ডাভেল দুর্গে আটকে যাওয়া হিন্দু সৈন্যদের বন্দি করা হলো। যেসব হিন্দু সৈন্য সশস্ত্র মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হয়েছিল ওদের অধিকাংশই মারা পড়ল। ডাভেলের সক্ষম নাগরিকদের মধ্যেও অধিকাংশ মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পড়ার পর মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে আক্রমণে যোগ দিয়েছিল, ফলে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক লোকও মারা যায়। দুর্গ জয়ের পর বিন কাসিম বেসামরিক লোকদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে প্রাণ ভয়ে যেসব হিন্দু অধিবাসী দুর্গের বাইরে বনে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও দুর্গে ফিরে এলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিম যুদ্ধলব্ধ পণ্যসামগ্রী ও ধন-সম্পদ সৈন্যদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করে দিলেন, আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অংশ এবং বন্দীদেরকে জাহাজে তুলে ইরাক পাঠিয়ে দিলেন। আর হামিদ-বিন বিদায় নজদীকে ডাভেলের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। ডাভেলকে একটি মুসলিম অধ্যুষিত শহরে পরিণত করার জন্য বিন কাসিম শহরের মাঝখানে একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিলেন এবং নিজ হাতে বিন কাসিম মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন।
বর্তমানে বিন কাসিমের নির্মিত সেই মসজিদ যেমন দেখা যায় না, ডাভেল দুর্গও অবশিষ্ট নেই। সেই দুর্গের ভগ্নাবশেষও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসে ডাভেল দুর্গ ও বিন কাসিমের অভিযান অক্ষয় অম্লান হয়ে আছে। সম্ভবতঃ হিন্দুস্তানের বুকে সেটিই ছিল প্রথম মসজিদ।
কোন কোন ঐতিহাসিক লিখেছেন, মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তাঁর সহযোদ্ধাদের সদাচরণে দুর্গের হিন্দু অধিবাসীরা এতোটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, তারা শ্রদ্ধাভক্তির আতিশয্যে বিন কাসিমের মূর্তি তৈরী করে তাকেই পূজা করতে শুরু করে দিয়েছিল। অবশ্য একথাটির পক্ষে মজবুত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে একথা ঠিক যে অধিবাসীরা ছিল মুসলিম শাসনে প্রীত ও মুগ্ধ।
বিন কাসিমকে আরো সামনে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা তাড়া করছিল, কিন্তু শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুদৃঢ় না করে তার পক্ষে অগ্রাভিযান শুরু করা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ তিনি শুধু দেশ জয় করা ও ধনরত্ন কব্জা করার জন্য হিন্দুস্তানে অভিযান করেন নি। তার সামনে ছিল সুনির্দিষ্ট মিশন।
মুহাম্মদ বিন কাসিম খালিদ বিন ওয়ালীদের মতোই জোরদার গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি বিখ্যাত গোয়েন্দা বিশেষত্ব শা’বান ছাকাফীকে তার গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। সৈন্য সামন্ত নিয়ে তিনি ডাভেল দুর্গে অবস্থান করলেও গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তিনি উরুঢ় ও নিরূনকেও তাঁর নখদর্পনের আওতায় নিয়েছিলেন।
