উল্লেখযোগ্য কোন সৈন্যও ছিলনা। এটাকে তুমি বড় বিজয় কিংবা আমাদের পরাজয় মনে করার মতো বিষয় নয়।
আমাদের অভিজ্ঞ সেনাধ্যক্ষদের একজনও যদি সেখানে থাকতো, তাহলে তোমাদের পরিণতিও আগের দুই সেনাপতির মতোই হতো।
তোমার তারুণ্যের প্রতি আমার মায়া হচ্ছে। আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, আর একপাও সামনে অগ্রসর হবে না। যতটুকু অগ্রসর হয়েছে সেখান থেকেই দেশে ফিরে যাও। আরো সামনে অগ্রসর হলে আমার ছেলে জয়সেনার মুখোমুখি হতে হবে তোমার। তুমি জানোনা, বড় বড় পরাক্রমশালী রাজা বাদশারাও তার ক্ষোভ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে। হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজারা পর্যন্ত তাকে ভক্তি করে। আমার ছেলে জয়সেনা সিন্ধু, মাকরান ও তুরানের শাসক। তার কাছে একশ জঙ্গি হাতি রয়েছে, যেগুলো যুদ্ধ ক্ষেত্রে উম্মাদের মতো যুদ্ধ করে এবং শত্রু বাহিনীকে পায়ের তলায় পিষে ফেলে। জয়সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে একটি সাদা হাতিতে আরোহণ করে, সে হাতি পর্যন্ত কোন অশ্বারোহী কিংবা বর্শাধারী সৈন্য যেতে পারেনা। সামান্য একটু বিজয়ে তুমি এতোটাই গর্বিত হয়ে গেছ যে, তোমার বিবেকের ওপর পর্দা পড়ে গেছে। আমার হুঁশিয়ারি লঙ্ঘন করলে তোমাকেও সেনাপতি বুদাইলের পরিণতি বরণ করতে হবে।”
মুহাম্মদ বিন কাসিম পয়গামের বক্তব্য শুনে মুচকি হাসলেন। তিনি সকল সেনাধ্যক্ষ, ডেপুটি সেনাধ্যক্ষ ও ডাভেলের শাসক হুমাইদ বিন বিদায়কে ডেকে পাঠালেন। তারা এলে দুভাষীকে তাদের সামনে দাহিরের পয়গাম পড়ে শোনানোর নির্দেশ দিলেন। দুভাষী আবারো পয়গাম সবার সামনে পড়ে শোনালে সবাই হাসতে লাগলেন।
“রাজা আমাকে অহংকারী মনে করেছে।” গম্ভীর কণ্ঠে বললেন বিন কাসিম। অথচ সে নিজে কি একটা নির্বোধ ও পাষণ্ড নয়।…যাক, আমি এখন এর জবাবে যা লিখতে চাচ্ছি তা আপনারা সবাই শুনুন এবং মন্তব্য করুন।
বিন কাসিম রাজা দাহিরের পয়গামের জবাবে কি লিখবেন তা জানালেন। শুনে সবাই বলল, এমন একজন অহংকারীর পত্রের জবাব এতোটা ভদ্রোচিত ভাষায় দেয়া উচিত হবেনা। অবশেষে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে একটি জবাবী পয়গাম রচিত হলো। বিন কাসিম দাহিরকে যে পয়গাম পাঠিয়ে ছিলেন, ইতিহাস সেটাকেও সংরক্ষণ করেছে।
“এ পয়গাম সেই মুহাম্মদ বিন কাসিম ছাকাফীর পক্ষ থেকে লিখা হচ্ছে, যিনি অহংকারী রাজা মহারাজা ও বাদশাদের মাথা নীচু করার সামর্থ রাখেন। আর যিনি যে কোন মুসলমানের রক্তের প্রতিশোধ নিতে সিদ্ধহস্ত। এই পয়গাম লিখা হচ্ছে, সেই অহংকারী, উন্মাদ দাহিরের কাছে যে একজন নির্বোধ, বেঈমান, চরিত্রহীন ও আপন বোনকে বিবাহকারী। যার এতটুকু বোধ নেই যে, পরিস্থিতি বদলাতে বেশী সময়ের প্রয়োজন হয় না এবং পরিস্থিতি অহংকারী ও আত্মম্ভরিতাকারীদের গর্বকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। হে আহমক! তুমি উন্মাদের মতো মুখতা বশতঃ যা লিখেছ তা আমি পড়েছি। তাতে তো গর্ব অহংকার আর নীচুতা ছাড়া কিছু নেই। তোমার পয়গাম পড়ে আমি জানতে পারলাম, তোমার কাছে জঙ্গি হাতি, যাদু, অস্ত্র শস্ত্র ও সামরিক শক্তি রয়েছে। বুঝতে পেরেছি, এসব জিনিসের ওপর নির্ভর করেই তুমি গর্ব করছ। জেনে রেখো, আমার কাছে এতো শক্তি নেই কিন্তু আল্লাহর দয়া আর মেহেরবাণীই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। হে কাপুরুষ! হাতি ঘোড়া আর সৈন্যবাহিনী নিয়ে কেন গর্ব করো। হাতিতো একটা মানুষের চেয়েও অক্ষম প্রাণী।
যে নিজের শরীর থেকে একটা মাছিও তাড়াতে পারেনা। আমার যেসব সৈন্যকে তোমার দেশে অভিযান চালাতে দেখে তুমি বিস্মিত হচ্ছে, এরা সবাই আল্লাহর সৈনিক। আল্লাহ এদের ভাগ্যেই বিজয় লিখে রেখেছেন। দেখবে এরাই বিজয়ী হবে কারণ এরা যে আল্লাহর প্রিয়। শুনে রাখো, আমরা তোমার দেশে কখনো অভিযান চালাতাম না কিন্তু তোমার দুশ্চরিত্র, শত্রুতা আর মাত্রাতিরিক্ত অহংকার আমাদেরকে তোমার দেশে অভিযান চালাতে বাধ্য করেছে। সন্দিপ থেকে আরবগামী আমাদের মুসাফিরদের জাহাজ তুমি লুট করেছ, তদুপরি তাদের বন্দি করেছ। অথচ তুমি জানতে, মুসলিম খলিফাকে সারা দুনিয়ার শাসকরা শ্রদ্ধা করে তার শক্তিকে সবাই সম্মান করে। পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র তুমিই এমন এক শাসক যে আমাদের শক্তিকে হেয় করেছ, আর গায়ে পড়ে আমাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করেছ। তুমি ভুলে গেছ, তোমার বাপ-দাদা আমাদের খেলাফতকে কর দিতো। তুমি ক্ষমতায় বসে কর দেয়া তো বন্ধ করেই দিয়েছ, সেই সাথে মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করে আমাদের প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করে দিয়েছ। এজন্য খেলাফত থেকে তোমাকে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে।
আমার বিশ্বাস, যেখানেই তোমার ও আমার মধ্যে মোকাবেলা হোক না কেনো, আমরাই বিজয়ী হবে। তোমাকে অবশ্যই পরাজয়ের গ্লানী পোহাতে হবে। আমি হয় তোমার মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ইরাক পাঠাবো নয়তো নিজের জীবন বিলিয়ে দেবো।
তুমি যেটাকে তোমার দেশে সেনাভিযান বলছে, এটা আমাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর পথে জিহাদ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমরা এযুদ্ধে এসেছি। আমরা কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই, তারই সাহায্য কামনা করি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তোমাদের নিপ্রাণ মূর্তির বিপরীতে সদা জাগ্রত আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করবেন।”
