এক পর্যায়ে পায়চারিরত রাজা থেমে গেল। রাজা দাহিরের অভ্যাস এই ছিল যে, সে যখন কোন কথা বলতো, তখন পরিষ্কার দ্ব্যর্থহীন শব্দে উচ্চ আওয়াজে বলতো। ঘুমন্ত মানুষও তার আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠত। আর সে যখন কোন শাহী ফরমান জারী করতো, তখন তার সিংহাসনে বসে রত্নখচিত হীরের তরবারীর হাতলে মুষ্টিবদ্ধ করে এমন এক ধরনের গাম্ভীর্য কণ্ঠে ঘোষণা দিতো যে, দেখে মনে হতো সে শুধু সিন্ধু অঞ্চলের নয় যেন গোটা মহাভারতের মহারাজা।
তখন তার সকল দরবারী রাজা দাহিরের দিকে এক পলকে তাকিয়ে থেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যেতো। সকল উপদেষ্টা ও সেনাকর্মকর্তাদের পরামর্শ শোনার পর রাজা দাহির তার সিংহাসনে আরোহণ করে সকলের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। অতঃপর মহারাজার মতো ভাবগাম্ভীর্য কণ্ঠে বলল, “আমি ওদেরকে এখানে আসতে দেবো, কিন্তু ওরা আসবে বটে তবে আমাদের পায়ের নীচে ওদের গর্ব অহংকার মিটিয়ে দেয়ার জন্যে আসবে। কোন আরব মায়ের নির্বোধ শিশুটি হয়তো এখন নিজেকে জঙ্গলের বাঘ ভাবছে। আমরা তাকে একথাই বলে দিতে চাই, সেই মূর্খ বাঘ বটে কিন্তু রাজধানী এসে সেই বাঘ দেয়ালের দূরে বসে নিজের ক্ষতস্থানগুলো চাটবে। তোমরা কি জানোনা, সিন্ধু অঞ্চলের সিংহ জয়সেনা ওর পথে পাহাড়ের মতো প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে? তোমরা জেনে রেখো, ব্রাহ্মণবাদে এক আরব বালক ও এক সিন্ধি যুবকের মোকাবেলা হবে। এরপরই নির্ধারিত হবে এদেশে হিন্দুত্ববাদ থাকবে না ইসলাম। তোমরা হৃদয়ে একথা ভালো ভাবে লিখে নাও যে, আমরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের সেনা বাহিনীকে প্রতিরোধ করছিনা, ইসলামকে প্রতিরোধ করছি যা অতি অল্প সময়ে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
তোমরা কেউ জানো, কেন এতো অল্প সময়ে চারদিকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে? শহরের প্রধান হিন্দু পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে দাহির বলল, ঋষি মহারাজ। এখন আপনি ওদের সেই কারণটি জানিয়ে দিন।
ইসলাম প্রসার লাভ করার কারণ হলো, এ পর্যন্ত ইসলামের মোকাবেলা হয়েছে যেসব ধর্মের সাথে সেই সব ধর্ম সত্য ছিলনা।” বলল পণ্ডিত। এক দিকে ছিল অগ্নিপূজারী পারসিক আর অপর দিকে ছিল যীশুখৃস্টের পূজারী খৃস্টান। এসব ধর্মের নিজস্ব কোন শক্তি ছিলনা। পক্ষান্তরে হিন্দুধর্ম দেবদেবীদের ধর্ম। আমাদের দেবদেবীরা ইচ্ছা করলে আকাশ থেকে আগুন বর্ষণ করতে পারে, ইচ্ছা করলে একটি পাহাড় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তুলে নিয়ে বসিয়ে দিতে পারে। ইচ্ছা করলে শত্রুদের ওপর পাহাড় চাপিয়ে দিতে পারে। এসব মুসলমান হিন্দুদেরকে অগ্নিপূজারী আর খৃস্টানদের মতো মনে করে বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের দেশে চলে এসেছে।
“আমাদের ধর্ম এমন এক ধর্ম আমাদের মেয়েরা পর্যন্ত যে ধর্মের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে পারে।” বলল রাজা। ধর্ম ও দেশের জন্য আত্মদানকারী নারীকে দেবতারা মাটি থেকে উঠিয়ে আকাশে তুলে নেন এবং তাদেরকে দেবতাদের সান্নিধ্যে রাখেন।”
“মহারাজের জয় হোক! আমাদের নারী সমাজ তখনই কেবল আত্মদান করবে যখন আমরা সবাই মরে যাবো” বলল এক প্রবীণ যোদ্ধা।
“আরে আমি যা বলেছি, তুমি তা বুঝতে পারনি। আমাদের তরুণী মেয়েরা ইতিমধ্যে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে।
