দুর্গে প্রবেশ করে প্রথমেই বিন কাসিম এক সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন আগে আমাদের বন্দীদের খোঁজ করো। তাদের যদি এই দুর্গে বন্দি করা হয়ে থাকে তাহলে আক্রোশে হিন্দুরা হত্যায় মেতে উঠতে পারে। ডাভেল দুর্গে মুসলিম বাহিনী প্রবেশের পর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে গেল। মুসলিম বাহিনীর সামনে হিন্দু সৈন্যরা প্রতিরোধ তো দূরে থাক কচুকাটা হতে লাগল। বিন কাসিম উচ্চ আওয়াজে হুংকার দিয়ে বললেন, কোন-শত্রু সেনাকেই রেহাই দেব না।” এই দুর্গের কোন পুরুষ ক্ষমার যোগ্য নয়। বিন কাসিমের এতোটা ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ ছিল এরা আগে দুইজন সেনাপতিসহ অসংখ্য মুসলিম সৈন্যকে হত্যা করেছিল। তাছাড়া নিরপরাধ মুসলিম নারী পুরুষ ও শিশুদের আটকে রেখেছিল। সর্বোপরি বিন কাসিমের সহযোদ্ধাদের প্রতি নানা ভাবে পি তাচ্ছিল্য করেছিল। বিন কাসিমের যোদ্ধারা হুংকার দিয়ে বলছিল, হে মূর্তি পূজারীরা। কোথায় গেল
তোমাদের গর্ব। এখন তোমাদের দেব-দেবীদের ডাকোনা কেন। তারা কেন তোমাদের রক্ষায় শক্তির মহড়া দেখায় না। ওদের বলো, পারলে দেবদেবীরা তোমাদের রক্ষা করুক। বিন কাসিম তার নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে শহরের কয়েদখানার দিকে ঘোড়া ছুটালেন। আসলে হিন্দু জাতিও ইহুদিদের মতো। ওদের মধ্যে কোন গভীর বুদ্ধি বিবেক কাজ করেনা। আসলে সত্যে উপণীত হওয়ার মতো ওদের বিবেক বুদ্ধিই নেই। ওরা অনেকটা জড়বস্তুর মতো।
০৬. আল্লাহর কসম
আল্লাহর কসম। হাকীক সম্প্রদায়ের মায়েরা আর এমন ছেলে জন্ম দেবেনা…
মুহাম্মদ বিন কাসিম নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে বন্দিশালার দিকে যাচ্ছিলেন। বিন কাসিমের নিরাপত্তারক্ষীরা দুর্গের এক বাসিন্দাকে পথ দেখানোর জন্য সাথে নিয়ে ছিল। সেই লোকটিই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জেলখানার দিকে। পথ প্রদর্শকের ঘোড়া তাদের আগে আগে দৌড়াচ্ছিল। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। হঠাৎ বিন কাসিমের সামনে পড়ল, দুই মুসলিম সেনা এক তরুণীকে টেনে হেঁচড়ে একটি বাড়ি থেকে বের করছে, আর ওদের ছেড়ে দেয়ার জন্যে এক বৃদ্ধ কড়জোরে অনুরোধ করছে।
বিন কাসিম এই দৃশ্য দেখে ঘোড়া থামিয়ে দিলেন। বাধাগ্রস্ত হয়ে সৈনিক বাধাদানকারী বৃদ্ধের প্রতি ক্ষেপে গেল এবং তাকে হত্যা করার জন্য তরবারী উত্তোলন করল।
হঠাৎ করে সেই সৈন্যের কানে ভেসে এলো হুংকার “থামো, তরবারী নামিয়ে ফেলো” সৈনিক তরবারী নামিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রধান সেনাপতি বিন কাসিম।
বিন কাসিম সৈনিকের মুখোমুখি ঘোড়া দাড় করিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, তোমরা কি আরব নও?
“জী হ্যাঁ, প্রধান সেনাপতি! আমরা অবশ্যই আরব।” বিনয়ের সাথে জবাব দিলো সৈনিক।
‘তোমরা কি মুসলমান নও? “আলহামদুলিল্লাহ’ অবশ্যই আমরা মুসলমান, মাননীয় সেনাপতি।
“তোমাদের রক্তে কি রোম-পারস্যের রক্তের কোন মিশ্রন ঘটেছে? আল্লাহর কসম! আমার প্রিয় রাসূল বেসামরিক নিরপরাধ নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর কখনো হাত তুলেননি। ছেড়ে দাও ওদের।”
মুহাম্মদ বিন কাসিম তরুণী ও বৃদ্ধকে ইশারায় ঘরের ভিতরে চলে যেতে বললেন এবং তাঁর দুভাষীদের নির্দেশ দিলেন, তোমরা সারা শহরে ঘোষণা করে দাও, বেসামরিক নারী, শিশু, বৃদ্ধদের ওপরে যদি কোন মুসলিম সেনা হাত তুলে তাহলে তাদের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। কোন মুসলিম সেনা যেন বেসামরিক লোকের বিরুদ্ধে কোন ধরনের দমনমূলক পদক্ষেপ না নেয়।
খুব দ্রুততার সাথে বিন কাসিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্যে জরুরী নির্দেশ দিয়ে বন্দীদের মুক্ত করার জন্য তাড়াতাড়ি কয়েদখানায় পৌছানোর জন্য উদগ্রীব ছিলেন। কারণ শত্রুরা পরাজয়ের প্রতিহিংসায় বন্দীদের হত্যা করার প্রবল আশঙ্কা করছিলেন তিনি।
শহরের মতো কয়েদখানার মধ্যেও হিন্দু কারারক্ষীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কারারক্ষীরা মন্দির চুড়া ভেঙ্গে পতাকা নীচে পড়তে দেখেই প্রাণ ভয়ে কারাগারে দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করে। আর চিৎকার করতে থাকে, ডাভেল ভেঙ্গে পড়ছে, দেবীর গযব ধেয়ে আসছে, শহরের সব মানুষ পালাচ্ছে।
শহরের আতঙ্ক কারাভ্যন্তরেও আছড়ে পড়ল। কারারক্ষীরা প্রধান ফটক খুলে দিল। কয়েদখানার সকল প্রহরী ও কর্মচারী প্রাণভয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেল। কারাগারের ভিতরে যেসব বন্দি বিভিন্ন কক্ষে আটক ছিল তাদের বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় মুক্তির জন্য দরজায় করাঘাত করতে লাগল।
বাইরের অবস্থা একপর্যায়ে কারাগারের পাতাল কক্ষেও ছড়িয়ে পড়ল। ওখানেই বন্দি করে রাখা হয়েছিল আরবদেরকে। সংবাদ শুনে সকল আরব বন্দি মুক্তির আশ্বাসে আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হলো। তারা তখনও জানেনা মুসলিম সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করেছে। এমনটি তাদের ধারণার বাইরে। বন্দি আরবদের প্রতিটি দিনের সূর্য উদিত হতো জীবনের শেষ দিবস হিসাবে এবং প্রতিদিনের সূর্য অস্ত যেতো জীবনের শেষ রাত হিসাবে। তারা প্রতিটি মুহূর্তকেই মনে করতো মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য আরবদেরকে কোন প্রহরী উপহাসচ্ছলে বলেছিল, দু’বার তোমাদের বাহিনীকে সেনাপতিসহ আমরা কচুকাটা করে ফেরত পাঠিয়েছি কিন্তু কাপুরুষগুলো আবারো আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছে।
