বিজিত এলাকার মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করবে এবং সেখানকার কৃষক, ব্যবসায়ী ও সকল পেশার লোকজন যাতে সুখে শান্তিতে নিজ নিজ কাজ করতে পারে তা লক্ষ্য রাখবে। ওখানকার কৃষি জমিগুলো যাতে অনাবাদি না থাকে। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করুন। ২০ রজব ৯৩ হি. ৯১২ খৃ.। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের এই পয়গাম বিন কাসিমকে আরো উজ্জীবিত করল। তিনি সেনাবাহিনীর সকল সেনাধ্যক্ষ ও কমান্ডারদের তলব করে এ চিঠি পড়ে শোনালেন এবং বললেন, সকল সৈন্যকেই পয়গাম পৌছে দিতে। দুদিন সিসিমে অবস্থান করেই বিন কাসিম (নিরূন) হায়দারাবাদের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। নৌকা বহরও নৌপথে এগিয়ে চলল। সাতদিন এক নাগাড়ে পথ চলার পর বিন কাসিমের বাহিনী নিরূনের নিকটবর্তী বলহার নামক স্থানে পৌছল।
বলহার এসে বিন কাসিমের বাহিনী পানি সংকটের সম্মুখীন হলো। এলাকাটি ছিল পানি শুন্য। ধারে কাছে কোথাও সামান্যতম পানির উৎস পাওয়া গেল না। মনে হচ্ছিল এখানে কোন বৃষ্টিপাত হয়নি। সৈন্যদের গমন পথ আর নদীর মধ্যে দূরত্ব অনেক। সেনাবহরে পর্যাপ্ত পানি ছিলনা। দীর্ঘক্ষণ পানি পান না করায় তৃষ্ণায় ঘোড়া ও উটগুলোও চেঁচাতে শুরু করে দিল। যতোটুকু পানি সেনা বহরে সংরক্ষিত ছিল এ দিয়ে বড়জোড় একদিন পাড়ি দেয়া সম্ভব। এমন অবস্থায় আরো সামনে অগ্রসর হয়ে ঝুকি বাড়ানোর বিষয়টি সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। ভরদুপুরে সূর্যের তাপে পরিস্থিতি আরো দুর্বিসহ হয়ে উঠল। বিন কাসিম ভরদুপুরে সকল সৈন্যকে একত্রিত করে বৃষ্টির জন্য বিশেষ (ইস্তিসকার) নামাযের মাধ্যমে মোনাজাত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সকল সৈন্য এক জায়গায় জমায়েত হয়ে কিবলামুখী হয়ে দাড়ালো। সবাই বিন কাসিমের ইমামতিতে দু’রাকাত নামায আদায় করল। নামায শেষে সেনাপতি বিন কাসিম আবেগপূর্ণ ভাষায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে লাগলেন। সেই ঐতিহাসিক দোয়ার কথাগুলোও ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে। বিন কাসিম মোনাজাতে বললেন
“হে পথভ্রষ্ট পথহারা বিপন্ন বান্দাদের পথ প্রদর্শক প্রভু! হে ফরিয়াদির ফরিয়াদ শ্রবণকারী রব! তোমার ভাষা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এর বরকতে আমাদের আবেদন কবুল করো…।”
ইতিহাস লিখেছে সেই দিন বিন কাসিমের মুখে আর কোন কথা উচ্চারিত হচ্ছিল না, ভাবাবেগে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, আর তার সৈন্যদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, মোনাজাত শেষ করতে না করতেই চারিদিক অন্ধকার করে এমন মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হলো যে, মরুভূমিতেও পানি জমে সাগর সদৃস্য রূপ ধারণ করল। বৃষ্টিতে বিন কাসিমের সৈন্যরা পরম তৃপ্তির সাথে পানি পান করল এবং বহণযোগ্য পরিমাণ পানি সংগ্রহ করে নিলো। সেই স্থানে একদিন অবস্থান করে বিন কাসিম পর দিনই নিরূনের উদ্দেশে রওয়ানা করলেন। নিরূন থেকে সেনাবাহিনী কিছুটা দূরে থাকতেই তাদের দিকে এক উষ্ট্রারোহীকে আসতে দেখা গেল। লোকটি সোজা চলমান সেনাবাহিনীর সেই অংশের দিকে অগ্রসর হলো যে অংশে বিন কাসিম অশ্বারোহণ করে অগ্রসর হচ্ছিলেন। সে ছিল মুসলিম গোয়েন্দা। ছদ্মবেশে নিরূন থেকে সে গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে এসেছিল। আরোহী সোজা বিন কাসিমের সামনে গিয়ে থেমে গেল।
“ কি খবর এনেছ? গোয়েন্দাকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
“সম্মানিত সেনাপতি! নিরূন শাসক সুন্দরী হঠাৎ নিরূন থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।”
“কোথায় গিয়েছেন তিনি? তার কি হদীস নেই? “তিনি জরুরী তলবে রাজধানীতে গেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।” “শহরের লোকদের মনোভাব কি?
“শহরের লোকজন লড়াই করতে চায়না। কিন্তু রাজা নিরূনের সেনাপ্রধান পরিবর্তন করেছে। নতুন সেনাপতির নির্দেশে সেনারা লোকজনকে ভয় দেখাচ্ছে। মুসলিম বাহিনী শহরে ঢুকতে পারলে পাইকারী লুটতরাজ করবে, নারী শিশুদের ধরে নিয়ে যাবে। কারো ঘরের কিছুই থাকবেনা। শহরের সকল খাদ্য পণ্য ওরা নিয়ে যাবে।
“এর মানে হলো সেনাবাহিনী মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত?” “জী হা’ সেনাপতি। সেনারা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত।” বিন কাসিম সেনাদের চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে দ্রুত নিরূন দুর্গ অবরোধ করলেন। সেই সাথে ঘোষণা করে দিলেন, নিরুনের সৈন্যরা যদি বিনা যুদ্ধে দুর্গ আমাদের কাছে হস্তান্তর না করে আমাদেরকে যদি দুর্গ দখল করতে হয় তাহলে কোন সামরিক যোদ্ধার প্রাণ রক্ষা হবে না।
নিরূন শাসক সুন্দরীকে রাজধানীতে ডেকে পাঠানো ছিল একটা চক্রান্তের অংশ। মুসলিম বাহিনী নিরূনের দিকে অগ্রাভিযান করছে এ সংবাদ পেয়ে রাজা দাহির জরুরী পরামর্শের কথা বলে নিরূন শাসক সুন্দরীকে রাজধানীতে আসার খবর পাঠায়। কারণ নিরূন শাসক মুসলমানদের সাথে আগেই মৈত্রী চুক্তি করেছিল এবং মুসলিম সুলতানকে কর দিতে সম্মত হয়েছিল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিন কাসিমকে এক পয়গামে বলেছিলেন, তিনি নিরূন পৌছলে নিরূন শহরের প্রবেশপথ উন্মুক্ত পাবেন, তাকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থাও থাকবে। কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিমের জন্য নিরূন দুর্গের প্রবেশপথ খোলা ছিল না।
শহরের প্রবেশ পথ বন্ধ হলেও তিনি শহরের ওপর মিনজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ তাতে বেসামরিক বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ তার গোয়েন্দারা খবর দিয়েছে শহরের লোজন মোকাবেলা করতে অনিচ্ছুক। হিন্দু সৈন্যরা শহরবাসীকে নানাভাবে উস্কাতে চেষ্টা করছে।
