গোয়েন্দা রিপোর্টে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে, রাজা দাহির দুর্গের বাইরে এসে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হবেনা। এ থেকে এই সমীকরণ করা সম্ভব ছিলনা যে, রাজা দাহির সম্মুখ মোকাবেলার সাহস রাখেনা। মুহাম্মদ বিন কাসিম গোয়েন্দা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বুঝতে পেরেছিলেন, রাজা দাহির এমন কোন ময়দানে সম্মুখ সমরে মোকাবেলা করতে চায় যখন মুসলিম বাহিনীর সমরশক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, তারা দীর্ঘ সফরের ধকল সইতে না পেরে ক্লান্ত ও অবসাদ গ্রস্ত হয়ে পড়বে। বিন কাসিম বুঝতে পারলেন, রাজা দাহির মুসলিম সৈন্যদেরকে বিভিন্ন দুর্গ জয় করে বহু দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিতে চায়। পরপর জয়ের আগ্রহে বিন কাসিমের বাহিনীর মধ্যে হতাহতের সংখ্যা যখন বেড়ে যাবে, রসদ কমে আসবে, সক্ষম যোদ্ধারা হয়ে পড়বে ক্লান্ত তখন ডাভেল বন্দর থেকে রসদ পৌছার পথ বন্ধ করে দেবে দাহির এবং বন্দর থেকে দূরের কোন সুবিধা জনক ময়দানে বিন কাসিমের সৈন্যদের চ্যালেঞ্জ করবে দাহির বাহিনী।
বিন কাসিম দাহিরের সম্ভাব্য রণকৌশল সম্পর্কে সেনাধ্যক্ষদের অবহিত করলেন।
তিনি সেনাপতিদের বললেন, আপনারা সবাই অভিজ্ঞ যোদ্ধা। বন্দর থেকে রসদ ও সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত রাখতে আমাদের উচিত দাহিরের রাজধানী পর্যন্ত যে কয়টি দুর্গ আছে সবগুলো কব্জা করে নেয়া। পথে কিছু বসতি রয়েছে এগুলোকেও কব্জা করে নিয়ে ওখানে আমাদের কিছু সৈন্য মোতায়েন করতে হবে। তারা ঝটিকা টহল দিয়ে রসদ সাপ্লাই পথ উন্মুক্ত রাখবে।
অগ্রবর্তী গোয়েন্দারা যে সব রিপোর্ট দিয়েছিল, তা থেকে বিন কাসিম জানতে পারেন, সামনে সবার আগে রয়েছে সিসিম নামের একটি ছোট ধরনের দুর্গ। এর পরই নিরূন (হায়দারাবাদ) অবস্থিত। বিন কাসিমের টার্গেট হলো হায়দারাবাদ। ডাভেল থেকে তখনকার হায়দারাবাদের পথ সোয়াশ মাইলের কম ছিলনা।
হায়দারাবাদ এলাকা থেকে সাকিরা নামের একটি ছোট্ট নদী ডাভেল দিয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। নদী ছোট হলেও গভীর এবং স্রোতস্বীণী। বিন কাসিম সবগুলো মিনজানিক মাঝারী নৌকাতে বোঝাই করে নদী পথে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে নৌকা বোঝাই করে আরো প্রচুর রসদ সামগ্রীও নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
কয়েকদিন পর নৌকার একটি বহর নদী পথে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। নৌকা বহরে পালতোলা নৌকা যেমন ছিল, দাড়টানা মাঝি মাল্লা চালিত নৌকাও ছিল। নৌকার রসদপত্র রক্ষার জন্য বহুসংখ্যক তীরন্দাজকে নৌকা বহরের আশেপাশে নিয়োগ করা হলো। যাতে শত্রুবাহিনী আক্রমণ করতে চাইলেও নৌকার ধারে কাছে যেতে না পারে। তা ছাড়াও নদীর উভয় তীরে মোতায়েন করা হলো অশ্বারোহী ইউনিট। এরা নৌবহরকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
