বিন কাসিমের এই পয়গাম দাহিরের দূতের হাতে দিয়ে বিদায় করা হলো।
আজ থেকে সাড়ে বারো’শ বছর আগে সিন্ধু অঞ্চলের যে অবস্থা ছিল, তা এখন আর নেই। সিন্ধু নদী বহুবার তার গতিপথ বদল করেছে। এখন আর একথা কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয় বিন কাসিমের অভিযানের সময় সিন্ধু অঞ্চলে প্রবেশের মূল রাস্তা কোনটি ছিল। সিন্ধু তীরের কোন জায়গায় কোন ধরনের লোকজনের বসতি ছিল। সেই যুগের কোন চিহ্নই আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সিন্ধু নদের সাথে যুক্ত ছিল আরো বহু শাখা প্রশাখা, অসংখ্য খাল নালা। যেগুলো সিন্ধু নদীতে এসে পতিত হয়েছিল। এখন আর সেই সব শাখা প্রশাখা নেই। অধিকাংশই শুকিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রবাহ বন্ধ হয়ে খাল-নালা ঝর্ণাগুলোও জমিনের সাথে মিশে গেছে। সেই সময় ব্রহ্মণ্যবাদে ছিল সিন্ধু অঞ্চলের একটি বড় শহর। রাজা দাহিরের ছেলে জয়সেনা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ব্ৰহ্মণ্যবাদে অবস্থান নিল। যে সময় রাজা দাহির তার ছেলেকে ডাভেল থেকে প্রায় আড়াই’শ মাইল দূরের রাজধানী উরুটে বলছিল, এই যুদ্ধ এখন আর দু’জন শাসক আর রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধ এখন দুটি ধর্মের আদর্শিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ঠিক সেই দিন ডাভেলে মুহাম্মদ বিন কাসিম জুমার খুতবায় সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “এই অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্য আমাদের অর্জিত হয়েছে, আমরা বন্দীদের মুক্ত করেছি, হিন্দুদের পরাজিত করে শাস্তি সরূপ কিছু সংখ্যককে ইরাকেও পাঠিয়ে দিয়েছি। গণীমতের মাল এবং করও আদায় করেছি কিন্তু বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় যে, আমাদের ওপর আরো কর্তব্য রয়ে গেছে।”
বিন কাসিম বললেন, বন্ধুগণ! তোমরা দেখেছ, মন্দির চূড়ায় উড্ডীন পতাকা লুটিয়ে পড়তেই হিন্দুরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। ওদের বিশ্বাস ছিল মন্দির চূড়ার পতাকা যতোক্ষণ অবিচল থাকবে ততোক্ষণ তাদের কেউ পরাজিত করতে পারবে না। এরা মাটি পাথরের মূর্তি পূজা করে, কাল্পনিক দেবদেবীকে এরা মাবুদ মনে করে, আল্লাহর সাথে এদের কোন পরিচয় নেই। এরা জানেই না, আল্লাহ সব চেয়ে ক্ষমতাবান, তিনিই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন তিনি এক অদ্বিতীয়, তার কোন শরীক সমকক্ষ নেই। একমাত্র আল্লাহই মানুষের ইবাদতের যোগ্য। তোমরা কি দেখনি, আল্লাহ মানুষের ইবাদতের যোগ্য। তোমরা কি দেখনি, আল্লাহর সৃষ্ট মাখলুক হয়েও এরা আল্লাহকেই জানেনা। আল্লাহর পবিত্র নামের সাথেও এদের পরিচয় নেই। ওদের প্রভু হলো পতাকা, পুতুল, হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি। এদেরকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া আমাদের কর্তব্য। সেই কর্তব্য আমাদের অবশ্যই পালন করতে হবে। রাজা দাহির তার ছেলেকে যখন বলছিল, আমাদের একথা প্রমাণ করতে হবে দেবদেবীদের অসম্মানকারী দেবদেবীদের অভিশাপ থেকে কখনো রেহাই পায় না। ঠিকই সেই সময় বিন কাসিম তার সহযোদ্ধাদের বলছিলেন, আমাদের ওপর কর্তব্য হলো, এদেরকে বুঝিয়ে দেয়া যেসব দেবদেবীর কাল্পনিক মূর্তি বানিয়ে তোমরা পূজা-অর্চনা করো, এরাতো নিজেদের গায়ে বসে থাকা একটা মাছি তাড়ানোর ক্ষমতাও রাখেনা।
বিন কাসিম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এদেশের যে কোন মানুষের সাথে তোমাদের দেখা হয় তাহলে সম্মান ও ইজ্জতের সাথে তাদের সাথে কথা বলবে, তাদের মর্যাদা মমতা ও মায়া দিয়ে মন জয় করতে চেষ্টা করবে। তাদের একথা বুঝাতে চেষ্টা করবে, আরব অনারব সবাইকে এক আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন কিন্তু অযৌক্তিক ভাবে তোমরা নিজেরা মাটি পাথর দিয়ে প্রভু তৈরী করেছ। তোমরা যদি এখানকার মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে ব্যর্থ হও, তাহলে আমরা আল্লাহর সেই নির্দেশ অমান্যের অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হবে, যে নির্দেশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা যদি কাউকে গোমরাহীর পথে চলতে দেখো তবে তাদের সঠিক পথ দেখাও।” একাজটি এমন যে, কোন দৃষ্টিহীন মানুষকে আছাড় খেতে খেতে পথ থেকে বিচ্যুত হতে দেখে তার হাত ধরে সঠিকপথে উঠিয়ে দেয়ার মতো। রাজা দাহির বিন কাসিমের অগ্রাভিযানকে দুটি ধর্মের সংঘাত বলে অভিহিত করে আর বিন কাসিম সেটিকে হক ও বাতিল, সত্য এবং মিথ্যার
সংঘাত বলে চিহ্নিত করেন। বিন কাসিম দুর্গ জয়ের পর পরই হাজ্জাজকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফও যথা সময়ে করণীয় সম্পর্কে পয়গাম বিন কাসিমকে জানিয়ে দিলেন। হাজ্জাজ বললেন, সঠিক সময়ে সমুদ্রপথে তোমার রসদ পৌছে যাবে। আমি প্রয়োজন মতো সব ধরনের জিনিসই পাঠিয়েছি।
মুহাম্মদ বিন কাসিম গোয়েন্দা বিভাগকে খুবই সক্রিয় রেখেছিলেন। তাঁর একান্ত গোয়েন্দাদের সাথে আরো যোগ হয়েছিল স্থানীয় কিছু সংখ্যক সামরিক কর্মী। এরা বিন কাসিমের সব্যবহারে মুগ্ধ ও ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়ে সর্বান্তকরণে বিন কাসিমকে সহযোগিতা করছিল। এছাড়া আলাফী চারজন চৌকস যুবককে বিন কাসিমের সহযোগিতার জন্য পাঠিয়েছিলেন, এরা এই এলাকার ভাষা ও পথঘাট সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিল। তা ছাড়া গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী নিজেই তার কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ছদ্মবেশে নিরূন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে আসেন। বাকী সব গোয়েন্দা সদস্য ছদ্মবেশে সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে হিন্দুদের অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করছিল।