কি যেন নাম… ছেলেটার! বলল পণ্ডিত। হ্যাঁ, বিন কাসিম। সে তরবারী আর যুদ্ধটাকে একটা খেলা মনে করছে। সে বুঝতে পারছেনা, দেবদেবীদের আগুন নিয়ে খেলছে সে। আমাদের কোন সুন্দরী তরুণী যদি ওর সামনে চলে যায় তাহলে ওর হাত থেকে তরবারী পড়ে যাবে। কোন বোকা শিশুকে যদি সামান্য একটা খেলনা দেখাও তাহলে হাতের দামি খেলনাটাও সে ফেলে ওইটার প্রতি ঝুঁকবে এমনটা কি তোমরা কখনো দেখেছ? সবাইকে জিজ্ঞেস করল পণ্ডিত।
“কিন্তু এসব স্নেচ্ছের বিরুদ্ধে আমরা এখন সুন্দরী মেয়েদের ব্যবহার করিনি।” বলল রাজা। ওকে যখন উন্মুক্ত ময়দানে আমাদের মুখোমুখি আসতে বাধ্য করব, তখন সে সব মারপ্যাচ ভুলে যাবে। আমরা তাকে এমন খারাপ অবস্থায় আমাদের সামনে আনবো যে, হাত জোড় করে আমাকে বলবে, মহারাজ। ভগবানের দোহাই, আপনি আমাকে আপনার কাছে আশ্রয় দিন। বলল রাজা দাহির। রাজা দাহিরের সেই দিনের বৈঠকে উজির বুদ্ধিমান ছিলনা। উজির বুদ্ধিমান রাজ মহলেরই অপর একটি কক্ষে রাজার স্ত্রীরূপী বোন মায়ারাণীর
সাথে বৈঠক করছিল। যে সুন্দরী অস্ত্র প্রয়োগের কথা রাজা বৈঠকে সামরিক উপদেষ্টাদের জানালো, সেই কৌশল প্রয়োগের নানা বিষয় নিয়ে বুদ্ধিমান মায়ারাণীর সাথে কথা বলছিল। মায়ারাণী ও বুদ্ধিমান এই কৌশল প্রয়োগের দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিয়েছিল।
ইতিহাস সাক্ষী, দুটি জাতি ধোকা প্রতারণা এবং কাপুরুষতাকে অস্ত্রের চেয়েও বেশী মারাত্মক হাতিয়ারে পরিণত করেছে, তন্মধ্যে একটি হলো ইহুদি আর অপরটি পৌত্তলিকতাবাদী হিন্দু। ইহুদিরা কখনো প্রকাশ্য রণাঙ্গনে মুসলমানদের মোকাবলায় অবতীর্ণ হয়না। ইহুদিরা সব যুগেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। ওদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার সম্পদ আর প্রশিক্ষিত সুন্দরী নারী। হিন্দুদের ইতিহাসও কাপুরুষতা, দুর্নীতি ও চক্রান্তের বেড়াজালে ভরপুর। হিন্দুরা যখনই রণাঙ্গনে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হয়েছে তখন ওদের সুন্দরী ললনাদেরকে মুসলমানদের হাতে তুলে দিয়েছে। পরবর্তীতে এই নারীদের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের শিকড় কেটেছে। হিন্দুদের নারী অস্ত্র প্রয়োগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ মুগল শাসক আকবর। যে জন্য এখনো হিন্দুরা আকবরকে মোগলে আযমের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। মোগল সম্রাট আকবরের হেরেম হিন্দু চক্রান্তকারীরা প্রশিক্ষিত ও ধোকাবাজ রমণীদের দিয়ে ভরে ফেলেছিল। হিন্দু রমণীদের ফাঁদে পড়ে মোগল শাসক আকবর এতোটাই বিভ্রান্ত হয়েছিল যে, পৌত্তলিকতা, খৃস্টবাদ ও তৌহিদের মিশ্রণ ঘটিয়ে সে দীনে ইলাহী’ নামে একটি কুফরী মতাদর্শের জন্ম দিয়েছিল। যে জাতি মেয়েদের এক রাতের স্বামীর স্পর্শ পাওয়ার পর বিধবা হলে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে সেই জাতির পক্ষে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কন্যা জায়েদের সম্ভ্রম বিকিয়ে দেয়া নিন্দনীয় না হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিরূনবাসী মুহাম্মদ বিন কাসিমকে এভাবেই তাদের শহরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল যেন কোন অবতার আসমান থেকে জমিনে অবতরণ করেছে। বিন কাসিম নিরূন শাসক সুন্দরীকে স্বাধীন শাসকের মর্যাদায় অভিসিক্ত করলেন। কিন্তু আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তিনি জাহিল বাসরী নামে এক সহযোদ্ধাকে নিরূনের কোতোয়াল নিযুক্ত করলেন। অতঃপর শহর শাসন সম্পর্কে সাধারণ ঘোষণা দিয়ে শহরের প্রাণ কেন্দ্রে একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। বর্তমানে এটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল তখনকার নিরূন আর বর্তমানের হায়দারাবাদের কোন মসজিদটির ভিত্তি মুহাম্মদ বিন কাসিম নিজ
