জয়সেনা ছিল রাজার অপর এক স্ত্রীর সন্তান। বহু পত্নী উপপত্নী ছিল রাজা দাহিরের। অবশেষে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য নিজ বোন মায়ারাণীকেও বিয়ে করে কিন্তু তার সাথে কোন দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেনি। জয়সেনা ছিল দাহিরের সেনাবাহিনীর সিন্ধু ইউনিটের সেনাপতি। দাহির যখন জয়সেনাকে ডেকে পাঠালো তখন সে সিন্ধু অঞ্চলের নিরূনের একটি ময়দানে অবস্থান করছিল। রাজার নির্দেশে জয়সেনার উদ্দেশে তখনি রওয়ানা হয়ে গেল দৃত।
মাঝ রাতের পর রাজধানীতে পৌছলে জয়সেনা। রাজা দাহির জয়সেনার অপেক্ষায় জেগে ছিল। সে ছেলেকে কোন বিশ্রামের অবকাশ না দিয়েই তার কক্ষে ডাকলো। কক্ষে এলে পরম মমতায় নিজের কাছে বসিয়ে বলল, “প্রিয় বৎস! আমাদের মাথার উপর কেমন বিপদ এসে উপস্থিত হয়েছে তা কি তুমি আন্দাজ করতে পারছ?” “আমি পুরোপুরি জ্ঞাত মহারাজ। আমি আপনার নির্দেশের অপেক্ষা করছি। এখনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে আপনাকে ভাবনার মধ্যে দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি। আমি এক্ষনই ডাভেল আক্রমণের কথা ভাবছি মহারাজ।
“শোন। যুবক আর প্রবীণের মধ্যে এইতো পার্থক্য। যুবকরা করে ভাবে আর প্রবীণরা ভেবে চিন্তে কাজ করে। তোমার জানা আছে, নিরূনও আমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। ঘটনাটা বিষের বড়ির মতো আমার গলায় আটকে গেছে।”
বাবা মহারাজ! আপনার কি জানা নেই, আরব সেনাপতি আমার চেয়েও কমবয়সী। আমার বয়স কম, আমি তরুণ এজন্য আমাকে বোকা মনে করবেন না মহারাজ!
তোমাকে আমি বোকা মনে করছিনা। তাছাড়া তোমার আর মুসলিম সেনাপতির মধ্যে আমি তুলনাও করছিনা। বর্তমান পরিস্থিতিটা আমি তোমাকে বুঝাতে চাচ্ছি। আমি যা বলতে চাই তা বুঝতে চেষ্টা করো, সেই সাথে এটাও অনুধাবন করতে চেষ্টা করো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যুদ্ধটা এখন আর দুজন শাসক আর দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যুদ্ধ এখন দুটি ধর্মের সংঘাতে রূপ নিয়েছে। মুসলমানরা ডাভেল মন্দির চূড়ার পতাকা ভূপাতিত করে আমাদের দেবী ও ধর্মকে মিথ্যা করেছে। এখন আমাদেরকে প্রমাণ করতে হবে দেবদেবীদের অসম্মাণকারীরা তাদের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে পারে না। এ বিষয়টাও মাথায় রেখো।
মুসলমানদের যদি রোধ করতে না পারি তাহলে আমাদের বংশের নামে এই বদনাম ইতিহাস হয়ে থাকবে যে, আমরাই হিন্দুস্তানে মুসলমানদের আগমনের পথ খুলে দিয়েছি। যাক বেশী দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার সময় নেই। আরমান ভিলা ও ডাভেল হাতছাড়া হওয়াটা খুব মারাত্মক কিছু ছিলনা, কিন্তু রণকৌশলের দিক থেকে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শত্রুবাহিনী এখন দু’টি মজবুত দুর্গ কব্জা করে নিয়েছে। ডাভেল সিন্ধু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দর। শত্রুরা এখন অনায়াসে সমুদ্র পথে সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম আমদানী করতে পারবে। এদিকে নিরূন শাসক সুন্দরী যুদ্ধের আগেই শত্রুদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করেছে।” “পিতৃ মহারাজ! আমার সেনাবাহিনীকে নিরূনে চড়াও করে দিয়ে সুন্দরীকে ঘরে নজরবন্দি করে আমরা নিরূনকে কব্জায় রাখতে পারি।”
