বিন কাসিমের মূল্যায়ণ ও সদাচরণে মুগ্ধ হয়ে দারোগা কুবলা ইসলাম গ্রহণ করল। দারোগা কুবলা ডাভেলের অধিবাসী ছিল না। সে ছিল তৎকালীন হিন্দুস্তানের দাহির শাসিত রাজ্যের একজন জ্ঞানী বিদ্বান ব্যক্তি। বিন কাসিম হুমাইদ নজদীকে ডাভেলের শাসক নিযুক্ত করে তার অধীনে দারোগাকে জেলখানার দারোগা পদে বহাল রেখেছিলেন এবং কুবলাকে হুমাইদের উপদেষ্টার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন।
কুবলাকে দারোগা পদে বহাল করে বিন কাসিম তার কাছে জানতে চান, আরব বন্দীদের মতো আরো কোন নিরপরাধ লোক কি বন্দিশালায় আছে?
“যে দেশের শাসক সত্য শুনতে পছন্দ করে না, সে দেশের কারাগারগুলো সত্যনিষ্ঠদের আবাসস্থলে পরিণত হয়। এই কারাগারে এদের মতো নিরপরাধ বহু বন্দি রয়েছে।” বলল কুবলা।
“কে অপরাধী আর কে অপরাধী নয় কয়েদখানায় যারা রয়েছে এদের ব্যাপারে তুমিই ফয়সালা করবে।” বললেন বিন কাসিম। যারা নিরপরাধ তাদের ছেড়ে দেবে, আর অপরাধের তুলনায় যারা বেশী শাস্তি ভোগ করেছে তাদেরও মুক্ত করে দেবে। এখন থেকে সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মতো ইনসাফ করা হবে। কারো প্রতি জুলুম করা চলবেনা।” বিন কাসিম মুক্তিপ্রাপ্ত আরব বন্দীদের সাথে অনেকক্ষণ কথা বললেন। পরিশেষে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন, যতো শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হোক।
বিন কাসিম মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের উদ্দেশে বললেন, যে বন্দিশালা থেকে কোন দিন কোন বন্দির জীবিত বের হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, সেই কঠিন বন্দিদশা থেকে তোমরা মুক্তি পেয়েছ, শুধু এজন্যই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করোনা। এজন্যও আল্লাহর শোকর আদায় করা দরকার, তোমরা এখানে বন্দি না।
হলে আমাকে এখানে পাঠানো হতোনা। যেহেতু আমাকে এখানে আসতে হয়েছে, এজন্য আমার ওপর কর্তব্য হয়ে গেছে এই কুফরিস্তানের প্রতিটি জনপদে ইসলামের আলো পৌছে দেয়ার। তোমাদের বন্দিত্ব শুধু আমার জন্যই নয় হিন্দুস্তানে ইসলাম প্রচারের একটা কার্যকর পথ তৈরী করে দিয়েছে। হিন্দুস্তানে ইসলামের আগমনের ইতিহাস যখন লিখা হবে তখন ইসলামের আগমনের আগে তোমাদের বন্দিত্বের কথা উল্লেখ করা হবে। সিন্ধু বিজয়ের ইতিহাসের পাশাপাশি তোমাদের বন্দিজীবনের কষ্ট দুর্ভোগের কথাও সগর্বে উল্লেখ করা হবে। তোমরা যে কষ্ট অত্যাচার সহ্য করেছ, আল্লাহ এর প্রতিদান
দেবেন। দোয়া করো, আমি যে সংকল্প নিয়ে এসেছি তা যাতে সফল করতে পারি। তোমাদের মুক্ত করার মধ্যেই আমার মিশন শেষ হয়ে যায়নি, আমার মূলকাজ শুরু হয়েছে মাত্র। অতঃপর বন্দিরা দেশের পথে রওয়ানা হলো। ডাভেলের পৌত্তলিক শাসক দুর্গ পতনের সাথে সাথেই সুযোগ মতো পালিয়ে গেল। দুর্গের ভিতরের প্রতিটি বাড়ি তল্লাশী করেও তাকে পাওয়া গেল না। ডাভেল থেকে পালিয়ে দুর্গশাসক নিরূন আশ্রয় নিলো। কারণ নিরূন ছাড়া তার পক্ষে রাজধানীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিলনা। রাজধানী উরু গেলে রাজা দাহির পরাজয় ও