“জীবন দিতে তারা কসুর করেনি। মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পরার পর তখনকার সকল সৈন্য ও প্রজারা দুর্গফটক খুলে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল।”
সে কথা আমি জানি মহারাজ! ডাভেল থেকে আসা লোকের কাছ থেকে আমি সব খবর নিয়েছি। আমাদের সৈন্য ও ডাভেলের অধিবাসীরা মুসলিম সৈন্যদের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল, কিন্তু সেটি আক্রমণ ছিলনা মহারাজ। সেটিকে আত্মহত্যাই বলা উচিৎ। কারণ তারা সেই বিশ্বাস থেকেই শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল, পতাকা যেহেতু ভেঙ্গে পড়েছে, এখন আর শত্রুদের ঠেকানো যাবে না, তাই শত্রুদের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়ে এবং মৃত্যু বরণ করো।”
“হ্যাঁ, ওরা মৃত্যুইতো বরণ করেছে। কিন্তু এই গণহত্যার জন্য আমি ডাভেলের শাসক ও সেনাপতিদের জীবিত থাকতে দেবোনা। জানিনা ওরা এখন কোথায় আছে?
“এ ধরনের ভুল মহারাজের করা উচিৎ হবেনা” বলল বুদ্ধিমান। তাদের জীবিত থাকতে দিন তবে তাদেরকে তিরস্কার করুন। তাহলে দেখবেন ভবিষ্যত যুদ্ধে এই অপমানের কালিমা দূর করার জন্য এরা জীবন বিলিয়ে দেবে। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে মহারাজ! তাদের মধ্যে যদি এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গিয়ে থাকে যে, পতাকা দণ্ড ভেঙ্গে পড়ার কারণে তাদের ওপর দেবতাদের অভিশাপ পড়েছে, তাহলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এরা পরাজিত হতে থাকবে।”
“তাহলে আমি কি ওদের বলবো যে, তোমরা ধর্মান্তরিত হয়ে যাও।” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল রাজা দাহির। আমি কি ওদের বলবো, মুসলমানদের ধর্ম সত্য, তাই তারা আমাদের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করেছে। সত্য ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণেই তারা আমাদের দেবদেবীদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে?…বুদ্ধিমান! তুমি জ্ঞানী লোক। জ্ঞান-বুদ্ধি আমার চেয়ে তোমার বেশী হতে পারে কিন্তু জেনে রেখো, সিন্ধুতে আমি কখনো ইসলাম প্রবেশ করতে দেবো না।”
“আসতে আর না দেবেন কিভাবে, ইসলাম তো সিন্ধুতে এদের আগেই এসে গেছে মহারাজ! মহারাজ নিজেইতো ইসলামকে নিজের আঁচলে ঠাই দিয়ে রেখেছেন। যেসব আরবকে মহারাজ পরম আদর যত্নে আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন, ওরা আমাদের হিতাকাঙ্খী নয় নিজ ধর্মের লোকদেরই হিতাকাক্ষী। তাই যদি না হবে তাহলে কে মুসলিম সেনাপতিকে বলল, মন্দিরের পতাকা ভেঙ্গে ফেলল, তাহলেই ডাভেলবাসীর পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাবে? কারণ শহরের দরজা বন্ধ ছিল। দুর্গের ভিতর থেকে কেউ বাইরে যায়নি, আরব সৈন্যদের পক্ষে এই রহস্য জানার কথা নয় যে, মন্দির চূড়ার পতাকা ফেলে দিলেই হিন্দুদের মনোবল ভেঙ্গে যাবে। এই রহস্য মাকরানে আশ্রিতরাই তাদের জানিয়েছে।
“ওদের বিরুদ্ধে এখন আমি কি ব্যবস্থা নিতে পারি?”
“কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয় মহারাজ! এখন ওদেরকে আপনার আরো কাছে টেনে নিতে হবে। ওদের সাথে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে জেনে নিতে হবে, মিনজানিক তৈরীর ফর্মুলা। তাদের মধ্যেও মিনজানিক তৈরী করার মত কারিগর থাকতে পারে। এ মুহূর্তে যদি আমরা দু’চার দশটি মিনজানিক তৈরী করে নিতে পারি, তাহলে মুসলিম সৈন্যদের ওপর রাতের অন্ধকারেও আমরা পাথর ও আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে পারবো। মুসলিম বাহিনী জায়গা
দখল করতে চাইলেও আমরা ওদের নতুন শিবির স্থাপনে বাধা দিতে পারবো।”
“এই তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করে দাও। মাকরাণী মুসলমানদের মধ্যে যদি মিনজানিক তৈরীর কারিগর না থাকে তবে তাদের মধ্যে বিশ্বস্ত কাউকে মুসলিম সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে মিনজানিক তৈরীর কৌশল শিখে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করো। তুমি ওর মাধ্যমে জানতে চেষ্টা করো, মিনজানিকের গঠনটা কেমন এবং কি কাঠ দিয়ে তৈরী হয়। মিনজানিক তৈরীর কাজ শিখে আমাদের জানালে আমি তাকে এমন উপঢৌকন দেবো যে সাতপুরুষ খেয়েও শেষ করতে পারবে না।” ডাভেল দুর্গের পতন ছিল রাজা দাহিরের জন্য অশনি সংকেত। রাজা দাহির উজিরের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল কোন আনাড়ী লোক ছিলনা। দাহির নিজেও ছিল খুব ধূর্ত, চতুর চালবাজ। উজিরকে সে বাজিয়ে দেখতো। অবশ্য একথাও ঠিক উজির বুদ্ধিমান ছিল যথার্থই একজন বাস্তববাদী মানুষ। কিন্তু রাজা দাহির যেমন ছিল আত্মগর্বে বিভোর তেমনই অহংকারী ও অত্যাচারী। হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ পূজারী ছিল দাহির। নিজ ধর্ম ও নিজের শাসন কাজে কারো নাক গলানোকে মোটেই সহ্য করতে পারত না। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হলে যে কাউকে ধ্বংস না করে ক্ষান্ত হতে চাইত না এই ক্ষমতা লিপ্সু রাজা। রাজা দাহিরের চাল ছিল খুবই জটিল। কখন কার ওপর সে খড়গ চালাবে কারো পক্ষে বলা সম্ভব হতো না। তার মুচকি হাসি, তিরস্কার ও বকা চাউনির মধ্যে লুকিয়ে থাকতো অপার রহস্য। যার ফলে উজির, সেনাপতি শীর্ষ আমলা সবাই রাজাকে জমদূতের মতো ভয় করত। কোন পরাজিত সেনাপতিকে ক্ষমা করতো না দাহির।
উজির বুদ্ধিমানকে বিদায় করে দিয়ে প্রহরীকে কক্ষের দরজা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলো রাজা। একাকী বসে গেল চিন্তা ভাবনায়। তার রাজন্যবর্গ মন্ত্রী উজিরগণ খাস কামরার বাইরে মহা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় অপেক্ষমাণ। তারা একে অন্যের দিকে তাকানোরও যেনো সাহস পাচ্ছে না। তারা শঙ্কিত রাজা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে, জানা নেই কখন কার ওপর এই আগুনের লাভা উদগীরণ করে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে ফেলবে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর রাজার খাস কামরার দরজা খোলার নির্দেশ শোনা গেল। দরজা খুলতেই রাজা নির্দেশ দিলো-জয়সেনাকে জলদি ডেকে পাঠানো হোক।
