“নির্দেশ পেয়ে কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষী পাতাল বন্দিশালার দিকে দৌড়ে গেল। তারা নীচের সব জায়গায় দারোগা কুবলাকে তালাশ করল কিন্তু কোথাও দারোগাকে খুঁজে পেল না। বন্দীদের কাছেও দারোগার কথা জিজ্ঞেস করল কিন্তু কেউ দারোগার সন্ধ্যান দিতে পারল না।
অবশেষে বুঝা গেল বিন কাসিম যখন মুক্ত আরব বন্দীদের মুক্তির আবেগঘন পরিবেশে সাফল্য ও কৃতজ্ঞতার আবেশে সিক্ত ছিলেন, আরব বন্দিরা তাকে ঘিরে আনন্দাশ্রু বর্ষণ করছিল এবং তাকে জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতায় চুমুই চুমুই ভরিয়ে দিচ্ছিল, মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দি ও সৈন্যদের এই মগ্নতার সুযোগে দারোগা কুবলা জেলখানা থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যায়।
বিন কাসিম কয়েদখানায় প্রবেশ করেই দারোগার সাক্ষাত পেয়ে যান। দারোগা কুবলা বিনাবাক্য ব্যয় ও কালক্ষেপণ না করে আরব বন্দীদের অবস্থানের কথা বিজয়ী সেনাপতিকে জানিয়ে দেয় এবং নিজে পাতাল কক্ষের চাবী নিয়ে দরজা খুলে দেয় এবং বন্দীদের মুক্ত করে দেয়।
বিন কাসিমের নিরাপত্তারক্ষীরা দারোগার খুঁজে সারা কয়েদখানায় তল্লাশী করে প্রধান ফটকের কাছে গেলে তারা দুই কয়েদীকে দেখতে পেল, হাত পায়ে বেড়ী নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ওরা কয়েদখানার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ওদের জিজ্ঞেস করে নিরাপত্তা কর্মীরা জানতে পারল তারা দারোগাকে প্রধান গেট পেরিয়ে যেতে দেখেছে। এ খবর পেয়ে দুই নিরাপত্তারক্ষী দারোগাকে ধরে আনার জন্য ঘোড়া দৌড়াল। এরা কয়েদখানায় প্রবেশ করেই দারোগাকে দেখেছিল। কিছুদূর অগ্রসর হয়েই তারা দারোগাকে
পেয়ে গেল। তারা দারোগাকে পাকড়াও করে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে এলো।
“তুমি কি ডাভেল দুর্গ থেকে পালিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করেছিলে? দু’ভাষীর মাধ্যমে ধৃত দারোগাকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
“সম্মানিত বিজয়ী সেনাপতি। আমার যদি প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালানোর ইচ্ছা থাকত, তাহলে এতো সহজে আপনার লোকেরা আমাকে ধরতে পারত না।”
“জীবন বাঁচানোর জন্য পালানোর কোন ইচ্ছাই কি তোমার ছিলনা?” জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। তুমি নিহত হতে চাও।”
“না, আমি মৃত্যুবরণ করতে চাই না। বিজয়ী সেনাপতি হিসাবে প্রতিপক্ষের সৈনিক হিসাবে আমাকে হত্যা করা ছাড়া, হত্যার আর কোন কারণ আপনি আমার বেলায় পাবেন না।
“এসব নিরপরাধ লোকগুলোকে এতো দিন পর্যন্ত বন্দি করে রাখা কি তোমার অপরাধের জন্য যথেষ্ট নয়? এই অপরাধ কি ক্ষমা যোগ্য মনে কর তুমি?”
