণ আমাকে মুকুটহীন রানী মনে করে।

‘মেরিনা! কথা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই।’ আউপাস বলল। তোমার ভাবাবেগ আমাকেও স্পর্শ করছে। মেরিনা, মন চায় বিশ বছর পূর্বের সেই না বলা কথাগুলো এখনই বলে নেই। হায়! বিশ বছর পূর্বে ফিরে যাওয়া যদি সম্ভব হতো তাহলে আমি তোমাকে সেই দুঃস্বপ্নের কথা শুনাতাম যে দুঃস্বপ্ন তোমার বিচ্ছেদের দিন থেকে আমার নিত্যসঙ্গী।

মেরিনা বলল, “সত্যি কথা কি জান? এতদিন পর তোমাকে দেখে আমি আত্মসংবরণ করতে পারছি না।’

এ মুহূর্তে আত্মহারা হলে চলবে না মেরিনা!’ আউস বলল। এখন আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার সময়। ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা গ্রহণ করে আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে হবে।’

‘আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি আক্রমণকারীদের সাথে এসেছ।’ মেরিনা বলল। ‘তারা কারা?’

‘তারা বাবার সম্প্রদায়।’ আউপাস বলল। তারা আফ্রিকান মুসলিম।

আউপাস মেরিনার নিকট ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করল। জুলিয়ান কীভাবে মুসলমানদেরকে এই হামলার জন্য প্রস্তুত করেছে, সে কথাও বলল। সবশেষে আউপাস মেরিনাকে বলল,

‘আন্দালুসিয়ার সেনাবাহিনীতে গোথ সৈন্যও আছে, ইহুদি সৈন্যও আছে। মেরিনা, তুমি কি এক কাজ করতে পারবে, যখন রডারিকের বাহিনী আর মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হবে তখন গোথ ও ইহুদি সৈন্যরা মুসলিম বাহিনীর সাথে মিশে যাবে–পারবে এমনটা করতে?

‘তুমি যা চাইছে, তাই হবে।’ মেরিনা বলল। এ ব্যাপারে আর কোন কথা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।’

‘এ মুহূর্তে তুমি আমাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিতে পারবে? আউস বলল।

‘হ্যাঁ,’ মেরিনা বলল। রডারিক এখন পাম্পালুনায় আছে। সে সৈন্য সংগ্রহ করছে। লোকদেরকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বলা হচ্ছে। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা কত?

‘সাত হাজার। আউপাস বলল। এখন কিছু কম হবে। প্রথম লড়াইয়ে কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়েছে।

‘উহ্! এতো কম সংখ্যক সৈন্য!’ মেরিনা বিস্মিত হয়ে বলল। “নির্ঘাত মুসলমানরা মার খেয়ে পিঠটান দেবে।

‘জেনারেল থিয়োডুমিরকে জিজ্ঞেস করে দেখো। আউপাস মুচকি হেসে বলল। তুমি এই মুসলিম সৈনিকদের লড়াই করতে দেখলে হতভম্ব হয়ে যাবে। এরা কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ‘জিহাদ’ বলে, যার অর্থ হল, পবিত্র যুদ্ধ। মুসলমানগণ জিহাদকে ইবাদত মনে করে। তারা তাদের এই ইবাদতে আপন জীবনকে নাযরানা হিসেবে পেশ করতে পারাকে পরম সৌভাগ্য মনে করে। কিন্তু তারা অবিবেচকের মতো জীবন বিসর্জনও দেয় না।

প্রথম আক্রমণেই তারা শত্রুপক্ষের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতে পরিণত হয়। তাদের অন্তরে যেহেতু মৃত্যুর কোন ভয়ই থাকে না, তাই তারা নির্ভয়ে শুক্রব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। তাদের জেনারেল এমন সব রণকৌশল প্রয়োগ করেন, যা শত্রুপক্ষ তখনই বুঝতে সক্ষম হয় যখন তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে মাত্র সাত হাজার মুসলিম সৈন্য থিয়োডুমিরের লৌহবর্ম পরিহিত পনের হাজার সৈন্যের যে করুন অবস্থা করেছে, তা আর বলে লাভ নেই। সম্ভবত তুমি ইতিমধ্যেই এ সম্পর্কে জানতে পেরেছ।

ভালো করে ভেবে দেখ, আউপাস!’ মেরিনা বলল। রডারিক যে বাহিনী প্রস্তুত করছে তার সৈন্যসংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি হবে।

‘এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, মেরিনা!’ আউপাস বলল। এখনও যদি তোমার অন্তরে আমার জন্য সামান্য ভালোবাসা থেকে থাকে তাহলে আমি তোমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছি, তা পূর্ণ করে দাও।’

“ঠিক আছে, তাই হবে।’ মেরিনা বলল। এখন তুমি পাগলের মতো আচরণ করতে করতে এখান থেকে বের হয়ে যাও।

‘আমি তোমার সাথে আবারও সাক্ষাৎ করব।’ এ কথা বলে আউপাস সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়ল।

***

জেনারেল থিয়োডুমিরকে পরাজিত করার কয়েকদিন পরের ঘটনা। সেনাসাহায্য পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীকে বর্তমান রণাঙ্গনের আশেপাশেই অবস্থানের নির্দেশ দেন।

শত্রুপক্ষের নিহত সৈনিকদের লাশ সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু রক্ত এতো বেশি পরিমাণে প্রবাহিত হয়েছে যে, মাটির উপরে জমাটবাঁধা রক্ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দিন-রাত বিভিন্ন প্রকার জীব-জন্তু সেখানে ঘোরাফেরা করছে, আর রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছে। সাপ ও অন্যান্য বিষাক্ত সরিসৃপের আনাগোনা বেড়ে গেছে।

তারিক বিন যিয়াদ পরবর্তী আক্রমণের জন্য যে অঞ্চল নির্ধারণ করেছিলেন, তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য ঘোড়ায় চড়ে একদিন সেদিকে রওনা হলেন। গাইড হিসেবে তার সাথে জুলিয়ানও ছিলেন। তার সাথে আরো ছিলেন, মুগীস আর-রুমি ও আবু যারু’আ তুরাইফ

‘আউপাস কবে নাগাদ ফিরে আসবে বলে মনে করছেন?’ তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন। ধরা পরে যাবে না তো?

সে এতোটা আনাড়ি নয়।’ জুলিয়ান উত্তর দিলেন। কিছু একটা করে তবেই ফিরে আসবে। সে এমন ছদ্মবেশ ধারণ করেছে যে, কেউ তাকে চিনতেই পারবে না। তার ধরা পরার সম্ভাবনাও খুবই কম। যুদ্ধবন্দীদের থেকে আপনি শুনেছেন, রডারিক এখন টলেডোতে নেই। যথাসম্ভব উযির-নাযিররাও তার সাথেই আছে। এই অবস্থায় আউপাসের জন্য কাজ করা অনেক সহজ হবে।

তারিক বিন যিয়াদরা কথা বলতে বলতে জেলে পাড়া অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। তারিক বিন যিয়াদকে বলা হয়েছিল যে, এখান থেকে বহুদূর পর্যন্ত কোন শহর বা উপশহর নেই। এ জন্য কোন সেনাক্যাম্পও আশেপাশে কোথাও নেই। তারা আরও কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একটি ছোট বসতি দেখতে পেলেন।

চারদিকে সবুজের সমারোহ। বসতিটিকে ঘিরে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়েছে। দূর থেকে লোকদের প্রাণচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সাথীদের নিয়ে সেই বসতির নিকট পৌঁছলেন। তাদেরকে দেখে লোকজন যার যার ঘরে দৌড়ে পালাল।

‘জুলিয়ান!’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এরা হয়তো জানতে পেরেছে, আমরা তাদের বাহিনীকে পরাজিত করেছি। তাদেরকে কে বুঝবে যে, আমরা সেইসব বিজয়ী সম্প্রদায়ের মতো নই, যারা কোন শহর বিজয় করার পর জোরপূর্বক সেখানকার বাসিন্দাদের গৃহে প্রবেশ করে লুটতরাজ করে, রক্তের হোলি খেলে, আর যুবতী মেয়েদেরকে বেআবরু করে।

“ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান বললেন। তাদেরকে বুঝানোর কী দরকার? তারা যখন আমাদের থেকে এমন কোন আচরণ না পাবে তখন তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে।

এমন সময় একজন অতসীপর বৃদ্ধা বসতির কোন এক ঘর থেকে বের হয়ে তারিক বিন যিয়াদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারিক তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন, অন্যরাও ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন।

‘তোমাদের মধ্যে তোমাদের কমান্ডারও কি আছেন, যিনি আমাদের বাহিনীকে পরাজিত করেছেন?’ বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।

‘হ্যাঁ, বুড়ি মা!’ এনিই হলেন সেই কমান্ডার, যিনি আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের দিকে ইঙ্গিত করে বৃদ্ধার ভাষায় উত্তর দিলেন।

‘বৎস, ঘোড়া থেকে নেমে এসো, তারপর তোমার শিরস্ত্রাণ খুলে ফেল।’ বৃদ্ধা। কোন রকম প্রভাবান্বিত না হয়ে তারিক বিন যিয়াদকে উদ্দেশ্য করে বললেন।

মুগীস আর-রুমি আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন। তিনি তারিক বিন যিয়াদকে বৃদ্ধার কথা তরজমা করে শুনালে তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া থেকে নেমে তাঁর পাগড়ী খুলে ফেললেন।

‘ওহো, তুমি এসে গেছ! বৃদ্ধা তারিক বিন যিয়াদের মাথায় হাত রেখে আনন্দিত হয়ে বললেন। আমার স্বামী একজন গণক ছিলেন। তার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা অনেক দূর-দূরান্তের মানুষও স্বীকার করত। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি আমাকে কয়েকবারই বলেছেন, এক ভিন জাতি আন্দালুসিয়া বিজিত করে তাদের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে। তাদের কমান্ডারের পরিচয়-চিহ্ন হল, তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল হবে লালচে রঙ্গের। ললাট হবে প্রশস্ত।

আমার বিশ্বাস তুমিই সেই ব্যক্তি। তোমার চুল লালচে রঙ্গের, আর তোমার ললাট প্রশস্ত। আরেকটি চিহ্ন আছে, তোমার বাম কাঁধের কাপড় সরাও। সেখানে একটি মোটা তিল থাকার কথা। তিলের চতুরপার্শ্বে পশম থাকবে।’

মুগীস আর-রুমী তারিক বিন যিয়াদকে বৃদ্ধার কথা তরজমা করে বললেন, ‘বৃদ্ধ আপনাকে বাম কাঁধের কাপড় সরাতে বলছেন।’

‘বৃদ্ধা ঠিকই বলেছেন। তারিক তার বাম কাঁধ উন্মুক্ত করতে করতে বললেন। ‘আমার এ কাঁধে একটি মোটা তিল আছে। তিলের চতুরপার্শ্বে পশমও আছে।’

‘তুমিই আন্দালুসিয়া জয় করতে পারবে।’ বৃদ্ধা তারিকের বাম কাঁধের তিল ও তার চতুরপাশের পশম দেখে বললেন, ‘তুমিই সেই ব্যক্তি, যে এই রাজ্যের হতভাগা লোকদেরকে বাদশাহ ও তার পরিষদবর্গের জুলুম-অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে পারবে।’

‘প্রিয় বন্ধুগণ!’ তারিক বিন যিয়াদ তার সাথী-সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বললেন। ‘আমি ইতিপূর্বে আপনাদেরকে এবং গোটা বাহিনীকে আমার স্বপ্নের কথা শুনিয়েছি। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে, বিজয় আমাদেরই হবে। এখন এই বৃদ্ধা ভবিষ্যত্বাণী শুনাচ্ছেন যে, আমিই হবো আন্দালুসিয়ার বিজেতা। তবে সকলকে মনে রাখতে হবে, এখানে আমাদেরকে জীবনবাজি রেখে লড়তে হবে।

***

ঐদিন রাতেই আউলাস ফিরে এলো। পথের দূরত্ব আর সফরের ক্লান্তি সত্ত্বেও সে জুলিয়ানের সাথে সাক্ষাৎ করল। জুলিয়ান তাকে তারিক বিন যিয়াদের নিকট নিয়ে এলেন। সেখানে অন্যান্য সেনাপতিগণও উপস্থিত ছিলেন। সে তার সফরের পূর্ণ বিবরণ তাদেরকে শুনাল। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ছাড়া মেরিনার সাথে তার যেসব কথা হয়েছে, তাও তাদেরকে শুনাল।

‘তোমার কি বিশ্বাস হয়, সেই নারী এতো বড়, আর এতো স্পর্শকাতর একটি কাজ করতে সক্ষম হবে?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

‘তার উপর আমার ভরসা আছে। আউপাস বলল। তারপরও মেরিনা যদি সেই কাজ না করে বা ব্যর্থ হয় তাহলে অন্যরা সেই কাজ করবে। গোখ সম্প্রদায়ের কয়েকজন সরদার সেখানে উপস্থিত আছে, আমি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছি।

তবে ইবনে যিয়াদ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, রডারিক এক লক্ষেরও বেশি সৈন্য নিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করবে। পাম্পানা থেকে টলেডো পর্যন্ত সামর্থবান সকল লোকজন তার বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে।

‘এটা আমার জন্য অত্যন্ত ভালো সংবাদ। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ‘বেসামরিক লোকজন যারা সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে, তারা এলোপাথারিভাবে লড়াই করবে। তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ সৈন্যদের মতো লড়াই করতে পারবে না। তারা সামরিক ডিসিপ্লেন ও যুদ্ধনীতি সম্পর্কেও অজ্ঞ থাকবে।

‘তথাপি আমাদেরকে আত্মপ্রশান্তিতে ডুবে থাকা ঠিক হবে না।’ সেনাপতি আবু যারু’আ তুরাইফ বললেন। আমাদের নিকট এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য কখনই হবে না। ইতিমধ্যে যদি সেনাসাহায্য এসে পৌঁছেও যায় তাহলে তা সাত হাজারের বেশি হবে না।’

‘আমি আপনাদের সকলকে আশ্বস্ত করার জন্য বলতে চাই। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আল্লাহ আমাদের বিজয়ের উপায়-উপকরণ তৈরি করছেন মাত্র। আউপাস টলেডোতে যা কিছু করে এসেছে, তা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহই বলতে হবে।

***

মিসর ও আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইর খলীফা ওলিদ বিন আবদুল মালেককে তারিকের প্রথম বিজয় সম্পর্কে অবগত করার জন্য পত্র লেখেন, সে পত্রে তিনি অতিরিক্ত সেনাসাহায্যের কথাও উল্লেখ করেন। প্রতিউত্তরে খলীফা পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি দল প্রেরণ করেন।

কোন ঐতিহাসিক সূত্রে এ বিষয়ে ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়নি যে, পাঁচ হাজার সৈনিকের সেই বাহিনীতে অশ্বারোহী কতজন ছিল, আর পদাতিক কতজন ছিল। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই সেনাসাহায্য এত নগণ্য ছিল যে, বাস্তবতার নিরিখে তা ছিল এক ধরনের প্রকাশ্য বিদ্রূপ।

তারিক বিন যিয়াদের সাথে ছিল সাত হাজার সৈনিক। প্রথম যুদ্ধে কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। সেনাসাহায্য পৌঁছার পর সে সংখ্যা দাঁড়াবে বার হাজারের কিছু কম। অপরপক্ষে রডারিকের ঘোষণা অনুযায়ী দলে দলে লোকজন সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছিল। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই রডারিকের সৈন্যসংখ্যা দাঁড়াল পঞ্চাশ হাজার। এ সংখ্যা অতি বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

উপদেষ্টাবৃন্দ রডারিককে বলল, ‘আক্রমণকারী বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মাত্র সাত হাজার। এত অল্প সংখ্যক দুশমনের মোকাবেলায় এতো বিশাল বাহিনী গঠন করার কি প্রয়োজন আছে? এতে করে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে ব্যয়ভারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

‘থিয়োডুমির আক্রমণকারীদেরকে জিন-ভূত বলেছে।’ রডারিক গর্জে উঠে বলল। আমি এক লক্ষেরও বেশি সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করব, যেন দুনিয়াবাসী অবগত হতে পারে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ কত বিশাল শক্তির অধিকারী। এরপর কখনও কেউ আন্দালুসিয়া আক্রমণের দুঃসাহস করবে না।

আমি বিপুল সংখ্যক সৈন্যের মাধ্যমে সেই সাত হাজার সৈন্যকে পদদলিত করে মারব। তাদের মৃত লাশের উপর বিশ-পঁচিশ হাজার ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের শরীরের গোস্তগুলো হাড়ি থেকে পৃথক করে ফেলব। আমি জিন-ভূতকে ভয় পাওয়ার মতো ব্যক্তি নই।’

রডারিক ছিল অকুতোভয় ও ভয়ঙ্কর এক যোদ্ধা। সে জিন-ভূতকে ভয় পাওয়ার পাত্র ছিল না। তার ডর-ভয়হীন মনোভাব, আর অসম সাহসিকতা এমন এক ঘটনার জন্ম দেয়, যা আজও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

***

তারিক বিন যিয়াদের আন্দালুসিয়া আক্রমণ করারও অনেক দিন আগের কথা। একদিন রডারিক টলেডোর শাহীদরবারে রাজ-সিংহাসনের উপর বসেছিল। এমন সময় সম্ভ্রান্ত দু’জন বৃদ্ধ লোক দরবারে প্রবেশ করলেন। তারা প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী আলখেল্লা পরিহিত ছিলেন। তাঁদের দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর মার্জিত ও গাম্ভির্যপূর্ণ চাল-চলন দেখে মনে হচ্ছিল, তারা সুউচ্চ সম্মানের অধিকারী কোন গণক বা ধর্মযাজক হবেন। তাঁদের কমরে কাপড়ের চওড়া ফিতা বাঁধা ছিল। সে ফিতায় অনেকগুলো চাবির ছড়া ঝুলছিল।

রডারিকের মতো আত্মগর্বিত, অহংবোধসর্বস্ব বাদশাহও তাদের সম্মানে উঠে দাঁড়াল। বৃদ্ধদের একজন হাতের ইশারায় রডারিককে বসতে বললেন। রডারিক বসে পড়ল।

‘হে আন্দালুসিয়ার বাদশাহ!’ বৃদ্ধদের একজন বললেন। আমরা তোমাকে একটি গোপন কথা বলতে এসেছি, প্রত্যেক নতুন বাদশাহকেই এই গোপন কথা শুনতে হয়। অনেক দিন হয়ে গেছে তুমি সিংহাসনে আরোহণ করেছ। তোমার ক্ষমতা সুসংহত হয়েছে।

‘এই গোপন কথা শুনতে আমি অস্থির হয়ে আছি।’ রডারিক বলল। কোন ভূমিকার প্রয়োজন নেই, যা বলার সরাসরিই বলে ফেলুন।

‘বেশি অস্থির হয়ো না, হে বাদশাহ!’ বৃদ্ধ বলল। এই গোপন কথা শুনার পরও ধৈর্যহারা হয়ো না, অন্যথায় পস্তাতে হবে। হিরাক্লে যখন এই মুলুকের বাদশাহ ছিলেন তখন তিনি আন্দালুসিয়ার সমুদ্রপ্রণালীতে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। আর টলেডো শহরের বাইরে বিশাল বড় এক দুর্গ তৈরী করেছিলেন। সেই দুর্গে তিনি এক রহস্যময় জাদুর প্রহরা নিযুক্ত করেন। সেই দুর্গের একটি মাত্র ফটক। ফটকটি অত্যন্ত মজবুত লৌহ দ্বারা নির্মিত। তিনি নিজ হাতে সেই ফটকে তালা লাগান।

তিনি বলে গেছেন, আন্দালুসিয়ার প্রত্যেক নতুন বাদশাহই যেন সিংহাসনে আরোহণের কিছুদিনের মধ্যে এই লৌহফটকে তালা লাগিয়ে চাবি আমাদের নিকট দিয়ে দেয়।

বৃদ্ধ রডারিককে চাবির ছড়াগুলো দেখিয়ে বললেন, এগুলো সেসব তালার চাবি, যা হিরাক্কেলের পর থেকে তোমার পূর্ববর্তী বাদশাহগণ দুর্গের লৌহফটকে লাগিয়েছেন। এখন তোমার পালা। লৌহফটকে তোমার তালা লাগিয়ে দাও। আমরা অন্য আরেকদিন এসে চাবি নিয়ে যাব।’

‘আমি এই দুর্গ দেখেছি। রডারিক বলল। আমি ওটাকে প্রাচীন কোন প্রাসাদ মনে করতাম। আপনারা উভয়ই কি সেই দুর্গে অবস্থান করেন?

‘না, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ!’ প্রথম বৃদ্ধ বললেন। আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি। এই চাবিগুলো আমাদের বাব-দাদা আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। এই দুর্গের হেফাযত করা আমাদের খান্দানের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও আদায় করতে থাকবে।’

‘আমি আপনাদের এই দায়িত্ব এখানেই খতম করে দিতে চাই।’ রডারিক বলল।

“হে বাদশাহ। দ্বিতীয় বৃদ্ধ বললেন। আমাদের দুজনকে তোমার প্রজা মনে করো না। তোমার ইচ্ছা যদি এই হয় যে, তুমি দুর্গের ফটক খুলবে তাহলে শুনে রাখো, তোমাকে পস্তাতে হবে। তোমার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এমন অনেক বাদশাহই অতিবাহিত হয়েছে, যারা এই ফটক খুলতে চেয়েছিল। কোন প্রবীণ প্রত্যক্ষদর্শীকে ডেকে জিজ্ঞেস করে দেখ, সে সকল বাদশাহর পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হয়েছিল।

জুলিয়াস সিজারের চেয়ে প্রবল প্রতাপশালী বাদশাহ আর কে ছিল? সেও এই ফটক খোলার চেষ্টা করেনি। আমরা এখন যাচ্ছি। খবরদার, হে বাদশাহ! এটা কোন কল্পকাহিনী নয়। আমরা বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করছি, কয়েক দিন পর এসে আমরা সেই তালার চাবি নিয়ে যাব, যা তুমি দুর্গের ফটকে লাগাবে।’

কথা শেষ হতেই বৃদ্ধ দু’জন দরবার থেকে বের হয়ে চলে গেলেন।

***

‘রডারিক যদি এই মুলুকের শাহানশা হয়ে থাকে তাহলে এই মুলুকের কোন রহস্যই তার নিকট গোপন থাকতে পারবে না।’ বৃদ্ধ দুজন চলে যাওয়ার পর রডারিক ঘোষণা করল। আমি ঐ দুর্গে তালা লাগাব না, বরং সবকটি তালা ভেঙ্গে ফটক খুলে দেখব ভিতরে কি আছে।

‘বাদশাহ নামদার, গোস্তাখি মাফ করবেন। একজন দরবারী বিনীত স্বরে বলল। আমাদের কারোই এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, বাদশাহ হুজুরের সাহসিকতা ও ভয়হীনতা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। বাদশাহ হুজুরকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা আমাদের কর্তব্য। বৃদ্ধ ধর্মযাজক বলে গেছেন, হিরাক্কেল দুর্গের ভিতর জাদুর প্রহরা নিযুক্ত করেছেন। আর কোন মানুষের পক্ষে জাদুর মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বাদশাহ হুজুরের নিকট আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, হুজুর দুর্গের লৌহফটকে তালা লাগিয়ে সে বিষয় বেমালুম ভুলে যাবেন।

‘তা হলে আজ থেকে আমাকে বাদশাহ বলা পরিত্যাগ কর। রডারিক চিৎকার করে বলল। এই মুলুক আমার, এই মুলুকের প্রতিটি গোপন রহস্য আমাকে জানতে হবে। ইতিপূর্বে আমি এই দুর্গের ব্যাপারে মনযোগ দেইনি। এখন আমার উপলব্ধি হচ্ছে, সেই রহস্যময় দুর্গ আমার বুকের উপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসেছে।’

‘বাদশাহ রডারিকা’ রাজ্যের প্রধান পাদ্রি দাঁড়িয়ে বলল। আন্দালুসিয়া, ফ্রান্স এবং জার্মানের পর্বতমালা পর্যন্ত রডারিকের নাম শুনে কেঁপে উঠে; কিন্তু এমন কিছু রহস্যময় শক্তি আছে, যার সামনে মানুষ কিংকর্তব্যবিমোঢ় হয়ে পড়ে। বাদশাহ নামদার যদি আমাকে আপন ধর্মের ধর্মীয় গুরু মনে করেন তাহলে তিনি যেন আমাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত না করেন যে, আমি তাকে দুর্গে প্রবেশ করা থেকে বাধা প্রদান করব।’

‘হিরাক্বেল আমার মতোই একজন বাদশাহ ছিলেন। রডারিক বলল। তিনি যদি কোন রহস্যময় শক্তি দুর্গের মাঝে বন্দী করে রেখে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে, ওটা তার আয়ত্তে ছিল। আমিও সেই রহস্যময় শক্তি করায়ত্ত করতে চাই।’

রডারিক সামান্য সময়ের জন্য নীরব হয়ে দরবারে উপবিষ্ট লোকদের উপর তার দৃষ্টি একবার ঘুরিয়ে আনল। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, কাপুরুষের দল! সেই দুর্গে রোমানরা গুপ্তধন গচ্ছিত রেখেছে। সেখানে অবশ্যই অতি মূল্যবান হীরা-জহরত ও মণি-মাণিক্য রয়েছে। ভয় শুধু একটাই হয়তো সেখানে অনেক বিষাক্ত সাপ আছে। অথবা মাত্র এক জোড়া বিষাক্ত সাপ আছে। তোমাদের মধ্যে এমন বীরপুরুষ কি নেই, যারা আমাকে সেই দুর্গের রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করবে?

রডারিক তার দরবারে উপস্থিত জেনারেলদের প্রতি দৃষ্টিপাত করল। তারা কেউই বাদশাহর চোখে কাপুরুষ হতে চাচ্ছিল না। তাই সকলেই একে একে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি বাদশাহ নামদারের সাথে যাব।’

রডারিকের উপদেষ্টাবৰ্গ, রাষ্ট্রের বড় বড় পাদ্রি এবং তার পরিবারের সদস্যরাও তাকে তার সংকল্প ত্যাগ করার জন্য অনেক অনুরোধ করল, কিন্তু সে কারো অনুরোধ-উপরোধ শুনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

তিন-চার দিন পর দেখা গেল, সে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে সেই দুর্গের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার সাথে তিন-চারজন নামকরা জেনারেলও ছিল, যারা বিভিন্ন যুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের সাথে নিজ নিজ রক্ষীবাহিনীর সেরা অশ্বারোহীরাও উপস্থিত ছিল।

প্রকাণ্ড চওড়া এক পাথরের উপর দুর্গটি অবস্থিত। দুর্গের চতুর্পাশে স্তম্ভের ন্যায় উঁচু উঁচু পাথর মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্তম্ভগুলো উচ্চতায় দুর্গকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম পলকেই মনে হবে, স্তম্ভের ন্যায় উঁচু পাথরগুলোই বুঝি দুটাকে স্থির করে রেখেছে। দুর্গটি মরমর পাথরে নির্মিত। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য স্থানে স্থানে ধাতব পদার্থের টুকরা লাগানো হয়েছে। সামান্য আলো পেলেই সেগুলো ঝলমল করে উঠে।

ভিতরে প্রবেশের জন্য পাথর কেটে সুরঙ্গ বানানো হয়েছে। দুর্গের প্রবেশদ্বার এতটাই প্রশস্ত ও উঁচু যে, ঘোড়ার উপর আরোহণ করে দুর্গে প্রবেশ করা যায়। সুরঙ্গের শেষ মাথায় বিশাল আকৃতির লৌহফটক। সেই ফটকে অসংখ্য তালা ঝুলছে। তালার রং বিকৃত হয়ে গেছে। এগুলো হিরাকেল থেকে অর্টিজা পর্যন্ত সকল বাদশাহ নিজ হাতে লাগিয়ে ছিলেন।

যে দুজন বৃদ্ধ ধর্মাষক রডারিকের দরবারে গিয়েছিলেন তারা সেই দুর্গের সামনে দাঁড়ানো ছিলেন। দুজন ফটকের দুই পার্শ্বে প্রহরীর মতো অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

‘আমরা তোমাকে শেষবারের মতো সতর্ক করছি।’ দু’জন বৃদ্ধের একজন বললেন।

‘এদের থেকে চাবি নিয়ে নাও।’ রডারিক নির্দেশ দিল। সকল তালা খুলে দাও।

বৃদ্ধ দুজন শক্তিশালী সৈন্যদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হলেন না। সৈন্যরা তাদের থেকে চাবি ছিনিয়ে নিল। অসংখ্য জং পড়া তালা। কোন তালার চাবি কোনটা সেটা জানাও ছিল অসম্ভব, সারা দিন ধরে তালা খোলার চেষ্টা করা হল। অবশেষে সূর্য ডুবার কিছু পূর্বে সমস্ত তালা খোলা সম্ভব হল। তালা খোলার সাথে সাথে লৌহকপাটও খুলে গেল।

রডারিক ভিতরে প্রবেশ করল। তার সাথে আসা জেনারেল ও রক্ষীসেনারাও ভিতরে প্রবেশ করল। লৌহকপাট পার হয়ে তারা এক বিশাল হলরুমে এসে পৌঁছল। হলরুমের এক দিকে একটি দরজা। সেই দরজা ভিতর দিক থেকে বন্ধ। দরজার সামনে রাং ও তাম্র মিশ্রিত ধাতু দ্বারা নির্মিত এক বিশাল আকৃতির মানব-মূর্তি দাঁড়ানো। তার এক হাতে লৌহ নির্মিত এক বিশাল মুগুর।

আশ্চর্যের বিষয় হল, মূর্তিটি সেই লৌহ-মৃগুর মাথার উপর উঠিয়ে মাটির উপর আঘাত করছে। তার বুকের উপর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে। আমি আমার কর্তব্য আদায় করছি।’

‘আমি মন্দ কোন উদ্দেশ্যে এখানে আসিনি। রডারিক মূর্তিটিকে লক্ষ্য করে বলল। কোন কিছুতেই আমি হাত দেব না। কেবল এখানের রহস্য জানার জন্যই এসেছি। তার পর যেভাবে এসেছি, সেভাবেই ফিরে যাব। আমাকে বিশ্বাস কর, আমাকে সামনে যাওয়ার রাস্তা দাও।

রডারিকের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মূর্তিটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মূর্তির মুগুর ধরা হাত উপরে উঠে রইল। রডারিক তার বাহুর নিচ দিয়ে দ্বিতীয় কামরায় প্রবেশ করল। তার সাথে আগত লোকেরাও তার পিছনে পিছনে ঐ কামরায় প্রবেশ করল।

দ্বিতীয় কামরাটি অত্যন্ত পরিপাটি ও সাজানো-গুছানো। রডারিকের দেহরক্ষীরা মশাল জ্বালিয়ে এনেছিল। মশালের হলুদ আলোতে কামরার দেয়ালগুলো থেকে আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হতে লাগল। আসলে সেগুলো ছিল মহামূল্যবান পাথর ও হীরার টুকরো। সেগুলো দ্বারা দেয়ালের মাঝে নকশা অঙ্কিত করা হয়েছিল।

কামরার মধ্যভাগে একটি টেবিল রাখা আছে। তার উপর একটি বড়সড় বাক্স রাখা। তাতে লেখা আছে, “এই বাক্সে দুর্গের রহস্য সংরক্ষিত আছে। কোন বাদশাহ ব্যতীত এই বক্স অন্য কেউ খুলতে সক্ষম হবে না। তবে সেই বাদশাহকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তার সামনে আশ্চর্যজনক ঘটনাবলীর পর্দা উন্মোচিত হবে। আর সেসব ঘটনা সেই বাদশাহর জীবদ্দশায় বাস্তবায়িত হবে।”

