মন্দিরে এসে প্রধান পুরোহিতের কক্ষে প্রবেশ করে কিন্তু সে কখন মন্দির থেকে বেরিয়ে গেছে এ সম্পর্কে কেউ কিছুই জানাতে পারলো না।
আচ্ছা! সেই তরুণির নাম শিমুরাণী? এক পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন শাবান। হ্যাঁ ওর নাম শিমুরাণী, বলল এক পুরোহিত। শাবান ছাকাফী শিমুরাণীর কথা শুনে নিহত পুরোহিতের কক্ষে গিয়ে কক্ষটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। তিনি দেখতে পেলেন, কক্ষে একটি পানপাত্র পড়ে আছে এবং সেই পাত্রে এক দুই ঢোক খাবার পাণীয়ও অবশিষ্ট রয়েছে। শাবান ছাকাফী পানপাত্রটি তুলে নিয়ে মন্দিরের বাইরে এসে একটা কুকুর কিংবা বিড়াল ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। সৈন্যরা কিছুক্ষণের মধ্যে একটি কুকুর ধরে নিয়ে এলো। শাবান ছাকাফী কুকুরের মুখ হাঁ করিয়ে পানপাত্রের অবশিষ্ট পাণীয়টুকু কুকুরের গলায় ঢেলে দিলেন এবং কুকুরটিকে ছেড়ে দিতে বললেন। কুকুরটি ছাড়া পেয়ে দৌড় দিলো কিন্তু সামান্য এগিয়েই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। সেই সাথে কয়েকটা ঝাকুনি দিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল কুকুরটি। মুহূর্তের মধ্যে দেখা গেল কুকুরটি প্রাণ ত্যাগ করেছে।
শিমুরাণী এখন কোথায়? মন্দিরের পুরোহিত ও দেবপুত্রদের জিজ্ঞেস করলেন গোয়েন্দা প্রধান।
সবাই অজ্ঞতা সূচক জবাব দিল। শাবান ছাকাফী সবাইকে মন্দিরের দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড় করিয়ে ছিলেন। এরা ছিল সংখ্যায় ১২ জন। ১২ জন তীরন্দাজকে ওদের থেকে আট দশ গজ দূরে দাঁড় করিয়ে নির্দেশ দিলেন, প্রত্যেকেই ওদের দিকে একটা করে তীর তাক করো।
গোয়েন্দা প্রধান নির্দেশ দিলেন, শিমুরাণী কোথায় আছে যে সেই কথা বলবে তাকে প্রাণে বাঁচানো হবে। কিন্তু কেউ কোন কথা বলল না। গোয়েন্দা প্রধানের নির্দেশে তীরন্দাজরা কামানের ধনুক দিয়ে তীর ছোড়ার জন্য উদ্যত হলো এমন সময় হঠাৎ এক পুরোহিত বলে উঠল আমি বলব। সাথে সাথে শাবান ছাকাফী তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেললেন। পুরোহিত গোয়েন্দা প্রধানের কাছে ব্যক্ত করল, রাতেই সে জানতে পারে শিমুরাণী বড় পুরোহিতকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে। রাতের বেলায় অপর এক পুরোহিত বড় পুরোহিতের কক্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল শিমুরাণী তখন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। বড় পণ্ডিত তখন বহুকষ্টে শুধু এতটুকুই বলতে পেরেছিল, “ওকে ধরো আমাকে বিষ খাইয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।” বড় পুরোহিতের কথা অন্য লোকেরা তাড়াতাড়ি শিমুকে পাকড়াও করে এবং সকাল বেলায় শহরের
দরজা খোলা হলে পুরুষের পোষাক পরিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
‘কোথায় নিয়ে গেছে? জিজ্ঞেস করলেন ছাকাফী।
‘এতক্ষণে সে হয়তো উরুঢ়ের অর্ধেক পথ অতিক্রম করেছে।” বলল পুরোহিত। উরুঢ় পৌছলেই ওকে হত্যা করে ফেলা হবে।
“ওকে হত্যা করাই উচিত, প্রধান পুরোহিতের হত্যা কোন সাধারণ অপরাধ নয়” বললেন ছাকাফী। শিমুকে হয়তো কিছুদিন শাস্তি দেয়া হবে বলল, পুরোহিত। অপরাধ শুধু এই নয় যে, সে প্রধান পুরোহিতকে খুন করেছে। তার বড় অপরাধ হলো যাকে খুন করানোর জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিল তাকে বিষ পান না করিয়ে সে পণ্ডিতের জীবন নিয়েছে।
কাকে বিষ খাওয়ানোর জন্যে পাঠানো হয়েছিল? ‘আপনার প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে?