নৌবহর রওয়ানা করিয়ে দিয়ে গোয়েন্দা রিপোর্ট মতো ছক আঁকা পথ ধরে অবশিষ্ট সৈন্যরা স্থলপথে অগ্রসর হচ্ছিল। শাবান ছাকাফী ডানে বামে ও সামনে গোয়েন্দা দল নিযুক্ত করে রেখেছিলেন সন্দেহজনক কোন লোককে দেখতে পেলেই তাকে পাকড়াও করার জন্য। তাদের চেষ্টা ছিল রাজার বাহিনীর অজ্ঞাতে নিরূন পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া। কিন্তু এমনটা কিছুতেই সম্ভব ছিলনা। কারণ নদীর উভয় তীরে বহু বসতি পল্লী ছিল। এসব পল্লীর লোকেরা নৌবহর পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া অশ্বারোহীদের দেখে বিদেশী সৈন্য বলে চিনতে পেরেছিল। তাছাড়া নদীতেও বিচরণকারী বহু সাধারণ মানুষেরও দেখা পেয়েছিল মুসলিম নৌবহর।
তখন শ্রাবন মাস। প্রচণ্ড গরম। আরব দেশের মানুষের জন্য গরম কোন অসহ্যকর বিষয় নয়। তারা মরুভূমির লুহাওয়ায় বেড়ে ওঠে, তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে মরুভূমিতে ঘোড়া দৌড়াতে অভ্যস্ত কিন্তু সিন্ধু অঞ্চলের গরম তাদের কাছে অচেনা, এ যেন শরীরের সব পানি শুষে নেয়।
এক পর্যায়ে সিসিম দুর্গের কাছে নৌবহর পৌছে যাত্রা বিরতি করল। দুদিনপর পদাতিক সৈন্যরাও সেখানে পৌছাল। বিন কাসিম সবাইকে ক্যাম্পিং এর নির্দেশ দিলেন। সেই রাতে বসরা থেকে এক দূত পয়গাম নিয়ে এলো। ডাভেল দুর্গ হয়ে স্থলপথে সে সিসিম পৌছল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পয়গাম নিয়ে এসেছে দূত। হাজ্জাজ লিখেছেন
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পক্ষ থেকে সেনাপতি বিন কাসিমের নামে…। আমরা কায়মনোবাক্যে তোমাদের বিজয়ের জন্য দোয়া করছি। আশা করি বিজয়ী বেশেই তুমি ফিরে আসবে। আল্লাহ পাকের রহমত ও নুসরতে আমাদের শত্রুরা দুনিয়াতেই শাস্তি ভোগ করবে এবং চিরদিনের জন্য পরকালের আযাবে নিপতিত হবে। শত্রুদের হাতি, ঘোড়া, ধনদৌলত তোমাদের কব্জায় যাবে মনের মধ্যে এ ধরনের কোন লিল্লা জায়গা দিওনা। ধনসম্পদ প্রাপ্তির চেয়ে এটা কি বেশী সুখকর নয় যে, সকল সহযোদ্ধাদের নিয়ে তুমি দুনিয়াতে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবে। সম্পদের লোভ যদি না করো তাহলে সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারবে…। তোমাদের নিয়ে আমরাও গর্ব করতে পারবো।
বিজিত এলাকার ছোট বড় প্রতিটি লোকের সাথে তোমাদের আচরণ হবে প্রীতি ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। শত্রুদেশে বিজয় লাভের পরও ওখানকার মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস জন্মাতে চেষ্টা করবে যে, দেশটি তাদেরই। কোন দুর্গ বিজয়ের পর প্রাপ্তধন সম্পদ কখনো নিজের কব্জায় রাখবেনা। সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে। কোন সৈনিক যদি খাবার মতো জিনিস বেশীও নিজের কাছে রাখে তবে তা ছিনিয়ে নিও না, তাকে তিরস্কারও করোনা। বিজিত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পর জরুরী পণ্য সামগ্রীর দাম নির্ধারণ করে দেবে। যেসব পণ্য ডাভেল দুর্গে পড়ে রয়েছে, সৈন্যদের প্রয়োজনে সেগুলো ব্যয় করবে। ডাভেল দুর্গের কোষাগারে পড়ে থেকে অব্যবহারের কারণে যাতে কোন পণ্য নষ্ট না হয়। কোন দুর্গ বা অঞ্চল জয় করার পর সেখানকার দুর্গকে আগে সুরক্ষিত করবে এবং খেয়াল করবে লোকজন যাতে নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারে।
