“যা বলতে ইচ্ছা করে বলো?”
“এখানে এসে আপনার আচরণ ও ব্যবহারে আমি আপনাকে বিষ পান করাতে পারতাম না। আপনার উন্নত নৈতিকতা ও আদর্শবাদিতা আমার মিশনকে ভণ্ডুল করে দিয়েছিল। আপনি হয়তো একথা বিশ্বাস করবেন না। হয়তো বলবেন, ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমি একথা বলছি। শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমি বাহানা তালাশ করছি। দয়া করে আপনি আমাকে শাস্তি দেয়ার জন্য অন্য কারো কাছে তুলে দেবেন না। আমার আনা বিষ আমাকে পান করতে দিন। কারণ এই বিষ এতোটাই তীব্র যে মরতে বেশি সময় লাগবে না। এর পর আমার মরদেহ যেখানে ইচ্ছা ফেলে দিন তাতে আমার কোন আফসোস থাকবে না। না তরুণী, তুমি যা ভেবেছ আমি তেমন কিছুই করব না। তুমি যদি কোন আরব মুসলমান কন্যা হতে তাহলে তোমার এই যাদুকরী রূপ সৌন্দর্য মণ্ডিত দেহ আমার এই তরবারী দিয়েই দ্বিখণ্ডিত করে দিতাম। কিন্তু তুমি অমুসলিম ও শত্রু পক্ষের অবলা নারী। তোমাকে অস্ত্র হিসাবে প্রয়োগ করেছে আমার শত্রু পক্ষ। কিন্তু কোন শত্রু নারীর ওপর আমার তরবারীর কার্যকারিতা প্রয়োগের অবকাশ নেই। ইসলাম খুবই মানব হিতৈষী ধর্ম।
রাজা দাহির, উজির বুদ্ধিমান তোমরা নিজের কৃতকর্মের আত্মউপলব্ধি করার জন্য তোমাকে অক্ষত অবস্থায় তোমার কর্তাদের কাছেই ফিরিয়ে দেবো। একথা শুনে শিমু বলল, আপনি মানুষ নন, সত্যিই একজন দেবতা। কিন্তু দেবদেবীতে আপনি বিশ্বাসী নন বলে আপনাকে আমি ফেরেশতা বলতে চাই। আগে আমি আপনাকে প্রতারিত করার জন্য আপনার সান্নিধ্যে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিলাম এখন একান্তভাবেই আবেদন করছি, আপনার সেবাদাসী হিসাবে আপনার সংস্পর্শে আমাকে থাকার অনুমতি দিন। আমি আপনার কাছে কখনো আসব না। শুধু দূর থেকে আপনাকে দেখে দেখে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিতে দিন। আমাকে আপনার দাসী হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ দিন। তোমার সব কথার জবাব আমি ইতোমধ্যেই দিয়ে দিয়েছি। তোমার সব আকাক্ষাও আমি পূর্ণ করেছি। তোমার পূর্বেও আমরা তোমার মতো আরো তিন তরুণীকে রাজা দাহির ও উজির বুদ্ধিমানের কাছে পাঠিয়েছি। এরা মাকরানে বসবাসকারী আরব যুবকদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। তুমি হয়তো ওদের সম্পর্কে জানেনা। ওদেরকেও দাহিরের উজির সেখানে নিযুক্ত করেছিল। তাদের চক্রান্তও ব্যর্থ হয়েছে। আমি সেই তরুণীদের বলেছিলাম, তোমাদের রাজাকে গিয়ে বলবে, যোদ্ধাদের লড়াই মুখোমুখি রণাঙ্গনে তরবারীর সাহায্যে হয়ে থাকে। এখন তুমি গিয়ে রাজা দাহির ও উজির বুদ্ধিমানকে বলো, “হে কাপুরুষ রাজা! আরবদের সাথে যদি মোকাবেলা করার এতোই সাধ থাকে তাহলে মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হও।” সে কি ভেবেছে, তার দুর্গের উঁচু দেয়াল তাকে আরব যোদ্ধাদের তরবারী আর আল্লাহ্র সৈনিকদের বর্শা ও তীর থেকে রেহাই দিতে পারবে?