‘শিমু হয়তো মন্দিরে এসে বলেছিল কেন সে আমাদের সিপাহসালারকে বিষ পাণ করায়নি।’
না সে এসেই বড় পণ্ডিতের কক্ষে ঢুকে পড়েছিল।
বল এই মন্দিরে আর কি কি চক্রান্ত হয়? তোরা অসুস্থ কুকুরের মতো যদি ধুকে ধুকে মরতে না চাস, তাহলে বল, এখন তোদের সবার জীবন মরণ আমার হাতে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে পুরোহিতদের উদ্দেশ্যে বললেন গোয়েন্দা প্রধান।
‘মিথ্যা নয় সত্যই বলব, প্রতিশ্রুতি দিলো পুরোহিত। সে বলল, গত রাতে এক মহিলা কয়েকজন তরুণীকে নিয়ে আপনার সিপাহসালারের কাছে গিয়েছিল। সেটি হলো একটা চক্রান্ত। আমরা খবর পেয়েছিলাম, মুসলিম সৈন্যরা সুন্দরী মেয়েদের প্রতি খুবই আকৃষ্ট। আমাদের রাজার প্রধান উজির বুদ্ধিমান খুবই জ্ঞানী লোক। তিনি বলেছিলেন, মুসলিম বাহিনীর সিপাহসালার তরুণ লোক। সুন্দরীদের ফাঁদে সে অবশ্যই ধরা দেবে এবং ভোগ বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে অগ্রাভিযান বন্ধ করে দেবে। শিমুর প্রতি নির্দেশ ছিল সে সিপাহসালারের কাছে থেকে যাবে এবং তার রূপের যাদু ও ছলনা দিয়ে তাঁকে। ভুলিয়ে রাখবে। এমতাবস্থায় আমাদের রাজা একদিন মুসলিম বাহিনীকে অবরোধ করবে ঠিক সেই সময় শিমু সিপাহসালারের পানিতে বিষ প্রয়োগ করবে।
“কি ভাবে বিষ দেয়ার কথা ছিল?
“শিমুর হাতে যে আংটিটি ছিল সেটির টোপটি ছিল ঢাকনা ওয়ালা। কাছ থেকে দেখেও কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলনা এর মধ্যে ঢাকনা আছে।” বলল পুরোহিত। ঢাকনার ভিতরে বিষ মাখানো তুলা ভরা ছিল। এই বিষ এতোটাই ভয়াবহ যে, মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। তরুণির পক্ষে আপনার সেনাপতির পাণীয়দ্রব্যে বিষ প্রয়োগ করা মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিলনা। কিন্তু বলা যাচ্ছে না এই পরিকল্পনা কি করে উল্টো হয়ে গেল। আপনি আমার জীবন ভিক্ষা দেয়ার ওয়াদা দিয়েছেন, আমি আপনার উপকারের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ জানাতে চাই, আপনার সিপাহসালারকে বাঁচিয়ে রাখুন। এটা হিন্দুস্তান। রহস্যময়ী, যাদুটোনা আর তিলিসমাতির জন্য এই অঞ্চল বিখ্যাত। আপনি দুর্গের পর দুর্গ জয় করতে পারেন, লড়াইয়ের ময়দানে বিজয়ী হতে পারেন, কিন্তু একদিন না একদিন এই চক্রান্তের ফাঁদে আপনাকে অবশ্যই আটকে ফেলা হবে।” টার্গেট ব্যর্থ হওয়ার পর হিন্দু চক্রান্তকারীরা অর্ধবয়স্কা মহিলা ও তরুণীদেরকে অস্বাভাবিক কৌশল ও দ্রুততায় নিরূন থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল। চক্রান্তের উৎস উদঘাটিত হওয়ার পর গোয়েন্দা প্রধান মন্দিরের সকল পুরোহিত ও বাসিন্দাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। পুরোহিতরা স্বীকার করে নিয়েছিল বিন কাসিমকে হত্যার চক্রান্তে তারাও জড়িত ছিল। তারা একথাও জানালো এর চক্রান্তের মূল হোতা রাজা দাহিরের প্রধান উজির বুদ্ধিমান ও মায়ারাণী।
