ওরা আমাদের দুর্গ অবরোধ করেছে। দেখবে এবার মজা। কয় দিন ওরা এভাবে অবরোধ বহাল রাখতে পারবে। আরব সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করলেও বিজয়ী হয়ে তাদের মুক্ত করতে পারবে এ আশাবাদ খুব একটা জোরালো হতে পারছিল না এর আগের দু’টি অভিযানের পরাজয়ের সংবাদে। তাই নিত্যদিনের মতো আল্লাহর দরবারে আকুতি জানানো ছাড়া এহেন পরিস্থিতিতে তাদের আর কিছুই করার ছিলনা। তাদের সবগুলো কক্ষ যেমন ছিল মজবুত তেমনই শক্ত শিকলের দরজায় তালাবদ্ধ। আরব কয়েদীরা ইসলামী রীতি অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে ওমর বিন আওয়ানাকে দলনেতা মনোনীত করেছিল। দলনেতা হিসাবে কয়েদখানার বাইরে মানুষের ছুটাছুটির সংবাদ শুনে সে আরব বন্দীদের চিল্কার করে জানিয়ে দিলো, আরব বন্দিগণ। আমাদের মুক্তি নয়তো মৃত্যু সেই কাক্ষিত দিন সমাগত। সবাই দোয়া করো, বন্দিশালার প্রহরীরা আমাদের কাছে পৌছার আগে যেন স্বদেশী যোদ্ধারা আমাদের কাছে পৌছতে পারে। কোন হিন্দু প্রহরী যদি তোমাদের জোর করে বাইরে নিয়ে যেতে চায় তাহলে ওদের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে চেষ্টা করা। মরতেই যদি হয়, তাহলে লড়াই করেই মরতে চেষ্টা করবে। আমাদের সবাইকে যদি একসাথে বের করতে চায় তাহলে পাতাল কক্ষেই আমরা ওদের উপর হামলে পড়বো। সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করো। আল্লাহর দয়া ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর নেই।” সর্দারের কথায় সবাই একমত পোষণ করল। নারী শিশুরা পর্যন্ত লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
পাতাল কক্ষে যাওয়ার জন্য ওপর থেকে যে সিড়ি পথ নেমেছে হঠাৎ আরব সর্দার সেপথে বহুলোকের পদধ্বনী শুনতে পেল। সিঁড়ির কাছের কক্ষ থেকে আওয়াজ হলো, “সবাই হুশিয়ার হয়ে যাও। দরজা খোলার সাথে সাথেই শত্রুদের ভিতরে টেনে নেবে।”
সকল আরব বন্দি প্রস্তুত হয়ে গেল। নিস্তব্ধ নীরবতা। আরব বন্দিরা প্রথমে দেখতে পেল কয়েদখানার দারোগাকে। তার নাম কুবলা। তার হাতে ছিল এক গোছা চাবী। কয়েদীরা দেখল দারোগা কুবলার সাথে সাথে যে লোকটি আসছে সে কয়েদখানার কোন প্রহরী নয়। দেখতে দেখতে ত্রিশ চল্লিশ জন আরব সেনা পাতাল কক্ষে প্রবেশ করল। ওদের দেখে পাতাল বন্দিশালার প্রথম কক্ষের একবন্দি চিৎকার করে বলে উঠল, আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই আরব মুজাহিদ। তোমাদের শরীর থেকে আরব মুজাহিদের গন্ধ পাচ্ছি! একথা ধ্বনিত
হওয়ার সাথে সাথেই মাটির নীচের বন্দিশালার পরিবেশ বদলে গেল। কয়েদীরা মুক্তির আনন্দে আত্মহারা হয়ে স্বদেশী যোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরল। ওরা ছিল বিন কাসিমের একান্ত নিরাপত্তা ইউনিটের সৈনিক।
সিঁড়ির কাছ থেকে এক কমান্ডার উচ্চ আওয়াজে হাঁক দিলো। “সবাইকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে চলে এসো। সিপাহসালার ওপরে অপেক্ষা করছেন।”
মুহাম্মদ বিন কাসিম কয়েদখানার মাঝখানের খালি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। অশ্বপৃষ্ঠে উপবিষ্ট অবস্থায় তিনি বন্দিশালার পাতাল পথের প্রবেশ মুখের দিকে এক পলকে তাকিয়ে রয়েছেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি নারী বন্দীদেরকে ওপরে উঠে আসতে দেখতে পেলেন। তারা দিনের আলোয় এসেই দু’হাতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। দীর্ঘ দিন সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে তাদের চোখ হঠাৎ করে প্রখর সূর্যালোক সহ্য করতে পারছিলনা। সবাই চোখে অন্ধকার দেখছিল। সেনাপতি বিন কাসিম লক্ষ্য করলেন নারী শিশুদের পিছনে পুরুষরাও ওপরে ওঠা মাত্রই চোখ দু’হাতে বন্ধ করে ফেলছে।
“আরে বোকার দল। চোখ খোলল। চেহারা থেকে হাত সরাও। মুক্তি ভ্রাতা হিসেবে আগত বীর সেনাপতিকে দেখো।” আবেগের আতিশয্যে কম্পিত কণ্ঠে বলল বন্দীদের দলনেতা আমর বিন আওয়ানা।
বন্দীদের ওপরে আসতে দেখে এক লাফে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন সেনাপতি বিন কাসিম! সবার আগে যে নারী দলটি পাতাল কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ততোক্ষণে তাদের দৃষ্টি শক্তি দিনের আলোকে সহ্য করে নিয়েছে। তারা দেখতে পেল, পরম সুশ্রী এক নওজোয়ান মাটিতে হাটু ভেঙ্গে দু’হাত প্রসারিত করে তাদের স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে বলছে- “আমি কি ওয়াদা পূরণ করেছি? তোমরা কি কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দেবেনা, যে এই ছেলে আমাদেরকে বেঈমানদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে উদ্ধার করেছিল?”
নারীদের দলটি আগেই ঠায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, বিন কাসিমের আবেদন শুনে এক অর্ধবয়স্কা মহিলা এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমুই চুমুই ভরিয়ে দিতে দিতে বলল, “আল্লাহর কসম! সাকীফ গোত্রের আর কোন মা এমন বীর সন্তান জন্ম দিতে পারবে না।
যারই দৃষ্টি একটু ধাতস্থ হয়ে আসছিল, সেই বন্দিই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে জড়িয়ে আবেগে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর বিন কাসিম মুক্ত বন্দীদের নিয়ে জেলখানার দফতরে প্রবেশ করলেন। দফতরে দাঁড়িয়ে তিনি জেলখানার বদ্ধ কুঠিরে মুক্তিকামী বন্দীদের দরজায় কড়াঘাত করার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। যেসব বন্দির হাত মুক্ত ছিল কিন্তু হাত পায়ে বেড়ি ছিল, তারা শিকল ছিড়ে মুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল। ওদের শিকল ভাঙ্গার আওয়াজ ভেসে আসছিল বিন কাসিমের কানে। সব বন্দিই যেন পিঞ্জিরে আবদ্ধ পাখির মতো মুক্ত স্বজাতিদের সাথে উন্মুক্ত আকাশে উড়ার জন্য তড়পাচ্ছিল।
“দারোগাকে ধরে নিয়ে এসো এবং ওকে হত্যা করো।” নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম।
