হাতে করেছিলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম নিরূন শহরের কব্জা পূর্ণ করলেও অগ্রাভিযান শুরু করা সম্ভব ছিলনা। কারণ হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশনা মতো সাহায্যকারী রসদপত্র পৌছা এবং সামানপত্র পরিবহণের পথ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার আগে অগ্রাভিযান ছিল অসম্ভব। বিন কাসিম এ বিষয়টা যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন যে, রাজা দাহিরের লক্ষ আরব সৈন্যদের ডাভেল বন্দর থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া; যাতে তাদের রসদ সরবরাহ পথ দীর্ঘ হয় আর সরবরাহ লাইন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
রাস্তা নিরাপদ রাখার পাশাপাশি গোয়েন্দাদের অগ্রিম অনুসন্ধানী তৎপরতাও জটিল হয়ে উঠল। আরব সৈন্যরা সিন্ধু অঞ্চলের যতোই ভিতরে প্রবেশ করছিল তাদের জন্যে পথ ঘাট, শত্রু পক্ষের অবস্থান ও স্থানীয় ভাষা ইত্যাকার সমস্যাবলী তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠল।
এদিকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল সিন্ধু অভিযানের দিকে। তিনি রীতিমত সরবরাহ পাঠাচ্ছিলেন। সরবরাহ পাঠাতে ডাভেল বন্দর প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হলো। মুহম্মদ বিন কাসিম কোন সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই নিরূন শহর দখল করেন। নিরূনের পরিবর্তিত সেনাধ্যক্ষ বিন কাসিমের শহরে পদার্পণের সময়েই কয়েকজন জুনিয়রকে নিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে শহর ত্যাগ করেছিল। অথচ বিন কাসিমের কাছে গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল, নিরূনের সেনাবাহিনী এখন মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত কিন্তু নিরূন শাসক সুন্দরী যখন দাহিরের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরূন পৌছলেন এবং শহরে প্রবেশ করেই প্রহরীদেরকে প্রধান গেট খুলে দিয়ে আরব বাহিনীকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করলেন, তখন শহরের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মুসলিম সৈন্যদের স্বাগত জানায় এবং সেনা বাহিনীকেও প্রতিরোধ থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেয়।
নিরূনবাসীর প্রতিক্রিয়া ও গোয়েন্দাদের পূর্ব রিপোর্টের ভিত্তিতে বিন কাসিম এই সিদ্ধান্তে উপণীত হলেন, হিন্দু সৈন্যরা যে কোন সময় আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে। সেই ধারণা থেকে শহর দখলে আসার পর তিনি হিন্দুদেরকে একটা ময়দানে সমবেত করে দুভাষীর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “হিন্দু রাজের সৈন্যরা শোনো, তোমাদের মধ্যে এখনো হয়তো এই ভয় রয়েছে যে, আমরা তোমাদের হত্যা করব। অবশ্য তোমাদের বেলায় তাই
হওয়া স্বাভাবিক ছিল। দুনিয়া জুড়ে এই রীতিই চলে এসেছে যে, বিজিত রাজ্যের সৈন্যদেরকে বিজয়ী বাহিনী হত্যা করে কিন্তু এই নীতি সেই শাসকের সৈন্যরাই করে থাকে যারা রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করে। এরা পরাজিত সৈন্যদের বিপদের ঝুঁকি মনে করে হত্যা করে। আমরা সাম্রাজ্য বিস্তার ও শাসন করার লিঙ্গ নিয়ে এদেশে আসিনি। আমরা আল্লাহর পবিত্র পয়গাম নিয়ে হিন্দুস্তানে এসেছি। তোমরা পরাজিত হয়েছ বলে তোমাদের ওপর আমরা আমাদের ধর্ম-চাপিয়ে দেবোনা। আমরা তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিচ্ছি অবশ্য সেই সাথে তোমাদেরকে আহবান করছি তোমরা আমাদের ধর্মকে দেখো, যদি তোমাদের দৃষ্টিতে আমাদের ধর্ম সত্য