রাজা দাহির রাজধানীতে নিরূন শাসক সুন্দরীকে বিনা প্রয়োজনে আটকে রাখে। রাজা ভেবেছিল নিরূনে তার পাঠানো নতুন সেনা প্রধান শহরবাসীদের সঙ্গী করে মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।
এভাবে কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর একদিন সকালে রাজা দাহির সুন্দরীকে তার একান্ত কক্ষে ডেকে পাঠালেন। রাজার কাছে খবর গেল নিরূন শাসকের জন্য অতিথিশালার যে কক্ষ বরাদ্ধ ছিল তাতে তিনি নেই। সম্ভাব্য সব জায়গায় তাকে তালাশ করা হলো কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। আসলে পাওয়ার কথাও নয়। সুন্দরী ততোক্ষণে রাজধানী ত্যাগ করে বহু দূর চলে গেছেন। তীব্র বেগে ঘোড়া দৌড়িয়ে নিরূনের দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন সুন্দরী। তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষীরাও রাজধানী থেকে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। আসলে তারাও নিরূন শাসকের সাথেই ফিরে যাচ্ছিল। কারণ মুহাম্মদ বিন কাসিম শহরে প্রবেশ করতে না পেরে নিরূন অবরোধ করলেন। কিন্তু শহর দখলে আক্রমণ চালানোর ব্যাপারে তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে অনুগত স্থানীয় এক চৌকস গোয়েন্দাকে এই বলে রাজধানীতে সুন্দরীর কাছে পয়গাম পাঠালেন, শহরের প্রবেশ পথ বন্ধ। আমাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না, অথচ আপনার সাথে রয়েছে আমাদের মৈত্রী চুক্তি। আপনিও শহরে অনুপস্থিত। এমতাবস্থায় আমি কি করব? দ্রুত আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
সুন্দরীর কাছে যথারীতি পৌছে গেল বিন কাসিমের গোয়েন্দা। খবর পেয়েই সুন্দরী বিচলিত হয়ে পড়লেন, ভাবলেন, আরে এ জন্যই তো
টালবাহানা করে রাজা আমাকে এখানে আটকে রেখেছে, অথচ কোন জরুরী কথা হচ্ছে না আমার সাথে। তিনি একান্ত নিরাপত্তারক্ষীদের বললেন, আমাদের এক্ষুণই নিরূন ফিরে যেতে হবে। দুর্গ থেকে এভাবে ঘোড়াগুলোকে বাইরে নেবে যে, আমরা চলে যাচ্ছি এমন সন্দেহ যাতে কেউ করতে না পারে। কারো সন্দেহ হোক বা না হোক রাজধানী ত্যাগ করে নিরূন রওয়ানা তারা করবেনই এমন পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরূন শাসক কৌশলে দুর্গ থেকে বেরিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে নিরূনের পথ ধরলেন। রাত পেরিয়ে তারা যখন নিরূন পৌছলেন তখন বেলা অনেক ওপরে ওঠে গেছে। সুন্দরী অবরোধ ডিঙ্গিয়ে শহরের প্রধান ফটক দিয়ে শহরে এলেন। অবরোধ তখনো নিষ্ক্রিয়। অবরোধকারীরা কোন আক্রমনাত্মক তৎপরতা তখনও করেনি। সেদিন শেষে রাত নেমে এলো।
নিরূন শাসককে দেখে অবরোধ প্রতিরোধকারী সৈন্যরা প্রধান ফটক খুলে দিল। সুন্দরী শহরে প্রবেশ করে ফটক আর বন্ধ না করার নির্দেশ দিলেন। তিনি একান্ত একজন নিরাপত্তা রক্ষীকে দিয়ে বিন কাসিমের কাছে পয়গাম পাঠালেন, “আপনি আসুন, শহরে প্রবেশ করুন। এ শহর আপনি ও আপনার সহযোদ্ধাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।”
