ভিতরে প্রবেশ করেই তারা সবাই হিন্দু রীতি অনুযায়ী বিন কাসিমকে হাত প্রসারিত করে প্রণাম করল। অর্ধবয়স্কা মহিলা সামনে অগ্রসর হয়ে বিন কাসিমের পায়ে সিজদা করল। বিন কাসিম মহিলাকে সিজদা করতে দেখে পিছনে সরে গেলেন। এরপর যুবতীরা অগ্রসর হয়ে কেউ তাঁর হাতে চুমু খেতে লাগল, আর কেউ তার জামা ধরে চোখে লাগাল সেই সাথে প্রাণখোলা আবেগপূর্ণ ভাষায় তাঁর কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা প্রকাশ করতে লাগল। বিন কাসিম সাথে সাথে তাঁর দুভাষীকে ডেকে তার মাধ্যমে তাদের সাথে কথা বলা শুরু করলেন।
তিনি জানতে চাইলেন, রাতের বেলায় তোমরা এখানে কেন এসেছ? বয়স্কা মহিলা বলল, এসব তরুণীকে বেশ কিছু দিন ধরে মাটির নীচে গোপন কক্ষে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই লুকানো অবস্থা থেকে এদেরকে বের করে আনা হয়েছে। আমাদের লোকজন এদেরকে লুকিয়ে রেখেছিল।”
লুকিয়ে রেখেছিল কেন?’
“আমাদেরকে বলা হয়েছিল মুসলিম সৈন্যরা যে শহর জয় করে প্রথমেই সেই শহরের যুবতী তরুণীদের ধরে এনে সৈন্যরা ভাগাভাগি করে নেয়।” বলল অর্ধবয়স্কা মহিলা। আমাদের আরো বলা হয়েছিল, মুসলমান খুবই হিংস্র জাতি, এদের আচার ব্যবহার হিংস্র জন্তুর মতো। মুসলিম সৈন্যরা যখন শহরে প্রবেশ করছিল, তখন শহরের সকল হিন্দু তরুণী যুবতীদেরকে যে যেখানে পেরেছে। লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু আমাদের যেমনটা বলা হয়েছিল মোটেও তেমন কিছু হয়নি। গতকাল আমরা জানতে পেরেছি, আপনি সামরিক বেসামরিক সবার জন্যই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। আমাদের যে ধরনের ভয় দেখানো হয়েছিল, আপনার সৈন্যরা যদি তেমনই হতো তাহলে ইতিমধ্যে তেমন কিছু ঘটত। কিন্তু আপনার সৈন্যদের সদাচার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা দেয়ার কথা শুনে সকল তরুণী যুবতীদেরকেই লুকানো অবস্থা থেকে বের করে আনা হয়। কোন বিরূপতা না দেখে সবাই অবাধে শহর জুড়ে ঘোরা-ফেরা করে কিন্তু আপনার কোন সৈন্য অত্যাচার উৎপীড়ন করবে তো দূরে থাক কোন তরুণির প্রতি তাকিয়েও দেখেনি।”
“তোমারতো কোন ভয় ছিল না, তুমিতো বাধকে উপনীত হয়েছে।”
‘এরা আমাকে নিয়ে এসেছে। আপনার মহানুভবতা, মমতা ও দয়ার কথা শুনে এরা আপনাকে দেখার জন্য, আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এরা আপনার দয়ার জন্য আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতে চায়। কেন এরা আপনার কৃতজ্ঞতা জানাবে না, চেয়ে দেখুন, এদের মতো সুন্দরী রূপসীদের প্রতি কোন বিজয়ী সৈন্যরা হাত না বাড়িয়ে থাকতে পারে? এদের আগ্রহকে সম্মান দিয়ে আমি তাদের এখানে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছি।” ‘তোমরা যেটাকে বিস্ময়কর মনে করেছ, এটা আমাদের কাছে মোটেও বিস্ময়কর নয়, আমরা এতো দূর থেকে আনন্দ ফুর্তি করতে আসিনি। আমরা তোমাদেরকে বাদী দাসী বানাতেও আসিনি। তোমাদের ইজ্জত সম্মান ধনসম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। এটা আমাদের ধর্মের নির্দেশ। তোমরা এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যেতে পারো।’
“তরুণীদের মনোভাব এমন ছিল যে, তারা কেউ এখান থেকে ফিরে যেতে চায়না। একতো এরা প্রত্যেকেই ছিল সুন্দরী রূপসী, তদুপরি এদের অঙ্গভঙ্গিও ছিল যে কোন পুরুষের মধ্যে কামনা জাগানোর মতো উত্তেজক। কিছুক্ষণ পর আবারো বিন কাসিম তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা স্মরণ
করিয়ে দিলে তরুণিরা ঘর ছেড়ে যেতে উঠল কিন্তু তরুণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী রূপসী তরুণী তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। সে বলল,
‘আমি আরো কিছু সময় আপনার সামনে একান্তে থাকতে চাই।’ ‘এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কি করবে তুমি?’