রডারিক নির্ভয়ে সেই বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেলল। বাক্সে চামড়া দ্বারা নির্মিত এক ফুট দৈর্ঘ ও এক ফুট প্রস্থ একটি কাগজ রাখা ছিল। তাম্র নির্মিত একটি প্লেট সে কাগজের উপর রাখা আছে, আরেকটি প্লেট তার নিচে রাখা আছে।

রডারিক চামড়ার সেই কাগজটি হাতে নিয়েই যুদ্ধবাজ সৈনিক দলের একটি চলমান চিত্র দেখতে পেল। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে সৈনিকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তীর-ধনুক ও অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত সেই সৈনিকরা সকলেই অশ্বারোহী। তারা সকলেই বিশাল আকৃতি ও ভয়ঙ্কর দর্শন চেহারার অধিকারী। সেই চলমান চিত্রের উপর লেখা আছে :

‘হে অবাধ্য মানুষ! দেখে নাও, এরা সেই অশ্বারোহী, যারা তোমাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। তোমার বাদশাহীর অবসান ঘটাবে।’

রডারিক অবাক হয়ে সেই চলমান চিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সাথে আগত জেনারেলদের দৃষ্টিও সেই কাগজের উপর নিবদ্ধ। তারা অতি নিকট থেকে লড়াইরত দুটি বাহিনীর শোরগোল শুনতে পাচ্ছে। সৈনিকদের চিৎকার চেঁচামেচি, ঘোড়ার হেষাধ্বনি, আর ক্ষুরের আঘাতে ময়দান প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।

রডারিক এতোটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, তার মনে হচ্ছিল অন্য কোন রাজ্যের বাহিনী তার রাজ্যে আক্রমণ করে বসেছে। তারা হয়তো টলেডো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে তার চোখের সামনেই এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিল।

যুদ্ধের এই দৃশ্য ছায়াছবির ন্যায় এতটাই জীবন্ত লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল দুর্গের মজবুত প্রাচীর অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেই প্রাচীরের স্থানে বিশাল বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আকাশে পেঁজা পেঁজা কালো মেঘ জমা হয়ে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে।

উভয় পক্ষের বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। একদল খ্রিস্টানদের। আরেক দল উত্তর আফ্রিকার মুসলমানদের। উভয় পক্ষের সৈন্যরাই সমানতালে প্রতিপক্ষের রক্ত প্রবাহিত করে চলছে। ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানি আর তীর-বর্ষার সাঁ সাঁ শব্দ ভেসে আসছে। মুহুর্মুহু যুদ্ধডঙ্কা বেজে উঠছে। পদাতিক সিপাহী ও অশ্বারোহী সৈন্যরা আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।

সওয়ারিহীন ভীত-সন্ত্রস্ত ঘোড়াগুলো আহত সৈন্যদেরকে পদদলিত করে এলোপাথারি ছোটাছুটি করছে। সৈনিকদের বজ্রনিনাদে আকাশ ফেটে পড়ছে। ঘোড়ার পদাঘাতে জমিন কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর কিছুক্ষণ পর পর বজ্রকণ্ঠে ঘোষিত হচ্ছে :

হে রাসূলুল্লাহর অনুসারীগণ! কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন।

হে মুসলমানগণ, তোমাদের পিছনে অথৈ সমুদ্র। তোমাদের রণতরী পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে।

আল্লাহর রাসূল তোমাদের বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন।

রডারিক ও তার জেনারেলরা খোলা চোখে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখছিল। তারা সৈনিকদের রণহুঙ্কার আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিল। রক্তাক্ত এই ভয়ানক ছায়াচিত্রের যুদ্ধকে একেবারেই বাস্তব মনে হচ্ছিল। রডারিকের চেহারায় চিন্তার বলিরেখা ফুটে উঠল। তার জেনারেল ও রক্ষীদের চেহারাও ভয়ে পাংশু বর্ণ ধারণ করল। রডারিক যদি না থাকত তাহলে তারা এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করত।

যুদ্ধের শুরুতে খ্রিস্টানদের যে সকল যুদ্ধ-নিশান স্বগৌরবে পত পত করে উড়ছিল সেগুলো একে একে ভূপাতিত হতে লাগল। মুসলমানদের ঝাণ্ডা আকাশে মাথা উঁচু করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছিল। অবশেষে খ্রিস্টানদের কুশ অঙ্কিত যুদ্ধ-নিশানও ভূপাতিত হল। সাথে সাথে খ্রিস্টান সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। আর মুসলিম সৈন্যরা তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করতে লাগল।

রডারিক খ্রিস্টান সৈন্যদের মাঝে এক যোদ্ধাকে দেখতে পেল। তার পিঠ রডারিকের দিকে ছিল। তার মাথায় এমন শিরস্ত্রাণ ছিল যেমনটি স্বয়ং রডারিক ব্যবহার করত। তার লৌহবর্মও ছিল রডারিকের লৌহবর্মের ন্যায়। সে যোদ্ধা যেই সাদা ঘোড়ায় আরোহণ করেছিল, সেটাও দেখতে রডারিকের ঘোড়ার মতোই মনে হচ্ছিল। মোটকথা, সেই অশ্বারোহী যোদ্ধা আর রডারিকের মাঝে পূর্ণ সামঞ্জস্য ছিল।

ছায়াচিত্রের যোদ্ধাকে রডারিক লক্ষ্য করছিল। তাকে বাদশাহ মনে হচ্ছিল। হঠাৎ সে যোদ্ধা ঘোড়া থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার সাদা ঘোড়া এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে লাগল।

রডারিক ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে দ্রুত পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। দৌড়ে সে ঐ কামরায় এসে পৌঁছল, যেখানে কাঁসার মূর্তিটি মুগুর নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখা গেল, মূর্তিটি সেখানে নেই।

রডারিক ও তার সঙ্গীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা দৌড়ে সেই কামরা থেকে বের হয়ে দুর্গের লৌহফটক পেরিয়ে দুর্গের বাহিরে এসে পৌঁছল। দুর্গের বাহিরে এসে দেখল, সেই বৃদ্ধ ধর্মযাক দুজন মরে পড়ে আছেন।

রডারিক দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, ধোয়ার ন্যায় কালো মেঘ দুৰ্গটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। মুহূর্তের মধ্যে মেঘের ভিতর থেকে বিদ্যুৎ চমকাল, সেই সাথে গোটা দুর্গ এক লেলিহান অগ্নিশিখায় পরিণত হল। দুর্গের মর্মর পাথরগুলোও জ্বলতে লাগল।

অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গের বাহিরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথরগুলোতেও আগুন জ্বলে উঠল। বাতাস দ্রুত বেগে বইতে শুরু করল। দুর্গের ভস্মাবশেষ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সাথে ছিটকে এসে জমিনের যে স্থানটিতে পড়ত, সেখানে ফুটা ফুটা রক্তের ছাপ লেগে থাকত। রডারিক অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জেনারেল ও রক্ষীদেরসহ সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়ল।

এই ঘটনার পর রডারিক ধর্মগুরুদের, রাষ্ট্ৰীয় পণ্ডিতদের ও জাদুকরদের নিকট জিজ্ঞেস করল, এই রহস্যময় দুর্গের অর্থ কি? দুর্গে দেখা সেই যুদ্ধের উদ্দেশ্যই বা কি? তারা সকলেই যার যার মতো উত্তর দিল; কিন্তু রডারিক কারো উত্তরেই আশ্বস্ত হতে পারল না। প্রত্যেকেই তার অসম সাহসিকতার প্রশংসা করল, আর শত্রুপক্ষের উপর তার বিজয়ের সুসংবাদ শুনালো। একজনমাত্র জাদুকর তাকে সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলল,

‘শাহানশাকে সতর্ক থাকতে হবে। কারো পক্ষেই এটা বলা সম্ভব নয় যে, হিরাকেল কেন সেই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি, সেই দুর্গের মাঝে অভিশপ্ত ও অশুভ কিছু শক্তিকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই দুর্গে প্রবেশ করাই আপনার ঠিক হয়নি। যুদ্ধের যে ইঙ্গিত আপনাকে দেওয়া হয়েছে, সেটা কোন শুভ লক্ষণ নয়।

‘আমি কি সেই অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে বাঁচতে পারব?’ রডারিক জিজ্ঞেস করল।

‘হে আন্দালুসিয়ায় বাদশাহ, একটি মাত্র উপায় আছে। জাদুকর বলল। ‘আপনি যখন কোন শত্রুপক্ষের সম্মুখীন হবেন তখন আপনার সৈন্যসংখ্যা এত বেশি হতে হবে, যেন শত্রুপক্ষ আপনাকে দেখেই পালিয়ে যায়। অথবা যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।

এই ঘটনার পর পাম্পালুনা এলাকায় বিদ্রোহ দেখা দিলে রডারিক অনেক বেশি সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। পাম্পালুনার বিদ্রোহীদেরকে সে নির্মমভাবে দমন করে। সেখানেই সে জানতে পারে যে, আফ্রিকার দিক থেকে আন্দালুসিয়ার উপর আক্রমণ করা হয়েছে।

থিয়োডুমির তাকে সংবাদ দিয়েছে, আক্রমণকারীদের সংখ্যা সাত-আট হাজার হবে। রডারিক এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বিপুল পরিমাণ সৈন্য জমায়েত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে টলেডোর দিকে রওনা হয়ে যায়।

রডারিক টলেডো আসার পথে স্থানে স্থানে যাত্রা বিরতি করে সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকে। অবশেষে সে যখন টলেডো এসে পৌঁছে তখন তার সৈন্যসংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে ছিল কয়েক সহস্র অশ্বারোহী। রডারিক টলেডোতে যাত্রা বিরতি না করে উত্তরের সেই রণাঙ্গনের দিকে রওনা হয়ে যায়, যেখানে মুসলমান সৈন্যরা জেনারেল থিয়োডুমিরকে পরাস্ত করেছে।

ওদিকে তারিক বিন যিয়াদের নিকট মাত্র পাঁচ হাজার সেনাসাহায্য এসে পৌঁছেছে। এখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র বার হাজার।

রডারিকের এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মুসলমানদের বার হাজার সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনীকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড ঝাবায়ুর ন্যায় সুতীব্র বেগে ধেয়ে আসতে লাগল।

৪. দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর

০৪.

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে পাঁচ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ অধীর আগ্রহে সেনা-সাহয্য পৌঁছার অপেক্ষা করছিলেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছতেই আল্লাহর দরবারে তিনি শোকরিয়া আদায়ের জন্য সেজদায় লুঠিয়ে পড়লেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছার আগ পর্যন্ত তিনি এতটাই অস্থির আর বেকারার ছিলেন যে, গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি তাঁবু থেকে বের হয়ে সোজা রক্ষীবাহিনীর কমান্ডারের তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে ডেকে তুলতেন, আর বলতেন,

‘এখনই দুজন ঘোড়সওয়ার সমুদ্রের দিকে পাঠিয়ে দাও। সেনা-সাহায্য আসার সাথে সাথে যেন তারা আমাকে সংবাদ দেয়। আমি ঘুমিয়ে পড়লেও আমাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দেবে।’

প্রতিদিন একবারের জন্য হলেও তিনি সমুদ্রসৈকতে গিয়ে উপস্থিত হতেন। আর জাবালুতারিকের উঁচু কোন টিবির উপর দাঁড়িয়ে জাহাজের প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকতেন। কখনও পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে দৃষ্টির শেষ সীমানায় জাহাজের চিহ্ন খুঁজে বেড়াতেন। অবশেষে যখন নিশ্চিত হতেন যে, আজ আর জাহাজ আসবে না তখন তার প্রতিটি কথায় ও কাজে গোসা ঝড়ে পড়ত। তার সহকারী সারগণ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন,

‘এতো দূর থেকে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছতে কিছুটা বিলম্ব তো হবেই। এতো বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই।

‘আমি বুঝতে পেরেছি, সেনা-সাহায্য আসতে এত দেরী হচ্ছে কেন?’ তারিক বিন যিয়াদ প্রতিদিন এই একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন। আফ্রিকার সম্মানিত আমীর হয়তো খলীফার নিকট সেনা-সাহায্য চেয়ে দামেস্কের উদ্দেশ্যে কাসেদ পাঠিয়েছেন। দামেস্ক থেকে সেনা-সাহায্য পৌঁছতে তো তিনটি নতুন চাঁদ উদিত হবেই। বুড়ো আর জোওয়ানের মধ্যে পার্থক্য তো এখানেই।’

তারিক বিন যিয়াদ একবার অধৈর্য হয়ে বলে বসেন।

‘মুসা বিন নুসাইর অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি এখন সব কাজই ধীরে সুস্থে করতে পছন্দ করেন। এটা তার মনে রাখা উচিৎ, আমি নওজোওয়ান। আমার ধৈর্যশক্তি কম। সিরিয়া ও আরব থেকে সেনা-সাহায্য তলব করার মাঝে কী এমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আছে? বাবার সম্প্রদায় তো এখনও মরে যায়নি, তাদের মাঝে শুধু এই এলান করলেই চলত যে, সমুদ্রের ওপারে বিন যিয়াদের সেনা-সাহায্য প্রয়োজন, তা হলে এক দিনেই মুসা বিন নুসাইরের নিকট শত-সহস্র যোদ্ধা জানের নাযরানা পেশ করার জন্য জমা হয়ে যেত।

সেনা-সাহায্য পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হল। আত্মসংবরণ করতে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও তিনি বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন। তিনি অশ্বচালনার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। থিয়োডুমিরের পরাজয়ের পর যুদ্ধলব্ধ ঘোড়াগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য তিনি বিশেষ নির্দেশ জারি করেছিলেন।

জাবালুততারিকের যুদ্ধে যে ঘোড়াগুলো মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল, তারিক বিন যিয়াদ কয়েকশ’ পদাতিক সৈন্য বাছাই করে ঘোড়াগুলো তাদেরকে দিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে ঘোড়ায় চড়ে গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ প্ৰশীক্ষণও প্রদান করেন।

তারিক বিন যিয়াদ অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকার লোক ছিলেন না। পরাজিত জেনারেল থিয়োড়মিরের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন, থিয়োডুমির পরাজয় মেনে নিয়ে পরবর্তী আক্রমণের আশায় নিশ্চিন্তে বসে থাকবে না। সে অবশ্যই পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার চেষ্টা করবে। নিশ্চয় সে জবাবী হামলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

তারিক বিন যিয়াদ পূর্বেই এই সংবাদ পেয়েছিলেন যে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক এখন রাজধানী টলেডোতে নেই। সে বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাম্পালুনা নামক এক সীমান্ত এলাকায় গেছে। তারিক ভাবছিলেন, রডারিকের এই অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দালুসিয়ার আরও কিছু এলাকা দখল করে নেওয়া যায় কি না? কিংবা অতর্কিত হামলা চালিয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয় কি না?

অবশেষে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছলে তারিক তাদেরকে মাত্র একটি রাতের জন্য বিশ্রাম দিলেন। পরদিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে গোটা বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করে সামনের এলাকা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন। তাঁর গুপ্তচর ইউনিটের প্রধান অস্ত্র ছিল হেনরি।

এই সেই হেনরি, যে ফ্লোরিডার সাথে ওয়াদা করে এসেছিল, রডারিকের মাথা কেটে নিয়ে যাবে। তারিক বিন যিয়াদ তার সাথে আরও দুজন চৌকস সৈনিককে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নিযুক্ত করলেন। তারা সামনের এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করে আনত। তাদের দায়িত্ব হল, কোন এলাকায় কতজন সৈন্য আছে, কোন্ দুর্গ কতটা মজবুত, ইত্যাদি সংবাদ সংগ্রহ করা।

তারিক বিন যিয়াদ সামনে যে এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, সেই এলাকার নাম ছিল কার্টিজা। কার্টিজার দুর্গ ছিল অত্যন্ত মজবুত। থিয়োডুমিরের বেশ কিছু সৈন্য যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেই দুর্গে আশ্রয় নেয়, ফলে কার্টিজা দুর্গের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এতে দুর্গপ্রধানও অত্যন্ত খুশী হয়। সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সে ভাবতে শুরু করে যে, তার দুর্গ এখন অপরাজেয়। অথচ পালিয়ে আসা সৈন্যদের মাঝে লড়াই করার মতো কোন মনোবলই অবশিষ্ট ছিল না। বার্বার সৈন্যরা তাদের মনোবল ভেঙ্গে ঘুড়িয়ে দিয়েছিল।

যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা পরাজিত কোন সৈনিক কখনও নিজেকে ভীরু আর কাপুরুষ মনে করে না। সে নিজের পরাজিত মনোবৃত্তিকে গোপন করার জন্য শত্রুপক্ষকে অতিশক্তিশালী ও ভয়ঙ্কররূপে চিত্রিত করে। খিয়োডুমিরের পরাজিত সৈন্যরা কার্টিজার দুর্গে প্রবেশ করে আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে ভীতি আর ত্রাস ছড়াতে লাগল।

তাদের একজন বলল, এরা তো মানুষ নয়, মানুষরূপী জিন-ভূত। আপন জীবনের কোন পরোয়াই তারা করে না।

আরেকজন বলল, ‘আমরা দেখলাম, তাদের নিকট একটি ঘোড়াও নেই। হঠাৎ দেখি, অসংখ্য বোড়সওয়ার আমাদের পিছন দিক থেকে এসে আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল।

অন্যজন বলল, ‘আসমান থেকে আমাদের উপর তীর নিক্ষেপ করা হতো। একেকটি তীর আমাদের একেকজন সৈন্যকে হত্যা করে ফেলত।’

আরেকজন বলল, ‘সংখ্যায় তারা আমাদের অর্ধেকও ছিল না।

অন্যজন বলল, তারা মেঘের গর্জনের ন্যায় মর্মভেদী হুঙ্কার ছেড়ে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, আমরা তাদেরকে প্রতিহত করতে পারতাম না।

পরাজিত সৈন্যদের এসব কথাবার্তা দুর্গের ফৌজদের মনে যে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া শহরের বাসিন্দাদের মাঝেও পরিলক্ষিত হল। তারা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তারা ঘরে ঘরে প্রার্থনার আয়োজন করল। তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, এই ভয়ঙ্কর শত্রুবাহিনী যেন এদিকে না আসে। গোটা শহরে শক্তবাহিনীর নির্মমতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, শহরবাসী ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ল।

এ সময় কার্টিজা শহরের যে অবস্থা হয়েছিল তার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক লেনপুল লেখেন, মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা কম হলেও তারা সকলেই ছিল অসাধারণ সাহসী, অসম্ভব কষ্ট সহি, আর আত্মোৎসর্গের বলে বলিয়ান। তাদের নেতৃত্ব ছিল এমন এক সিপাহসালারের হাতে, ইতিহাস যাকে হিরো আখ্যায়িত করেছে। সামরিক শক্তি, উন্নত অস্ত্র-সস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অপরাজেয় মনে হলেও মানসিক দিক থেকে তারা ছিল অত্যন্ত ভীরু ও কাপুরুষ। অপর দিকে মুসলিম বাহিনী সামরিক শক্তিতে দুর্বল হলেও তাদের মানসিক শক্তি ছিল পর্বতসম। প্রত্যেকটি সৈনিক যুদ্ধজয়ের নেশায় টগবগ করছিল। যুদ্ধজয়ের তামান্না আর আত্মোৎসর্গের স্পৃহাই বলে দিচ্ছিল, কোন শক্তিই তাদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।

মুসলিম বাহিনী লড়াই করছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য, আর আন্দালুসিয়ার বাহিনী লড়াই করছিল বাদশাহর ক্রোধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য। মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হুঙ্কার ছেড়ে প্রবল বিক্রমে শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের এই রণহুঙ্কার অন্তরের অন্তস্থল থেকে বের হয়ে আসত। এই রণহুঙ্কারের মাঝে ভীতি সঞ্চারণকারী যে প্রভাব ছিল, তা হল আল্লাহর নাম। আন্দালুসিয় বাহিনীর এমন কোন রণহুঙ্কার ছিল না। তারা শুধু। বলত, ‘আন্দালুসিয়ার বাদশাহ দীর্ঘ জীবি হোক। এটা ছিল এক নিষ্প্রাণ রণহুঙ্কার। আপন সৈনিকদের মাঝে যুদ্ধ-উন্মাদনা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে এই রণহুঙ্কারের কোন ভূমিকাই ছিল না।

***

সবুজে ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক নগরী কার্টিজা। প্রকৃতি যেন তার চতুর্দিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। তখনও পূর্ণরূপে ভোরের আলো ফোটেনি। দুর্গ প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে এক সৈনিক চিৎকার করে ঘোষণা করল, ঐ তো ওরা এসে গেছে।’

মানুষের মুখে মুখে মুহূর্তের মধ্যে এই ঘোষণা গোটা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি করে ছোটাছুটি করতে শুরু করল।

দুর্গপতি দৌড়ে দুর্গ-প্রাচীরের উপর এসে দাঁড়াল। সে দেখতে পেল, মুসলিম বাহিনী সুতীব্র বেগে দু লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। দুর্গপতি ভাবতে লাগল, এই সেই বাহিনী, যারা থিয়োডুমিরের মতো অভিজ্ঞ জেনারেলকে পরাজিত করেছে। থিয়োডুমির কিছুক্ষণের জন্য এই দুর্গেও আশ্রয় নিয়েছিল। সে এমনভাবে যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছিল যে, দুর্গপতি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সে দেখতে পেল, সেই জিন-ভূতের বাহিনী এখন তার দুর্গ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।

‘দুর্গের সকল ফটক ভালোভাবে বন্ধ করে দাও।’ দুর্গপতি প্রাচীরের উপর থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দিল। ফটকের পিছনে সকলেই প্রস্তুত থাক।’

নির্দেশ ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে তীরন্দাজ বাহিনী ও বর্শা নিক্ষেপকারী দল দুর্গপ্রাচীরের উপর আবস্থান গ্রহণ করল। দুর্গের ফটক ভিতর থেকে মজবুতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হল। প্রত্যেক ফটকের পিছনে বিপুল সংখ্যক সৈন্য পজিশন নিয়ে দাঁড়াল।

মুসলিম বাহিনী দ্রুতগতিতে দুর্গের নিকট পৌঁছে দুর্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার ভাষায় ঘোষণা করালেন, দুর্গের ফটক খোলে দাও। অস্ত্র সমর্পণ কর। তোমাদের কারো তীরের আঘাতে আমাদের কোন সৈনিক যদি আহত বা নিহত হয়, কিংবা দুর্গের ফটক ভেঙ্গে যদি আমাদেরকে দুর্গে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে তোমাদের প্রত্যেক সৈন্যের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তোমরা নিজেরাই যদি ফটক খোলে দাও তাহলে তোমাদের সাথে অত্যন্ত উত্তম আচরণ করা হবে।

মনে রেখো, আমরা দীর্ঘ দিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকব না। আজকের সূর্য তখনই অস্ত যাবে যখন দুর্গ আমাদের করতলগত হবে।

‘তোমাদের সূর্য তো সেদিনই অস্ত গেছে, যেদিন তোমরা আন্দালুসিয়া আক্রমণ করেছ।’ দুর্গপ্রচীরের উপর থেকে দুর্গপতির গলধগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো। সাহস থাকলে নিজেরাই দুর্গের ফটক খোলে নাও।

তারিক বিন যিয়াদ তাঁর নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন মনে করলেন না। সাথে সাথে তিনি নির্দেশ দিলেন,

‘দুর্গ আক্রমণ কর, দুর্গের রক্ষাপ্রাচীর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দাও।’

মুসলিম বাহিনী দুর্গ আক্রমণ করার অর্থ ভালোভাবেই বুঝতেন। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই এক দল সৈনিক কুঠার ও হাতুরী নিয়ে দুর্গের প্রধান ফটক লক্ষ্য করে ছোটে গেল। প্রাচীরের উপর থেকে তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হল। চতুর্দিক থেকে বর্শা ছুটে আসতে লাগল।

বার্বার যোদ্ধারা তীরবৃষ্টির কোন পরোয়াই করত না। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শা, আর তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে সম্মুখ দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

দুর্গের ফটক আক্রমণকারী বাহিনীর পিছনে তীরন্দাজ বাহিনী প্রস্তুত ছিল। তাদের ধনুক অত্যন্ত মজবুত ছিল। এ সকল ধনুক দ্বারা বহুদূরের লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব ছিল। ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের অভ্যন্তরে ঢুকে যেত। এ জাতীয় ধনুক পরিচালনার জন্য বিশেষ দৈহিক শক্তির প্রয়োজন হত।

মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী দুর্গপ্রাচীরের উপর অবস্থানরত তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীদের লক্ষ্য করে সজোরে তীর ছুঁড়তে লাগল। তাদের নিক্ষিপ্ত তীরে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন সৈনিক দুর্গপ্রাচীর থেকে নিচে পড়ে গেল। আর অন্যরা মাথা নিচু করে আত্মরক্ষা করল।

দুর্গের ফটক ছিল চারটি। সকল ফটকের উপর বার্বার যোদ্ধারা এক যোগে আক্রমণ রচনা করল। তুমুল তীরবৃষ্টি আর ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শার আক্রমণ–কোন কিছুই তাদের নিবৃত রাখতে পারছিল না। তারা বিপুল বিক্রমে দুর্গের সকল ফটকের উপর কুঠার আর হাতুরীর সাহায্যে অনবরত আঘাত হেনে চলল।

এটা ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ। সাধারণত এভাবে দুর্গ আক্রমণ করা হয় না। কারণ, কোন সেনাপতিই তার অধীনস্থ যোদ্ধাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিতে চান না। কিন্তু তারিক বিন যিয়াদের ধরনই ছিল ভিন্ন। তাঁর নীতি হল, তুমি নিজেই যদি শত্রুর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে যাও তাহলে সকল বিপদাশঙ্কাই বিদূরীত হয়ে যাবে।

তারিক বিন যিয়াদের শক্তির উৎস ছিল তাঁর অন্তর। যে অন্তরে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম নিয়ে কাফেরদের মোকাবেলায় জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পবিত্র নাম তার হৃদয়ের গভীরে স্বমহিমায় প্রথিত ছিল। স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বিজয়ের সুসংবাদ ছিল তাঁর শক্তির আরেক উৎস।

মূলত স্বপ্নের এই সুসংবাদ আল্লাহ তাআলার নির্দেশেরই পুনরাবৃত্তি ছিল। তিনি পবিত্র কালামে ইরশাদ করেছেন, “যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা দুইশ কাফেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে। আর যদি তোমাদের মধ্যে দুইশ জন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা এক হাজার কাফেরকে পরাজিত করতে পারবে।” (সূরা আনফাল : ৬৫, ৬৬)।

তারিক বিন যিয়াদ এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যার অন্তরে পবিত্র কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে কেবল রাসূলুল্লাহর সুসংবাদবাণীই তাঁর শক্তির উৎস ছিল না; বরং পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত অমোঘ বাণীও তাঁর প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণের সামনে কার্টিজার সৈন্যরা টিকতে পারল না। সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। অল্প সময়ের মধ্যে তারা একটি ফটক ভেঙ্গে ফেলল। তারপর বাধাপ্রাপ্ত পানির ঢলের ন্যায় মুসলিম বাহিনী ভাঙ্গা ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। দুর্গের সিপাহীরা সামান্য সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলল, কিন্তু তাদের প্রতিরোধযুদ্ধে বিজয়ের জন্য কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তারা শুধু দুর্গপতির নির্দেশক্রমে যুদ্ধ করছিল। দুর্গপতি নিজ সৈনিকদের মনোভাব বুঝতে পারল। বিপুল পরিমাণ সৈনিকের জীবন ধ্বংস হওয়ার পূর্বেই সে অস্ত্র সমর্পণ করল।

আন্দালুসিয়ার বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর সর্বপ্রথম এই ঘোষণা প্রচার করা হল যে, কোন লোক যেন পালিয়ে না যায়। তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর পূর্ণ হেফাযত করা হবে।’

লোকজনের মাঝে ভাগ-দৌড় শুরু হয়ে গেল। মা-বাবারা যুবতী মেয়েদের লুকিয়ে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যাদের ঘরে ধন-দৌলত ছিল তারা সেই ধন-দৌলত একত্রিত করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে লাগল। তারিকের নির্দেশে পলায়নের সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হল।

তারিক বিন যিয়াদের দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল, ‘সকল সৈন্য যেন অস্ত্র সমর্পণ করে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি এই নির্দেশও জারি করেন যে, ‘নগরবাসীদেরকে এই মর্মে সতর্ক করা হচ্ছে, তারা যেন কোন সিপাহীকে তাদের ঘরে আত্মগোপন করার সুযোগ না দেয়। কেউ যদি এই ভুল করে তাহলে তার ঘরের সকল সদস্যকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রেফতার করা হবে, আর যাবতীয় সহায়-সম্পদকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বিবেচনা করা হবে।’

এমনিভাবে কার্টিজার মজবুত দুর্গ খুব অনায়াসে মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। সকল যুদ্ধবন্দীকে কার্টিজার দুর্গেই বন্দী করে রাখা হল।

***

কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হওয়ার কারণে আশপাশের বিশাল-বিস্তৃত উপত্যকা তারিক বিন যিয়াদের দখলে এসে গেল। এই উপত্যকার নাম রাখা হল, লাকা। সবুজ-শ্যামল দৃষ্টিনন্দন এই উপত্যকার সীমানা কয়েক মাইল দূরবর্তী এক নদীর সাথে গিয়ে মিশেছে। নদীর নাম গোয়াডিলেট।

তারিক বিন যিয়াদ দুর্গে অবস্থান না করে নদীর তীরে তবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে মুসলিম বাহিনীকে সদা সতর্ক ও চৌকস থাকতেও বললেন।

বিজিত দুর্গ থেকে এতো বিপুল পরিমাণ ঢাল-তলোয়ার, আর তীর-বর্শা হস্তগত হল যে, সেগুলো অনেক বড় ও দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট ছিল। সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল দুই হাজার ঘোড়া। তারিক বিন যিয়াদ এ সকল ঘোড়া এমন সব বাহাদুর সিপাহীদের মাঝে বণ্টন করে দেন, যারা প্রকৃত শাহসওয়ার ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাদের প্রত্যেককে তারিক বিন যিয়াদ কমান্ডো যুদ্ধের বিশেষ প্রশীক্ষণও প্রদান করেন।

তারিক বিন যিয়াদ প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাচ্ছিলেন। তিনি চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য নিজ বাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন। তাঁর হাতে ছিল মাত্র বার হাজার সদস্যের এক সাধারণ বাহিনী। এই বাহিনীর মাধ্যমেই তাঁকে এক লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে হবে। ইতিপূর্বের দুটি যুদ্ধে তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার বাহিনীর নিকট যে অস্ত্র-সস্ত্র আছে, তা অত্যন্ত উন্নত। তাদের প্রত্যেকের দেহে আছে লৌহবর্ম, আর মাথায় শিরস্ত্রাণ। এক লাখ সৈন্যের সংখ্যাটা এতো বেশি যে, মাত্র বার হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনীকে পদপিষ্ট করে মেরে ফেলা তাদের জন্য একেবারেই সহজ। এই বিশাল বাহিনীকে একমাত্র রণকৌশলের মাধ্যমেই পরাজিত করা সম্ভব। তারিক বিন যিয়াদের একমাত্র চিন্তা ছিল, তিনি কী এই বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

‘ইবনে যিয়াদ!’ তারিক বিন যিয়াদের চেহারায় দুশ্চিন্তার চিহ্ন দেখে জুলিয়ান একদিন তাঁকে বললেন। আপনার রাসূল তো আপনাকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েই দিয়েছেন। তারপরও আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের থেকে যে দুআ আপনি পাচ্ছেন, তাও আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করি, এ কথা আপনি বলবেন না যে, যারা মুসলমান নয়; আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করেন না। আল্লাহ অবশ্যই তার নির্যাতিত বান্দার আহাজারি শুনেন; তাদের দুআ কবুল করেন।

আপনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও শহরবাসীদের সাথে আরও বেশি উত্তম আচররণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বলেছেন, মুসলিম বাহিনীকে এই আস্থা অর্জন করতে হবে যে, তারা শহরবাসীদের ইজ্জত-আবরুর রক্ষক; তক্ষক নয়। মানুষ হিসেবে সব ধরনের অধিকার তারা প্রাপ্ত হবে। তারা যা উপার্জন করবে, তা তাদের নিজস্ব সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। তবে সামর্থ অনুযায়ী সকলকে নিরাপত্তাকর আদায় করতে হবে।

আপনি তো জানেন, রডারিকের রাজত্বে সাধারণ মানুষকে কীট-পতঙ্গের মতো মনে করা হয়। এখানে সেই ব্যক্তিই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, যার কোন সরকারী পদ বা পদবী আছে। কিংবা আছে বিশাল ভিত্ত-বৈভব। যার রূপসী কন্যা-সন্তান আছে সে তার কন্যা-সন্তানকে এই ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় যে, বাদশাহ বা কোন সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা যদি তার কন্যার রূপ-লাবণ্য সম্পর্কে জানতে পারে তাহলে তার কন্যার সতীত্ব রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সামিরিক বাহিনীর লোকেরা সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেগার খাটতে বাধ্য করে।

ইবনে যিয়াদ! এই কার্টিজা ও তার আশপাশের যে সকল এলাকা আপনার করতলগত হয়েছে, সে সকল এলাকার লোকজন হানাদার বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেসব এলাকা মানবশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, হানাদার বাহিনীর প্রধান হয়তো কোন রাজ্যের বাদশাহ হবে এবং রডারিকের মতোই জালিম হবে। তার বাহিনী বিজিত এলাকায় সুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ চালাবে। যুবতী মেয়েদের ইজ্জত-আবরু নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, তাদেরকে দাসী-বান্দি বানাবে। জবরদস্তী গৃহপালিত পশু নিয়ে যাবে। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ছেলে-মেয়ে ও গৃহপালিত পশু নিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। পরে যখন জানতে পারল যে, হানাদার বাহিনী তাদের ঘরবাড়ির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না তখন তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে এলো।

ইবনে যিয়াদ। এ সকল নির্যাতিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষও আপনার সাথে আছে। তারা সকলেই আপনার বিজয়ের জন্য আপন প্রভুর নিকট প্রার্থনা করছে। তারা সুবিশাল আকাশের দিকে হাত প্রসারিত করে ফরিয়াদ করছে, রডারিকের বাদশাহী যেন ধ্বংস হয়ে যায়, তার সালতানাত যেন বরবাদ হয়ে যায়।

‘বিজিত এলাকার লোকদের সাথে মানবোচিত আচরণ করার নির্দেশ, আমার মনগড়া কোন নির্দেশ নয়। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এই নির্দেশ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ।

***

আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে ঝড়ের গতীতে এগিয়ে আসছিল। রডারিক রাজধানী টলেডোতে অবস্থান না করে সামনে এগিয়ে চলছিল। সে পূর্বেই পয়গাম পাঠিয়ে ছিল যে, সে টলেডোর শাহীমহলে অবস্থান করবে না। শহরের বাহিরে সামান্য সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি করবে। সে টলেডোর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছার পূর্বেই সেখানে সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, পারিষদবর্গ ও খোশামদীদের এক বিরাট অংশ তর আগমনের অপেক্ষা করছিল। তাদের মাঝে পরাজিত জেনারেল থিয়োডুমিরও উপস্থিত ছিল। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে রডারিক সেখানে এসে উপস্থিত হল। থিয়োডুমির আগত লোকদের সম্মুখভাগে দাঁড়ানো ছিল। তার প্রতি দৃষ্টি পড়তেই র.রিক বলে উঠল,

‘তুমি কি নিজেকে এর উপযুক্ত মনে কর যে, আমি তোমার চেহারা দেখব? নিজ বাহিনীর চেয়েও অর্ধেক সংখ্যক বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়ে আমাকে এখন স্বাগত জানাতে এসেছ? ধিক তোমাকে।

‘সম্মানিত শাহানশা, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি একা লড়াই করে না। থিয়োডুমির রডারিকের গোসা বরদাশত করে বলল। আমি আমার বাহিনীর পূর্বে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসিনি। আমার কসুর শুধু এতটুকুই যে, আমি সেখানে বেঘোরে মরার জন্য বা যুদ্ধবন্দী হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকিনি।

রডারিক আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে তাকে খুব তিরস্কার করল। থিয়োডুমিরও কোন সাধারণ জেনারেল ছিল না। রডারিক নিজেও তার শক্তি-সাহস, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করত। থিয়োভুমিরও রডারিকের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ছিল। সে আহত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠে বলল,

‘আন্দালুসিয়ার মহামান্য শাহানশা। আপনি শাহীমহলে গিয়ে আরাম করুন, আর এই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর দায়িত্বভার আমার হাতে ন্যস্ত করুন। আমি এই হানাদার বাহিনীকে একদিনে পদপিষ্ট করে সমুদ্রতীর পর্যন্ত পৌঁছে যাব, তারপর হানাদার বাহিনী যে রাজ্য থেকে এসেছে সেই রাজ্যে আপনার বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীন করে তবে ক্ষান্ত হব। আমাকে তিরস্কার করার পূর্বে মহামান্য শাহানশা সে সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যান, যে সংখ্যক সৈন্য আমার সাথে ছিল। আমার সাথে ছিল মাত্র পনের হাজার সৈন্যের এক ক্ষুদ্র বাহিনী। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে তো যে কোন অযোগ্য ও কাপুরুষ জেনারেল বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

কোন এক গোপন রহস্যের কারণে রডারিক থিয়োড়মিরের প্রতি কিছুটা দুর্বল ছিল। অন্যথায় রডারিকের মতো জালিম ও নিষ্ঠুর বাদশাহ থিয়োডুমিরকে এই গোস্তাখির জন্য অত্যন্ত কঠোর শান্তি প্রদান করত। কিন্তু সে থিয়োড়মিরের কথার কোন উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

রডারিকের দৃষ্টি মেরিনার উপর এসে স্থির হল। মেরিনা শাহীমহলের ভিতর রডারিকের মনোরঞ্জনের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। রডারিক মেরিনার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সাথে সাথে মেরিনা সসম্মানে তাকে কুর্নিশ করে নিবেদন করল, ‘আমার প্রতি আঁহাপনার কি কোন নির্দেশ আছে?

‘তোমার জন্য কি নির্দেশ-তুমি কি তা জান না? তোমার পুস্পকাননে নতুন কোন ফুলের আগমন ঘটেছে কি?

‘জী, জাহাপনা, মেরিনা বলল। অর্ধপ্রস্ফুটিত অপরূপ রূপসী এক গোলাপের আগমন ঘটেছে। জাহাপনা আমিও কি আপনার সাথে আসব?

‘ঐ গোলাপকে সাথে নিয়ে তুমিও চলে এসো।’ রডারিক বলল। সে ছাড়া আরও কোন গোলাপ থাকলে তাদেরকেও নিয়ে এসো। মেয়েদের ঘোড়াগাড়ি পিছনে রয়েছে।’

মেরিনা রডারিকের প্রতি গভীরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর সম্মান প্রদর্শন করে সেখান থেকে চলে গেল।

রডারিকের আগমনের পূর্বেই সেখানে তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। তাঁবুর উপর মহামূল্যবান শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তাঁবুর ভিতর মখমলের গালিচা বিছিয়ে তার উপর ময়ূর সিংহাসনের ন্যায় শাহীকুরসী রাখা হয়েছে। এই তাঁবুকেই রডারিকের দরবার কক্ষ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। রডারিক ঘোড়া থেকে নেমে জাঁকজমকপূর্ণ সেই দরবারকক্ষে উপস্থিত হল। দরবারকক্ষে প্রবেশ করার সময় রডারিক তার সাথে আগত এক ব্যক্তির কানে কানে কি যেন বলল।

‘সে এখানেই উপস্থিত আছে, জাহাপনা!’

ঐ ব্যক্তি রডারিকের কথার উত্তর দিয়ে পিছনে আগত লোকদের মধ্য থেকে এক লোকের নিকট চলে এসে তাকে বলল, ‘বাদশাহ নামদার আপনাকে ডাকছেন।

রডারিক এই ব্যক্তি সম্পর্কেই জানতে চাচ্ছিল। এই ব্যক্তি হল, একজন নামকরা জাদুকর। তার বিশেষ ধরনের পোশাক, আর বার্ধক্যপীড়িত গৌরবর্ণের চেহারার মাঝে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার বয়স সত্তরের উপরে হবে বলেই মনে হচ্ছে। মুখভরা দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর কাঁধ থেকে টাখনু পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা জুব্বার মাঝে তাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।

তার মাথায় আছে গোল টুপি, আর গলায় সবুজ রঙের মোটা মোতির মালা। ডান হাতে ছোট ছোট মোতি দিয়ে বানানো তছবিহ, আর বাম হাতে গাড় বাদামী রঙের আঁকাবাঁকা লাঠি। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা সেই লাঠির উপরের অংশে সাপের ফনাতুলা মাথার আকৃতি। তার কমর লাল রঙের কাপড়ের বেল্ট দিয়ে বাঁধা। কিন্তু রডারিক তাকে দেখে কোন রকম প্রভাবিত হল না এবং তাকে কুরসীতেও বসতে বলল না; বরং দাঁড় করিয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করল,

‘বোসজান, তুমি কি দেখতে পেয়েছ, ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে?

‘বাদশাহ নামদার! জাদুকর বোসজান বলল। ভবিষ্যতের অবস্থা আমার কাছে অস্পষ্ট ও মেঘাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। যা দেখতে পাই তা কখনও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, আবার কখনও সামান্য স্পষ্ট হয়।

‘তুমি কী দেখতে পাও।’ রডারিক বলল।

‘দুর্গের মাঝে আপনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, আমি অনেকটা সে রকমই দেখতে পাই।’ জাদুকর বোসজান বলল।

‘দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, তা কি তোমার পূর্ণরূপে মনে আছে?’ রডারিক বলল।

‘মহামান্য শাহানশা, আপনি যা বলেছেন, তা আমার পূর্ণরূপে মনে আছে। জাদুকর বলল। আপনার এই গোলামের স্মৃতিশক্তি অতল সমুদ্রের ন্যায়।’

‘তোমাকে যা জিজ্ঞেস করছি শুধু তার উত্তর দাও। রডারিক শাহী গাম্ভির্যের সাথে বলল। ফালতু কথা শুনার সময় আমার নেই। দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমাকে নিয়ে ছিলাম তা যদি তোমার স্মরণ থেকে থাকে তাহলে বল, তা বাস্তব রূপ নিবে না তো?

‘এক লাখ ফৌজের সামনে কোন বাস্তবতাই টিকতে পারে না। জাদুকর বলল। এই বিশাল বাহিনীর তুলনা শুধু সামুদ্রিক ঝড়ের সাথেই হতে পারে, বালির বাঁধ যাকে আটকে রাখতে পারে না।

‘আরেকটি কথা, অল্পবয়স্কা একটি মেয়েকে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি।’ রডারিক বলল।

‘শাহানশা! তাকে কি অবস্থায় দেখতে পান?’ জাদুকর বলল।

‘মস্তকহীন অবস্থায় সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। রডারিক বলল। ‘ক্ষাণিক পরেই দেখা যায়, তার শরীরে মাথা আছে। সে মিট মিট করে হাসছে, আর আমাকে দেখছে। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণপর মেয়েটির মুখের কথা শুনতে পায়, সে ঘৃণাভরে আমাকে বলে, “তোর রাজত্বের উপরও ঘোড়া দৌড়ানো হবে। তোর নাম-নিশানাও থাকবে না।” কথা বলার সময় মেয়েটির ঠোঁট নড়ে না, কিন্তু আওয়াজ শুনা যায়।

‘শাহানশা কি ঐ মেয়েটিকে চিনেন? এমন কোন মেয়ে কি আপনার সান্নিধ্যে এসেছে?’ জাদুকর জিজ্ঞেস করল।

‘হা, পাম্পালুনায় এমন একটি মেয়ে আমার সান্নিধ্যে এসেছিল। রডারিক বলল। সে বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে। তার বয়স ছিল খুবই কম। আমি তাকে আমার কাছে রেখেছিলাম। তারপর এক গোস্তাখির কারণে তলোয়ারের এক আঘাতে ধড় থেকে তার মাথাটা আলদা করে ফেলি।

রডারিক পালুনার বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে উস্তোরিয়া সম্পর্কে পূর্ণ ঘটনা বলার পর বলল,

‘এটা কি কোন খারাপ লক্ষণ? তাছাড়া আমার মতো অকুতোভয় ব্যক্তিও ঐ এতটুকুন মেয়েকে স্বপ্নে দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি।

‘শাহানশা! লক্ষণ ভাল নয়।’ জাদুকর বলল। ছোট বাচ্চাদের বন্দুআ তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। যিনি সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সবার সাথে ইনসাফ করেন।’

‘আমি জানি, তোমার হাতে এমন ক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তুমি কুলক্ষণের প্রভাব নষ্ট করতে পার।’ রডারিক বলল। এটা সেই জাদুর প্রভাব, যার উদ্ভাবক হল ইহুদি সম্প্রদায়। আর তুমি সাধারণ কোন ইহুদি নও, বরং তুমি ইহুদিদের ধর্মগুরু এবং একজন বিখ্যাত জাদুকরও বটে। আমি তোমাকে শাহীমহলে যে মর্যাদা দান করেছি, তার উপযুক্ত কোন ইহুদিকে আমি মনে করি না। কেবল তুমিই হলে একমাত্র ইহুদি, যাকে আমি এত সম্মান দান করেছি।’

‘মহামান্যের এই অধম গোলাম কি এ সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত নয়? এতটুকু ইজ্জত কি তার প্রাপ্য নয়?’ জাদুকর বলল।

‘নিশ্চয়!’ রডারিক বলল। আমি তোমাকে এর চেয়েও বড় পুরস্কার দেব। তুমি এখনই এমন কোন তদবির কর, যেন ঐ মেয়ে স্বপ্নে আমার কাছে না আসে, আর আমার অন্তর হতে যেন তার ভয় বিদূরিত হয়ে যায়। এমন যেন না হয় যে, আমি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলায় গেলে আমার অন্তরে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।

এক পোর্তগিজ ঐতিহাসিক ডিলোমেগো লেখেন, রডারিক অত্যন্ত সাহসী বাদশাহ ছিল। যুদ্ধের ময়দানে সে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা। কিন্তু ঐ কিশোরীকে হত্যা করার পর থেকে তার মাঝে ভয় বাসা বাঁধে।

বোসজান জাদুবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। সে গণনা করে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারত। আর এ কারণেই রডারিক তাকে শাহীমহলে জায়গা দিয়েছিল।

রডারিক বোসজানকে বলল, ‘স্বপ্নে দেখা ঐ মেয়েটির ব্যাপারে আমাকে নির্ভয় করে দাও এবং তোমার জাদুর প্রভাবে ঐ অশুভ লক্ষণকে শুভ করে দাও।

জাদুকর বোসজান রডারিকের মাথা থেকে মুকুট নামিয়ে নিজের কোলে রাখল। তারপর রডারিকের মাথা নিজের হাতের মাধ্যে নিয়ে তার চেহারাটা সামান্য উঁচু করে ধরলো। বোসজান রডারিকের চোখে চোখ রেখে তার দুই হাতের মধ্যমা আঙ্গুলে পরিহিত এক বিশেষ ধরনের আংটি দিয়ে রডারিকের কপালে ঘষতে লাগল। অল্প কিছুক্ষণ এমনটি করে সে তার হাত সরিয়ে নিল। রডারিক তার মাথা ডানে-বায়ে ঘুরিয়ে বলল,

‘আমার কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।

‘আমি জানি, শাহানশা! বোসজান বলল। এখন ঐ মেয়ে আর শাহানশাকে স্বপ্নে বিরক্ত করবে না। ঐ মেয়ের কোন চিন্তাই শাহানশাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারবে না।’

‘আর সেই অশুভ লক্ষণের কি হবে?’ রডারিক বলল। “তুমি না বললে, লক্ষণ শুভ নয়–এর কি বিহিত করবে?

‘শাহানশা কি আমাকে একটি আনকোরা কুমারী মেয়ে দিতে পারবেন? বোসজান বলল।

‘একটি কেন? একশটির কথা বল।’ রডারিক বলল। কোন বয়সের মেয়ে চাই তোমার?

‘একুশ বছরের চেয়ে কম হতে হবে। বোসজান বলল। আমার নিজের কোন প্রয়োজনে আমি এই মেয়েকে চাচ্ছি না। এই মেয়েকে জীবিত রাখা হবে না। আজকের রাতই হবে তার জিন্দেগির শেষ রাত। আমি তার বুক ফেড়ে হৃদপিণ্ড ও আরো কিছু জিনিস বের করব। তার পর সারা রাত তার উপর জাদু প্রয়োগ করব।’

রডারিক তৎক্ষণাৎ মেরিনাকে ডেকে পাঠাল। মেরিনা আসতেই রডারিক তাকে জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি না একটি মেয়ের কথা বলেছিলে? তুমি বলেছিলে, তার বয়স খুবই কম। সে অর্ধপ্রস্ফুটিত এক কলি। তার বয়স কত হবে?

‘ষোল-সতের বছর হবে, শাহানশা’ মেরিনা বলল।

‘ঐ মেয়েকে আজ রাতে এই জাদুকরের নিকট পৌঁছে দেবে।’ রডারিক বলল।

‘আমার প্রতি শাহানশার নির্দেশ ছিল, আমি যেন শাহানশার সফরসঙ্গী হই।’ মেরিনা বলল।

‘আমার সাথে আসার কোন প্রয়োজন নেই। রডারিক বলল। বোসজান যেখানে বলবে, আজ রাতেই তুমি সেই মেয়েকে সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছে যাবে।

রডারিক বোসজানের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হল মেরিনা। একে তুমি সাথে করে নিয়ে যাও এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে বল, তাকে কী করতে হবে।

রডারিকের কথা শেষ হতেই জাদুকর চলতে শুরু করল। মেরিনাও তার অনুসরণ করল।

***

রাতের প্রথম অংশ অতিবাহিত হয়েছে অনেকক্ষণ হয়। মেরিনা অত্যন্ত রূপসী একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ ইহুদি জাদুকর বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল। রডারিকের নির্দেশে মেরিনা যখন বৃদ্ধ জাদুকরের সাথে মহলে ফিরে এলো তখন সে জাদুকরকে বলল, শাহানশা আপনাকে অনেক বড় ও সুন্দর একটি উপহার দিয়েছেন। এই মেয়েকে আমি শাহানশার জন্য উপঢৌকনরূপে এনেছিলাম। কথাছিল সে শাহানশার সাথে যাবে।

‘তুমি কি কখনও আমার কামরায় কোন মেয়েকে আসতে দেখেছ?’ বৃদ্ধ জাদুকর বলল। এই বয়সে যুবতী মেয়েদেরকে দিয়ে আমি কি করব? এই মেয়েকে অন্য একটি উদ্দেশ্যে এখানে আনা হয়েছে। রাতে এ ব্যাপারে তোমাকে সবকিছু বলব। তুমি এ কাউকে কিছু বলতে পারবে না। যদি কাউকে কিছু বল তাহলে মৃত্যুই হবে তোমার শেষ পরিণতি। আশা করি, বেঘোরে মারা পড়াটা তুমি কিছুতেই পছন্দ করবে না।’

কিছুক্ষণ পর মেরিনা ঐ মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ জাদুকরের ঘরে প্রবেশ করল। মেয়েটি বৃদ্ধের ঘরে প্রবেশ করতেই ভয়ে সড়জড় হয়ে গেল। সে মেরিনার আঁচল আকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধের ঘরে একটি টেবিলের উপর তিনজন মৃত মানুষের মাথার খুলি রাখা আছে। ঘরের এক দিকের দেওয়ালে মানুষের একটি কঙ্কাল ঝুলছে।

বৃদ্ধ জাদুকর একটি লাকড়ীর বাক্সের ঢাকনা খুললে সেখান থেকে দুটি কালো সাপ মাথা উঁচিয়ে ফনা তুলে ফুসফুস করতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে মেয়েটি চিৎকার করে উঠল। বোসজান সাপের বাক্সে কি যেন নিক্ষেপ করে সাথে সাথে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।

কামরা এমন দুর্গন্ধময় যে, মনে হচ্ছে এখানে কোন পচা-গলা লাশ আছে। কিন্তু এখানে কোন লাশ নেই; বরং পঁচা গলা লতাগুল্ম, আর রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে এমন একটা দুর্গন্ধ পুরো কামরার মাঝে ছড়িয়ে আছে যে, নাড়িভূঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম হচ্ছে।

বোসজান সেই কামরায় বিভিন্ন পদার্থ জ্বালিয়ে রেখেছিল। কামরার মাঝে এমন একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ছিল যে, ভয়ে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে। ছোট-বড় অসংখ্য পুঁটলি, আর বিভিন্ন আকৃতির বাক্স বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

এই সেই বোসজান, যাকে গৌরবর্ণের চেহারা, দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর পরিচ্ছন্ন লম্বা জুব্বার কারণে অত্যন্ত সম্মানী, বিজ্ঞ, আর আত্মমর্যাদাশীল মনে হত। এই পুঁথিগন্ধময় কামরায় সেই তাকেই অত্যন্ত রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।

বোসজান পার্শ্ববর্তী আরেকটি কামরার দরজা খুলে মেরিনাকে বলল, এই মেয়েকে এখানে বসিয়ে রেখে তুমি আমার কাছে চলে এসো।’

মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে সেই কামরায় প্রবেশ করল। এই কামরাটি অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কামরার এক দিকে খুব সুন্দর একটি পালঙ্ক রাখা। পালকের উপর পরিচ্ছন্ন বালিশ, আর সুন্দর পালঙ্কপোশ বিছানো আছে। মেঝেতে মহামূল্যবান গালিচা বিছানো। ছাদের সাথে ঝুলন্ত ফানুসের আলোয় গোটা কামরা ঝলমল করছে। পূর্বের কামরায় পাওয়া গন্ধের মতো তীব্র একটা গন্ধ এই কামরায়ও অনুভব হচ্ছে।

‘কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে?’ মেয়েটি মেরিনাকে জিজ্ঞেস করল। ‘বাদশাহ রডারিক কি এই ব্যক্তি? এতো সেনাবাহিনীর সেই জেনারেলও নয়, যার জন্য তুমি আমাকে নিয়ে এসেছিলে। সেই জেনারেল তো তার বাহিনীর সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে গেছে।’

‘বাদশাহর নির্দেশে সমস্ত পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’ মেরিনা বলল। ‘তোমাকে যে কাজের জন্য আমি এনেছিলাম, তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। কথা ছিল আমিও বাদশাহর সাথে যাব, কিন্তু আমাকে এখানে থাকতে বলা হয়েছে।’

‘কিন্তু কেন? মেয়েটি বলল। আমি দুর্গন্ধযুক্ত এই কামরায় ঐ বৃদ্ধের সাথে কিছুতেই থাকতে পারব না। তুমি আমার বাবাকে যে টাকা দিয়েছ তা ফিরিয়ে নিয়ো, আমি চললাম।’

‘জলদি এসো, মেরিনা! পাশের কামরা থেকে বোসজান বলল। মেয়েটিকে ওখানেই থাকতে দাও।

‘ভয় পেয়ো না।’ মেরিনা মেয়েটির কানে কানে বলল। আমি তোমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করব।’

এ কথা বলে মেরিনা পাশের কামরায় চলে গেল।

***

‘আমি জানি, তুমি একজন ইহুদি। জাদুকর বোসজন বলল। হয়তো তুমিও জান, আমি একজন ইহুদি। আমাকে তোমার সহযোগিতা করতে হবে। বাদশাহ রডারিকের বিজয়ের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটা কাজ করতে হবে। আমার এসব কাজ দেখে তোমার ভয় পেলে চলবে না।’

‘কোন ইহুদির উচিৎ নয় রডারিকের বিজয়ের জন্য কিছু করা। মেরিনা বলল। ‘এই বিপুল সংখ্যক সৈন্যের মাধ্যমে তিনি অবশ্যই বিজয় লাভ করবেন।’

‘আমার কাজে নাক গলাতে এসো না। বেসিজান মেরিনাকে ধমকের সুরে বলল। বাদশাহ রডারিকের জন্য দুটি লক্ষণ খুবই অশুভ। সেই অশুভ লক্ষণের প্রভাব অবশ্যই বিদূরিত করতে হবে।’

‘শুনেছি, হানাদার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মাত্র বার হাজার। মেরিনা হাসতে হাসতে বলল। বাদশাহ নামদারের এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীতে শুধু অশ্বারোহীর সংখ্যাই তো বার-তের হাজার। বিজয় আমাদের বাদশাহরই হবে। সুতরাং আপনার এই কষ্ট স্বীকার করার কোন প্রয়োজন নেই। কোন রকম কষ্ট স্বীকার করা ছাড়াই আপনি পুরস্কার পেয়ে যাবেন।

‘আমি যা জানি তুমি তা জান না। বোসজান বলল। ‘আমার কথা শোন, ঐ মেয়েকে আমি বিশেষ পদ্ধতিতে হত্যা করব। সে যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে তখন তার বুক চিড়ে হৃদপিণ্ড বের করব। তারপর পেট ফেড়ে আরও দুটি অঙ্গ বের করব। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমি জাদু প্রয়োগ করব। আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে। আমার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তোমাকে এই লাশ গোম করে ফেলতে হবে। এই মহল থেকে লাশ গেম করা কোন কঠিন কাজ নয়। এখান থেকে প্রায়ই লাশ গোম করা হয়ে থাকে। কীভাবে লাশ গেম করতে হবে, আমি তোমাকে তা দেখিয়ে দিচ্ছি।

ভয়ে-আতঙ্কে মেরিনার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল, অনেক কষ্টে সে নিজেকে সংবরণ করে রাখল।

‘যাও, মেয়েটিকে নিয়ে এসো।’ বোসজান বলল। ছলে-বলে-কৌশলে তাকে এখানে নিয়ে আসবে, সে যেন কিছুই বুঝতে না পারে।’

মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় প্রবেশ করে দ্রুত এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। একটি শক্ত মজবুত লাঠি তার দৃষ্টিগোচর হল। সে লাঠিটি উঠিয়ে তার আস্তিনের ভিতর লুকিয়ে রাখল।

‘এখন কি হবে?’ মেরিনাকে দেখতে পেয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল। আমাকে এই নোংরা বুড়োর কাছে রেখে চলে যাচ্ছ বুঝি?

‘ভয় পেয়ো না। মেরিনা বলল। অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ আমাদের করতে হবে। আমাকে সাহায্য কর। চল, এখন বুড়োর কামরায় যাই।

মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল।

‘এসো মা এসো।’ বোসজান মেয়েটির মাথায় হাত রেখে আদর করে বলল। ‘এই টেবিলের উপর বস। ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমার বাবার মতো।

মেয়েটি ভয়ে মেরিনার দিকে ফিরে তাকাল। মেরিনা চোখের ইশারায় তাকে টেবিলের উপর বসতে বলল। জাদুকর বোসজান একেবারে মেয়েটির শরীরের সাথে ঘেসে দাঁড়াল। সে কোন কিছু শুকিয়ে বা সম্মোহনী শক্তির মাধ্যমে মেয়েটিকে হত্যা করতে উদ্যত হল। মেরিনা বোসজানের ঠিক পিছনে দাঁড়ানো ছিল। সে দ্রুত হাতে লাঠি বের করে সজোরে বৃদ্ধ বোসজানের মাথায় আঘাত করল। সে অনবরত আঘাত করেই চলল। বোসজান কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই বেহুশ হয়ে মাটিতে লুঠিয়ে পড়ল।

মেরিনা বোসজানকে চিক্করে শুইয়ে দিয়ে সজোরে তার বুকের উপর চেপে বসল। তারপর দু’হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরল। বোসজান কিছুক্ষণ ছটফট করে অসার হয়ে গেল।

মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় একটা বড়সড় কাঠের বাক্স দেখেছিল। মেরিনা আর ঐ মেয়েটি ধরাধরি করে বোসজানের লাশ ঐ কামরায় নিয়ে গেল। মেরিনা সেই বাক্স খোলে বোসজানের লাশ বাক্সে রেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।

‘এখন দেখব, ওর বাদশাহ বিজয় লাভ করে কীভাবে ফিরে আসে?’ মেরিনা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। চল, মেয়ে! জলদি এখান থেকে বের হয়ে পড়।

‘আমার ভয় করছে। মেয়েটি বলল। এসব কি হচ্ছিল?