সৈন্যদের ফেলে পালিয়ে আসার জন্য তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতো। তাই নিরূন শাসক শান্তিকামী সুন্দরীর কাছেই। আশ্রয়প্রার্থী হলো সে। রাজা দাহিরের কাছে যখন খবর পৌছলো, ডাভেল দুর্গের পতন ঘটেছে, মুসলমান বাহিনী দুর্গ দখল করে নিয়েছে, তখন রাগে ক্ষোভে আগুন হয়ে গেল দাহির। কেউ তখন রাজার মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। কিন্তু তার বুদ্ধিমান উজির সাহস করে রাজার একান্ত কক্ষে প্রবেশ করল।
কিসের জন্য এখানে এসেছ? সিংহের মতো গর্জে ওঠলো রাজা। তোমার এতো বুদ্ধি চাতুরী কোথায় গেল উজির? মহারাজ! আমাদের সৈন্যরা দু’বার আরব বাহিনীকে পরাজিত করেছে। এর ফলে তারা মনে করেছিল আমাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের সৈন্যরা ছিল বিজয়ের নেশায় উত্ত, এজন্য মুসলিম সেনাদের সতর্ক ও কৌশলী আক্রমণ এরা প্রতিরোধ করতে পারেনি।
“আমাদের গোয়েন্দারা বলেছে, ওরা নাকি আগে ডাভেলের মন্দির চূড়া ধ্বংস করে পতাকা ভূলুষ্ঠিত করেছে” বলল রাজা।
আপনাকে ঠিকই বলা হয়েছে মহারাজ। শত্রুবাহিনী আগে মন্দির চূড়া ভাঙ্গার জন্য পাথর নিক্ষেপ করেছে। মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পড়ার কারণে পতাকা দণ্ড ভেঙ্গে পড়ে। আমাদের ভাগ্য ডাভেল পতাকা দরে সাথেই যুক্ত ছিল। পতাকা দণ্ড ভেঙ্গে পড়ার কারণে আমাদের সৈন্য সংখ্যা আরো চার গুণ বেশী হলেও পরাজিত হতে হতো। মহারাজ! মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পড়ার বিষয়টি মুখ্য নয়, আসল বিষয় হচ্ছে, আপনার রাজভাগ্য। বলল বুদ্ধিমান। মুসলিম বাহিনী যদি এভাবে একের পর এক দুর্গ জয় করতে থাকে তাহলে আপনার রাজধানী এবং শাসন ক্ষমতাও
সংকীর্ণ হয়ে আসবে। আপনি সব সময় আমাকে বিশ্বাস করেছেন এবং সতর্ক বুদ্ধিমান মনে করেছেন। আমার ওপর যদি এখনো আপনার আস্থা ও বিশ্বাস অটুট থেকে থাকে তাহলে আমি কিছু কথা বলতে চাই, আশা করি আপনি তাতে ক্ষুব্ধ হবেন না। “ঠিক আছে আমি রাগ করবনা। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে উজির। ডাভেল শত্রুরা কব্জা করে নিয়েছে। মনে করো শত্রুদের হাত আমার গলা পর্যন্ত এসে গেছে।
“আমরা এজন্য পরাজিত হচ্ছি মহারাজ, আমরা আমাদের ভাগ্যকে কিছু মাটির তৈরী পুতুলের সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলেছি। একটি পতাকা দণ্ড ভেঙ্গে পড়েছে তো কি হয়েছে? এটিতো একটুকরো কাপড় আর একপ্রস্ত বাঁশ ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। অথচ মন্দিরের পুরোহিতেরা আমাদের সমাজে এ ধারণা বদ্ধমূল করে দিয়েছে যে, এই পতাকাদণ্ড দেবতারা নিজ হাতে ধরে রেখেছে। তারা মানুষকে বুঝিয়েছে, এই পতাকা দণ্ড ভেঙ্গে পড়লে মনে করবে তোমরাও ভেঙ্গে পড়েছ, দেবতাদের অভিশাপে পতিত হচ্ছো তোমরা। অথচ আমাদের প্রজা ও সৈন্যদের যদি বোঝানো হতো এই পতাকা আমাদের মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। এই পতাকা পর্যন্ত যেনো শত্রুরা কখনো আসতে না পারে। এভাবে লোকজনকে বোঝাতে পারলে পতাকার মান রক্ষার জন্য এরা জীবন বিলিয়ে দিতো।”