বিন কাসিম যখন শিমুকে একথাগুলো বলছিলেন, তখন শিমু হাঁটু গেড়ে বসে দুহাত জোড় করে দেবতার মুখোমুখি পূজা করার মতো করে বসে রইলো। যেন সাক্ষাত কোন দেবতার কণ্ঠে সে আশ্চর্য কিছু শুনছে। ঘটনার আকস্মিকতায় শিমুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
বিন কাসিম বললেন, হে হতভাগী মেয়ে। আমরা এমন ধর্মের অনুসারী যে ধর্মে নারীর ইজ্জত সম্ভ্রম রক্ষা করাকে জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে করা হয়। নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় আমরা জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না। আমরা কখনো নারীর জীবন উৎসর্গ করে ধর্ম ও রাজ্য রক্ষার চেষ্টা করি না। তুমি জানো, তোমাদের রাজা শুধু আরব মুসাফিরদের জাহাজই লুট করেনি,
জাহাজের অধিবাসীদের কয়েদখানায় বন্দি করে রেখেছে। আমরা সেই বন্দীদেরই মুক্ত করতে এসেছি। কিন্তু আমাদের আগে আরো দু’বার আমাদের সৈন্যরা এখানে এসে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেছে এবং আমার আগে দু’জন সেনাপতি শাহাদাতবরণ করেছেন। এজন্য আক্রমণের আগে আমাকে অনেক ভেবে চিন্তে এগুনোর কথা ছিল। কিন্তু এক আরব কন্যার মুক্তির ফরিয়াদী পয়গাম পেয়ে আমার চাচা হাজ্জাজ আমাকে এই বলে নির্দেশ পাঠালেন, “তুমি যেখানে যে অবস্থায় আছে এবং যা-ই করছ না কেন সেই অবস্থাতেই সিন্ধু রওয়ানা হয়ে যাবে, সৈন্যরা তোমার সাথে গিয়ে মিলিত হবে। ফলে সেই অবস্থাতেই আমি রওয়ানা হয়ে এসেছি কোন প্রস্তুতিই নিতে পারিনি। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দয়ার ভরসা ছাড়া আমার আর কোন বাহ্যিক শক্তি নেই।
বন্দীদের তো আপনি মুক্ত করে নিয়েছেন? বলল শিমু।
হ্যাঁ, এক অত্যাচারী রাজার হাত থেকে শুধু আরব মজলুম বন্দীদেরই আমরা মুক্ত করিনি, শহরের অধিবাসীদেরকেও মুক্তি দিয়েছি। তুমি কি এই রাজাকে অত্যাচারী বলবে না? নিজের ক্ষমতার স্বার্থে যে তোমার মতো তরুণীদেরকে সম্ভ্রম বিক্রি করে দেয়ার কাজে লিপ্ত করে। তোমার কি সাধ ছিল, তুমি কোন বীর বাহাদুর স্বামীর বন্ধু হবে, স্বামীর বীরত্বে গর্ববোধ করবে? হে আরব শাহজাদা, আমি ও আমার মতো এদেশের অসংখ্য সুন্দরী তরুণী কোন ভদ্র ঘরের বধু হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছি। অতি শৈশব থেকেই আমাদেরকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের আবেগ অনুভূতি সুখ আহ্লাদকে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমাদেরকে এই ঘৃণ্য কাজের জন্য তৈরি করেছে আমরা তাদের হাতের খেলনা মাত্র। মন্দিরের পুরোহিতরাও অবাধে আমাদের ভোগ করে…। কিন্তু আজ আপনি আমার মৃতপ্রায় অনুভূতিকে জাগিয়ে দিয়েছেন। আমি এখন অনুভব করতে পারছি, আমার আত্মপরিচয়।