‘এই বুড়ো না মরলে এতক্ষণে এখানে তোমার লাশ পড়ে থাকত। মেরিনা বলল। ভয় পেয়ো না, সকালে তোমাকে আমি এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব। ভুলেও কারো সাথে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা করো না।’

ভোর হওয়ার সাথে সাথে উভয়ে জাদুকর বোসজানের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। মেরিনা অতি সংগোপনে মেয়েটিকে তার বাড়ি পৌঁছে দিল। তারপর উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ চলার পর তার মনে হল, সে নিজের জন্য অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছে। তার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে চিন্তা করতে লাগল, রডারিক যদি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় সে ভাববে, বোসজান অশুভ লক্ষণ দূর করার পর হয়তো কারো হাতে নিহত হয়েছে। আর যদি পরাজিত হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় আগুন লাগিয়ে দেবে। সে আলবত ধরে নিবে, জাদুকর বোসজানের মৃত্যুর পিছনে আমার হাত রয়েছে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে মেরিনা সিদ্ধান্ত নিল যে, যত দ্রুত সম্ভব তাকে এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে। এই এলাকার এক আমীর ব্যক্তির সাথে মেরিনার সম্পর্ক ছিল। সে ব্যক্তি ছিল গোথ বংশীয়। মেরিনা তার নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলল,

‘আমি জাদুকর বোসজানকে হত্যা করে এসেছি।’

‘তুমি অতি উত্তম কাজ করেছ।’ গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তি বলল। তুমি একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছ। এখন কী হয়–আমরা তা দেখব।’

‘এমন আশা করা কি ঠিক হবে যে, রডারিক জীবন নিয়ে আর ফিরে আসবে না।’ মেরিনা বলল। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা তো খুবই কম।

‘ধরে নাও, রডারিক জীবিতই ফিরে আসবে।’ লোকটি বলল। “চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সে এক দিক দিয়ে ফিরে আসবে, আর তুমি অন্য দিক দিয়ে এখান থেকে বের হয়ে যাবে। তোমাকে নিরাপদে সিউটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। দুআ কর, আউপাস যেন বেঁচে থাকে। সে যদি বেঁচে থাকে তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাকে তার নিকট পৌঁছে দেব।’

***

আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের মানসিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। বাহ্যিকভাবে সে নিজেকে যতই সাহসী আর দৃঢ় মনোবলের অধিকারী বলে প্রকাশ করুক না কেন, ভিতরে ভিতরে সে একেবারে মুষড়ে পড়েছিল। তাই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর উপরও তার কোন ভরসা হচ্ছিল না। সে জাদু মন্ত্রের আশ্রয় নেওয়াকেই অধিক নিরাপদ মনে করছিল। অপর দিকে মুসলিম বাহিনীর একমাত্র ভরসা, আর আশ্রয়স্থল ছিলেন আল্লাহ তাআলা।

তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীকে পূর্বেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য আটগুনের চেয়েও বেশি সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। প্রত্যেক মুজাহিদকে অন্তত আটজনের সাথে লড়াই করতে হবে। প্রতি দিন ফজরের পর তারিক তার বাহিনীকে সেই স্বপ্নের কথা শুনাতেন, যে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও তিনি পবিত্র কুরআনের সেসব আয়াত পাঠ করে শুনাতেন, যেসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে বিজয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তারিক বিন যিয়াদ কখনও তাঁর বাহিনীকে এই আয়াত পাঠ করে শুনাতেন : ‘আল্লাহর নির্দেশে অনেক ছোট দল বড় দলকে পরাজিত করে থাকে’।  (সূরা বাকারা : ২৪৯)

এই আয়াত তেলাওয়াত করে তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর সৈন্যদেরকে এ কথা বুঝতেন যে, একটি ছোট বাহিনীর সদস্য ও তাদের আমীরের মাঝে কী ধরনের গুণাবলী, এবং কী পরিমাণ ঈমানী শক্তি থাকলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বড় দলের বিপক্ষে বিজয় দান করবেন।

তারিক বিন যিয়াদ এই আয়াতটিও বারবার তেলাওয়াত করে তার বাহিনীকে শুনাতেন : ‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন আমি সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করলাম এবং তোমাদেরকে বাঁচিয়ে দিলাম, আর ফেরাউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে মারলাম।’ (সূরা বাকারা : ৫০)

তিনি তাঁর বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলতেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করেছেন। হযরত মুসা আ. ফেরাউনের জাদুকরদের চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় এমন মুজেযা প্রদর্শন করেছিলেন যে, জাদুকরদের সকল ভেলকিবাজি মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং ফেরাউন হতভম্ব হয়ে পড়ে। এর পর বনী ইসরাঈল যখন মিসর হতে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের সামনে নীলনদ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামনে বিশাল-বিস্তৃত গভীর নদী, আর পিছনে ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে মুসা আলাইহিসসালাম তর লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত হানলেন। সাথে সাথে নদীর পানি সরে গিয়ে রাস্তা বের হয়ে এলো। মুসা আ, তার বাহিনী নিয়ে সে রাস্তা দিয়ে নিশ্চিন্তে নদী পাড় হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সেই একই রাস্তায় ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হল, তখন নদীর উভয় তীরের পানি প্রচণ্ড বেগে এক সাথে মিলিত হয়ে গেল। ফলে ফেরাউন ও তার বাহিনীর সলীল-সমাধি ঘটল।

মুহাজিদ ভায়েরা! আল্লাহ্ তাআলা হযরত মূসা আ. কে চল্লিশ দিনের জন্য আহ্বান করেছিলেন তখন বনী ইসরাঈল তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি গো-বাছুরকে তাদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিয়েছিল। পরিণতিতে তাদের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়।

সুতরাং হে মুজাহিদ ভায়েরা! আজ আমরা যারা ইসলামের জন্য নিজের মাথাকে নাযরানাস্বরূপ পেশ করতে চাই, আমাদের উচিত–পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলারই ইবাদত করব।’

এমনি আরও কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করে তিনি মুজাহিদদেরকে ঈমানের বলে বলিয়ান করে তুলছিলেন এবং তাদের মাঝে জিহাদের স্পৃহা, আর উদ্দীপনা বৃদ্ধি করছিলেন।

তারিক বিন যিয়াদ দিনের বেলা মুজাহিদদেরকে এমন স্থানে নিয়ে যেতেন যে স্থানটি তিনি যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি এমন এক রণাঙ্গনের ছক এঁকে নিয়েছিলেন, যেখানে শক্র-বাহিনীকে পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড ও বিপর্যস্ত করে দেওয়ার মতো রণকৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল। তিনি পাহাড় ও ছোট ছোট টিলার মধ্যবর্তী এমন কিছু জায়গা নির্বাচন করে রাখলেন, যেখানে শত্রুবাহিনীর অগ্রবর্তী দলকে বোকা বানিয়ে শেষ করে দেওয়া একেবারেই সহজ। মোটকথা, তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে একটি বিশেষ ধরনের রণকৌশল শিখাতে লাগলেন।

তারিক বিন যিয়াদের জন্য কোন অশুভ লক্ষণ ছিল না। কোন শুভ লক্ষণও ছিল না; বরং শুভ-অশুভ কোন ধরনের লক্ষণের সাথেই তার কোন পরিচয় ছিল না।

***

মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে ইতিপূর্বেও সে কয়েকবার এসেছিল। প্রতিবারই সে এমন বেশভূষা ধারণ করে এখানে আসত যে, কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে। টলেডো শহরে এ ধরনের বেশকয়েকটি প্রাসাদ ছিল। এ সমস্ত প্রাসাদে রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকেরাই বসবাস করত। তাই এসব প্রাসাদের অভ্যন্তরে কী হতো–সে ব্যাপারে কারো কোন মাথা ব্যথা ছিল না।

মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সে প্রাসাদে এমন এক গোপন আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে ইউরোপের ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছিল। আইপাস যেদিন ঝিলের পাড়ে মেরিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল সেদিন থেকেই এ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আউলাস সেদিন মেরিনাকে বলেছিল,

‘রডারিকের বাদশাহী ধ্বংস করার এখনই সময়। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের উচিত এ সুযোগকে কাজে লাগান। আর তার একমাত্র উপায় হল, ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের যেসকল সৈন্য রডারিকের বাহিনীতে রয়েছে, চূড়ান্ত লড়ায়ের সময় তারা মুসলমানদের সাথে মিলে রডারিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

মেরিনা ছিল ইহুদি। এ কারণেই তার মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। অধিকন্তু তার অন্তরে রডারিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। সে আউপাসকে ভালোবাসত। আউপাসকে নিয়ে ঘর বাঁধার সুন্দর একটা স্বপ্ন ছিল তার। রডারিক তার সেই ভালোবাসাকে অপবিত্র করেছে, তার সেই স্বপ্নকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সেদিন বিশ বছর পর আউপাস যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করে তখন তার সেই পুরনো ক্ষত বের হয়ে আসে। সময়ের আবরণে চাঁপা পড়া প্রতিশোধের সেই আগুন লেলিহান অগ্নিশীখার রূপ ধারণ করে। সেদিন বিকেলে উপাসের কথা শুনে সে শপথ করে বলেছিল, রডারিকের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করার আগে আমার অশান্ত আত্মা কখনও শান্তি পাবে না।’

রডারিক সবেমাত্র পাম্পালুনা থেকে রওনা হয়েছে। রাস্তায় তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। মেরিনা সেদিন রাত থেকেই রডারিক থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু করেছিল। তার কাছে অসংখ্য সুন্দরী মেয়ে ছিল। রূপ-লাবণ্যে কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না। বাদশাহর খাছ মহল পর্যন্ত মেরিনার অবাধ যাতায়াত ছিল। শাহীমহলের রহস্যময় জগতে তার বিরাট প্রভাব ছিল।

শাহীমহলে দুই-চারজন গোথ সম্প্রদায়ের লোক বিশেষ সম্মান-মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। দুই-একজন ইহুদিও এমন মর্যাদার অধিকারী হল। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্দালুসিয়ায় সবচেয়ে মজলুম সম্প্রদায় ছিল ইহুদি। তাদের অধিকাংশই ছিল গরীব। যে দুই-একজন ইহুদি শাহীমহলে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল, তারা অত্যন্ত ধূর্ত আর চালাক ছিল। এসমস্ত লোকদের সাথে মেরিনার বিশেষ সম্পর্ক ছিল।

মেরিনা নিজেও ছিল ইহুদি। এজন্য তার অন্তরে ইহুদিদের জন্য সহমর্মিতা ছিল। কিন্তু সে ভাবল, এখনই তাদের সাথে রডারিকের বিপক্ষে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই মেরিনা সবকিছু বিবেচনা করে গৌথ সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় নিল। শাহীমহলে ও সেনাবাহিনীতে এই ব্যক্তির বিশেষ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। এই ব্যক্তি অর্টিজাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। সে এজন্য অত্যন্ত মর্মাহত ছিল যে, রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করেছে এবং নিজে বাদশাহ হয়ে গেছে। যার ফলে সোথ সম্প্রদায়ের বাদশাহী খতম হয়ে গেছে।

মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে জিউস নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল আউপাসের বাল্যবন্ধু। মেরিনা তার সাথে সাক্ষাৎ করে আউপাসের সাথে তার যে কথা হয়েছিল তা সবিস্তারে বর্ণনা করল। জিউস কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মেরিনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে মেরিনাকে তার বাবা ও ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করাল এবং আউপাসের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদেরকে বলল।

জিউসের বাবা বলল, ‘উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু এই প্রস্তাব যতটা উত্তম তার চেয়ে বেশি বিপদজনক। কারণ, কেউ বিশ্বাস করবে না যে, এত স্বল্প সংখ্যক হামলাকারী আন্দালুসিয়ার একলাখ ফৌজকে পরাজিত করতে পারবে। এটা অসম্ভব। ইহুদি ও গোথিরা যদি গাদ্দারী করেও তাহলে তাদের সংখ্যা কতইবা হবে। বেশির চেয়ে বেশি পনের-বিশ হাজারই হবে। এরা হামলাকারীদের সাথে মিলে কিইবা করতে পারবে? বিজয় রডারিকেরই হবে। তারপর জানই তো পরিণাম কি হবে? রডারিক একজন গাদ্দারকেও জীবিত রাখবে না। আর গোথ ও ইহুদিদের উপর যে নিপীড়ন চালান হবে, তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

‘আউপাসের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। মেরিনা বলল। সে বলেছিল মুসলিম বাহিনী খুবই সাহসী ও বীরপুরুষ। তারা এতটাই যুদ্ধপটু যে, তাদের চেয়ে দ্বিগুণ সৈন্য ছিল থিয়োডুমিরের। কিন্তু খুবই কম সময়ের মধ্যে তারা থিয়োডুমিরের সেই বাহিনীকে পরাজিত করে। থিয়োডুমিরের প্রায় অর্ধেক সৈন্য রণাঙ্গনেই মারা পড়ে, আর অল্প কয়েকজন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্যরা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এখন আপনারা নিজেদের মাঝে সলা-পরামর্শ করে ঠিক করুন, আপনারা কোন পক্ষ অবলম্বন করবেন এবং আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? আউপাস আবারও আসবে। আমি তাকে আপনাদের নিকট পৌঁছে দেব।’

‘তুমি ইহুদি নেতাদের সাথেও আলোচনা করে নাও।’ জিউসের বাবা বললেন।

***

মেরিনা দিন-রাত ইহুদি ধর্মগুরু ও নেতাদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করে কাটাতে লাগল। তার অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে এক রাতে তিন-চারজন ইহুদি নেতা আলোচনার জন্য জিউসের প্রাসাদে এলো। সেখানে তিন-চারজন গোথ বংশীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন। তারা সকলেই এ ব্যাপারে মতবিনিময় করছিলেন। মেরিনা চুপ করে তাদের কথাবার্তা শুনছিল।

এক বৃদ্ধ ইহুদি বললেন, আমরা শুধু একটা বিষয়েই চিন্তা-ভাবনা করছি। আর তা হল, আজ আমরা রডারিকের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছি। এখন আমরা রডারিকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হামলাকারীদেরকে সাহায্য করতে চাচ্ছি। কিন্তু তারা যখন বিজয়ী হবে তখন তারা রডারিকের মতোই আমাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করবে। আমরা ইহুদিরা রডারিকের পরিবর্তে মুসলমানদের জুলুম-নির্যাতনের শিকারে পরিণত হব। আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যে, আমরা মুসলমানদেরকে এমনভাবে সাহায্য করব, যেন তারা রডারিককে পরাজিত করতে পারে। তার পর আমরা মুসলমানদের উপর এমন অতর্কিত আক্রমণ করব, যেন তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তারপর ইহুদি ও খোথরা যৌথভাবে আন্দালুসিয়া শাসন করবে।

মেরিনা দেখতে পেল, আউপাসের সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, সে ঝিলের পাড়ে আউপাসকে নিজের ব্যাপারে বলেছিল,

‘আমি কারো স্ত্রী হতে পারিনি, হতে পারিনি কারো মা। আমি সাক্ষাৎ শয়তান হয়ে গেছি। আমার মাঝে শয়তানী স্বভাব-চরিত্র দানা বেঁধে উঠেছে।

এখন সে ভাবল, সেদিন সে ঠিকই বলেছিল। বৃদ্ধ ইহুদির কথা শুনার সাথে সাথে সে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,

‘মুসলিম বাহিনী এখানে বাদশাহী করবার জন্য আসেনি। আউপাস আমাকে বলেছে, তারা লুটতরাজ করার জন্য এসেছে। তাদের ঝুলি ভরে গেলে তারা ফিরে যাবে। এটা কীভাবে সম্ভব যে, আট-দশ হাজার সৈন্যের এক মামুলি বাহিনী এত বিশাল একটি রাজ্য জয় করার জন্য আসবে? আউপাস আমাকে বলেছে, সে এবং জুলিয়ান রডারিকের সিংহাসন ভূলণ্ঠিত করার জন্য তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। তারা মুসলমানদেরকে বলেছে, আন্দালুসিয়ার শাহী জানায় এত বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত, সোনা-দানা রয়েছে, যা বহন করার জন্য হাজারো উটের প্রয়োজন। আপনারা তাদের ব্যাপারে ভয় পাবেন না, তারা কোন মুলুকের সেনাবাহিনী নয়; বরং তারা দস্যুদল।’

‘তাহলে আমি বলব, তুমি মুসলমানদের ব্যাপারে অবহিত নও।’ বৃদ্ধ ইহুদি বলল। তারা যেখানেই যায়, সেখানেই স্বল্প সংখ্যক গিয়ে বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে নিজেদের অধীনত করে ফেলে। তারা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও পারস্য ও রোমের মতো বিশাল সাম্রাজ্যকে খতম করে দিয়েছে। লক্ষ্য করে দেখ, ইসলামী সালতানাত কতটা বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই মুসলিম বাহিনী লুণ্ঠনকারী নয়; তারা অমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে।

বৃদ্ধ ইহুদি মুসলমানদের বীরত্ব ও সাহসিকতার ইতিহাস বর্ণনা করে শুনাচ্ছিল, মেরিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

‘শ্রদ্ধেয় মেহমান! আমি নিশ্চিত, আপনি আরবের মুসলমানদের কথা বলছেন। আন্দালুসিয়ায় যারা এসেছে তারা বার্বার। যুদ্ধ-বিগ্রহ, আর লুটতরাজ করাই তাদের পেশা। তাদের সিপাহসালারও বার্বার। এরা যুদ্ধবাজ সম্প্রদায়। ছোট-বড় পোত্র, আর বিভিন্ন উপগোত্রে তারা বিভক্ত। তারা নিজেদের মুলুকে কোন ধরনের বাদশাহী কায়েম করে রেখেছে যে, আমাদের মুলুকে বাদশাহী কায়েম করবে?

মেরিনা বাকচাতুর্যের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রমাণিত করে বৃদ্ধ ইহুদিদেরকে ষমতাবলম্বী বানিয়ে ফেলল।

***

দুই-তিন দিন পরের কথা। টলেডো এসে পৌঁছতে রডারিকের আরও তিন-চার দিন সময় লেগে যাবে। এই সুযোগে আটপাস এক সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করে টলেডো এসে মেরিনার সাথে সাক্ষাতের মওকা তৈরী করে নিল। মেরিনা তাকে গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তির প্রাসাদে নিয়ে গেল। এখানকার নেতৃস্থানীয় গোথ ও ইহুদিদের সাথে কি ধরনের কথা-বার্তা হয়েছিল সে ব্যাপারেও মেরিনা আউপাসকে সবকিছু বলল। এ সময় একজন ইহুদি পণ্ডিত কি ধরনের যুক্তি পেশ করেছিল এবং মেরিনা তার যুক্তি খণ্ডন করে কীভাবে তাকে সমতাবলী বানিয়ে ফেলেছিল, সে কথাও সে আউপাসের কাছে বর্ণনা করল।

আটপাস যেদিন সেই প্রাসাদে এসে পৌঁছল সেদিন রাতেই গোথ ও ইহুদি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সেখানে একত্রিত হল। মেরিনাও সেখানে ছিল। আউপাস যেহেতু গোথ বংশীয় ছিল, আর রডারিক গোথদের থেকে বাদশাহী ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাই আইপাস সহজেই গোথ নেতাদেরকে নিজ মতের অনুসারী করে ফেলল। কিন্তু ইহুদি নেতৃবর্গ কেবল নিজ সম্প্রদায়ের ফায়দার কথাই বারবার বলতে লাগল।

আউপাস ইহুদি নেতাদেরকে সম্বোধন করে বলল, ‘এটা তো খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যে, আপনারা তা ভুলে যাবেন। গোখরা তাদের রাজত্বকালে ইহুদিদেরকে যে সম্মান দান করেছিল এবং তাদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা আপনারা কীভাবে ভুলে গেলেন? এটা তো ভুলার কথা নয়। ইহুদিদেরকে গোথদের সমমর্যাদা দান করার কারণেই তো আমার ভাই অর্টিজাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনারা আমাদের সাথে থাকুন, কথা দিচ্ছি, ইহুদিরা আবার তাদের সেই মান-মর্যাদা ফিরে পাবে। বার্বাররা তো লুটতরাজ করে ধন-সম্পদ গুছিয়ে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে।

অবশেষে সেই রাতেই সকল পরিকল্পনা সম্পন্ন করা হল এবং পরদিন সকাল থেকেই পূর্ণ উদ্দমে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে গেল। একজন গোথ জেনারেল রাজী হচ্ছিল না। সে রডারিকের অপেক্ষা করছিল। জেনারেল মূলত রডারিকের চাটুকার ছিল। মেরিনা তার উপর বিশেষ জাদু প্রয়োগ করল, সে তাকে উদ্ভিন্ন যৌবনের অধিকারিনী খুবসুরত এক মেয়ের প্রলোভন দেখাল। জেনারেল সাথে সাথে কাবু হয়ে গেল। সে মেয়েটিকে তার সাথে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইল।

‘বাদশাহ আপনার জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।’ মেরিনা বলল। এত সুন্দর একটি মেয়েকে সে আপনার কাছে রাখতে দেবে না, বরং আমি এই মেয়েকে বাদশাহর কাছে পৌঁছে দেব। সে বাদশাহর সাথেই যাবে; কিন্তু আমি তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলব, যেন সে আপনার সাথে সম্পর্ক রাখে। তবে আমি আপনাকে যা বললাম, আপনি যদি তা করেন তাহলে আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, রডারিক যদি নিহত হয় তাহলে নতুন বাদশাহকে বলে আপনার জন্য বিশাল জায়গীরের ব্যবস্থা করে দেব।’

মেরিনা সেই তরুণীকে ডেকে এনে বলল, এই জেনারেলের উপর কোন ভরসা করা যায় না। সে প্রতারণাও করতে পারে।’

মেরিনা ঐ তরুণীর হাতে সামান্য ‘সুফুফ’ দিয়ে বলল, “রাত্রে এই জেনারেলের তাঁবুতে গিয়ে তাকে শরাব পান করাবে এবং শরাবের সাথে এই সুফুফ মিশিয়ে দেবে।

সুফুফ এক জাতীয় চূর্ণ ঔষধ। এর মাঝে কোন বিষক্রিয়া নেই। তবে তা সেবনের ফলে মেধা লোপ পায় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। সুফুফ সেবন করানো দ্বারা মেরিনার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের সময় এই জেনারেলকে অকেজো করে রাখা।

এই সুফুফ যদি রডারিককে পান করান যেত তাহলে ইহুদি ও গোছদের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল একেবারেই অসম্ভব। কেননা রডারিক কোন কিছু পানাহার করার পূর্বে দু’জন ব্যক্তিকে খাইয়ে তা পরীক্ষা করে নিত। এমন কি খানা পাক করার সময়ও তার একান্ত আস্থাভাজন দুই-তিনজন লোক সেখানে উপস্থিত থাকত। মোটকথা, রডারিককে সুফুফ জাতীয় কোন কিছু পান করানো একেবারেই অসম্ভব ছিল।

ঐতিহাসিকগণ লেখেন, বাদশাহরা সাধারণত এধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেই থাকে। কিন্তু রডারিক জানত যে, সে কত বড় জালিম। তাই সে সর্বদা মাজলুমদের প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকত।

***

গোধ ও ইহুদি নেতবর্গ আউপাসের সাথে পরামর্শ করে যে প্লান বানিয়েছিল, সে অনুযায়ী প্রায় দেড়শ নওজোয়ান তৈরী করা হল। রডারিক টলেডোতে পৌঁছার পর নওজোয়ানদেরকে তার সামনে উপস্থিত করা হল এবং বলা হল যে, এরা স্বেচ্ছায় ফৌজে শামিল হতে চায়। এরা সাধারূণ কোন সিপাহী নয়, বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও জানবাজ।

রডারিককে আরও বলা হল, এরা নৈশ অভিযানে পারদর্শী। রাতের আঁধারে হামলাকারীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে এরা তাদের সমূহ ক্ষতি সাধন করতে পারবে।

রডারিক যেদিন টলেডো এসে পৌঁছে তার আগের দিন আউপাস টলেডো ছেড়ে চলে যায়। সেদিন রাতেই গোথ সম্প্রদায়ের কমান্ডাররা এক গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়। এই বৈঠকে দু’জন ইহুদি নেতাও ছিল। তারা অনেক গোপন বিষয়ে মতবিনিময় করার পর সবাই যার যার মতো চলে গেল।

পরদিন রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে টলেডো এসে পৌঁছলে দেখা গেল, তার বাহিনীর ঘোড়সওয়ারই হবে কয়েক হাজার। তারা হানাদার বাহিনীকে আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত করার জন্য ঝড়ের গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, কিন্তু তারা নিজেদের মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ভট ও ভীতিকর গল্প-গুজব করছিল।

কেউ বলল, ‘থিয়েভুমিরের মতো বাহাদুর জেনারেলও তাদেরকে দেখেই পালিয়ে এসেছে।

অন্য একজন বলল, ‘তারা সংখ্যায় মাত্র কয়েক হাজার, কিন্তু এক লাখ সৈন্যের জন্যও ভয়ঙ্কর।

আরেকজন বলল, ‘তাদের কোন তীরই ব্যর্থ হয় না। তারা বাতাসে তীর ছুঁড়ে মারে, আর তীর নিজেই কারো বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়।’

অন্যজন বলল, ‘তাদের একজন পদাতিক সৈন্য পাঁচ-ছয়জন অশ্বারোহীকে ধরাশায়ী করে হত্যা করে ফেলে।

অন্য আরেকজন বলল, ‘আরে ভাই, কী আর বলব, স্বয়ং থিয়োডুমিরও বাদশাহকে বলেছে, তারা মানুষ নয়; জিন-ভূত।

অপরজন বলল, ‘শুনা যায় তারা কিস্তিতে চড়ে আসেনি; বরং সাঁতার কেটে এত বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছে।

অন্যজন বলল, ‘আমি তো এমন শুনেছি যে, তারা সাঁতার কাটে না, বরং পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে; কিন্তু ডুবে না।’

এমন অনেক কথাই রডারিকের বাহিনীর মাঝে গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ল। একজন একটি কথা শুনে তার সাথে আরও দুই-তিনটি কথা যোগ করে অন্যের কাছে বর্ণনা করত। ফলে গোটা বাহিনীর মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে ভয়-ভীতি বেড়েই চলছিল। তবে একটি কথা তাদের সকলের মনেই আশার আলো হয়ে জ্বলছিল। তাই তারা সকলেই বলাবলি করছিল, ‘হানাদার বাহিনী যতটাই নির্মম ও ভয়ঙ্কর, ততটাই দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তবে শুধু সেই ব্যক্তির জন্য যে তাদের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে তাদের বন্দীত্ব স্বীকার করে নেয়।’

ইহুদি ও গোথদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফৌজের মাঝে এ ধরনের ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আউপাসই এধরনের প্রপাগাণ্ডা চালানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিল। যে দেড়শত সিপাহীকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নৈশযুদ্ধে পারদর্শী বলে ফৌজে শামিল করা হয়েছিল, তারা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সৈন্যদের মাঝে এসব ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্থ গ্রেম্যান স্বীয় গ্রন্থ ‘মুসলমানদের ইতিবৃত্তিতে লেখেন :

‘আন্দালুসিয়ার ফৌজের উপর এটা এক মানসিক আক্রমণ ছিল। তারিক বিন যিয়াদ এই আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আউপাসকে বলেছিলেন, সে যেন আন্দালুসিয়ার ফৌজের মাঝে এমন কিছু লোক শামিল করে দেয়, যারা হবে অত্যন্ত চালাক-চতুর ও বাকপটু। তারা মুসলমানদের ব্যাপারে অন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করবে। আউপাস ইহুদি ও গোথ সরদারদের কাছে এ প্রস্তাব পেশ করলে তারা সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেয় এবং দেড়শত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর রডারিকের ফৌজে শামিল হয়ে যায়।

আর্থ গ্লেম্যান আরও লেখেন : ‘তারিক বিন যিয়াদের এই আক্রমণ ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও সফল।

***

মুসলমানদের তাঁবুতে সর্বদা বিজয়ের জন্য দুআ করা হচ্ছিল। অপরদিকে ইহুদি ও গোদের উপাসনালয়ে রডারিকের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছিল। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পর এ ধরনের আলোচনা করত যে, রডারিক যদি নিহত হয় বা পরাজিত হয় তাহলে রাজত্ব তো আমাদেরই থাকবে। হানাদার বাহিনী তো লুটতরাজ করে চলেই যাবে।’

রডারিকের বাহিনী গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ খবর পেয়ে ঘোড়ায় করে একটি নিকটবর্তী পাহাড়ের উপর চড়লেন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে বহুদূর পর্যন্ত তিনি অসংখ্য মানুষ আর ঘোড়ার মিছিল দেখতে পেলেন। এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনী ইতিপূর্বে তিনি কখনও দেখেননি। তাকে পূর্বেই বলা হয়েছিল যে, রডারিকের সৈন্যসংখ্যা এক লাখের মতো হবে।

‘আল্লাহ্! হে আমার আল্লাহ! তারিক বিন যিয়াদ আসমানের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন। তোমার নামের সম্মান রক্ষা করো, আমরা তো তোমার নামেই কুফুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছি। আমরা একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’

তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে নদী থেকে প্রায় এক মাইল পিছনে রেখেছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, রডারিকের বাহিনীকে গোয়াডিলেট নদীর তীরে নিয়ে আসতে, যাতে তাদের পশ্চাদে থাকে অথৈ পানি, আর খরস্রোতা নদী।

তারিক বিন যিয়াদ অল্প কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে নদীর দিকে অগ্রসর হন, আর বেশির ভাগ সৈন্যকে তিনি পাহাড়ের ভিতর আত্মগোপন করে থাকতে বলেন। তারিক সামনে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, রডারিকের বাহিনী অতিদ্রুত নৌকা দিয়ে পুল তৈরী করছে।

‘এদেরকে তো অত্যন্ত ক্ষিপ্র মনে হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদের পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল।

তারিক বিন যিয়াদ কথা শুনে পিছন ফিরে দেখেন, মুগিস আর-রূমী ও আবু জুরাআ তুরাইফ তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন।

‘আমরা খুব দ্রুতই এই বাহিনীকে তাড়িয়ে দিতে পারব।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।

‘তারা যদি যুদ্ধক্ষেত্রেও এমন ক্ষিপ্র হয় …।’ আবু জারু’আর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই তারিক বিন যিয়াদ বলে উঠলেন,

‘আপনারা কি দেখতে পারছেন না, তাদের এই ক্ষিপ্রতার কারণ কি? তারিক বিন যিয়াদ বললেন। লক্ষ্য করে দেখুন, তাদেরকে কীভাবে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় এই কাজ করছে না; বরং তাদের সালারের অনবরত বেত্রাঘাত তাদেরকে এ কাজ করতে বাধ্য করছে। যুদ্ধের ময়দানেও কি তাদের সালার তাদেরকে এভাবে পিঠিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে?”