আপনাকে মানুষ নয় দেবতা মনে হয়। আমি আপনাকে জানতে চাই, আপনাকে বুঝতে চাই।”
অর্ধবয়স্কা মহিলা অন্যদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। সে ভিতরে থাকা তরুণির জন্য অপেক্ষা করে অন্যদের নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর দুভাষীও বেরিয়ে গেল। শুধু সেই তরুণী বিন কাসিমের কক্ষে রয়ে গেল।
পরদিন সকাল বেলায় শোনা গেল শহরের প্রধান পুরোহিতকে মন্দিরের ভিতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই খবর দিনের আলো বেড়ে ওঠার সাথে সাথে শহরব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। মুহাম্মদ বিন কাসিম অমুসলিমদেরকেও ধর্মীয়, স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। হিন্দু, বৌদ্ধ যার যার মতো নিজ নিজ ধর্মালয়ে উপাসনা করছিল। এমতাবস্থায় শহরের সুরক্ষিত প্রধান মন্দিরের গ্রান্ডপুরোহিতের আকস্মিক মৃত্যুর ব্যাপারটি কোন সাধারণ ঘটনা ছিল না। খবরের নানা ডালপালা গজিয়ে শহরময় নানা গুঞ্জনের জন্ম দিল। প্রধান সেনাপতি বিন কাসিমের কানেও গেল সেই খবর। তিনি যথাসম্ভব দ্রুত মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের জন্যে গোয়েন্দা বিভাগকে নির্দেশ দিলেন। গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী সাথে সাথে ছুটে গেলেন অকুস্থলে। শাবান ছাকাফী মন্দিরের ভিতরে শয়ন কক্ষে পুরোহিতের মৃতদেহ দেখেই বলে ফেললেন, একে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বিন কাসিমের কাছে বিষ প্রয়োগে হত্যার রিপোর্ট দিলেন।
বিন কাসিম রিপোর্ট শুনে বললেন, এটা উদঘাটনের চেষ্টা করুন, বিষ প্রয়োগের সাথে কোন মুসলমান জড়িত কি না। শাবান ছাকাফী মন্দিরের অন্যান্য পুরোহিত ও সেখানে অবস্থানকারী দেবপুত্রদের (যেসব ছেলেদেরকে শৈশবেই দেবতার নামে মন্দিরে উৎসর্গ করা হয় অথবা মন্দিরে অবস্থানকারী দেবদাসীদের পাপাচারে যেসব ছেলে সন্তান জন্ম নেয় তাদেরকে দেবপুত্র বলে) প্রত্যেককে ন্নি ভিন্ন ভাবে জিজ্ঞেস করেন, জানতে চাইলেন, প্রধান পুরোহিতেব সাথে কারো কোন ধরনের শত্রুতা ছিল কি-না। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল, গভীর রাতে একজন সুন্দরী তরুণী