“না, তাতে নিরূনের লোকেরা তোমাদের বৈরী হয়ে যাবে। এমনও হতে পারে যে, তোমাদের সেনাভিযানের কারণে নিরূনবাসী তোমাদের মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হবে। তুমি কি জানো না, উজির বুদ্ধিমান সুন্দরীর শাসনের বিরুদ্ধে ওখানকার মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য যাদু টোনার আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু সে ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার মূলে ছিল আরব বাহিনী। হয়তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুন্দরী ওদের এনেছিল, নয়তো ওরাই এগিয়ে এসেছিল। এ থেকেই প্রমাণিত হয়েছে, আরবদের সাথে সুন্দরী তলে তলে মৈত্রী গড়ে তুলেছে।
“পিতৃ মহারাজ! আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি অকৃতজ্ঞ বৌদ্ধটাকে চিরদিনের জন্য গায়েব করে দিতে পারি।” বলল জয়সেনা। না, তাও করা যাবেনা। এ ধরনের কিছু করতে চাইলে অনেক আগেই আমি তা করতে পারতাম। কিন্তু এ মুহূর্তে এ ধরনের কোন কাজ করা ঠিক হবেনা। কারণ শত্রুদের গোয়েন্দা এখন আমাদের প্রতিটি মহল্লায় রয়েছে, আমাদের দুটি দুর্গ শত্রুদের দখলে চলে গেছে, এ মুহূর্তে ওই বৌদ্ধটাকে গায়েব করে দিলে নিরূনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিদ্রোহ করতে পারে। আর সেই বিদ্রোহে শত্রু বাহিনীই লাভবান হবে। আমি ভাবছি, ডাভেল থেকে যখন মুসলিম বাহিনী আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য রওয়ানা হবে, তখন নানা ছলাকলায় সুন্দরীকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। আমার মনে হয় ডাভেল ত্যাগ করে শত্রু বাহিনী নিরূনের দিকেই অগ্রসর হবে। তুমি তাড়াতাড়ি গিয়ে তোমার সৈন্যদের নিয়ে ব্রাক্ষ্মণাবাদ চলে যাও। নদী পেরিয়ে তোমাদের
ওপারে চলে যেতে হবে। যাতে নদী তোমাদের পিছনে থাকে। এতে সুবিধা এই হবে যে, শত্রু বাহিনী তোমাদের অজ্ঞাতে পিছন থেকে আক্রমণ করতে পারবে না। নিরূনে আমাদের যে সেনাধ্যক্ষ আছে তার সাথে গোপনে সাক্ষাত করবে। তাকে বুঝাবে সে যেন কিছুতেই নিরূন হাতছাড়া হতে না দেয়।
“ওখানকার লোকেরা যদি আমাদের বাহিনীর জন্যেই কোন অসুবিধা সৃষ্টি করে তাহলে কি করতে হবে?”
“পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। যদি আমার কাছে সংবাদ পাঠানো সম্ভব হয়, তাহলে আমাকে দ্রুত বিষয়টি জানাবে। তাতে আমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সময়ক্ষেপনের চেষ্টা করব। . আমি শত্রুবাহিনীর সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে চিঠি লিখছি। তাতে আমি ওকে আতঙ্কিত করার চেষ্টা করছি। আমি জানি দেশ ছেড়ে যে এতো দূর পর্যন্ত এসে আক্রমণ করার সাহস রাখে তাকে কোন কথায় ভয় দেখানো যাবে না, তবুও এতে আমি হাতে কিছুটা সময় পাবো আমার সেনাদের এই ফাকে সুবিধা মতো জায়গায় স্থানান্তরিত করে নেবো।” বলল রাজা দাহির। জয়সেনা কোন বিশ্রাম না করে সেই বৈঠক থেকে উঠেই তার সেনা শিবিরের দিকে রওয়ানা করল।