হঠাৎ একদিন ডাভেল দুর্গের প্রধান ফটকের বাইরে আটজন শাহী অশ্বারোহী এসে থামল। তারা ফটকের প্রহরীদের জানালে তারা রাজা দাহিরের পক্ষ থেকে বিন কাসিমের জন্য জরুরী পয়গাম নিয়ে এসেছে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমকে পয়গামবাহীদের খবর দেয়া হলো।
“গেট খুলে ওদের ভিতরে নিয়ে এসো এবং ওদের দূতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও, আর সৈন্যদের সরকারী মেহমানের মর্যাদায় আপ্যায়ন করো।” নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। রাজা দাহিরের দূত বিন কাসিমের সামনে গিয়ে মাথা ঝুকিয়ে কুর্ণিশ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে তাঁর বক্তব্য বলতে শুরু করলে, বিন কাসিমের দুভাষী তাঁর ভাষান্তরিত করে আরবীতে বলতে শুরু করল। বিন কাসিম দুভাষীকে বললেন, “ওকে বলল, এখানে উপস্থিতিই যথেষ্ট, আমরা মানুষের সামনে কোন মানুষকে মাথা ঝুকিয়ে কুর্ণিশ করা পছন্দ করিনা, আমাদের ধর্মও তা
অনুমোদন করে না। তুমি ওর কাছ থেকে পয়গাম নিয়ে নাও, আর ওকে কক্ষের বাইরে অন্য কক্ষে বসিয়ে দাও।” রাজা দাহিরের দূত প্রথম কোন আরব সেনাপতিকে দেখেছিল। সে বিন কাসিমের কথাবার্তা ও তার নীতিবোধ দেখে বিস্মিত হলো। আরো অবাক হলো এতো অল্প বয়সী এই তরুণ একজন গর্বিত বিজয়ী সেনাপতি। তদুপরি তার আখলাক, ভাবভঙ্গি কত মার্জিত। দূত পয়গাম বিন কাসিমের হাতে দিয়ে পুনরায় অভ্যাস বশতঃ তাকে কুর্ণিশ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। দূত বেরিয়ে গেলে বিন কাসিম পয়গাম খুলে দেখলেন দাহির স্থানীয় ভাষায় পয়গাম লিখেছে। তিনি পয়গামটি দুভাষীর দিকে এগিয়ে দিলেন। দুভাষী পয়গাম পড়তে শুরু করল। ইতিহাস সেই পয়গামটি হুবহু সংরক্ষণ করেছে। রাজা দাহিরের পয়গামের বক্তব্য ছিল—
“এ পয়গাম রাজা চন্দ এর পুত্র দাহিরের পক্ষ থেকে যিনি সিন্ধু অঞ্চলের বাদশা আর হিন্দুস্তানের একজন রাজা। এটি সেই মহান রাজার পয়গাম সাগর, নদী পাহাড় জঙ্গল সর্বত্র যার নির্দেশে প্রতিপালিত হয়। আরবের এক অখ্যাত অল্প বয়স্ক অনভিজ্ঞ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রতি এ পয়গাম লিখা হচ্ছে, যে নরহত্যায় অত্যন্ত নির্মম আর যুদ্ধলব্ধ মালে গণীমতের লিপ্সু। যে অনভিজ্ঞ সেনাপতি তার সৈন্যদেরকে ধ্বংস আর মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার মতো বোকামীতে লিপ্ত।
হে অনভিজ্ঞ বালক, তোমার আগে আরো দু’জন সেনাপতি এমন অবাস্তব মানসিকতা নিয়ে এসেছিল যে, তারা সিন্ধুসহ গোটা হিন্দুস্তান জয় করে ফেলবে। তুমি কি ওদের করুণ পরিণতির কথা শোননি বা জানোনা? এই ডাভেল শহরের অধিবাসীরাই তাদেরকে এভাবে নাজেহাল করেছিল যে, তারা জীবন নিয়ে পালানোর অবকাশও পায়নি। ওরা আমাদের দুর্গ জয় করবে তো দূরে থাক, দুর্গপ্রাচীরের ধারে কাছেও ঘেষতে পারেনি। কিন্তু তুমিও সেই অবাস্তব কল্পনা নিয়েই এসেছ। ডাভেল দুর্গজয় করে তুমি মনে হয় খুবই আত্মশ্লাঘা অনুভব করছ, কিন্তু আমি তোমাকে সতর্ক করে বলছি, ডাভেল বিজয়ের ফলে তোমার গর্ব করার কিছু নেই। কারণ এটি আমার বিশাল রাজত্বের ছোট একটি দুর্গ মাত্র। যেখানে কিছু ব্যবসায়ী, বণিক ও দোকানী বসবাস করে। এরা লড়াই করতে জানেনা। কখনো তাদের লড়াই করার প্রয়োজন পড়েনি। এদের ওপরে তোমরা কিছু পাথর নিক্ষেপ করাতেই ওরা ভয় পেয়ে পরাজয় মেনে নিয়েছে। তা ছাড়া ডাভেল দুর্গে আমাদের