তারিক বিন যিয়াদের দুই সালার গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, গোয়াডিলেট নদীর তীরে ফেরাউনের সময়কার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। কিছু মানুষ কর্মরত মানুষের মাথার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। কেউ একটু অলসতা করলে সাথে সাথে তার পিঠে সপাং সপাং বেতের বাড়ি পড়ছে।

‘লাঠির ভয় দেখিয়ে যুদ্ধ করানো যায় না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। দৃঢ়চেতা মন, আর পাহাড়সম মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। যে সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের অধীনস্থদেরকে গোলাম মনে করে, আর বাদশাহ তার প্রজাদের জন্য ফেরাউন হয়ে যায়, সে সম্প্রদায়ের ধ্বংস অনিবার্য। উঁচু-নীচুর ভেদাব্দে একটি সুসংঘঠিত জাতিকেও ধ্বংস করে ছাড়ে। আমাদের সিপাহীদের মনোবল অটুট। জেনারেল হোক বা সিপাহী, অশ্বারোহী হোক বা পদাতিকসকলের অন্তরেই এক আল্লাহ ও এক রাসূল। এ কারণেই আমাদের মাঝে পূর্ণ সমতা বিদ্যমান। কারো আল্লাহ বড়, আর কারো আল্লাহ ছোট–এমন নয়। প্রাসাদ কিংবা পর্ণকুটির–সর্বত্রই আল্লাহ্ সমানভাবে বিরাজমান। বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহরই।

‘কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য!’ আবু জারু’আ তুরাইফ অনেকটা হতাশার স্বরে বললেন।

‘সকলেই নিজ নিজ জায়গায় চলে যান। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ‘আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে বিজয় দান করার জন্য এমনসব উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যা আমি মোটেও আশা করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ মিথ্যে হতে পারে না; কিন্তু আমি কেবল স্বপ্ন দেখার মানুষ নই। আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি আল্লাহকে তালাশ করে সে অবশ্যই আল্লাহকে পায়। আর আল্লাহ কেবল তাকেই সাহায্য করেন, যে চেষ্টা-সাধনা করে। এখন তোমাদের কাজ হল, মাথা ঠিক রেখে অটল-অবিচল থাকা।

নদী পার হতেই রডারিকের সৈন্যদের সারা রাত লেগে গেল। সকাল হওয়ার সাথে সাথে দেখা গেল নদীর তীরের বিস্তৃত প্রান্তর জোড়ে রডারিকের একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী লড়ায়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেনপোল লেখেছেন :

তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়ায় আরোহণ করে তার ফৌজের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন :

‘আমার মুজাহিদ ভাইয়েরা! তোমাদের সামনে আছে তোমাদের রক্তপিপাসু দুশমন, আর পিছনে আছে কূলকিনারাহীন অথৈ সমুদ্র। পলায়নের কোন রাস্তাই তোমাদের জন্য খোলা নেই। তোমাদের সম্মুখে একটাই রাস্তা খোলা আছে, তা হল বীরত্বের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা। দুশমনের সংখ্যাধিক্যে ভয় পেয়ো না; বরং সেই পরাজয়কে ভয় কর, যা তোমাদের জন্য বয়ে আনবে সীমাহীন লাঞ্ছনা।

তারিক বিন যিয়াদের এই সংক্ষিপ্ত জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে মুসলিম মুজাহিদগণ আকাশ-বাতাস মুখরিত করে গর্জন করে বলে উঠল, ‘তারিক বিন যিয়াদ। তোমার কোন ভয় নেই, আমরা তোমার সাথে আছি; তোমার সাথেই থাকব।’

আন্দালুসিয়ার বাহিনীর পক্ষ হতে ঘোষণা করা হল, তোমরা যেই হও না কেন, এখান থেকে চলে যাও। আন্দালুসিয়ার শাহানশার বাদশাহী এক সদ্র হতে আরেক সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। তার তলোয়ারের ভয়ে গোটা ইউরোপ প্রকম্পিত। তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহ এটাই যে, তোমরা এখান থেকেই ফিরে যাবে, তা হলে আর তলোয়ার কোষবদ্ধ থাকবে। অন্যথায় তোমাদের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।

তারিক বিন যিয়াদকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর ঘোষণা তরজমা করে বুঝানো হলে তিনি তার জবাব দিয়ে বললেন, আন্দালুসিয় ভাষায় এটা ঘোষণা করে শুনাও। ঘোষণা শুনানোর জন্য আটপাস ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চ আওয়াজে বলল :

‘তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে সালাম। মুহতারাম শাহানশা! আমরা বিনয়ের সাথেই জানাচ্ছি যে, আমরা ফিরে যেতে পারব না। করণ, আমরা আমাদের সকল রণতরী জ্বালিয়ে দিয়েছি। আমরা এ জন্য শাহানশার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদের জন্য সমুদ্রে নৌকার পুল তৈরী করে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর নির্দেশে এসেছি, সুতরাং আন্দালুসিয়ার বাদশাহর হুকুমে ফিরে যেতে পারি না।’

অপর প্রান্ত হতে আন্দালুসিয় এক জেনারেল বার্বার ভাষায় ঘোষণা করল, ‘শাহানশা রডারিকের মুকাবেলা করতে এলে আল্লাহও তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। তোমরা হলে ডাকাতের দল, আমরা তোমাদেরকে শেষবারের মতো …।’

জেনারেলের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে তিনটি তীর এসে সমূলে তার বুকে বিদ্ধ হল। সে ঘোড়া হতে নিচে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ আন্দালুসিয়ার দুইজন অশ্বারোহী ঘোড়া দৌড়িয়ে এসে তার লাশ ঘোড়ায় উঠিয়ে নিয়ে গেল।

***

রডারিক সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে ছিল না। তার পতাকা ছিল পিছনে। সে তার সফেদ ঘোড়া ‘উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে যখন জানতে পারল যে, মুসলিম বাহিনী তার এক জেনারেলকে হত্যা করে ফেলেছে তখন সে আক্রমণ করার নির্দেশ দিল। রডারিক সমরশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিল। আক্রমণাত্মক যুদ্ধে তার বেশ সুনামও ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের যে প্লান সে বানিয়েছিল তার জেনারেলরা তা পরিপূর্ণরূপে রপ্ত করে নিয়েছিল।

ররিক তার জেনারেলদেরকে বলল, “ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ করতে হবে। দুই-তিনটি দল মিলে এক সাথে আক্রমণ করবে। এর চেয়ে বেশি সৈন্য এক সাথে ভীড় করলে তোমাদের নিজেদের তীরেই তোমরা জখম হবে এবং তোমাদের নিজেদের ঘোড়ার পদতলে পিষ্ঠ হয়ে মারা যাবে। তাছাড়া ভীড়ের মাঝে সিপাহীরা ঠিকমত তীর চালাতে এবং স্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই প্রতিটি আক্রমণই হবে ছোট ছোট দলের মাধ্যমে এবং প্রতিটি আক্রমণের সময়ই নতুন ও উদ্যমী সৈন্য অংশ গ্রহণ করবে। দুশমনের সংখ্যা খুবই অল্প, তাদেরকে অনবরত যুদ্ধ করতে বাধ্য করতে হবে, যেন তারা বিশ্রামের সুযোগ না পায়। এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করা ঠিক হবে না। যুদ্ধ যতই প্রলম্বিত হবে দুশমন ততই আমাদের তলোয়ারের শিকারে পরিণত হবে। এক সময় তারা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে হাতিয়ার সমর্পণ করতে বাধ্য হবে।

এদিকে তারিক বিন যিয়াদ তার কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, কোথাও এক জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে লড়াই করবে না। আঘাত করেই সরে পড়বে। সরে পড়ার সময় চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে, যেন তোমাদের পিছু নিয়ে দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে কোন হসনাই হোক শত্রুবাহিনীকে পাহাড়ের আড়ালে নিয়ে আসতে হবে। তখন তীরন্দাজ বাহিনীই তাদেরকে সামলাতে পারবে।

তারিক বিন যিয়াদের প্রান ছিল গেরিলা যুদ্ধের। কারণ, এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনীর সাথে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে এক জায়গায় স্থির থেকে সামনা-সামনি যুদ্ধ করে যাওয়া কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধও কোন সহজ যুদ্ধ নয়। কেবলমাত্র বিজ্ঞ কোন জেনারেলের পক্ষেই গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।

রডারিক তার বাহিনীকে আক্রমণ করার নির্দেশ দিলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ তিন-চারটি ছোট দলকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারা এমনভাবে লড়াই করতে লাগল, যেন তারা পলায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ করতে করতে তারা সন্তর্পণে পিছু হটে এলো, যেন আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা কিছুই বুঝতে না পারে। মুসলিম বাহিনী একটা পাহাড়ের আড়ালে এসে ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে সাথে পাহাড়ের চূড়া হতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর বর্শী ও তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

এ সকল তীর-বর্শা থিয়োডুমিরের বাহিনী থেকে হাসিল হয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে বর্শা নিক্ষেপ করার বিশেষ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন।

যেসকল মুসলিম সৈন্য ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়েছিল তারা কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একত্রিত হয়ে গেল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা হঠাৎ তীর বৃষ্টির মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে যখন পলায়ন করতে লাগল তখন মুসলিম বাহিনী অতর্কিতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আন্দালুসিয়ার বাহিনীর যে দলটি আক্রমণ করতে এসেছিল তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছুটোছুটি করতে লাগল। তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়ল। ফলে তারা অসহায়ভাবে মুসলিম বাহিনীর হাতে মার খেতে লাগল।

সমরবিশারদ ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, মুসলিম সেনাপতির রণকৌশল নিঃসন্দেহে তার যুদ্ধ-পারঙ্গমতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই আন্দালুসিয়ার প্রতিটি সৈনিকের অন্তরে মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তা-ই তাদের যুদ্ধের মনোবল একেবারে দুর্বল করে দিয়েছিল।

সেদিন রডারিক আরও কয়েকটি দলের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনা করাল। প্রত্যেক বাহিনীকে ভালোভাবে বলে দিল যে, মুসলিম বাহিনী যদি পিছু হটে তাহলে তোমরা তাদের পিছু নিবে না। কিন্তু তখন আর মুসলিম বাহিনীর পিছু হটার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের উপর আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে তারা দূর-দূরান্তের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে তাদের প্রচুর ক্ষতি সাধন করল।

মুসলিম বাহিনী পিছু হটার কৌশলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর আক্রমণ করত। তারপর আচানক একত্রিত হয়ে তিন দিক থেকে ব্যুহ রচনা করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে ঘিরে ফেলত। মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের ন্যূহ সংকুচিত করে আনত। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর জন্য তলোয়ার উঁচিয়ে আঘাত করারও সুযোগ থাকত না। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলত।

সূর্য অস্ত যাওয়ার পর দেখা গেল, গোটা রণাঙ্গণজোড়ে শুধু রডারিকের সৈন্যদের লাশ আর লাশ। নিয়ম অনুযায়ী সেদিনের মতো সকল সৈন্য নিজ নিজ ছাউনিতে চলে গেল। মাত্র একদিনের যুদ্ধে এত বিপুল পরিমাণ সৈন্যের প্রাণহানী দেখে রডারিক বাহিনীর অপরাপর সৈন্যদের অন্তরআত্মা কেঁপে উঠল। তারা সকলেই ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।

***

রাতের অর্ধ প্রহর অতিবাহিত হয়েছে। রডারিকের বাহিনী গভীর ঘুমে অচেতন। কয়েকজন প্রহরী এদিক-সেদিক ঘুরাফেরা করছে। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে এক প্রহরীর মুখ চেপে ধরে সমূলে তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিল। আরও কয়েকজন প্রহরীর অবস্থাও এমনই হল। অল্প সময়ের মধ্যে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর এই দিকটা একেবারে প্রহরী মুক্ত হয়ে গেল। সাধারণ সৈন্যদের জন্য তাবুর কোন ব্যবস্থা ছিল না। খোলা আকাশের নিচে বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে ছিল। প্রত্যেক সিপাহীর ঘোড়া তার নিকটেই বাঁধা ছিল।

প্রহরী নিহত হওয়ার পর ছয়টি ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে ঘোড়াগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তারপর দ্রুত হাতে ঘোড়র রশি কেটে দিয়ে খঞ্জর মেরে ঘোড়াগুলো জখম করে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রায় দেড়শ ঘোড়া তারা জখম করে ফেলল। আঘাত এত গভীর ছিল যে, ঘোড়াগুলো ভয়ঙ্ককরূপে হ্রেষা ধ্বনি করতে করতে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল।

ছায়ামূর্তিগুলো অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে একেকটি ঘোড়াকে আঘাত করছিল, আর ঘোড়াগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিৎকার করতে করতে এলোপাথারি ছুটতে লাগল। আহত ঘোড়ার চিৎকার শুনে সিপাহীরা জেগে উঠল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সৈন্যরা ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে লাগল। এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে, ঘোড়র পদতলে পিষ্ট হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকা ও পলায়নরত অসংখ্য সৈন্য বেঘোরে মারা পড়ল।

বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে রডারিকের সৈন্যরা সারাদিনের যুদ্ধক্লান্ত দেহ নিয়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আঘাতপ্রাপ্ত ও লাগামহীন ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে কত সিপাহী যে মারা পড়ল, তার কোন হিসাব রইল না। ঘোড়াগুলোকে রাও সম্ভব ছিল না। যেই ছুটন্ত ঘোড়ার সামনে এসে পড়ত, তারই পরিণতি হত অত্যন্ত করুণ। ঘোড়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, আর অন্য ঘোড়ার পা তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে সামনে অগ্রসর হয়ে যেত।

এই চোরাগোপ্তা হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তারা ছিল জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ। তারা মিশন শেষ করে নিরাপদে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে এলো। তারা যখন তাদের ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনও রডারিকের সৈন্যদের শোরগোল শুনা যাচ্ছিল। তখনও আঘাতপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর এলোপাথারি ছুটোছুটি করার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আঘাতপ্রাপ্ত এই ঘোড়াগুলো কোন সাধারণ ঘোড়া ছিল না। যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অসাধারণ ঘোড়া ছিল এগুলো। তাই ঘোড়াগুলোকে আয়ত্বে আনা সহজ কোন ব্যাপার ছিল না। ঘোড়ার ছুটোছুটি আর আহত সৈন্যদের চিৎকারে রডারিকসহ বাহিনীর সকল সৈন্যই জেগে উঠল।

মশাল জালানো হল। একটা ঘোড়াকে খুব কষ্ট করে ধরা হল। ঘোড়র পিঠ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছিল। রডারিক হতভম্ব হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল, এতগুলো ঘোড়া জখম হল কি করে? আরও কয়েকটি ঘোড়া ধরে আনা হল। সবগুলোর শরীর থেকেই প্রবল বেগে রক্ত ঝরছিল।

‘নিশ্চয় শত্রুবাহিনী রাতের অন্ধকারে এ কাজ করেছে।’ রডারিক বলল ‘যারা পাহারায় ছিল তাদের সকলকে ঘোড়ার পিছে বেঁধে মোড়া ছুটিয়ে দাও। তারপর তাদের চামড়া ছিলে সমুদ্রে নিক্ষেপ কর।’

সাথে সাথে প্রহরীদেরকে খোঁজা শুরু হল। অনেকক্ষণ পর তাদের তিন জনের লাশ পাওয়া গেল।

***

রাত শেষ হয়ে যখন পূর্ব আকাশে দিনের আলো ফুটে উঠল তখন চোখে পড়ল, মাত্র এক রাতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কী ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। রাত্রি যাপনের জন্য আন্দালুসিয়ার বাহিনী ময়দানের যে স্থানটিতে অবস্থান করছিল সে স্থানটির চতুর্দিকে কেবল লাশ আর লাশ।

অন্যন্য সৈন্যরা দেখার আগেই লাশগুলো সরিয়ে না ফেলে রডারিক বড় ধরনের একটি ভুল করল। আগে থেকেই আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সকাল হতেই বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধার মৃত দেহ দেখে অন্যান্য সৈন্যরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। রডারিকের উচিৎ ছিল রাতের অন্ধকারেই লাশগুলো উঠিয়ে সমুদ্রে ফেলার ব্যবস্থা করা। কিন্তু সে হয়তো এ কথা ভেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, মুসলিম বাহিনী এক রাতে এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য খতম করল কীভাবে? তার ধারণা ছিল, মাত্র কয়েকটি দল আক্রমণ করলেই এই স্বল্প সংখ্যক মুসলমান পলায়ন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু প্রথম দিনের যুদ্ধেই তার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হল।

রডারিক তার জেনারেলদেরকে ডেকে বলল, ‘ময়দানে তোমাদের সৈন্যদের যে পরিমাণ লাশ দেখেছ এই পরিমাণ মুসলমানদের লাশ আজ আমি দেখতে চাই। তোমাদেরকে আজ অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।’

‘আজ আমরা বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করব। একজন জেনারেল বলল।

‘পাহাড়ের অভ্যন্তরে গিয়ে আমরা তাদেরকে খতম করব। থিয়োডুমির বলল।

‘তোমার মাথায় যদি সামান্য বুদ্ধি থাকত তাহলে তুমি তাদের হাতে মার খেয়ে পলায়ন করতে না।’ রডারিক বলল। তুমি যদি সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর তাহলে তুমি তো মারা পরবেই, তোমার একজন সিপাহীও জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না।’

তারপর সে অন্য জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি বলছ, বিপুল পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। তুমি কি কালকের যুদ্ধ দেখনি? তারা প্রথমে তোমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তারপর তোমাদেরকে এক জায়গায় একত্রিত করে ব্যুহ রচনা করে সবাইকে খতম করেছে। তুমি কি জান না, যুদ্ধের ময়দানে দুশমনের সামনে জটলা সৃষ্টি করা ক্ষতিকর?’ আজ বরং স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। একজন মুকাবেলা করবে একজনের। নিজেদের মাঝে এতটুকু দূরত্ব রাখবে, যেন অনায়েসে তলোয়ার চালান যায়। আজকের হামলায় অর্ধেক অশ্বারোহী, আর অর্ধেক পদাতিক থাকবে।’

এদিকে তারিক বিন যিয়াদ কয়েকজন পদাতিক সৈন্য নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি প্রথমে আক্রমণ করতে চাচ্ছিলেন না, বরং দুশমনের যুদ্ধ-কৌশল বুঝার জন্য প্রথমে তাদেরকে আক্রমণের সুযোগ দিতে চাচ্ছিলেন।

রডারিকের পরিকল্পনা মুতাবেক তার ফৌজ গতকালের মতো দ্রুত বেগে সম্মুখে অগ্রসর হল না, বরং তারা স্বাভাবিক গতিতে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। তারা তিনটি সারিতে সারিবদ্ধ ছিল। প্রথম সারিতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। তারা মুসলিম বাহিনীকে দেখামাত্র দ্রুত বেগে ধেয়ে আসল। মুসলিম সৈন্যগণ পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। তারা সকলেই ছিল পদাতিক। তাদের মাঝে একজন অশ্বারোহীও দেখা যাচ্ছিল না।

মুসলিম বাহিনীর পক্ষ হতে যুদ্ধের নাকারা বেজে উঠল। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীরা পূর্ব হতেই বর্শা প্রস্তুত করে রেখেছিল। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে লক্ষ্য করে তীর-বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাল্টা আক্রমণ না করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অবাক করে দিয়ে মাটির উপর বসে পড়ল। ক্ষিপ্রবেগে ছুটে আসা ঘোড় মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। তারা সাথে সাথে ঘোড়া থামাতে ব্যর্থ হল। পরে যখন তারা ঘোড়া থামিয়ে পিছনে ফিরে আসছিল ততক্ষণে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার পদাতিক বাহিনীর নিকট পৌঁছে পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।

এ অবস্থায় আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী একেবারে কিংকর্তব্যবিমোঢ় হয়ে পড়ল। কারণ, তারা যদি মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাহলে তাদের পদাতিক সৈন্যও আক্রমণের শিকার হয়ে পড়বে। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী যখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে ভাবছিল, কী করা যায়–এমন সময় পিছন দিক হতে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দল আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। এই আক্রমণ আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কাছে অকল্পনীয় ছিল। তারা কোন কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলল।

আন্দালুসিয়ার বাহিনী যখন তাদের অশ্বারোহীদের করুন অবস্থা দেখল তখন তাদের সাহায্যার্থে আরেক দল অশ্বারোহী মুসলিম অশ্বারোহীদেরকে প্রতিহত করার জন্য সামনে অগ্রসর হল। কিন্তু তারা পৌঁছার পূর্বেই মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে যে পাহাড়, আর টিলা হতে বের হয়ে এসেছিল সেদিকে চলে গেল।

আন্দালুসিয়ার যে অশ্বারোহী বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়েছিল–পিছন থেকে তাদেরকে বারবার এই বলে সতর্ক করা হল, “খবরদার, পাহাড়ের ভিতর যেও না। ফিরে এসো।’

অগত্যা আন্দালুসিয়ার দ্বিতীয় অশ্বারোহী দলটিও যখন ফিরে আসতে লাগল তখন মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর আরেকটি দল পিছন হতে আক্রমণ করে তাদেরকে খতম করতে লাগল। মুসলিম বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করেই দ্রুত পালিয়ে যেত।

ঐতিহাসিকগণ লেখেন, উভয় পক্ষের সৈন্যরাই সমানতালে বীরত্ব প্রদর্শন করছিল, কিন্তু মুসলমানদের মাঝে যে স্পৃহা ছিল আন্দালুসিয়দের মাঝে তা ছিল না। মুসলিম বাহিনী ছিল বাবার সম্প্রদায়ের লোক। বার্বার জাতি-গোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহ হল একটি সাধারণ বিষয়। অধিকন্তু তারা ছিল যুদ্ধপারদশী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি বাহিনী। রণাঙ্গনে তাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের কথা ছিল খুবই মশহুর। ইসলাম গ্রহণের পর কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের ধর্মীয় বিশ্বসে পরিণত হয়েছিল, ফলে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

যাহোক, আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সামনে টিকতে পারল না। তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনীকে অতর্কিত হামলা করে নাজেহাল করে তুলল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। একেকজন মুসলিম যোদ্ধা কয়েকজন আন্দালুসিয় সৈন্যকে হত্যা করে অকুতোভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী সৈন্যদেরকেও তারা সমানতালে হত্যা করছিল। অনেক সৈন্যকে তারা ঘোড়াসহ জীবন্ত পাকড়াও করল।

মুসলিম বাহিনীর মুহুর্মুহু তাকবীর-ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর পরই যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছিল। যুদ্ধের ময়দানে বার্বার সৈন্যরা এক ধরনের বিশেষ দামামা বাজাতে অভ্যস্ত ছিল। সেই দামামার বিকট আওয়াজ শত্রুবাহিনীর অন্তরে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে দিত।

রডারিকের সৈন্যদের মাঝে পূর্ব হতেই আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ফলে যুদ্ধের ময়দানে এসে শত্রুপক্ষের দুর্দমনীয় আক্রমণ দেখে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা একেবারেই খতম হয়ে গেল। তাদের অনেকেই হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে লাগল।

***

রডারিকের নির্দেশে রাতের বেলা ক্যাম্পের চতুর্দিকে পাহারা জোরদার করা হল। তারপরও জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ ক্যাম্পে পৌঁছে কমান্ডো আক্রমণের মাধ্যমে বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে এবং অসংখ্য ঘোড়া জখম করে নিমিষেই অন্ধকারে পালিয়ে গেল।

সকালে রডারিক অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ‘আজ আমি এই দস্যুবাহিনীর উপর শেষ আঘাত হানব। আজকের লড়াই হবে শেষ লড়াই। আজ আমি নিজেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেব।’

রডারিক এক গৌথ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, এখন পর্যন্ত কোন গোথ সিপাহীকে আমি সম্মুখ যুদ্ধে পাঠাইনি। তুমি তোমার গোথ সিপাহীদেরকে প্রস্তুত হতে বলে দাও। গোথ সিপাহীরাই এখন আমার একমাত্র ভরসা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একমাত্র তোমরাই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। আমার সম্প্রদায়ের সিপাহীরা আমাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।’

এই সেই জেনারেল, যাকে মেরিনা নিজের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে এই প্রস্তাব দিয়েছিল যে, যখন পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হবে তখন সে যেন গোথ বাহিনীকে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিশে যায়। কিন্তু এই জেনারেল মেরিনার কথায় রাজি হয়নি। অবশেষে মেরিনা একটি সুন্দরী মেয়ের লোভ দেখিয়ে তাকে বাগে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে বলেছিল,

এই মেয়েকে আমি রডারিকের জন্য এনেছি। যুদ্ধের দিনগুলোতে সে রডারিকের মনোরঞ্জনের জন্য রডারিকের সাথে থাকবে। তুমি যদি আমার কথায় রাজি হও তাহলে এই মেয়ে সুযোগ করে তোমারও মনোরঞ্জন করবে। চিন্তা করে দেখ, এমন সুযোগ বারবার আসবে না।’

মেরিনা চাচ্ছিল, জেনারেল যদি রাজি হয় তাহলে যুদ্ধ চলাকালীন সময় অন্তরঙ্গ কোন এক মুহূর্তে মেয়েটি জেনারেলকে এক ধরনের নেশাকর পানীয় পান করাবে। সেই নেশার প্রভাবে মেয়েটি তাকে যা বলবে, সে তাই করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রডারিকের নির্দেশে মেয়েটিকে জাদুকর বোসজনের হাতে তুলে দিতে হল। ফলে মেরিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হল না। ইহুদি জাদুকর বোসজন সেই মেয়েটিকে জবাই করার জন্য নিয়ে গেল।

আজ যুদ্ধের তৃতীয় দিন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে গোথ সিপাহীরা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হল। তাদের পিছনে ছিল অন্য সম্প্রদায়ের সৈন্যবাহিনী। রডারিক তাদের মাধ্যখানে অবস্থান করছিল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসেছিল। তার মাথার উপর ছিল আন্দালুসিয়ার পতাকা, আর চতুরপার্শ্বে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী।

তারিক বিন যিয়াদ রডারিকের পতাকা দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে চলে এলেন। তারিক বিন যিয়াদের পিছনে তার রক্ষী বাহিনী এগিয়ে এলে তিনি তাদেরকে পিছনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মুগীছ আর-রূমীকে কাছে ডেকে তার কানে কানে কি যেন বললেন।

মুগীছ আর-রূমী আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করলেন, আমরা আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে স্বাগতম জানাচ্ছি। আমাদের সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদ বলছেন, বাদশাহ রডারিক যদি যুদ্ধের জন্য এসে থাকেন তাহলে তিনি যেন আমাদের মতো রক্ষিবাহিনী ছাড়া একাকী সামনে আসেন।’

‘আমার মতো কোন বাদশাহ যদি তোমাদের মাঝে থাকত তাহলে আমি তোমাদের সামনে যেতাম। অপর দিক থেকে রডারিক ঘোষণা করাল। একজন দস্যুসরদারের সামনে যাওয়া আমার মতো বাদশাহর জন্য শোভা পায় না। তোমাদের উচিৎ ছিল তোমাদের বাদশাহকে সাথে নিয়ে আসা।’

‘আমরা তোমাকে অচিরেই আমাদের বাদশাহর নিকট পৌঁছে দেব। তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হল। আমাদের বাদশাহ হলেন আল্লাহ। আমরা কোন মানুষকে বাদশাহ বানাই না। আমাদের সকলের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ” এই পয়গাম পৌঁছানোর জন্য এবং তোমাদের বাদশাহী চিরতরে খতম করার জন্যই আমরা এসেছি।’

‘সামনে অগ্রসর হও।’ গোথ জেনারেলের নাম নিয়ে রডারিক হুঙ্কার ছেড়ে বলল। এই বর্বর জংলিদের মুখ বন্ধ করে দাও।

‘গোথ সিপাহীরা, আঁপিয়ে পড়। শত্রু বাহিনীকে ধ্বংস করে দাও।’ গোথ জেনারেল চিৎকার করে নির্দেশ দিয়ে সে নিজেও প্রবল বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে দিল।

এমন সময় এক অশ্বারোহী গোখ সৈন্য পিছন দিক থেকে দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জেনারেলের পিঠ লক্ষ্য করে সজোরে বর্শার আঘাত হানল। তারপর টেনে বর্শা বের করে পুনরায় আঘাত করল। জেনারেল ঘোড় হতে পড়ে সাথে সাথে মারা গেল।

গোখ সৈন্যরা তলোয়ার কোষাবদ্ধ করে মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝে পদাতিক ও অশ্বারোহী বিপুল সংখ্যক সৈন্য ছিল। তারা হৈ-হট্টগোল করে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তো পূর্বে থেকেই জানতেন যে, গোধ ও ইহুদিরা তাদের সাথে মিলে যাবে। কিন্তু রিকের সৈন্যরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারা ভাবছিল, এটা আবার কেমন হামলা! হামলাকারী তলোয়ার কোষবদ্ধ করে রেখেছে।

‘তাদেরকে স্বাগত জানাও। তারিক বিন যিয়াদ ঘোষণা করালেন। এখন থেকে তারা তোমাদের দোস্ত, তোমাদের সহযোদ্ধা।

‘এটা হচ্ছে কি?’ রডারিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল। এরা যাচ্ছে কোথায়? এরা তো দেখছি, নিজেদের জেনারেলকে হত্যা করে ফেলল?

তার এসব প্রশ্নের জওয়াব দেওয়ার কেউ ছিল না। এটা ছিল মেরিনা ও আউপাসের গোপন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।

কত সংখ্যক গোথ সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, বিশ হাজার। কেউ বলেছেন, পঁচিশ হাজার। আবার কেউ বলেছেন, পনের-বিশ হাজারের মাঝামাঝি হবে।

রডারিকের প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারছিল না। মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে এক গোথ সৈন্য সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চস্বরে বলল,

‘আমরা আমাদের বাদশাহ অর্টিজার প্রতিশোধ নেব। আন্দালুসিয়ায় বাদশাহী করার অধিকার একমাত্র গোয় সম্প্রদয়েরই আছে। রডারিক! তুমি গোথদের রাজত্ব খতম করে নিজে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলে। এবার দেখতে পাবে, আমরা আমাদের অধিকার কীভাবে আদায় করি।

***

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রণাঙ্গনের চেহারাই পাল্টে গেল। আগের দুই দিন রডারিক তার সৈন্যদের মাধ্যমে বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করিয়েছিল, কিন্তু প্রতিটি আক্রমণই চরম ব্যর্থতার রূপ নিয়েছিল। আজ যখন এক সাথে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বিশ হাজার বৃদ্ধি পেল তখন গোটা আন্দালুসিয় বাহিনীর মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেল।

বিশ হাজারের মতো যে বিপুলসংখ্যক সৈন্য মুসলিম বাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল, তারা কোন মামুলি সিপাহী ছিল না। তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সিপাহী ছিল। তাদের সকলের অন্তরেই প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে যে সকল গৌথ ও ইহুদি সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, মুসলিম বাহিনী তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করল। ফলে মুসলিম, গোথ ও ইহুদি সৈন্যদের সম্মিলিত বাহিনী এক অপ্রতিরুদ্ধ শক্তিতে পরিণত হল।

সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধ পলিসি পরিবর্তন করলেন এবং গোথদের মধ্য থেকেই একজনকে তাদের জেনারেল নিযুক্ত করলেন। তাদের পূর্বের জেনারেল গোথ সৈন্যের হাতে নিহিত হয়েছিল।

‘কে বলতে পারবে, আমার রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামের ভবিষ্যত্বাণী সত্য প্রমাণিত হবে না?’ তারিক বিন যিয়াদ তার সালারদেরকে সম্বোধন করে বললেন। আল্লাহর সাহায্য যখন আসে তখন তার বান্দার সকল সমস্যাই দূর হয়ে যায়। আল্লাহ অবশ্যই তার মাহবুবের সুসংবাদ পূর্ণ করবেন। এখন আমার সামনে সেই সুসংবাদ চিরসত্যের রূপ ধারণ করেছে। তোমরা তোমাদের অধীনস্থ সকল সিপাহীকে বলে দাও, তারা যেন আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়, আর সর্বদা অন্তরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।

রণাঙ্গনের অপর দিকের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে এক জাঁকজমকপূর্ণ তাবুতে রাগে-দুঃখে বাদশাহ রডারিক ছটফট করছিল। কখনও সে কুরসীর উপর বসছিল, কখনও আবার লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁবুর মাঝে পায়চারী করছিল। কখনও রাগে-গোসায় টেবিলের উপর সজোরে আঘাত করছিল। আবার কখনও এক হাত দ্বারা অন্য হাতে আঘাত করছিল।

সেই তাঁবুর বাইরে দুজন জেনারেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে একজন বয়স্ক জেনারেল—-রডারিক যাকে অত্যন্ত সম্মান করত–কামরায় প্রবেশ করে বলল :

‘বাদশাহ নামদার! আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। গোথ সিপাহীরা ধোঁকা দিয়েছে তাতে কী এমন অসুবিধা হয়েছে? আমরা সেসকল বিশ্বাসঘাতক গোথদের বংশ ধ্বংস করে দেব।’

‘আমাদের বংশই তো ধ্বংস হচ্ছে। রডারিক সজোরে মাটিতে পদাঘাত করে গর্জে উঠে বলল। যা বলছ, যদি তোমরা তা করতে পারতে তাহলে প্রথমদিনই এ লড়াই শেষ হয়ে যেত। তোমরা দুশমনের কী ক্ষতি করতে পেরেছ? সংখ্যার বিচারে আমাদের সামনে তাদের দৃষ্টান্ত হলে, মানুষের পায়ের নিচে পিপড়ার ন্যায়। কিন্তু এই পিপড়াই এখন আমাদের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুশমন কমজোর হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আমার সামনে থেকে চলে যাও।

জেনারেল চলে না গিয়ে বরং পানপাত্রে শরাব ঢেলে রডারিকের সামনে পেশ করে বলল, ‘আমরা শাহানশাকে এ অবস্থায় দেখতে চাই না। এই নিন; পান করে নিজেকে একটু সামলে নিন।

রডারিক জেনারেলের হাত থেকে পানপাত্র নিয়ে সজোরে তা ছুঁড়ে ফেলে দিল। পানপাত্র শক্ত মেজের সাথে লেগে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

‘তোমরা চাও, শরাবের নেশায় যেন আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়।’ রডারিক বলল। তোমরা চাও, আমি যেন এই কঠিন বাস্তবতাকে ভুলে যাই।

জেনারেল রডারিকের তাঁবু থেকে বের হয়ে মেয়েদের তাঁবুর দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর জেনারেল যখন ফিরে এলো তখন তার সাথে একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ছিল। রডারিক মেয়েটিকে খুবই পছন্দ করত। জেনারেল মেয়েটির সাথে কি যেন বলল। তাঁবুর নিকটবর্তী হয়ে সে মেয়েটিকে তাঁবুতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তাঁবু থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। রডারিক তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁবু থেকে বের করে দিল। তাল সামলাতে না পেরে মেয়েটি হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে মেয়েদের কামরার দিকে চলে গেল।

***

রডারিক চিৎকার করে বৃদ্ধ জেনারেলকে ডাকল। জেনারেল হন্তদন্ত হয়ে রডারিকের তাঁবুতে এসে উপস্থিত হল। রডারিককে কিছুটা শান্ত মনে হচ্ছিল।

‘মনে হয়, সেই ইহুদি জাদুকর ব্যর্থ হয়ে গেছে।’ রডারিক হতাশার সুরে বৃদ্ধ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল। সেই জাদুকর আমাকে বলেছিল, একটি অল্প বয়স্কা কুমারী মেয়েকে বলি দিলে আমি অশুভ শক্তির মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারব। আমি তাকে একটি কুমারী মেয়ে দিয়েছিলাম। সে হয়তো তাকে বলি দিয়েছে, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। সেই ইহুদি আমাকে ধোঁকা দেয়নি তো?