অবাক করার মতো কাণ্ড ছিল বিন কাসিমের জন্য। নিরূন শাসক অতিপুরনো বন্ধুত্বের মতো বিন কাসিমকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানালেন। মূল্যবান উপহার উপঢৌকন দিলেন এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গোটা মুসলিম বাহিনীকে দুর্গে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আরো ঘোষণা করলেন, নিক্সনের অধিবাসীরা বিন কাসিমের যোদ্ধাদের বিশ্বস্ত থাকবে।”
বিন কাসিম ভেবেছিলেন নিরূনের হিন্দু সৈন্যরা কোন গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীকে নিরূনের অধিবাসীরা এতোটাই আনন্দচিত্তে বরণ করে নিলো যে, হিন্দু বাহিনীর আশঙ্কা হলো, তারা কোন ধরনের বিরূপতা দেখালে মুসলিম বাহিনীর আগে নিরূনের অধিবাসীরাই তাদের ইহলীলা সাঙ্গ করে দেবে।
০৭. হে নির্বোধ আরববাহিনী
হে নির্বোধ আরববাহিনী। তোমরা এ অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে পারবে বটে কিন্তু পৌত্তলিকতা এদেশের মানুষের রক্তের সাথে মিশে গেছে। পৌত্তলিকতার প্রেতাত্মাদের এ দেশ থেকে নির্মূল করতে পারবে না।
নিরূন হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ছিল রাজা দাহিরের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। কিন্তু আরমান ভিলা বেদখল হয়ে যাওয়ার পর দাহিরের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল নিক্সনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুর্গশহর হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় রাজা দাহিরের প্রতিক্রিয়া হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিরূন বেদখল হয়ে যাওয়ার পর রাজা দাহিরের প্রাসাদে তার সকল পরিষদ ও মন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ এবং উপদেষ্টারা সমবেত হলো।
একজন সামরিক উপদেষ্টা বলল, “মহারাজ! আরববাহিনীকে নিরূন থেকে আর সামনে অগ্রসর হতে দেয়া যাবে না।”
আমাদের নির্দেশ দিন মহারাজ। আমরা অকৃতজ্ঞ সুন্দরীকে গোষ্ঠীসহ নিপাত করে দেই। আর ওর শরীর থেকে মাথা দ্বিখণ্ডিত করে আপনার পায়ের কাছে এনে ফেলে দেই, বলল অপর একজন সামরিক কর্তকর্তা।
শুনতে পেলাম আরব বাহিনীর সেনাপতি একটা বালক। কিন্তু ওর চাল চলন খুবই তেজস্বী। আমাদের সামরিক কৌশল পরিবর্তন করা দরকার, মহারাজ! বলল অপর একজন।
“ওকে রাজধানী পর্যন্ত আসতে দেয়া ঠিক হবেনা মহারাজ! আমরা ওদের নিরূনেই শেষ করে দিতে পারি, বলল অপর এক সেনাধ্যক্ষ।
মহারাজ! আমরা নিরূন অবরোধ করতে পারি। ওদের মিনজানিকগুলো এখনো বহুদূরে নদীতে রয়ে গেছে।” বলল আর একজন সামরিক উপদেষ্টা।
রাজা দাহির পিছনে হাত বেধে তার কক্ষে পায়চারি করছিল। তার দৃষ্টি অবনত। যখন তার উদ্দেশ্যে কেউ উপদেশ দিতো, রাজা এক পলক
আড়চোখে কড়া দৃষ্টিতে তাকে একটু দেখে নিতো। প্রত্যেকের পরামর্শ শুনে রাজা দাহির রহস্যজনক ভঙ্গিতে একটু শুষ্ক হাসির ভাব করতো। যতোলোক রাজার দরবারে হাজির ছিল, প্রত্যেকেই কোন না কোন কথায় রাজাকে উপদেশ দিল। সবার কথা বলা শেষ হলে কক্ষে নেমে এলো নীরবতা। রাজা দাহিরের পায়চারির সামান্য আওয়াজ ছাড়া কক্ষে কারো নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল না।