মনে হয় তাহলে তা গ্রহণ করো; সেই সাথে একথাও ভেবে দেখার কথা বলব, তোমাদের কথিত দেবদেবীর যেসব মূর্তি আমাদেরকে শহরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি, ওরা তোমাদের কি উপকার করতে পারবে। ওরাতো নিজেদের শরীর থেকে একটা মাছিও দূর করতে পারে না। এসব মানুষের তৈরী প্রভু। আসলে ইবাদতের উপযুক্ত মাত্র একজন, যিনি নিরাকার অদ্বিতীয় যিনি সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মনে রাখবে, তোমাদের ক্ষমা করে দেয়ার অর্থ এই নয় যে, তোমরা স্বাধীনতা পেয়ে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে মেতে উঠবে। এমন তৎপরতায় লিপ্ত হলে মনে রেখো, তোমাদের কোন তৎপরতাই আমাদের অজানা থাকবেনা। মনে রাখবে, তোমাদের প্রতিটি কথা আমাদের কানে পৌছবে। তোমাদের জানিয়ে দিতে চাই তোমাদের কেউ যদি শহর থেকে চলে যেতে চাও তবে যেতে পারো, কিন্তু সে আর এই শহরে আসার অনুমতি পাবে না।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, তাৎক্ষণিত ভাবেই কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এদের ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ হয়তো ছিল জীবনাশঙ্কা। কারণ সামরিক সদস্যদেরকেও সাধারণ ক্ষমার আওতায় ক্ষমা করে দেয়া হবে এটা অনেকের বিশ্বাস হচ্ছিল না। জীবন রক্ষার জন্য এদের কেউ তাৎক্ষণিক রক্ষাকবচ হিসাবে ইসলাম গ্রহণকেই যৌক্তিক মনে করেছিল। কিন্তু সকল সৈন্যকেই যখন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো, তখন অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে এরা “আরব শাহজাদার জয়” শ্লোগানে ময়দান মুখরিত করে তুললো। শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে চরম ভীতি বিরাজ করছিল। কারণ আরমান ভিলা মুসলিম বাহিনী কব্জা করার পর থেকেই
শহরের মন্দিরগুলোতে পুরোহিত পূজারীদের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছিল, মুসলিম মানে অত্যাচারি জালেম। ওরা কোন শহর দখল করলে সেখানকার কোন ঘরের জিনিসপত্র অক্ষুন্ন রাখেনা এবং যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে শ্লীলতাহানি ঘটায়। কিন্তু নিরূনের অধিবাসীরা দেখলো হিন্দু পুরোহিতদের সব প্রচারণাই অবাস্তব। বিজয়ী মুসলিম সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে লুটতরাজ তো দূরের কথা কোন ঘরে উকি দিয়েও দেখেনি। শহর জুড়ে সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা বিরাজমান। পণ্ডিত পুরোহিতদের আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় এবং মুসলিম বাহিনীর অভাবনীয় সদাচার শহরের অধিবাসীদের এতোটাই মুগ্ধ করেছিল যে, বিন কাসিম শহরের কেন্দ্রস্থলে যে মসজিদের ভিত্তিস্থাপন করেন স্থানীয় অধিবাসীরা স্বেচ্ছা শ্রম দিয়ে সেই মসজিদ নির্মাণে সৈন্যদের সাথে সহযোগিতা করেছিল। শহরের নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে বিন কাসিমের কয়েক দিন ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে। তিন চার দিন পর এশার নামাযান্তে সারা দিনের ক্লান্তি ও পরিশ্রমে কারণে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষে তিনি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় প্রহরীরা তাকে খবর দিলো, স্থানীয় কিছু সংখ্যক মহিলা প্রধান সেনাপতির সাথে সাক্ষাত করতে চায়। বিন কাসিম সাথে সাথেই তাদেরকে ভিতরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। সাক্ষাত প্রার্থীদের মধ্যে সাত আটজন ছিল যুবতী আর একজন অর্ধবয়স্কা মহিলা। তারা সবাই ছিল হিন্দু এবং একজনের চেয়ে অপরজন সুন্দরী।