‘আমি এখনই একজন দ্রুতগতি সম্পন্ন অশ্বারোহী টলেডো পাঠিয়ে দিচ্ছি, সে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংবাদ নিয়ে ফিয়ে আসবে।’ বৃদ্ধ জেনারেল বলল।

‘সে কবে পৌঁছবে, আর কবেইবা ফিরে আসবে?’ পরাজিত সৈনিকের মতো হতাশার সুরে রডারিক বলল। আসলে হিরাক্লিয়াসের দুর্গ খোলা আমার ঠিক হয়নি। দুর্গের রক্ষক সেই পাদ্রি দুজন আমাকে বাধা দিয়েছিল। তুমি আমার সাথে ছিলে, তুমিও আমাকে নিষেধ করেছিলে।

‘শাহানশা! অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা এখন বের করে দিন। বৃদ্ধ জেনারেল বলল।

‘কীভাবে আমি আমার অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা বের করে দেব। রডারিক ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল। তুমি কি দেখতে পাচ্ছে না, দুর্গে আমরা যুদ্ধের যে দৃশ্য দেখেছিলাম, সে দৃশ্য আমরা এখানে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানদের সেই রণহুঙ্কার শুনতে পাচ্ছি। প্রতিদিন আমার বাহিনী মার খেয়ে পিছু হটে আসছে। দুর্গের সেই ছায়াচিত্রে আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি দেখেছিলাম, আমার ঘোড়া আমাকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। আর যে মেয়েটিকে আমি পাম্পালুনায় হত্যা করেছিলাম, তাকে আবারও স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি।’

ঐতিহাসিক লেনপোল তকালীন আন্দালুসিয়ার তিনজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছেন, ‘রহস্যময় দুর্গ, আর সেই কিশোরী মেয়ে রডারিকের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রেতাত্মার ন্যায় বেঁকে বসেছিল। যে ইহুদি জাদুকর রডারিককে এই প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি দেবে বলে কথা দিয়েছিল, সে জাদুকর মেরিনার হাতে নিহত হয়েছে। তারপর বিশ-পঁচিশ হাজার সিপাহীর বিশাল বাহিনী কেবলমাত্র রডারিকের পক্ষই ত্যাগ করেনি, বরং তার বিরুদ্ধে দস্তুরমতো লড়াই করছে। তারপরও রডারিকের নিকট যে পরিমাণ সৈন্য ছিল, তার সংখ্যাও মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তার বাহিনীর প্রতিটি সৈন্য মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। রণাঙ্গনের কর্তৃত্ব পুরোদমে তারিক বিন যিয়াদের হাতে চলে এসেছিল। তারিক কোন দুশ্চিন্তা বা প্রেতাত্মার অশুভ প্রভাবের শিকার ছিলেন না। তাঁর মনে কোন পাপের অনুশোচনা ছিল না। তার দৃঢ় বিশ্বাস তার মনোবলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। পক্ষান্তরে পাপের অনুশোচনা রডারিককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সে ভাবছিল তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় উপস্থিত হয়েছে।

***

গোয়াডিলেট নদীর তীরে যুদ্ধের অষ্টম দিনের সর্য উদিত হল। রডারিক তার সকল সৈন্যকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ময়দানে দাঁড় করাল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে ঘোড়ায় চড়ে সারিবদ্ধ সৈন্যদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছুটতে ছুটতে ঘোষণা করতে লাগল,

‘আজকের যুদ্ধেই চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আজ তোমরা যদি দুশমনকে পরাজিত করতে পার তাহলে এত বিপুল পরিমাণ পুরস্কার তোমাদেরকে দেব যে, তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শাহানশা রডারিককে স্মরণ করবে।’

ওদিকে তারিক বিন যিয়াদ সোথ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন : ‘হে গোথ সম্প্রদায়, তোমরা যদি আজ পরাজিত হও তাহলে আন্দালুসিয়া হতে তোমাদের বংশ নির্মূল করা হবে। তোমাদের স্ত্রী-কন্যা ও ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে রডারিক জীবন্ত কবর দেবে।

হে আমার বাবার সম্প্রদায়! তোমরা কি কখনও কারো কাছে পরাজিত হয়েছ? আজ যদি তোমরা পরাজিত হও তাহলে কোথায় যাবে? তোমরা এই প্রথম অন্য একটি দেশে আক্রমণ করতে এসেছ। আরব মুসলমানরা কয়েকটি রাজ্যকে ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তোমরা কি এটা পছন্দ করবে যে, তোমাদের আরব ভাইরা বলবে, বার্বাররা অন্য দেশে গিয়ে যুদ্ধ করার যোগ্য ছিল না?’

‘না, তারিক! কক্ষণও না! বার্বার মুজাহিদগণ সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল। আমরা তোমার সাথে আছি, তোমার সাথেই থাকব।

‘আক্রমণকারীদের রণহুঙ্কারে ভয় পেয়ো না।’ রডারিক তার বাহিনীকে বলল। এরা কোন বাদশাহর ফৌজ নয়, এরা ডাকাত; এরা লুটেরা।’

‘হে আমার মুসলিম ভায়েরা!’ তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর মাঝে বিজয়ের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য বললেন। “বিজয় তোমাদেরই হবে। তোমরা দুশমনের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করতে পেরেছ। আর এটা ভুলে যেয়ো না যে, হাজার হাজার গোথ সৈন্য তাদের জালিম বাদশাহর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তোমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হল, কোন জনবসতির উপর যদি জুলুম-নির্যাতন করা হয় এবং তাদেরকে সাহায্য করার কেউ না থাকে তাহলে তোমরা তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাও। তোমরা তোমাদের এই গোথ বংশীয় ভাইদেরকে জালিম বাদশাহর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দাও।

‘আমরা জীবনবাজি রেখে তাদের জন্য যুদ্ধ করব, আমরা তাদের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করে দেব।’ বার্বার সিপাহীরা এক সাথে চিৎকার করে বলে উঠল।

***

রডারিক হামলা করার নির্দেশ দেওয়ামাত্র তার অশ্বারোহী সৈন্যরা উন্মাদের ন্যায় ছুটে এলো। তারিক বিন যিয়াদ তার অশ্বারোহী বাহিনীকে সামনের কাতারে রেখেছিলেন। যখন দুশমনের অশ্বারোহী দল কাছাকাছি চলে এলো তখন হঠাৎ করে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী সামনে চল এলো। তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে আন্দালুসিয়দের উপর তীর নিক্ষেপ করতে লাগল।

বার্বার সৈন্যদের ধনুক ছিল খুবই মজবুত। এসব ধনুক হতে নিক্ষিপ্ত তীর খুবই দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানত। এসব ধনুকের মাধ্যমে দূরপাল্লার লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব ছিল।

তীরের আঘাতে বেশ কয়েকজন আন্দালুসিয় অশ্বারোহী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তাদের ঘোড়া সমান গতিতে সামনের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। ঘোড়র গতি একটুও কমল না। তারা যখন একেবারে কাছে চলে এলো তখন তীরন্দাজ বাহিনী দ্রুতগতিতে অশ্বারোহী বাহিনীর পিছনে চলে গেল।

মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী পূর্ব হতেই তৈরী ছিল। উভয় বাহিনী প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হল। উভয় বাহিনী যখন পুরোদমে যুদ্ধে লিপ্ত ঠিক তখনই তারিকের ইশারায় গোথ সৈন্যদল অতর্কিতে আন্দালুসিয়দের উপর হামলা করে বসল।

রডারিক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছিল। গোথ সৈন্যদল আক্রমণ করার সাথে সাথে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিল।

তারিক বিন যিয়াদ এবার তাঁর বিশেষ রণকৌশল প্রয়োগ করতে লাগলেন। তিনি গোথ সৈন্যদেরকে সামনাসামনি যুদ্ধ করতে বললেন, আর মুসলিম বাহিনীকে ডানে-বামে পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে গেলেন মুগীস আর-রুমী, আর অপরদিকে গেলেন আবু জারু’আ তুরাইফ। তারা বহুদূর ঘুরে পূর্ব থেকে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে পৌঁছলেন।

রডারিক পূর্ণোদ্যমে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। রডারিক বাহিনীর পিছনে ছিল গোয়াডিলেট নদী। রডারিকের চতুপার্শ্বে যে বাহিনী ছিল মুগীস আর-রুমী ও আবু জারু’আ তুরাইফ সে বাহিনীর উপর বীর বীক্রমে আক্রমণ করে বসলেন। তাঁরা এতটাই আচমকা হামলা করে বসলেন যে, আন্দালুসিয় সৈন্যরা পুরোপুরি ঘাবড়ে গেল। রডারিক নিজেও বুঝে উঠতে পারল না যে, কি হতে যাচ্ছে।

রডারিকের বাহিনী নিজেদেরকে সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার পরিবর্তে ভীত-সন্ত্রস্ত মেষ পালের ন্যায় একজন আরেকজনের সাথে হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। যারা অস্ত্র সমর্পণ করল তারাই কেবল মুজাহিদদের হাত থেকে রেহাই পেল।

উভয় সালার ডান ও বাম দিকের বাহিনীকে পরাজিত করে রডারিকের মূল বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমণ করে বসল। গোথ সৈন্যরা এই বাহিনীর সাথেই সামনাসামনি লড়ায়ে লিপ্ত ছিল। পিছন দিকের এমন অতর্কিত হামলার জন্য রডারিক বাহিনী মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠল না। ফলে অসংখ্য আন্দালুসিয় সৈন্য বেঘোরে জীবন হারাল। যারা আত্মসমর্পণ করল তারাই শুধু বাঁচতে পারল।

সমর বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকদের মতে গোয়াডিলেটের যুদ্ধ বিশ্বের বড় বড় যুদ্ধসমূহের মাঝে একটি অন্যতম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যেমন বীরত্ব প্রদর্শিত হয়েছে তেমনিভাবে মুসলমানদের পক্ষ হতে এমনসব রণ-কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, যা খুব কম যুদ্ধেই পরিলক্ষিত হয়।

ভয়ঙ্কর এই যুদ্ধের ময়দানে এক ব্যক্তি উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে কাউকে যেন তালাশ করে ফিরছিল। গৌরবর্ণের সে যুবক যুদ্ধ করছিল না। কাকে যেন খুঁজতে খুঁজতে সে গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারপর প্রমোদবালাদের কামরায়ও গেল, কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে যাকে খোঁজ করছিল তাকে পাচ্ছিল না।

এই যুবকই হল হেনরি, যে ফ্লোরিডার কাছে ওয়াদা করে এসেছিল যে, রডারিকের মস্তক কেটে এনে ফ্লোরিডার পদতলে রাখবে। হেনরি হন্তদন্ত হয়ে রডারিককে তালাশ করছিল।

রডারিকের ঝাণ্ডা দেখা যাচ্ছিল না। অনেক্ষণ হয় সেই ঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়েছে। আন্দালুসিয় সৈন্যদের হতোদ্যম হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হল, তাদের শাহীঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়ে গিয়েছিল। যার অর্থ হল, বাদশাহ হয়তো নিহত হয়েছে, নয়তো গ্রেফতার হয়েছে।

হেনরি নদীর তীরে রডারিকের সাদা ঘোড়া দেখতে পেল, কিন্তু রডারিককে দেখতে পেল না। ঘোড়র কাছেই একটি তলোয়ার পড়েছিল। তলোয়ারের হাতলে বহু মূল্যবান মণি-মুক্তা খচিত ছিল। এটা যে রডারিকের তলোয়ার তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হল, রডারিকের জুতাও তলোয়ারের কাছে পড়েছিল।

হেনরি প্রমোদবালাদের তাঁবুতে প্রবেশ করল। সেখানে রডারিকের লালসার শিকার মেয়েরা জড়সড় হয়ে বসেছিল। হেনরি তাদেরকে ধমক দিয়ে রডারিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। তারা সকলেই জবাব দিল, তারা কেউ রডারিকের ব্যাপারে কিছুই জানে না।

হেনরি দ্রুত তাঁবু থেকে বের হয়ে রডারিকের তলোয়ার ও জুতা উঠিয়ে তার ঘোড়ায় আরোহণ করল। তারপর দ্রুত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে লাগল, ‘রডারিক নিহত হয়েছে, রডারিক নিহত হয়েছে।’

ঘোষণা করতে করতে হেনরি তারিক বিন যিয়াদের নিকট পৌঁছে বর্ণনা করল, কীভাবে রডারিকের ঘোড়া, তলোয়ার ও জুতা তার হস্তগত হয়েছে।

হেনরির ঘোষণার সাথে সাথে আট দিনের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। লেনপোল লেখেন, এই আট দিনের যুদ্ধই মুসলমানদেরকে আন্দালুসিয়ার উপর আটশত বছর রাজত্ব করার ক্ষমতা প্রদান করেছিল। এরপরও মুসলমানদেরকে আরও কয়েকটা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে ‘গোয়াডিলেটের যুদ্ধ’ই ইতিহাসে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

সকল ঐতিহাসিকই একমত হয়ে লেখেছেন যে, এই ঘটনার পর রডারিকের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার সফেদ ঘোড়া, মণি-মুক্তা খচিত তলোয়ার, আর জুতা গোয়ডিলেট নদীর তীরে পড়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, সে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে সে পলানোর উদ্দেশ্যে নদী পাড়ি দিচ্ছিল, কিন্তু নদীর উত্তাল তরঙ্গরাশী তাকে অপর পাড়ে পৌঁছতে দেয়নি।

অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার খ্রিস্টানদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় এ বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, রডারিক নিহত হয়নি; বরং সে অতিসত্ত্বর ভিন্ন রূপে খ্রিস্টবাদের প্রচারক ও রক্ষক হিসেবে ফিরে আসবে। এ বিশ্বাস দীর্ঘদিন যাবৎ আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের মাঝে বদ্ধমূল ছিল।

সে সময়ে রচিত যেসকল ঐতিহাসিক প্রমাণপঞ্জি পাওয়া যায় এবং যার অধিকাংশই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা থেকে আরেকটি নতুন বিষয় প্রতীয়মান হয়। তা হল, রডারিক নদীতে ডুবে মারা যায়নি; বরং সে নদী পার হয়ে একটি দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই দ্বীপে বিষাক্ত সাপের আধিক্য ছিল। প্রতিদিন একটি করে বিষাক্ত সাপ রডারিককে দংশন করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও রডারিক মৃত্যুবরণ করত না। আল্লাহ তাআলা রডারিককে তার পাপের শাস্তি স্বরূপ সুদীর্ঘ জীবন দিয়েছিলেন। প্রতিদিনই সাপ তাকে দংশন করত। অবশেষে সে যেদিন মারা যায়, সেদিন তার মৃত দেহ সাপের খাদ্যে পরিণত হয়। যেসকল ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব লেখেছেন, তাদের সকলেই হলেন খ্রিস্টান।

এই যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার আন্দালুসিয় সৈন্য নিহত হয়। এই বিপুল পরিমাণ সৈন্যের মাঝে নামকরা জেনারেল এবং আন্দালুসিয়ার ধনী ও বনেদি বংশের লোকেরাও ছিল। ত্রিশ হাজার সিপাহী এবং ছোট-বড় অসংখ্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ঐতিহাসিক দলীল-প্রমাণে পাওয়া যায় যে, রডারিকের সৈন্যরা মুসলমানদেরকে বন্দী করে বেঁধে আনার জন্য বড় বড় রশি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, মুসলিম বাহিনী সেই রশি দ্বারাই রডারিকের। ত্রিশ হাজার সৈন্যকে বেঁধে তাদেরকে সাথে নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়।

৫. যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে

০৫.

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। রডারিকের পরাজিত সৈন্যরা আত্মরক্ষার জন্য দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছোটাছুটি করছে। আহত সৈন্যদের মর্মভেদি চিৎকার আর চেঁচামেচিতে গোটা রণাঙ্গনে কেয়ামতের বিভীষিকা বিরাজ করছে। “লাকা পর্বতের পাদদেশ থেকে গোয়াডিলেট নদীর তীর পর্যন্ত বিশাল-বিস্তৃত জায়গাজোড়ে শুধু লাশ আর লাশ। নিহিত সৈন্যদের শরীর থেকে প্রবাহিত রক্ত আর রণাঙ্গনের মাটি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আহত সৈন্যদের অনেকেই উঠতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। অনেকে শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণ করছিল। সবচেয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল সে সকল সৈন্য, যাদের শরীরে তীর বিদ্ধ হয়েছিল। ছুটন্ত ঘোড়া আর পদাতিক বাহিনীর পায়ের আঘাতে উড়ন্ত ধুলা খণ্ড খণ্ড মেঘমালার ন্যায় আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর দিকে উড়ে যাচ্ছিল।

ঐতিহাসিক স্ট্যাফিজ লেখেন : ‘বড় আশ্চর্যের বিষয় হল, মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ অবাক হয়ে রডারিকের পরাজয়ের শেষ দৃশ্যাবলী দেখছিলেন। আজ পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসের বিস্ময় এই যে, মাত্র বার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীকে কীভাবে এমন করে ধ্বংস করে দিল?’

রডারিকের অশুভ আত্মা যখন রক্ত ও মাটির মাঝে গড়াগড়ি খাচ্ছিল তখন তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া ছুটিয়ে এক উঁচু পাহাড়ের উপর এসে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে তিনি রণাঙ্গনের পূর্ণ দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর জানবাজ মুজাহিদ সাথীরা শহীদ ও আহত মুজাহিদগণকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে রণাঙ্গন থেকে উঠিয়ে আনছে। আর কয়েকজন মুজাহিদ আন্দালুসিয় সৈন্যদেরকে গ্রেফতার করছে। আন্দালুসিয় সৈন্যরা ঝোঁপঝাড়ে, গাছের আড়ালে এবং লাশের নিচে আত্মগোপন করতে চেষ্টা করছে। তারা হয়তো এই আশঙ্কা করছে যে, মুসলিম সৈন্যরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে।

তাদের নিজ হাতে বানানো নৌকার পুলের কোন ক্ষতি হয়নি। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সেই পুল পার হয়ে পালাতে চেষ্টা করল। সকলেই ধাক্কাধাক্কি করে সামনে অগ্রসর হল। ধাক্কাধাক্কির কারণে কয়েকজন পুল থেকে পানিতে পড়ে গেল। যারা হাতিয়ার সমর্পণ করে বন্দীত্ব বরণ করে নিয়েছিল তারাই শুধু নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে বসেছিল।

কে যেন নির্দেশ দিল, পুল দিয়ে যেসকল আন্দালুসিয় নদী পার হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে বাধা প্রদান করো। সাথে সাথে কয়েকজন তীরন্দাজ মুজাহিদ নদীর তীরে চলে এলো। তারা কয়েকজন বন্দীকে দিয়ে ঘোষণা করাল যে, ‘আন্দালুসিয় সকল সিপাহী যেন ফিরে আসে, অন্যথায় তাদের উপর তীর নিক্ষেপ করা হবে। ঘোষণা শুনে পিছনে আসার পরিবর্তে তারা আরও দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। ফলে তাদেরকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করা হল এবং বেশ কয়েকজন আন্দালুসিয় সৈন্য তীর বিদ্ধ হয়ে পুলের উপরই পড়ে গেল। তাদেরকে দেখে অন্য সৈন্যরা পিছনে চলে এলো। কিন্তু যারা পুলের শেষ প্রান্তে চলে গিয়েছিল তারা পালিয়ে গেল। পলায়মান এই সৈন্যদের সংখ্যাও খুব কম ছিল না।

তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনের অন্য দিকে তাকিয়ে দেখেন, কয়েকজন মুজাহিদ বিশ-পঁচিশজন যুবতী মেয়েকে পিছন দিক থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে। এরা সকলেই রডারিকের অন্দরমহলের মেয়ে ছিল। রডারিকের মনোরঞ্জনের জন্য তার সাথে রণাঙ্গনে এসেছিল।

তারিক বিন যিয়াদ নিচে নেমে এলেন। মেয়েদেরকে তার সামনে নিয়ে আসা হল। তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছিল মধ্য বয়সের। তাকেই এসকল মেয়েদের দায়িত্বশীল মনে হচ্ছিল। অন্যসব মেয়েদের সকলেই ছিল অল্প বয়স্ক যুবতী। কারো রূপ-লাবণ্য কারও চেয়ে কম ছিল না।

‘এ সকল মেয়েরা কি শাহীখান্দানের সাথে সম্পর্কিত?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

‘না, ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান বললেন। এরা বিভিন্ন খান্দানের সাধারণ মেয়ে। শাহানশাহে আন্দালুসিয়া এদের মাধ্যমে চিত্তরঞ্জন ও মনোরঞ্জন করত। সে আবার কিসের বাদশাহ, যার অন্দরমহলে বিশ-পঁচিশজন রক্ষিতা না থাকে!

এদেরকে জিজ্ঞেস করো, এদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে বাদশাহর অন্দরমহলে আনন্দে ছিল না?’ তারিক জানতে চাইলেন।

যখন তাদেরকে এই প্রশ্ন করা হল তখন তাদের প্রায় সকলেই একযোগে উত্তর দিল, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে বাদশাহর নিকট অর্পণ করা হয়েছে। এই সকল মেয়েদের মধ্যে খ্রিস্টান মেয়েও ছিল, কিন্তু বেশিরভাগই ছিল ইহুদি।

‘বাদশাহ কোথায়? তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

এই প্রশ্নের উত্তর কোন মেয়েই দিতে পারবে না।’ সরদারনী বলল। চার রাত হল, বাদশাহ কোন মেয়েকে তার তাঁবুতে ডাকেনি। প্রতি রাতেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু সে রাগ করে তাঁবু থেকে আমাকে বের করে দিত। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকেই সে রাগে-গোসায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। রাতের বেলা সে এত বেশি শরাব পান করত যে, এক রাতে আমি তাকে বেহুশ অবস্থায় মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি, তখন আমি একজন দারোয়ান ডেকে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেই। সকাল হওয়ার সাথে সাথে সে পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠত।

রডারিকের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর হাতে চরমভাবে পরাজিত হল। মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের মাথার উপর ছিল আল্লাহ তাআলার কুদরতি হাত, আর তাঁর অন্তরে ছিল রাসূলুল্লাহর এশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম পূর্বেই তাঁকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। মূলত এই সুসংবাদ রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের নির্দেশ ছিল। রাসূলুল্লাহ তারিক বিন যিয়াদকে এই বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারিক! তুমি যদি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তাহলে পরাজিত হয়ে ফিরে যাবে না। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন।

তারিক বিন যিয়াদ রাসূলুল্লাহর নির্দেশ পূর্ণরূপে পালন করেছিলেন।

আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের এই নির্মম পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তার পাপ। পাপের কারণেই সে পরাজিত হয়েছে। কে জানে, কত কুমারী মেয়ে তাকে হৃদয়বিদারী আর্তনাদের মাধ্যমে অভিশাপ দিয়েছিল। কিশোরী উস্তোরিয়া মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে বলেছিল, ‘রডারিক হোর বাদশাহীর উপরও ঘোড়া দৌড়ানো হবে। উস্তোরিয়ার প্রেতাত্মা সব সময় রডারিকের চিন্তা-চেতনায় আতঙ্ক ছড়াত। উস্তোরিয়ার মতো অসংখ্য কুমারী মেয়ের অভিশাপই রডারিককে চরম পরাজয়ের শিকার হতে বাধ্য করেছে।

তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রডারিকের রক্ষিতা মেয়েদেরকে তাঁর সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। আন্দালুসিয়ার যেসকল সৈন্য পালিয়ে গিয়েছিল তাদেরকে খোঁজে খাঁজে ধরে আনা হচ্ছিল। অন্দরমহলের মেয়েদের সামনে দিয়ে তিন-চারজন বন্দীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দুজন মুজাহিদ ছিলেন তাদের সাথে। সেই বন্দীদের মধ্যে এক বন্দীর লেবাস-ছুরত ও চালচলন দেখে তাকে সম্ভ্রান্ত মনে হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদের সামনে বৃত্তাকারে দাঁড়ানো রক্ষিতাদেরকে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘সামনে অগ্রসর হও।’ একজন মুজাহিদ তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল। দাঁড়িয়ে থেকো না।’

‘এই মেয়েদের মাঝে আমার ছোট বোন আছে। সেই বন্দী বলল। তার সাথে একটু দেখা করতে দাও। হয়তো আর কখনও তাকে দেখতে পাব না।’

সে মুজাহিদ ছিল বার্বার। এমনিতেই বার্বারদের দয়ামায়া কিছুটা কম। তাই সে বন্দীকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে বলল।

‘ইনি আমার বড় ভাই।’ অপরূপ রূপসী এক মেয়ে তারিক বিন যিয়াদ ও জুলিয়ানের সামনে হাতজোড় করে বলল। মেহেরবানী করে সামান্য সময়ের জন্য আমাকে তার সাথে দেখা করতে দিন।

‘তাকে আসতে দাও। তারিক সেই মুজাহিদকে লক্ষ্য করে বললেন। ‘শেষবারের মতো বোনের সাথে দেখা করে নিক।

আন্দালুসিয় সিপাহী বৃত্তাকারে দাঁড়ানো মেয়েদের নিকটে চলে এলো। সে ধীরে ধীরে তার বোনের দিকে অগ্রসর হল। তার সাথে একজন মুজাহিদও ছিলেন। যেন সে সিপাহসালারের সামনে কোন ধরনের বেয়াদবী না করতে পারে। মুজাহিদের হাতে ছোট বর্শা ছিল। আন্দালুসিয় সিপাহী আর মুজাহিদ যখন সেই মেয়ের সামনে পৌঁছল তখন অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মেয়েটি মুজাহিদের হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিল। তারপর ততোধিক ক্ষিপ্রগতিতে সেই বর্শা আপন ভায়ের বুকে সমূলে বসিয়ে দিল। মেয়েটি বর্শা টেনে বের করে পুনরায় আঘাত করার জন্য হাত উপরে উঠাল। পাশে দাঁড়ানো একজন মুজাহিদ মেয়েটির হাত ধরে ফেলল এবং তার হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিল।

বর্শার একটি আঘাতই যথেষ্ট ছিল। বর্শা সমূলে তার বুকের মাঝে বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। শক্ত-সামর্থ সুদর্শন সেই যুবকের হাটু প্রথমে মাটি স্পর্শ করল, তারপর সে এক দিকে ঢলে পড়ল।

‘তুমি এটা কি করলে?’ জুলিয়ান সেই মেয়েকে জিজ্ঞেস করল। নিজের ভাইকেই হত্যা করে ফেললে? সে হাতিয়ার সমর্পণ করেছে–এ জন্যই কি তাকে তুমি হত্যা করলে?

‘না, আমি আরও আগেই তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাইনি। মেয়েটি বলল। আপনারা যদি আমাকে এই অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে চান তাহলে শাস্তি দিতে পারেন। আপনাদের কাছে তলোয়ার আছে, বর্শা আছে, আপনারা আমার দেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুন।

মেয়েটির কথা তারিক বিন যিয়াদকে শুনানো হল।

‘তাকে বল, তাকে আমরা কোন শাস্তি দেব না।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। তবে তাকে জিজ্ঞেস কর, সে তার ভাইকে কেন হত্যা করেছে?

‘এই ভাই আমাকে বাদশাহ রডারিকের অন্দরমহলে যেতে বাধ্য করেছে। মেয়েটি বলল। ‘আমার ভাই ছিল একজন সাধারণ সৈনিক, কিন্তু সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল তার। তাই সে আমাকে ধোঁকা দিয়ে একদিন রডারিকের অন্দরমহলে নিয়ে যায়। তারপর সে আমাকে এই মহিলার নিকট রেখে চলে আসে। মহিলা আমাকে মহল দেখানোর অযুহাতে মহলের অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। তখন থেকে বৃদ্ধ রডারিক আমাকে তার ইচ্ছা মতো ব্যবহার করতে থাকে। আমি ছিলাম তার হাতের খেলনা। দুই বছর যাবৎ আমি অন্দরমহলে আছি। এই মহিলাকে আমি কয়েকবারই বলেছি, আমাকে আমার ভায়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে দাও। প্রতিবারই সে আমাকে উত্তর দিয়েছে, অন্দরমহলের কোন মেয়ের বাইরে যাওয়ার কোন নিয়ম নেই এবং অন্য কোন পুরুষেরও এখানে আসা নিষেধ। এই মহিলাই আমাকে বলেছে, আমার ভাই সেনাবাহিনীতে উচ্চ পদ পাওয়ার জন্য আমাকে অন্দরমহলে রেখে গেছে। দুই বছর পর আজ আমার ভায়ের পাওনা মিটানোর সুযোগ এসেছে।

‘যে বাহিনীতে এমন ভাই থাকবে সে বাহিনীর পরিণতি এমনই হবে।’ কমান্ডার মুগিস আর-রুমি মন্তব্য করলেন।

‘এ সকল মেয়েরা যদি নিজ নিজ ঘরে যেতে চায় তাহলে তাদেরকে যুদ্ধবন্দী বানানোর প্রয়োজন নেই। সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। এদেরকে আমাদের বাহিনীর সাথেই থাকতে দাও। এদের যেন কোন রকম কষ্ট না হয়। আমরা সামনে অগ্রসর হওয়ার সময় যখন এদের এলাকা আসবে তখন এদেরকে যার যার ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে।’

***

দ্বিতীয় দিন তারিক বিন যিয়াদ আমীর মুসা বিন নুসাইরের নিকট এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি গোয়াডিলেট যুদ্ধের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন। সবশেষে তিনি লেখেন :

‘এখন পর্যন্ত আমি কোন শহর বিজিত করতে সক্ষম হইনি, তাই বিশেষ কোন তোহফা প্রেরণ করছি না। আমার মনে হয়, আমীরুল মুমিনিন যুদ্ধবন্দীর তোহফাঁকেই বেশি পছন্দ করবেন। এ সকল যুদ্ধবন্দী সবসময় তাঁর নিকটই থাকবে। কেননা, তাদের বাদশাহ পানিতে ডুবে মারা গেছে। এসকল বন্দীকে মুক্ত করার জন্য, কিংবা তাদের মুক্তিপণ দেওয়ার জন্য কেউ বেঁচে নেই। আমাদের কোন সিপাহীও তাদের কাছে যুদ্ধবন্দী হিসেবে নেই, যার মুক্তিপণের জন্য হলেও এদের কাউকে মুক্ত করার প্রয়োজন হবে।

সম্মানিত আমীর! আরেকটি মূল্যবান তোহফা আছে, তা হল আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের প্রিয় সাদা ঘোড়া। ঘোড়াটির নাম হল, উরলিয়া। বাদশাহর তলোয়ারটিও পাঠানো হল। এখন আমি সামনে অগ্রসর হচ্ছি। আমার সফলতার জন্য যেন মসজিদসমূহে দুআর আয়োজন করা হয়।‘

যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধলব্ধ আহত ঘোড়াগুলোকে মিসর পাঠানোর জন্য যুদ্ধ জাহাজের প্রয়োজন দেখা দিল। জুলিয়ানের চারটি বড় বড় যুদ্ধ-জাহাজ তারিক বিন যিয়াদ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। মুসলমানদের নিজস্ব কোন যুদ্ধ-জাহাজ ছিল না।

ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ইতিপূর্বে মুসলিম বাহিনী কখনও নৌযুদ্ধের সম্মুখীন হয়নি। তাদের যুদ্ধ-জাহাজের কোন প্রয়োজনও পড়েনি। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী যখন যুদ্ধ-জাহাজে চড়ে নৌযুদ্ধের জন্য সমুদ্র-অভিযান শুরু করেন তখন সে সকল বাদশাহর নৌশক্তিকে অতল সমুদ্রে ডুবিয়ে ছাড়েন, যারা নিজেদের যুদ্ধ-জাহাজগুলোকে অপরাজেয় মনে করত।

আন্দালুসিয়ার যুদ্ধবন্দীদেরকে মিসর পাঠানোর জন্য আন্দালুসিয়ার একটি বড় যুদ্ধ-জাহাজ নেওয়া হল। যুদ্ধবন্দী সৈন্য আর আহত ঘোড়ার সংখ্যা এত অধিক ছিল যে, সেই জাহাজে করে যুদ্ধবন্দী ও ঘোড়াগুলো কায়রোয়ান সমুদ্রসৈকতে রেখে আসতে তিন দিন লেগে গেল।