“নিরপরাধ এই লোকগুলোকে এতোদিন বাচিয়ে রাখা কি অপরাধ? বলল দারোগা। এদেরকে আমাদের রাজার হুকুমে বন্দি করা হয়েছে কিন্তু আমার হুকুমে বন্দিদশাতেও এদেরকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাদের বন্দি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলে সেটির অপরাধে অপরাধী আমাদের রাজা। বন্দি অবস্থায় যদি এদের বিশেষ কোন কষ্ট দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এজন্য আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। সম্মানিত সেনাপতি! আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করার আগে তাদেরকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন, আমি তাদের কোন কষ্ট দিয়েছি কি-না? মুহাম্মদ বিন কাসিম আরব বন্দীদের কাছে দারোগা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা সবাই একবাক্যে জানালো, এই দারোগা তাদের ওপর কোন জুলুম করেনি। বরং সে প্রতিদিন পাতাল কক্ষে গিয়ে তাদের প্রয়োজনাদির খোঁজ খবর নিতো। তাদের দেখা শোনা করতো। সবাই দারোগা কুবলার প্রশংসা করল।
“সম্মানিত সেনাপতি। আপনি জানেন না, এই বন্দীদের মধ্যে যে দু’জন তরুণী ছিল তাদেরকে আমি ডাভেল শাসকের কুদৃষ্টি থেকে বহু কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছি। ডাভেল শাসক যখন কারাবন্দীদের দেখতে আসতো, আমাকে খবর দিতো আমি খবর পেয়েই ওই দুই তরুণীকে ডাভেল শাসকের
দৃষ্টি থেকে আড়ালে রাখতাম। শুধু তাই নয় সম্মানীত সেনাপতি! উরুঢ় থেকে রাজা দাহির নির্দেশ পাঠিয়েছিল, ডাভেল অবরোধে শত্রু বাহিনী যদি বিজয়ী হয়ে যায়, তাহলে মুসলমান সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করার আগেই আরব বন্দীদের হত্যা করে ফেলবে। রাজার সেই নির্দেশ প্রয়োগের সময় আমি পেয়েছিলাম, কিন্তু আমি রাজার হুকুম বাস্তবায়ন করিনি।”
তুমি ইচ্ছা করলেও তা পারতেন। জেলখানার সকল প্রহরীইতো পালিয়ে গিয়েছে। রাজা দাহিরের শাসনতো তখন খতম হয়ে গিয়েছিল, তবুও তুমি বন্দীদের মুক্ত করে দিলেনা কেন? জানতে চাইলেন বিন কাসিম।
তাদের আমি মুক্ত করে দিলে সবাই জানতো এই বন্দীদের মুক্ত করার জন্যই এসেছে আরব সৈন্য। ডাভেল মন্দিরের ওপর পাথর নিক্ষেপ ও মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পড়তে দেখেই ওরা প্রতিহিংসার আক্রোশে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। অবস্থা আন্দাজ করে আমি পাতাল বন্দিশালার প্রধান গেট বন্ধ করে দিয়েছিলাম এবং জেলখানার সকল প্রহরী পালিয়ে যাওয়ার পরও আমিই শুধু এখানে অপেক্ষা করছিলাম। আমি মনে মনে প্রতীজ্ঞা করেছিলাম, নিরপরাধ এই বন্দীদেরকে মুসলিম বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে আমি এখান থেকে যাবো। আমি নিজের প্রতীজ্ঞা পূরণ করার পর এখান থেকে বের হয়েছি, জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যাইনি।”
“এদের প্রতি তোমার এতোটা দয়া দেখানোর কারণ কি?” জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
“এদের কোন অপরাধ ছিলনা। নিরপরাধ লোকগুলোকে বন্দি করে রাখার কারণে আমি এদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছি। এই অপরাধে যদি আপনি আমাকে হত্যা করতে চান তাহলে তাদের কারো হাতে তরবারী দিয়ে বলুন, তাদের কেউ আমাকে হত্যা করে ফেলুক।” আরব বন্দিরা আগেই বিন কাসিমকে বলেছিল, দারোগা কুবলা তাদের প্রতি কোন অত্যাচার করেনি, বরং সদাচরণ করেছে। বিন কাসিম দারোগার উদ্দেশে বললেন, “তোমার মতো মানুষের ইসলাম গ্রহণ করা উচিত। তোমার এই মহানুভবতার মর্যাদা একমাত্র ইসলামই দিতে পারে। আমি তোমাকে বাধ্য করবো না, তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি মাত্র। ইসলাম গ্রহণ করলে তুমিই বুঝতে পারবে কেন আমি তোমাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিচ্ছি।”