উত্তর আফ্রিকার বার্বার গোত্রসমূহ চরম উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার মাঝে দিন অতিবাহিত করছিল। তারা কায়রোয়ানের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতের দিকে তাকিয়ে থাকত। রণাঙ্গনের সংবাদ শুনার জন্য অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করছিল। কেউ কেউ তো সিউটার সমুদ্রবন্দরে গিয়েও বসেছিল।

অবশেষে যখন কায়রোয়ানের বন্দরে যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে প্রথম জাহাজটি এসে ভিরল তখন বাবার জনগোষ্ঠি মাঝি-মাল্লাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বন্দীদের সাথে বার্বার মুজাহিদও ছিল। তারা যুদ্ধ জয়ের সংবাদ শুনালে আগত লোকেরা তাদের গোত্রের নিকট সংবাদ পৌঁছানোর জন্য ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।

যেখানে যেখানে তারিক বিন যিয়াদের বিজয় আর আন্দালুসিয়ার বিশাল সেনাবাহিনীর পরাজয়ের কথা পৌঁছল, সর্বত্র আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই পাগলের ন্যায় নাচতে শুরু করল।

অলিগলি সর্বত্র ঘোষণা হতে লাগল, ‘তারিকের সৈন্য সংখ্যা খুবই কম। সামনে অগ্রসর হলে তার বিপদ হতে পারে। তারিকের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।

এমন অসংখ্য ঘোষণা শ্লোগানে রূপান্তরিত হয়ে গেল। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল। কিশোর-যুবক-মধ্যবয়সী পুরুষরা দল বেঁধে সিউটা এবং কায়রোয়ানের সমুদ্রসৈকতে জড়ো হতে লাগল। কয়েক দিন পূর্বেই আন্দালুসিয়ার যুদ্ধ-জাহাজ বন্দীদেরকে রেখে ফিরে গেছে। নিরুপায় হয়ে বাবার সিপাহীরা নৌকার ব্যবস্থা করে তারিক বিন যিয়াদের সৈন্যদলে যোগ দেওয়ার জন্য আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল।

যুদ্ধবন্দীদের রেখে যাওয়ার জন্য যেসব জাহাজ সিউটা এসেছিল তার একটিতে হেনরি সিউটা বন্দরে এসে নামল। সে জাহাজ থেকে নেমেই জুলিয়ানের মহলের দিকে ছুটে গেল। হেনরি যখন সিউটার বন্দরে এসে নামল তখন পর্যন্ত আন্দালুসিয়ার রণাঙ্গন সম্পর্কে কোন খবর সিউটা এসে পৌঁছেনি।

হেনরি জাহাজ থেকে নেমে যখন জুলিয়ানের মহল লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগল। তখন দুই-তিনজন বাবার সম্প্রদায়ের লোকও তার পিছনে পিছনে দৌড়ে এলো।

‘তুমি কি আন্দালুসিয়া থেকে আসছ?’ দৌড়াতে দৌড়াতে একজন বার্বার হেনরিকে জিজ্ঞেস করল।

‘হা।’ হেনরি না থেমেই উত্তর দিল। আমি জানি তোমরা কি জানতে চাচ্ছ…, বার্বারদেরই বিজয় হয়েছে।’

‘একটু থেমে ভালো করে বল, ভাই!’ বার্বার লোকটি দৌড়ে হেনরিকে ধরে ফেলল।

হেনরি না থেমেই সংক্ষেপে আন্দালুসিয়ার বিজয়, রডারিকের মৃত্যু এবং তার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ দিল।

‘কায়রোয়ান চলে যাও।’ হেনরি বলল। সেখানে আন্দালুসিয়ার হাজার হাজার যুদ্ধবন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

বার্বার লোকগুলো বিজয়-ধ্বনী করতে করতে চলে গেল। হেনরিও পুনরায় মহলের উদ্দেশ্যে দৌড় লাগাল। দুর্গের ভিতর জুলিয়ানের মহল ছিল। দুর্গ বেশি দূরে ছিল না।

ফ্লোরিডা দুর্গের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্যবার সে দুর্গের উপর এসে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকত। কোন জাহাজ দেখা গেলে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে জাহাজ দৃষ্টির আড়াল না হত, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ জাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকত। জাহাজ দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে তার চেহারায় হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠত; অন্তর দমে যেত। এমনিভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়ে যেতে লাগল।

অবশেষে একদিন তার অপেক্ষার পালা শেষ হল। সে দূর থেকে দেখেই চিনতে পারল যে, হেনরি জাহাজ থেকে নিচে নেমে আসছে। সাথে সাথে সে দৌড়ে নিচে নেমে এলো।

হেনরি দুর্গের ছোট দরজা লক্ষ্য করে ছুটে আসছিল। এটাই মহলে প্রবেশের রাস্তা। দিনের বেলা মহলের দরজা খোলাই থাকত। হেনরি দরজা পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। মহলের সকলেই তাকে চিনত। কেউ তাকে বাধা দিল না।

হেনরি মহলের বাগিচায় প্রবেশ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই বাগিচায় বাইরের কারো প্রবেশের অনুমতি ছিল না। হেনরি অত্যন্ত উত্তেজিত ছিল। সে বিশাল বড় এক সংবাদ নিয়ে এসেছে। তাই সে কোন কিছুর পরোয়া করল না। বাগিচায় পৌঁছে সে কিছুটা সাভাবিক হতে চেষ্টা করল।

‘হেনরি!’ হেনরি শুনতে পেল, কে যেন পিছন দিক থেকে তার নাম ধরে ডাকছে এবং তাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।

সে পিছনে তাকাতেই ফ্লোরিডা তাকে দুই বাহু প্রসারিত করে ঝাঁপটে ধরল। সেও ফ্লোরিডাকে বাহুবন্দী করে নিল। অনেক দিন পর প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি তাদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পরই ফ্লোরিডা হেনরির বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে দুই পা পিছনে সরে এলো। তার চেহারায় অসন্তুষ্টির স্পষ্ট ছায়া পরিলক্ষিত হল।

‘তুমি খালি হাতে এসেছ কেন?’ ফ্লোরিডা হেনরিকে জিজ্ঞেস করল। মনে পড়ে, কি ওয়াদা করেছিলে আমার সাথে? রডারিকের মাথা কোথায়?

হেনরি চুপ করে শুনছিল, আর মিটি মিটি হাসছিল।

‘হেনরি!’ ফ্লোরিডা হেনরির কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল। আমি বুঝতে পারছি, তুমি বলতে এসেছ, মুসলিম বাহিনী রডারিকের হাতে পরাজিত হয়েছে, আর তুমি রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে এসেছ। আমার বাবা কী গ্রেফতার হয়েছেন নাকি মৃত্যুবরণ করেছেন?

‘না, ফ্লোরা!’ হেনরি বলল। কাউন্ট জীবিত আছেন। রডারিক মারা গেছে।’

‘তাহলে তার কর্তিত মাথা কেন আননি?

‘সে পানিতে ডুবে মারা গেছে, তার লাশ পাওয়া যায়নি। হেনরি রডারিকের জুতা ফ্লোরিডাকে দেখিয়ে বলল। তার এই জুতা পাওয়া গেছে। তার সাদা ঘোড়া নদীর তীরে দাঁড়ানো ছিল। ঘোড়ার কাছেই তার তলোয়ার আর জুতা পড়েছিল। এসকল বস্তু আমি এমনি এমনিই পেয়ে যায়নি। আমি তলোয়ার নিয়ে রডারিকের বাহিনীর মাঝে ডুকে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি রডারিকের ঝাণ্ডা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আমি নদী পর্যন্ত পৌঁছে যাই।

রডারিকের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে মার খাচ্ছিল। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় আমি রডারিকের সাদা ঘোড়া দেখতে পাই। কিন্তু রডারিককে সেখানে দেখতে পেলাম না। দেখি, ঘোড়ার নিচে রডারিকের তলোয়ার আর জুতা পড়ে আছে। আমি তার তলোয়ার আর জুতা উঠিয়ে তার ঘোড়ায় আরোহণ করে সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদের নিকট এসে পৌঁছি এবং তাকে বলি যে, রডারিক নদীতে ডুবে মারা গেছে। ঘোড়া আর বহু মূল্যবান হিরা-মুক্তা খচিত তলোয়ার তারিক বিন যিয়াদ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আমি তার নিকট আবেদন করি যে, জুতা জোড়া যেন আমার কাছে রাখা হয়। তিনি আমাকে জুতা জোড়া রাখার অনুমতি দেন। প্রমাণস্বরূপ সেই জুতাই আমি তোমার কাছে নিয়ে এসেছি।’

আনন্দে ফ্লোরিডার চেহারা ঝলমল করে উঠল। এতদিন পর তার প্রতিশোধের আগুন নির্বাপিত হল।

***

প্রফেসর ডোজি এবং গিয়ানগোজ লেখেন, মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদের চিঠি পাওয়ামাত্রই অধীর আগ্রহে তা পড়তে লাগলেন। তার চেহারা আবেগের আতিশয্যে লাল হয়ে গেল। তারিক বিন যিয়াদ আট দিনের যুদ্ধের বিবরণ লেখে ছিলেন, কিন্তু সে বিবরণ পড়ে আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের মন ভরল না।

‘তুমি নিজে যুদ্ধের বিবরণ দাও।’ মুসা বিন নুসাইর বার্তাবাহককে বললেন। ‘আট দিনের যুদ্ধের প্রত্যেক দিনের পূর্ণ বিবরণ দাও। তুমি নিজ চোখে যা কিছু দেখেছ, সবকিছু আমাকে শুনাও।’

ঐতিহাসিকগণ লেখেন, যুদ্ধের বিবরণ শুনতে শুনতে মুসা আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তন্ময় হয়ে ঝুলে ঝুলে গোয়াডিলেট যুদ্ধের সরেজমিন প্রতিবেদন শুনছিলেন। এরপর তিনি খলীফার নিকট যে চিঠি লেখেছিলেন তার কিছু অংশ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়। খলীফার নিকট যুদ্ধের বিবরণ লেখার পর তিনি এই মন্তব্যও লেখেন :

‘আমীরুল মুমিনিন। এই যুদ্ধ কোন সাধারণ যুদ্ধ ছিল না। এই যুদ্ধকে রোজ কেয়ামতের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আমি যুদ্ধের যে মৌখিক বিবরণ শুনেছি, তাতে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের বিজয় অসম্ভব ছিল। মাত্র বার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র দল এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অর্ধ দিবসও ঠিকে থাকার কথা নয়। আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর জীবন উৎসর্গকারীদের কারিশমা এটা। আমরা শুধু তাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে পারি। বিনিময় ও প্রতিদান তো কেবল আল্লাহই দেবেন।’

মুসা বিন নুসাইর চিঠির সাথে রডারিকের ঘোড়া ও তলোয়ার খলীফার নিকট পাঠিয়ে দেন। ত্রিশ হাজার যুদ্ধবন্দীকেও তিনি দামেস্কের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন।

ইবনে মানছুর নামে এক আরব কবি বন্দীদের এই দুর্দশা দেখে যে কাব্য রচনা করেন, তার মর্মার্থ হল :

‘ত্রিশ হাজার যুদ্ধবন্দীর এই বিশাল বহর দেখে মনে হচ্ছে, ইসলামের মোকাবেলায় কুফুরী শক্তি কতটা অসহায়, কতটা অক্ষম। বন্দীদের জন্য আমার মায়া লাগে, প্রথমে তো তারা একটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভেজালে বন্দী ছিল, তার পর তারা বাদশাহর হুকুমের গোলাম ছিল। এখন তারা যুদ্ধবন্দী হয়ে নাঙাপায়ে পথ চলছে, এখনও তাদেরকে কেউ এই সুসংবাদ দেয়নি যে, তোমরা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছ, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদেরকে এখনও বলা হয়নি যে, ইসলামে বাদশাহর পক্ষ থেকে কোন বাধ্যবাধকতা নেই, কোন জুলুম-নির্যাতনের আশঙ্কা নেই, ইসলামে বাদশাহ ও গোলামের মাঝে কোন ব্যবধান নেই।‘

লুকহার্ট নামে এক ইউরোপিয়ান কবি রডারিকের পরাজয় কবিতার আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি তার সেই কবিতার নাম দিয়েছেন। ‘আন্দালুসিয়ার শোকগাথা।

রডারিকের বাহিনী যখন পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে যায় তখন রডারিক উঁচু একটি স্থানে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকে। এই দৃশ্যকেই লুকহার্ট তার চমৎকার রচনা শৈলী ও কাব্যরসে পরিপূর্ণ শোকগাথায় এভাবে তুলে ধরেছেন :

‘রডারিক তার শাহীঝান্ডা দেখতে পেল গতকালও তা মাথা উঁচু করে বাতাসে পতপত করে উড়ছিল কিন্তু আজ তা এক টুকরো ছিন্ন কাপড়ে পরিণত হয়েছে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ধুলোবালিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রডারিক বিজয়-ধ্বনী শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু এটা ছিল মুসলিম বাহিনীর বিজয়-ধ্বনী।

তার ক্লান্ত ও হতাশাগ্রস্ত চোখের দৃষ্টি রণাঙ্গনের সর্বত্র ঘুরে ফিরছিল সে তার জেনারেল ও সেনাপতিদের খোঁজছিল রণাঙ্গনে যারা মারা গেছে, তারা ব্যতীত সকলেই পালিয়ে গেছে। রডারিক আফসোস করে নিজেকে বলল, আমার বাহিনীর নিহত সৈন্যদের লাশ কেউ গুণতে পারবে না এত লাশ গণনা করা করো পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশাল-বিস্তৃত রণাঙ্গন রক্তে লাল হয়ে আছে তার দৃষ্টি সেই রক্তের সরোবরে বারবার আটকে যাচ্ছে। তার চোখ থেকে এমনভাবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে যেমনভাবে কোন আহত সিপাহীর শাহরগ থেকে রক্তের শেষ ফুটা গড়িয়ে পড়ে। রডারিক নিজেকে সম্ভোধন করে বলল, গতকালও আমি আন্দালুসিয়ার বাদশাহ ছিলাম আজ আমি কিছুই না। সুউচ্চ প্রাসাদের শাহীদরজা আমার আগমনের বার্তা শুনামাত্রই খোলে যেত। কিন্তু আজ আমার জন্য পৃথিবীর কোথাও এতটুকু জায়গা নেই, যেখানে আমি নিশ্চিন্তে বসতে পারি। পৃথিবীর সকল দরজাই আমার মুখের উপর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হতভাগা! তুমি তো মনে করতে, গোটা পৃথিবীর সমস্ত শক্তি তোমার হাতের মুঠোয় …। হাঁ, আমি তো হতভাগাই, আজ আমি শেষবারের মতো সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখছি। হে মৃত্যু! তুমি ধীরে ধীরে কেন আসছ? আমাকে আলিঙ্গন করতে তোমার কিসের এত ভয়? এসো মৃত্যু, জলদি এসো।‘

এই বিজয়ের মাধ্যমে একাত্ববাদের অনুসারী মুজাহিদগণ ইসলামী ইতিহাসের আরেক সোনালী অধ্যায় রচনা করেন। বরং এভাবে বললেও ভুল হবে না যে, আন্দালুসিয়ার মাটিতে খ্রিস্টানরা স্বহস্তে নিজেদের রক্ত দিয়ে ইসলামী ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায় রচনা করে।

***

তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সহকারী সেনাপতিদের ডাকলেন। জুলিয়ান ও আউপাস তার সাথে ছিলেন।

‘আমরা এখানে আর বেশি দিন থাকতে পারি না। তারিক তার সহকারী সেনাপতিদের বললেন। এই রণাঙ্গন থেকে যেসব সিপাহী পালিয়ে গেছে, কোথাও তাদের বিশ্রাম নেওয়ার এবং সংঘটিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের পিছু ধাওয়া করতে হবে এবং এখনই সামনে অগ্রসর হতে হবে।’

জুলিয়ান ও আউপাসের দিক-নির্দেশনায় মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এমন সময় তারিক বিন যিয়াদের নিকট সংবাদ এলো যে, অসংখ্য বার্বার মুসলমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে মিসর থেকে আন্দালুসিয়া এসে পৌঁছেছে।

বার্বার জাতিগোষ্ঠির লোকেরা বিজয়ের সংবাদ শুনামাত্রই কায়রোয়ান ও সিউটার সমুদ্রসৈকত থেকে নৌকা ভাড়া করে আন্দালুসিয়া আসতে শুরু করেছিল। তারিক বিন যিয়াদ ঘোষণা করলেন, অগিত বার্বারদেরকে সেনাবাহিনীতে শামিল করে নেওয়া হোক। তবে তাদেরকে ভালোভাবে এ কথা বুঝতে হবে যে, এখানে লড়াই করতে হবে। লুটতরাজ করার কোন ইচ্ছা থাকলে, তা যেন মন থেকে বের করে দেয়।

সামনে ছিল ‘শাদুনা’ দুর্গ। এটি ছিল ছোট্ট একটি দুর্গ। মুসলিম বাহিনীকে দূর থেকে আসতে দেখে এই দুর্গে যত সৈন্য ছিল সকলেই পালিয়ে গেল। শহরের অধিবাসীরাও পালিয়ে যেতে লাগল। তারিক বিন যিয়াদ তৎক্ষণাৎ অশ্বারোহী বাহিনীর কমান্ডারকে বললেন, ‘জলদি কয়েকজন ঘোড়সওয়ারকে পাঠিয়ে পলায়নরত শহরের অধিবাসীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা কর। তাদেরকে এই অভয় দাও যে, তাদের জান-মাল ও ইজ্জতের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।’

অশ্বারোহী বাহিনী পলায়নরত শহরবাসীদেরকে ফিরিয়ে আনল। এর কিছুক্ষণ পরই শহরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল তারিক বিন যিয়াদের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলো।

‘আমরা অসহায়। প্রতিনিধি দলের সবচেয়ে বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন। ‘আমরা দুর্বল। আর দুর্বলের এই অধিকার নেই যে, সে সবলের উপর কোন শর্ত আরোপ করবে। একমাত্র বাদশাহই পারেন, আপন সমর-শক্তির মাধ্যমে দুর্বল রাজ্যের উপর আক্রমণ করে সে রাজ্যকে দখল করে নিতে। তখন তার সৈন্যরা বিজিত রাজ্যের লোকদের ঘর-বাড়ী লুটতরাজ করে এবং তাদের কন্যাদেরকে বেআবরু করে। আপনিও বোধ হয় তাই করবেন! এই শহরে আপনাকে বাধা দিতে পারে এমন কোন শক্তি নেই। মেহেরবানী করে আমাদেরকে যেতে দিন। খোঁজ করে দেখুন, আমরা আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ছাড়া আর কিছুই সাথে নেইনি। আপনি শহরে প্রবেশ করুন, আমরা আপনাকে স্বাগত জানাব।’

তারিক বিন যিয়াদকে জানানো হল, বৃদ্ধ কী বলছে।

‘তাকে বলো’, তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমরা এমন এক ধর্ম সাথে নিয়ে এসেছি, যা দুর্বলকে সবলের হাত থেকে হেফাযত করে এবং কাউকে বাদশাহ হওয়ার অনুমতি দেয় না। আমাদের ধর্মে কাউকে লুণ্ঠন করার কোন অনুমতি নেই। আর কোন নারীকে বেআবরু করার শাস্তি হল, অপরাধীকে লক্ষ্য করে এই পরিমাণ পাথর নিক্ষেপ করা হবে যেন, সে পাথরের আঘাতে মারা যায়।

এদেরকে বলো, আমরা রাজ্য জয় করতে আসিনি; বরং এই রাজ্যের লোকদের অন্তর জয় করতে এসেছি। তবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে নয়; প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে। সকলেই নিজ নিজ গৃহে চলে যাও। ধন-সম্পদ গোপন করার কোন প্রয়োজন নেই। যার যা আছে, তা তারই থাকবে।

প্রতিনিধি দলকে যখন তারিক বিন যিয়াদের কথা শুনানো হল তখন তাদের চেহারায় অনাস্থা ও অবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে উঠল। তারা কোন কিছু বলার আগেই তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। তার পিছনে মুজাহিদ বাহিনীও চলতে শুরু করল। এমনিভাবে শাদুনা দুর্গ রক্তপাতহীনভাবে মুসলিম বাহিনীর করায়ত্ব হয়ে গেল।

তারিক বিন যিয়াদ শহরের প্রশাসনিক কাজের জন্য যাদেরকে নিযুক্ত করেন তাদের সকলেই ছিল গোথ ও খ্রিস্টান। একজন মুসলমানকে শুধু প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। সিপাহীদের মধ্য থেকে কেউ শহরবাসীদের দিকে চোখ উঠিয়েও দেখল না। একদিন অতিবাহিত হতে না হতেই শহরবাসীদের অন্তর থেকে বিজয়ীদের ব্যাপারে সকল ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল।

***

সামনে ছিল আরেকটি ছোট শহর কারমুনা’। তারিক বিন যিয়াদ আট-দশ দিন শাদুনায় অবস্থান করেন। বাবার গোত্রসমূহ থেকে যেসব জোয়ানরা এসেছিল, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তাদের সংখ্যা ছিল বার হাজার। আবার কেউ কেউ লেখেছেন, তাদের সংখ্যা হল, পঞ্চাশ হাজার। প্রকৃত সত্য হল, তাদের সংখ্যা বিশ থেকে পঁচিশ হাজার হবে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সালারদের নির্দেশ দিলেন, এসকল নবাগত যুবকদেরকে যেন ভালোভাবে যুদ্ধের নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়া হয়।

অবশেষে তারিক বিন যিয়াদ সৈন্যবাহিনীসহ কারমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাইলে শহরের দুইজন সম্মানিত ও বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি তারিক বিন যিয়াদের নিকট এসে বললেন,

‘প্রথম দিন আমরা আপনার কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারিনি। কিন্তু আপনি কার্যত প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, আপনার ধর্ম মানবতার ধর্ম। আপনার ধর্ম প্রজা সাধারণের উপর কোন ধরনের অন্যায়ের অনুমতি দেয় না। এই শহরের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমরা আপনার অনুগ্রহের প্রতিদান এভাবে দিতে পারি যে, আমরা আপনাকে সামনের বিপদ সম্পর্কে অবহিত করে দেব।

এই বসতি যতটা সহজে আপনি জয় করেছেন সামনের কোন শহর জয় করা আপনার জন্য এতটা সহজ হবে না। এখান থেকে যেসকল সৈন্য পালিয়ে গেছে তারা আপনার ভয়ে পালিয়ে যায়নি। তাদের কমান্ডার ও দুর্গরক্ষক শহরবাসীদেরকে প্রথমে বলেছিল, তারাও মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করবে এবং দুর্গ অবরোধ সফল হতে দেবে না। আমরা উভয়ে সেই মিটিংএ ছিলাম। আমরা বলেছিলাম, এই শহরের সৈন্যসংখ্যা খুবই কম। তাছাড়া শহরবাসীদের অবরোধ বানচাল করার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।’

তখন অন্য আরেকজন সেনা অফিসার বলল, এখানে যুদ্ধ করার মতো রিস্ক নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। এই শহর হামলাকারীদের জন্য বিনা যুদ্ধেই ছেড়ে দেওয়া হোক। সামনের দুর্গে একত্রিত হয়ে আমরা হামলাকারীদের শক্তি নিঃশেষ করে দেব।’

দুর্গপ্রধান বলল, ‘রডারিকের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমাদের পরাজয় হয়েছে। তাছাড়া গোথ সৈন্যদের গাদ্দারীও আমাদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ।

অন্য একজন কমান্ডার বলল, আমরা এখন রডারিক থেকে মুক্ত হয়ে গেছি। এখন আমরা উত্তমরূপে লড়াই করতে পারব।’

‘সবশেষে সকলে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিন্ধান্তে উপনীত হল যে, মুসলিম বাহিনীকে দূর থেকে দেখা গেলেই দুর্গের সৈন্যরা দুর্গ থেকে পালিয়ে যাবে এবং পরবর্তী শহরে গিয়ে আশ্রয় নিবে।

‘কী বললে, তোমাদের সৈন্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল না?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

‘যারা গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছিল, তারা খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল।’ দ্বিতীয় বৃদ্ধ উত্তর দিল। কিন্তু দুর্গের সৈন্যরা এবং শহরের লোকেরা তাদেরকে এতটা লজ্জা দিয়েছে যে, তারা এখন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তৈরী হয়ে গেছে। তাদের অন্তরে এখন ভয় নেই, আছে প্রতিশোধের আগুন। এজন্যই আমরা আপনাকে সতর্ক করতে এসেছি, আপনাদের জন্য সামনের লড়াই খুবই কঠিন হবে।’

***

তারিক বিন যিয়াদ কারমুনা পৌঁছে দুর্গ অবরোধ করে বুঝতে পারলেন, সহজে এ দুর্গ দখল করা সম্ভব হবে না। অবরোধ দীর্ঘ হবে। দুর্গপ্রাচীরের উপর তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীরা বীরের ন্যায় দাঁড়িয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ দেয়ালের চতুর্দিক ঘুরেফিরে দেখলেন, কোথাও দেয়াল ভাঙ্গার ব্যবস্থা আছে কিনা, কিন্তু দুর্গের দেয়াল ছিল অত্যন্ত মজবুত। অগত্যা দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করা হলে উপর থেকে বৃষ্টির ন্যায় তীর-বর্শা নিক্ষেপ হতে লাগল। ফলে বেশ কয়েকজন মুসলিম সৈন্য আহত হলেন এবং কয়েকজন শহীদ হয়ে গেলেন।

কয়েক দিন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে চেষ্টা করা হল, কিন্তু কোন সাফল্য এলো না। উপর থেকে অবিরাম তীর-বর্শা নিক্ষেপ হত, আর অসভ্য ভাষায় খ্রিস্টান সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদেরকে গালাগাল করত।

‘জঙ্গলি বার্বার। এটা শাদুনা নয়, এটা হল কারমুনা।’ দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে খ্রিস্টান সৈন্যরা বলতে লাগল। এখান থেকে চলে যাও, অসভ্য জঙ্গলি কোথাকার, আমাদের হাতে কেন মরতে এসেছ? বাঁচতে চাইলে ফিরে যাও। ডাকাত, লুঠেরার দল। আমরা স্বর্ণ-রুপার কয়েকটা টুকরা নিক্ষেপ করছি, তা নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। কালো চেহারার বানরের দল! পরাজিত রডারিক মরে গেছে। আমাদেরকে রডারিকের মতো বেকুব মনে করো না।

অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে লাগল। কোন কোন ঐতিহাসিক লেখেছেন, অবরোধ এক মাস স্থায়ী হয়েছিল। কেউ লেখেছেন, দুই মাস স্থায়ী হয়েছে। অবশেষে এক রাতে অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হল। ফলে দুর্গপ্রাচীরের উপর আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা নাচতে শুরু করল। তারা চিৎকার করে মুসলিম বাহিনীকে গালাগাল করতে লাগল। শহরের অধিবাসীরাও দুর্গপ্রাচীরের উপর উঠে এলো। মশালের আলোতে রাতের অন্ধকার দূর হয়ে গেল। গোটা শহর যেন উল্লাসে ফেটে পড়ল।

অর্ধ রাতের পর লোকজন প্রাচীর থেকে নেমে যার যার ঘরে চলে গেল। দীর্ঘ অবরোধের কারণে ক্লান্ত সিপাহী ও সিপাহসালার সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল। দুর্গের প্রধান ফটকের উপর চোরা-কুঠরিতে ও ফটকের পিছনে কয়েকজন প্রহরী তখনও জেগেছিল। এমন সময় দুই-আড়াই শ সিপাহী এসে ফটকের সামনে দাঁড়াল। তাদের একজন উচ্চ আওয়াজে প্রহরীদেরকে চিৎকার করে ডাকল। তারা আন্দালুসিয় ভাষায় কথা বলছিল।

‘তোমরা কারা?’ প্রহরীদের কমান্ডার চোরা-কুঠুরি থেকে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করল।

‘আমি সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ান। ফটকের বাহির থেকে আওয়াজ এলো। মশাল নিচু করে আমাকে দেখ।

প্রহরীদের কমান্ডার কাউন্ট জুলিয়ান সম্পর্কে জানত এবং তাকে চিনত।

‘আপনারা কোথা থেকে আসছেন? কমান্ডার জিজ্ঞেস করল।

‘ফটক খোলে প্রথমে আমাদেরকে আশ্রয় দাও।’ জুলিয়ান বললেন। এরা আমার রক্ষিবাহিনীর লোক। আমার আট শ রক্ষিসেনা মারা গেছে। আমরা গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে কোন রকম প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। পাহাড়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করে থেকে অবশেষে আমরা এখানে আসতে পেরেছি। এই দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয়েছিল, তাই আমরা দুর্গ থেকে দূরে আত্মগোপন করেছিলাম। আজ অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই আমরা আশ্রয় নিতে এসেছি। আমি নিজেও আহত, আমার রক্ষিসেনাদের মধ্যে বিশ-পঁচিশজন সৈন্যও আহত। দীর্ঘ ক্লান্তি আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। জলদি ফটক খোল।

ঐতিহাসিকগণ লেখেন যে, জুলিয়ানের পোশাক-পরিচ্ছদ ও শারীরিক অবস্থা এই সাক্ষী দিচ্ছিল যে, সে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত। তার সাথে যে দুই-আড়াই শ সিপাহী ছিল তাদের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। প্রহরীদের কমান্ডার কয়েকটি মশাল জ্বালিয়ে ভালো করে দেখল যে, আশ্রয়প্রার্থী স্বয়ং জুলিয়ানই। রাতের অর্থ প্রহর অতিবাহিত হয়ে গেছে অনেক্ষণ হয়। কমান্ডার তাই দুর্গপতিকে জাগানো সমীচীন মনে করল না। দুর্গের ফটক খোলে দেওয়া হল।

জুলিয়ান দুই-আড়াই শ’ সিপাহীসহ দুর্গে প্রবেশ করলেন। প্রহরীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই জুলিয়ানের সিপাহীরা প্রহরীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সকলকে হত্যা করে ফেলল। জুলিয়ানের সাথে অগিত সিপাহীরা দৌড়ে অন্যান্য ফটকের নিকট পৌঁছে গেল। ফটক-প্রহরীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মুর্দা লাশে পরিণত হল। একে একে সকল ফটক খুলে দেওয়া হল। দুর্গের সিপাহীরা অবরোধ উঠে যাওয়ার আনন্দে শরাব পান করে বেহুঁশ হয়ে ঘুমাচ্ছিল। মুসলিম বাহিনী অবরোধ উঠিয়ে দূরে কোথাও যায়নি। আশেপাশেই ছিল। জুলিয়ানের ইশারার অপেক্ষা করছিল। রাতের অন্ধকার তাদেরকে ঢেকে নিল।

এটা ছিল জুলিয়ানের একটা কুটকৌশল। জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের সাথে পরামর্শ করে এ কৌশল তৈরী করেছিলেন।

দুইজন ঐতিহাসিক লেখেছেন, জুলিয়ানের সাথে যে দুই-আড়াইশ সিপাহী ছিল তারা সকলে ছিল গ্রিক এবং জুলিয়ানের নিজস্ব ফৌজ। কিন্তু অন্য ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, তারা সকলেই ছিল মুসলমান। তারা নিজেদের লেবাস পরিবর্তন করে নিয়েছিল। এই তথ্যকেই সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, জুলিয়ানের সাথে তার নিজস্ব কোন ফৌজ ছিল না।

প্রহরীদেরকে হত্যা করে দরজা খোলে জুলিয়ান স্বয়ং মশাল হাতে নিয়ে প্রাচীরের উপর উঠলে। তিনি মশাল উঁচু করে ধরে ডানে-বামে ঘুরাতে লাগল। তারিক বিন যিয়াদ এই ইঙ্গিতেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সাথে সাথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। তাঁর বাহিনী পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারিক বিন যিয়াদকে অগ্রসর হতে দেখে বাবার বাহিনী প্লাবনের ন্যায় দুর্গের দিকে ছুটে চলল। তারা খোলা দরজা দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। দুর্গের ভিতর হৈহুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। দুর্গের সিপাহীরা জাগ্রত হয়ে দেখতে পেল, তারা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী।

মুজাহিদ বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করার পর দুর্গের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও সাধারণ সিপাহী সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেল। বিশ-পঁচিশ মাইল সামনে দুর্গের মতো দেখতে একটি শহর ছিল। নাম ইসিজা। এটা ছিল বিরাট এক শহর। শহরের চতুর্পার্শ্বে মজবুত প্রাচীর। গোটা শহরটি দুর্ভেদ্য এক দুর্গ। তাছাড়া ইসিজা হল খ্রিস্টধর্মের প্রাণকেন্দ্র। এখানে বিশাল বড় এক গির্জা আছে। গির্জার পাশে ধর্মীয় পাঠশালা। এখানে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট গির্জা ও খানকা ছিল।

এটা সে সময়ের কথা যখন পাদ্রিরা খ্রিস্টধর্মের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে খানকা কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা চালু করেছিল। তারা ধর্মের ব্যাপারে চরম স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল। ফলে প্রত্যেক পাদ্রিই ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিত। তাদেরকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা স্বয়ং বাদশাহরও ছিল না। জনসাধারণ তাদেরকে পূত-পবিত্র মনে করত।

খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, পাদ্রিরা গির্জা ও খানকার মতো পবিত্র স্থানকেও ভোগ-বিলাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। তারা সেখানে যৌনকামিতা ও মদমত্ততার স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে রেখে ছিল। এসব সত্বেও সাধারণ মানুষ ইসিজাকে অতি পবিত্র স্থান মনে করত।

***

তারিক বিন যিয়াদের পরবর্তী লক্ষ্য হল এই ইসিজা শহর। জুলিয়ান ও আউপাস তাঁকে আগেই জানিয়ে ছিলেন যে, “ইসিজা খ্রিস্টানদের অত্যন্ত পবিত্র এক নগরী। খুব সহজে তা হস্তগত করা সম্ভব হবে না। শহরের সাধারণ মানুষও জীবনবাজি রেখে লড়াই করবে। অবলা নারীরা পর্যন্ত ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসবে।

জুলিয়ান ইসিজার ব্যাপারে তারিক বিন যিয়াদকে যা বলেছিলেন,তা ছিল পূর্ণরূপে বাস্তব। গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে যেসব সৈন্য পালিয়ে এসে প্রথমে শাদুনা ও কারমুনায় আশ্রয় নিয়েছিল, তারপর সেখান থেকে ইসিজা এসে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা এ সংবাদ প্রচার করছিল যে, মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর দখল করে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।

এ সংবাদ শুনে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রতিরোধের স্পৃহাও তৈরী হয়েছিল। পালিয়ে আসা সৈন্যরা বলছিল, তাদের রাজ্যে কোন সেনাবাহিনী হামলা করেনি; বরং এটা এমন এক ধর্মীয় হামলা, যা খ্রিস্টধর্মের মতো সত্য ধর্মকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

অন্যান্য রণাঙ্গন থেকে যেসকল সৈন্য পালিয়ে ইসিজা এসে পৌঁছেছিল স্থানীয় লোকেরা তাদেরকে তিরস্কার করে বলছিল,

‘এ সকল কাপুরুষদেরকে শহর থেকে বের করে দেওয়া উচিত।’

‘হে বেহায়া ও নির্লজ্জের দল! শাদুনা ও কারমুনার মেয়েদেরকে কি দুশনের হাতে তুলে দিয়ে এসেছ?

‘আমাদের মেয়েদের হেফাযত আমরা নিজেরাই করব।’

‘এই কাপুরুষদেরকে জীবিত রেখে কোন লাভ নেই।

‘এদের পোশাক খোলে মেয়েলোকের পোশাক পরিয়ে দাও।’

‘ইসিজার নারীরাও লড়াই করবে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসা নারীরা চিৎকার করে বলছিল। এ সকল কাপুরুষদেরকে কেউ এক ঢোক পানিও দেবে না। এর পানির পিপাসায় ছটফট করে মরুক।’

‘ক্ষুধার যন্ত্রণায় এরা ধুকে ধুকে মরুক।’

‘এদেরকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হোক।’

এ ধরনের হাজারো অভিসম্পাদ তীরের ন্যায় তাদের প্রতি নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। তারা এখানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য এসেছিল, কিন্তু তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সেনাবাহিনীর লোকেরাও তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছিল না। তারা যেহেতু সিপাহী ছিল এবং যুদ্ধের জন্য তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তাই তাদের জন্য পানাহারের ব্যবস্থা করা হল। তাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে অফিসাররা তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, আক্রমণকারীদের লড়াই করার পদ্ধতি কি?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারল না। যারা উত্তর দিল, তারা শুধু এ কথা বলল, আক্রমণকারীদের লড়াই করার পদ্ধতি কিছুই বুঝে আসে না। মাত্র কয়েক হাজার সিপাহী এক লাখের চেয়ে বেশি সংখ্যক সিপাহীকে কীভাবে খতম করে ফেলল, আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। শাহানশা রডারিকও তাদের যুদ্ধকৌশল বুঝতে না পেরে মারা গেছেন।

সন্ধ্যার পর বড় পাদ্রি এক সাধারণ সভা আহ্বান করলেন। সেই সভায় পালিয়ে আসা সিপাহী ও দুর্গের সকল সিপাহীকে আহ্বান করা হল। শহরের সর্বস্তরের জনসাধারণ ও সিপাহীরা সভাস্থলে সমবেত হল। পাদ্রি ওয়াজের ভঙ্গিতে তার বক্তব্য শুরু করল। ফলে মানুষের মাঝে ধর্মীয় ভাবাভেগ সৃষ্টি হল। অবশেষে সে তার আসল বক্তব্য শুরু করল।

‘ভায়েরা আমার! এ হামলা শুধু তোমাদের রাজ্যের উপর নয়; বরং এ হামলা তোমাদের ধর্মের উপর। এ আক্রমণ তোমাদের মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু উপর। এই শহরের গুরুত্ব ও পবিত্রতা সম্পর্কে তোমরা ভালোভাবেই অবগত আছ। যদি তোমরা এ শহর দুশমনের হাতে তুলে দাও তাহলে মনে করবে, কুমারী মরিয়মকে তোমরা দুশমনের কাছে অর্পণ করেছ। পবিত্র কুশকে তোমরা দুশমনের পদতলে সমর্পণ করেছ। ঈসা মসীহের রাজত্বের মুলোৎপাটন করেছ। মনে করবে, তোমরা তোমাদের যুবতী মেয়েদেরকে বিধর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছ।

হামলাকারীরা রক্তপিপাসু ডাকাত। তারা নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী, তারা দাস ব্যবসায়ী। তোমাদের কন্যাদের সাথে তারা তোমাদেরকেও নিয়ে যাবে। গোলামের মতো তোমাদেরকে ধনীদের কাছে বিক্রি করবে। তোমাদের এই পবিত্র গির্জা ও খানকাসমূহকে তারা আস্তাবলে পরিণত করবে। বল, তোমরা কি এমনটি মেনে নিবে?

‘না, ফাদার! না।’ সমবেত জনতা এক বাক্যে চিৎকার করে জবাব দিল। ‘আমরা এই শহরের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য জীবন বিলিয়ে দেব।

‘এখন আমি আমার সিপাহী ভাইদের লক্ষ্য করে দু-একটি কথা বলব। পাদ্রি সামান্য সময়ের জন্য থেকে পুনরায় বলতে শুরু করল। যারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে এসেছে, জনসাধারণ তাদেরকে বহু তিরস্কার করছে। তারাও লজ্জিত এবং অনুতপ্ত হয়েছে। লড়াইয়ের ময়দান থেকে পলায়ন করা পাপ। তবে এখন যদি তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে দুশমনকে তাড়িয়ে দিতে পারে বা পরাজিত করতে পারে তাহলে তাদের পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। আর যে এই পবিত্র শহর রক্ষার্ধে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে, সে সরাসরি বেহেশতে প্রবেশ করবে।’

পাদ্রি শহরের অধিবাসী এবং সৈন্যদের মাঝে যুদ্ধের স্পৃহা সৃষ্টি করার জন্য অত্যন্ত জ্বালাময়ী ও রক্ত গরমকরা বক্তৃতা পেশ করল। শ্রোতারা উত্তেজনাকর শ্লোগান দিল। জনসাধারণ ও সৈন্যবাহিনী সকলেই জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল।

***

তার পর পাদ্রি ঐ সকল মেয়েদের নিকট গেল, যারা নিজেদের জীবন-যৌবন এবং যৌবনের সকল সাধ-আরমানকে ধর্মের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত তাদের সৌন্দর্যের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা সকলেই ছিল চিরকুমারী। তাদেরকে ‘নান বলা হত। শুধু পাদ্রিরাই তাদের সাথে থাকত। এ সকল পাদ্রিরাও ছিল চিরকুমার।

বড় পাদ্রি সকল নানকে হলরুমে একত্রিত করে সাধারণ জলসায় যে বক্তব্য রেখেছিল, সেই একই বক্তব্য নানদেরকে শুনাল। সে মুসলমানদেরকে লুটেরা, ডাকাতি, হিংস্র, জঙ্গলি ইত্যাদি অভিধায় অভিযুক্ত করে বলল,

‘এ সকল হামলাকারীরা তোমাদের মতো সুন্দরী যুবতীদেরকে মখমল ও রেশমের কাপড়ে জড়িয়ে রাখবে না। তারা তোমাদের সাথে পাষবিক আচরণ করে তোমাদেরকে মেরে ফেলবে, অথবা আধমরা করে সাথে নিয়ে গিয়ে মরুবেদুঈন সরদারদের কাছে বিক্রি করে দেবে। এই শহর শত্রুর হাতে চলে যাবে, কিংবা আমাদের জীবন চলে যাবে–এ ব্যাপারে আমরা কোন চিন্তা করি না, আমাদের চিন্তা শুধু তোমাদের জন্য। তোমরা যদি তাদের হাতে চলে যাও তাহলে তোমাদের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।

‘ফাদার। তাহলে আমরা কর্ডোভা বা টলেডো চলে যাচ্ছি না কেন?’ একজন কুমারী নান বলল।

‘তোমাদের জন্য কোন জায়গাই নিরাপদ নয়। পাদ্রি বলল। তবে একটা ব্যবস্থা আছে, শুধু তার মাধ্যমেই এই বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব। আর এ জন্য পাঁচ-ছয়জন সাহসী মেয়ের প্রয়োজন। সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের ভয় পেলে চলবে না।’

‘কি কাজ করতে হবে? ফাদার!’ একজন নান জিজ্ঞেস করল।

‘আক্রমণকারীদের সবচেয়ে বড় কমান্ডার তারিক বিন যিয়াদকে হত্যা করতে হবে। পাদ্রি বলল। তার সাথে যে তিন-চারজন বড় জেনারেল আছে, তাদেরকেও হত্যা করতে হবে।’

সাথে সাথে গোটা হলরুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। মনে হল যেন, এখানে জীবিত কোন মানুষ নেই।

‘এটা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। পাদ্রি বলল। তারা আসছে, এসেই এই শহর দখল করে নিবে। তার পর তারা তোমাদেরকে তাদের রক্ষিতা। বানাবে। ভালো করে জেনে রাখো, এমন হবে না যে, তাদের একজন তোমাদের একজনকে তার রক্ষিতা বানাবে। তারা হল সিপাহী; সেনাবাহিনীর লোক। তোমাদের একেকজনের অবস্থা হবে সেই খরগোশের ন্যায়, নেকড়ে বাঘের পাল যার উপর আক্রমণ করেছে। এ পরিস্থিতির শিকার হওয়ার পূর্বেই তোমাদের উচিত তাদেরকে শেষ করে দেওয়া। তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি নেই, যে এই মহান কাজের জন্য রাজি হবে?

মুসলিম বাহিনী কারমুনা থেকে রওনা হয়ে রাস্তায় এক স্থানে যাত্রা বিরতি করবে। যারা যেতে চাও তাদেরকে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হবে। তারা সেখানে গিয়ে বলবে, আমরা তারিক বিন যিয়াদের কাছে যেতে চাই। তাদেরকে কেউ বাধা দেবে না। প্রত্যেকের কাপড়ের নিচে একটি করে খঞ্জর লুকানো থাকবে। তারিক বিন যিয়াদ অবশ্যই কোন একজনকে নিজের তাবুতে রেখে দেবে, আর অন্য মেয়েদেরকে তার জেনারেলরা নিয়ে যাবে। তারপর তোমরা নিজেরাই বুঝেতে পারছ, তোমাদেরকে কী করতে হবে। এই কাজের জন্য পাঁচ-ছয়জন মেয়ের প্রয়োজন। বল, কে কে তৈরী আছ?

মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে উঠে দাঁড়াল। তাকে দেখে আরেকজন রাজি হল। তারা উভয়ে এই বিপদজনক মিশনে যাওয়ার জন্য তৈরী বলে নিজেদের ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তাদের উভয়ের পীড়াপিড়ীতে আরেকজন রাজি হল।

‘তিনজনই যথেষ্ট। পাদ্রি বলল। ‘তোমরা আমার সাথে এসো।’

পাদ্রি তাদেরকে দুর্গপতির নিকট নিয়ে গেল। দুর্গপতি ছিল একজন অভিজ্ঞ জেনারেল। সে মেয়েদেরকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল, কীভাবে এই মিশন সফল করতে হবে।

***

তারিক বিন যিয়াদ কারমুনা থেকে ইসিজার দিকে রওনা হলেন। মুসলিম বাহিনী একদিনে পঁচিশ-ত্রিশ মাইল রাস্তা অতিক্রম করত। মুসলিম বাহিনীর দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা সে সময় সকলের নিকট মশহুর ছিল। পৃথিবীর যেখানেই মুসুলিম বাহিনী যুদ্ধ করেছে সেখানেই তারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে দুশমনকে বিস্মিত করে দিয়েছে। সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী এবং সুলতান মাহমুদ গজনবীর দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে ইউরোপিয় ঐতিহাসিকগণ প্রাণ খেলে মোবারকবাদ জানিয়েছিলেন।

তারিক বিন যিয়াদ তাঁর বাহিনী নিয়ে একদিনে পঁচিশ-ত্রিশ মাইল রাস্তা অতিক্রম করতেন। কিন্তু কারমুনা ও ইসিজার মাঝে তিনি এই উদ্দেশ্যে যাত্রা বিরতি করলেন যে, ইসিজা পৌঁছেই তিনি শহর অবরোধ করবেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে শহর কজা করে নিবেন। এ জন্য সৈন্যদেরকে একরাতের জন্য বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি ইসিজা ও কারমুনার মাঝে এক রাতের জন্য যাত্রা বিরতি করেন।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে তাৰু স্থাপন করা হল। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে রাতের গাঢ় অন্ধকার গোটা বাহিনীকে ঢেকে নিল। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। ইতিমধ্যে তাকে সংবাদ দেওয়া হল যে, একজন আন্দালুসিয় বৃদ্ধ তারিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। বৃদ্ধের সাথে তিনটি যুবতী মেয়েও আছে।

তারিক বিন যিয়াদ তাদের সকলকে ভিতরে ঢেকে দারোয়ানকে নির্দেশ দিলেন দোভাষীকে পাঠিয়ে দিতে।

দারোয়ান বেরিয়ে গেলে তারিক মেয়েদের দিকে তাকিয়ে একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর চেহারায় এমন ছাপ ফুটে উঠল যে, তিনি ইতিপূর্বে এত সুন্দরী মেয়ে কখনও দেখেননি। মেয়েরা গভীরভাবে তারিক বিন যিয়াদকে দেখছিল। তিনজনের ঠোঁটেই মুচকি হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল।

দোভাষী আসলে তারিক বিন যিয়াদ তাকে বললেন, ‘এদেরকে জিজ্ঞেস কর, এরা এখানে কেন এসেছে?

বৃদ্ধ আপন ভাষায় তার আগমনের কারণ বর্ণনা করল। মেয়েরাও বৃদ্ধের কথায় সায় দিল।

‘বৃদ্ধ বলছে, তারা নাকি ইসিজা হতে কারমুনা যাচ্ছিল। দোভাষী তারিক বিন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলল। এই মেয়েদের একজন বৃদ্ধের ভাগ্নি আর অন্য দু’জন তার ভাতিজি। তাদেরকে বলা হয়েছে, কারমুনায় শান্তি ফিরে এসেছে। এখন ইসিজার উপর হামলা করা হবে। হামলাকারী সৈন্যরা মেয়েদেরকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে তাদের লাশ পাওয়া যায়। এই ভয়ে সে মেয়ে তিনটিকে কারমুনা নিয়ে যাচ্ছে।’

‘সে তাদেরকে আমার কাছে কেন নিয়ে এসেছে?’ তারিক জিজ্ঞেস করলেন।

‘ক্ষুধ-পিপাসা তাদেরকে আপনার এখানে নিয়ে এসেছে। দোভাষী বলল। ‘বৃদ্ধ বলছে, তারা সিপাহীদের কাছে খানা-পানি চাইতে পারত, কিন্তু তার আশঙ্কা হয়েছে, সিপাহীরা মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করবে। এ জন্য সে আপনার নিকট আসাই ভালো মনে করেছে। আর এই মেয়েরাও আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাচ্ছে। এই মেয়েটি বলছে, জেনারেল তারিক বিন যিয়াদ অত্যন্ত বীরপুরুষ, তিনি রডারিককে হত্যা করে ভালোই করেছেন।’

তারিক বিন যিয়াদ দারোয়ানকে ডেকে বললেন, ‘এই চারজনের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা কর, বিশ্রামের জন্য উত্তম বিছানা দাও এবং খানা খাওয়াও।

দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন, “এদেরকে বলে দাও, মেয়েরা এখানে পূর্ণ হেফাজতে থাকবে। সকালবেলা তারা কারমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারবে।

দারোয়ান ও দোভাষী তাদেরকে তারিক বিন যিয়াদের তাবু থেকে বাইরে নিয়ে গেল। কিন্তু একটি মেয়ে পুনরায় তারিকের তাঁবুতে ফিরে এসে একেবারে তার কাছে বসে পড়ল। সে ইশারায় তাকে বুঝাতে চাচ্ছিল যে, সে আজ রাত এই তাঁবুতে কাটাতে চায়। তারিক দোভাষীকে পুনরায় ডেকে এনে বললেন, ‘মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করো, সে কি বলতে চায়?

দোভাষী তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, “সে তারিক বিন যিয়াদের সাথে কিছুক্ষণ একান্তে অতিবাহিত করতে চায়।’

‘তাকে বুঝিয়ে বল, আমরা এমন ধর্মের অনুসারী, যা কোন বেগানা নারীকে একাকী কোন পরপুরুষের সাথে থাকার অনুমতি প্রদান করে না। তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে বললেন। তাকে বুঝাতে চেষ্টা কর যে, আমি কেবল এ বাহিনীর সিপাহসালার নই; বরং তাদের ইমামও। তাই আমি এমন কোন কাজ করতে পারি না, যার কারণে অন্যরা ভুল পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়।

মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে তারিক বিন যিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তারিকের সাথে অনেক কথা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু সে তারিকের ভাষা বুঝে না, আর তারিকও তার ভাষা বুঝে না। তবে সে এটা ভালো করেই বুঝত যে, পাপাচারিতার জন্য কোন ভাষার প্রয়োজন হয় না। সুতরাং এই ব্যক্তি কেন মাঝখানে আরেকজনকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, যে উভয়ের মনের ভাব ও ভাবনাকে তরজমা করে বুঝাবে?

দোভাষী মেয়েটিকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করল যে, সিপাহসালার এখানে তার উপস্থিতি একেবারে পছন্দ করছেন না। তিনি চান, তুমি এখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু মেয়েটি এখানেই থাকবে বলে গো ধরে রইল।

‘তাকে বল, সে যেন এখান থেকে বের হয়ে যায়। তারিক রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন। সে যদি আমার কথা না শুনে, তা হলে আমি তাদের সকলকে এখন থেকে বের করে দেব।’

দোভাষী মেয়েটিকে বলল, ‘সিপাহসালার তোমার আচরণে অত্যন্ত রেগে গেছেন। তুমি এখান থেকে চলে যাও, অন্যথায় তোমাদের সকলকে এখান থেকে বের করে দেওয়া হবে।

মেয়েটি আরও বেশি আশ্চর্য হয়ে তারিক বিন যিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে তারিক বিন যিয়াদের দিকে অগ্রসর হল। সে আর কাপড় সামান্য উঠিয়ে ডান হাত কমরে রাখল। অতঃপর যখন সে তার হাত বের করে আনল তখন দেখা গেল, তার হাতে একটি খঞ্জর। মেয়েটি তারিক বিন যিয়াদের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে খঞ্জর তাঁর পদতলে রেখে দিল।

তারিক বিন যিয়াদ হতভম্ব হয়ে দোভাষীর দিকে তাকালেন। দোভাষী মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, এটা আবার কি?

‘আমি যা শুনেছিলাম তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মেয়েটি বলল। আজ আমি এমন এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে আমার মতো সুন্দরী যুবতী একটি মেয়েকে উপেক্ষা করল। আমি এই সিপাহসালারকে হত্যা করতে এসেছিলাম। আমার সাথে যে দুজন মেয়ে এসেছে তারাও একই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে। ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি যে আমাদের সাথে এসেছে, সে আমাদের কোন আত্মীয় নয়। তাকে আমাদের বড় পাদ্রি ও ইসিজার দুর্গপতি পাঠিয়েছে। তারা আমাদেরকে বলেছিল, তোমরা এভাবে মুসলমানদের প্রধান সেনাপতির কাছে পৌঁছবে। তারপর সে তোমাদের সৌন্দর্য ও রূপ-যৌবন দেখে তোমাদেরকে তার খাছ কামরায় স্থান দেবে। তখন তোমরা সুযোগ বুঝে, তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দেবে এবং তার মুখ চেপে ধরে শাহরগ কেটে ফেলবে। তারপর স্বভাবিকভাবে তাঁবু থেকে বের হয়ে আসবে। অন্য যে দুজন মেয়ে আমার সাথে এসেছে তাদেরও দায়িত্ব হল, দুজন সালারকে তাদের রূপ-যৌবনের ফাঁদে ফেলে হত্যা করা। তুমি তোমার সিপাহসালারকে বল, তিনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন। আমি তা মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি।’

‘আমি এদেরকে কোন শাস্তিই দেব না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এই মেয়েরা স্বেচ্ছায় আসেনি তাদেরকে পাঠান হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি এদেরকে নিয়ে এসেছে তাকে কাল সকালে ফজর নামাজের পর হত্যা করা হবে।’

মেয়েটি যখন তারিক বিন যিয়াদের ফায়সালা শুনল তখন সে বলল, ‘আমি আরও কিছু কথা বলতে চাই, সম্মানিত সিপাহসালার! আপনি হয়তো এ কথা ভেবে অবাক হচ্ছেন যে, এই মেয়ে কত বড় সাহসী। সে একটি বিজয়ী দলের সিপাহসালারকে হত্যা করতে এসেছে। আমি কখনই এত বড় সাহসী ছিলাম না। আমি তো এই জীবন সম্পর্কে একেবারে বিরক্ত হয়ে গেছি। এমন জীবন গ্রহণ করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আমাদের ধর্মের লোক আমাকে এবং আমার সাথীদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। কারণ, আমরা ধর্ম্যাজিকা। আমাদের দিন-রাত অতিবাহিত হয় উপাসনালয়ে। আমাদেরকে চিরকুমারী মনে করা হয়। এটাই নিয়ম যে, ধর্ম্যাজিকা ও ধর্মযাজক আজীবন অবিবাহিত থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, কোন ধর্মযাজক বা কোন ধর্ম্যাজিকাই কুমার বা কুমারী নয়। আমাদের উপাসনালয়ের পাশেই আমাদের বিশ্রামাগার। সেখানে দিন-রাত অপকর্ম, আর পাপাচার হয়। সেনাবাহিনীর বড় বড় অফিসাররা সেখানে আসে। শরাব পান করে উন্মাদ হয়ে আমাদের সাথে রাত্রি যাপন করে। দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে গির্জা ও উপাসনালয়সমূহে হিতোপদেশ আর উপাসনার মাধ্যমে মানুষদেরকে খোদার ভয় দেখানো হয়। তাদেরকে এ ধারণা দেওয়া হয় যে, পাদ্রি ও ধর্ম্যাজিকা নারীগণ আসমান থেকে অবতীর্ণ নিষ্পাপ ফেরেশতা। এ সকল ধর্মগুরুরা টলেডোর শাহীমহলকেও নিজেদের করতলগত করে রেখেছে। রডারিকের মতো জালিম বাদশাহও তাদেরকে ভয় পেত।

‘রডারিক তাদেরকে ভয় পেত না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। বরং সে ধর্মগুরুদের সামনে এ জন্য মাথা নত করে রাখত, যেন তারা তোমার মতো আকর্ষণীয় ও সুন্দরী, যুবতী ধর্ম্যাজিকাদেরকে তার দরবারে পেশ করে।

তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘এ মেয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছে। তাকে বল, সে যেন আরও কিছু কথা আমাদেরকে শুনায়।’

‘ইসিজা খ্রিস্টানদের একটি পবিত্র শহর। মেয়েটি বলল। কিন্তু প্রার্থনালয়ে যেসব ধর্মযাজিকা আছে, তাদের অধিকাংশ ইহুদিদের মেয়ে। আমিও ইহুদি। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী। আমার বয়স যখন তের-চৌদ্দ বছর তখন আমাকে জোরপূর্বক এক গির্জায় নিয়ে গিয়ে যাজিকা বানানো হয়। বাবা, মা, ভাই, বোন ঘর-বাড়ী সবই তারা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। তার পর গির্জার ঐ পাদ্রিরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ–আমার সতীত্ব ও কুমারীত্ব ছিনিয়ে নেয়। অথচ সাধারণ মানুষ আমাকে কুমারী ও ধর্মযাজিকা মনে করে তাদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে।

আমি আমার নিজের যে ঘটনা বর্ণনা করলাম–এটা প্রতিটি ধর্ম্যাজিকার জীবন বৃত্তান্ত। আমি সিপাহসালারের নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন এই শহরে–যাকে খ্রিস্টানরা অত্যন্ত পবিত্র শহর মনে করে আগুন লাগিয়ে দেন। অথৈ পাপে নিমজ্জিত এই শহরের নাম-নিশানা মিটিয়ে দেন।

আমার এই শরীর ছাড়া মুসলিম সেনাপতিকে দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার কাছে নেই। আমার একান্ত ইচ্ছা এই যে, আমি সেনাপতির ধর্ম গ্রহণ করে নেব, অতঃপর তিনি আমাকে শাদী করবেন। কিন্তু আমি আমার এ বাসনা পূর্ণ হতে দেব না। কারণ, আমি একটি অপবিত্র মেয়ে, আর সিপাহসালার আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র এবং অনেক সম্মানী ব্যক্তি। আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলছি, বিজয় আপনাদেরই হবে। পরাজয় ঐ সকল পাপীদেরই হয়, যারা ধর্মের লেবাস পরিধান করে লোকচক্ষুর অন্তরালে আকণ্ঠ পাপে নিমজ্জিত থাকে।

‘এই মেয়েকে অন্য মেয়ে দুটির কামরায় নিয়ে যাও। তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন। আর এদের সাথে যে বৃদ্ধ এসেছে, তাকে এখানে নিয়ে এসো।’

মেয়েটি চলে গেলে সেই বৃদ্ধ তারিক বিন যিয়াদের তাবুতে প্রবেশ করল। তারিক বিন যিয়াদের হাতে সেই খঞ্জরটি ছিল, যেটি ঐ মেয়ে তাঁর পদতলে রেখে গেছে।

‘তুমি কি এ খণ্ডর দ্বারা আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছিলে?’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে খঞ্জরটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

বৃদ্ধ ভয়ে ও বিস্ময়ে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন, তার চোখ দুটি কুঠরি ছেড়ে বের হয়ে আসবে। সে থর থর করে কাঁপছিল।

‘যে জাতী তার নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে ময়দানে নিয়ে আসে তাদের অবস্থা এমনই হয়, যেমনটি তোমাদের হচ্ছে।’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে লক্ষ্য করে বললেন। আমরা মিথ্যা ও অকল্যাণের মূলোৎপাটন করতে এসেছি। আমরা আল্লাহ্ তাআলার এই জমিনকে পাপমুক্ত করতে এসেছি। আর তোমাদের ধর্মগুরু ও সিপাহসালাররা সেই পাপের আশ্রয় নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথ রুদ্ধ করতে চাচ্ছে।

আমি যুদ্ধের ময়দানে তীর অথবা তলোয়ারের আঘাতে মৃত্যুবরণ করব। আমি যে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে এই রাজ্যে এসেছি, সে আল্লাহ আমাকে ব্যভিচারে লিপ্ত অবস্থায় কোন নারীর হাতে মারতে পারেন না। তুমি আমাকে বল, ইসিজার সৈন্য সংখ্যা কত? দুর্গের প্রাচীর কেমন? এমন কোন রাস্তা আছে কি, যেখান দিয়ে আমরা দুর্গের ভিতর প্রবেশ করতে পারব?

‘দুর্গ বহুত মজবুত।’ বৃদ্ধ বলল। শহর রক্ষাপ্রাচীর এতটাই শক্ত যে, আপনি কিছুতেই তা ভাঙতে পারবেন না। আপনার সিপাহী প্রাচীরের কাছেই যেতে পারবে না। কারণ, শহরের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত তীর, বর্শা, পাথর ও জ্বলন্ত লাকড়ি নিয়ে প্রাচীরের উপর প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে। এই শহর রক্ষার জন্য নারীরা পর্যন্ত লড়াই করবে। বড় পাদ্রি শহরবাসী ও সিপাহীদেরকে পূর্ণরূপে উত্তেজিত করে রেখেছে। যে সকল সিপাহী পরাজিত হয়ে পালিয়ে ইসিজায় আশ্রয় নিয়েছে, তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করবে।

‘তুমি কে?’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন।

‘আমি একজন পাদ্রি। বৃদ্ধ বলল।

‘তুমি কি আমাকে এবং আমার দুইজন সালারকে ঐ মেয়েদের মাধ্যমে হত্যা করার জন্য এখানে এসেছ?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।

‘হা, সিপাহসালার! বৃদ্ধ বলল। আমি এই ইচ্ছা নিয়েই এসেছিলাম, তবে এখন সে ইচ্ছা ত্যাগ করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।’

তারিক বিন যিয়াদের হাতে খঞ্জর ছিল। তিনি আস্তে আস্তে বৃদ্ধের কাছে এসে পূর্ণ শক্তি দিয়ে বৃদ্ধের বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিলেন।

‘সাপ কখনও দংশনের ইচ্ছে ত্যাগ করতে পারে না।’ তারিক বৃদ্ধের বুক থেকে খঞ্জর বের করতে করতে বললেন।

বৃদ্ধ তার হাত দুটি বুকের উপর রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ দারোয়ানকে ডেকে বললেন, ‘সেনা ছাউনি থেকে বহুদূরে এ লাশ ফেলে আসবে। আর মেয়ে তিনটির ব্যাপারে নির্দেশ হল, তাদেরকে পৃথক পৃথক স্থানে রাখবে এবং তাদের জন্য কঠিন হেফাজতের ব্যবস্থা করবে।’

তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ান, আইপাস ও অন্যান্য সালারদেরকে ডেকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পেশ করলেন।

***

ফজরের