“আর আমি যদি তিনবার মিনজানিক উৎক্ষেপণের দ্বারা এই মন্দির চূড়া ধ্বংস করতে না পারি তাহলে প্রধান সেনাপতি আমার দু’হাত কেটে দেবেন।” স্বীকারোক্তি করল সালমী।
“আল্লাহর কসম! তোমার মতো সাহসী যোদ্ধাই আমার দরকার জাউনা সালমী! তিনবার উৎক্ষেপণের কোন শর্তারোপের প্রয়োজন নেই। তুমি যেভাবে পারো মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পতাকাটি ফেলে দাও, আর পুরস্কার জিতে নাও।” বললেন বিন কাসিম। বিন কাসিমের নির্দেশে প্রধান মিনজানিক উরুসকে দুর্গের পূর্ব পাশে নিয়ে আসা হলো। কারণ তখন সূর্য উদিত হচ্ছিল মাত্র। পূর্ব দিক থেকেই মন্দির চূড়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে সৈন্যরা বিশালাকার পাথর জড়ো করল।
জাউনা সালমী আল্লাহর নাম নিয়ে মিনজানিকের নিশানা ঠিক করল। দূরত্বের পরিমাণু আন্দাজ করে মিনজানিকের পিছনের দিকে একটু জায়গার মাটি খুঁড়ে মিনজানিকের সম্মুখ ভাগ ওপরে তুলে নিলো। তাতে নিক্ষিপ্ত পাথর বেশী দূরে এবং ওপরে গিয়ে পড়বে। সিরিয়ার সেই অধিবাসী জাউনা সালমী হয়তো জানতো না, তার সেই নিক্ষিপ্ত পাথর ইতিহাস বদলে দেবে এবং সময়ের গতিকে ঘুরিয়ে দেবে।”
মিনজানিক উৎক্ষেপণকারী জাউনা সালমীর নির্দেশ মতো সৈন্যরা বড় বড় পাথর এনে মিনজানিকে স্থাপন করল, আর তার কথা মতো পাঁচশ’রও বেশী সৈন্য একসাথে মিনজানিকের রশি টানলো। মিনজানিকের পাথর উৎক্ষেপক
অংশ রশির টানে শেষপ্রান্ত স্পর্শ করলে জাউনা সালমী সৈন্যদেরকে ইশারা করতেই সবাই রশি ছেড়ে দিলো। বিশাল বিশাল পাথর মাটির ঢিলের মতো উড়ে উড়ে দুর্গপ্রাচীরের বহু উপর দিকে মন্দিরের প্রধান গম্বুজে আঘাত হানলো। বিকট আওয়াজে কেঁপে উঠল চতুর্দিক, সেই সাথে মুসলিম সৈন্যরা সমকণ্ঠে তাকবীর দিলেন। এরপর জাউনা সালমীর নির্দেশে সৈন্যরা দ্বিতীয়বার মিনজানিকের মধ্যে পাথর স্থাপন করল। পাথর স্থাপনের সময়ই সালমী বলল, এবার আর মন্দির চূড়া দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। দ্বিতীয় বারের আঘাতে নিক্ষিপ্ত পাথর আর গম্বুজে আঘাত করে প্রতিধ্বনীত হলো না বরং গম্বুজ ভেঙ্গে পাথর ভিতরে প্রবেশ করলো। আর মন্দির চূড়ার পতাকা দণ্ড হেলে গেল। তৃতীয়বারের উৎক্ষেপণের সময় জাউনা সালমী মিনজানিকের নিশানা একটু বদল করে নিলো। সেই সাথে মিনজানিকে পাথর স্থাপন করে যখন নিক্ষেপ করল, পাথরের গমণ পথের দিকে তাকিয়ে জাউনা সালমী তাকবীর দিলো, নিক্ষিপ্ত পাথর দ্বিতীয় আঘাতের একটু ওপর মন্দির চূড়ায় আঘাত হানলো। তাতে মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পতাকাদণ্ডসহ লুটিয়ে পড়ল মন্দিরের ভিতরে। পতাকা পড়তে দেখে বিন কাসিমের সৈন্যরা তাকবীর ধ্বনীতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে ফেলল।
মন্দিরে প্রথম পাথর নিক্ষেপের আওয়াজে শহরের সকল বেসামরিক হিন্দু মন্দিরে গিয়েজড়ো হলো, আর পূজাপাঠ করতে শুরু করল। এমতাবস্থায় কিছুক্ষণ পর যখন দ্বিতীয়বার মিনজানিকের নিক্ষিপ্ত প্রস্তরাঘাতে মন্দির গম্বুজের একাংশ ভেঙ্গে পড়ল, তখন মন্দিরের ভিতরে থাকা পূজারী ও মন্দিরের পুরোহিতরা ভয়ে আতঙ্কে বেরিয়ে এলো। তৃতীয়বারের প্রস্তরাঘাতে যখন মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পতাকা ভূলুণ্ঠিত হলো তখন হিন্দুরা আতঙ্কে আর্তনাদ শুরু করে দিলো। সারা শহর জুড়ে দেখা দিলে চিৎকার চেচামেচি। তাদের দৃষ্টিতে মন্দিড়া ভেঙ্গে পড়া ছিল ধ্বংসের আলামত। হিন্দু নারী শিশুদের আর্তচিৎকারে দুর্গাভ্যন্তরে কেয়ামত সৃষ্টি হয়ে গেল। মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পড়তে দেখে সৈন্যরা দুর্গের প্রধান ফটক খুলে দিলো। সকল হিন্দু সৈন্য ও সামর্থবান পুরুষরা দুর্গের বাইরে চলে এলো জীবনের শেষ মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হতে। হিন্দুরা সব একসাথে মুসলিম সৈন্যদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল, তারা কিছুটা পশ্চাৎপদ হয়ে হিন্দুদের অগ্রসর হতে দিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করল।
হিন্দুরা ছিল আক্রোশে উন্মাদ। আবেগ উন্মাদনায় হিন্দুদের মধ্যে কোন সামরিক শৃঙ্খলা ছিলনা। তাই মুসলিম সৈন্যদের সুনিয়ন্ত্রিত আক্রমণে ওরা কচুকাটা হতে লাগল। অবস্থা বেগতিক দেখে হিন্দু আক্রমণ কারীরা পিছু হটে দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশ করে দুর্গফটক বন্ধ করে দিলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিম তখন সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন সবগুলা মিনজানিক থেকে দুর্গের ভিতরে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকো। তখন দুর্গপ্রাচীরের ওপরে আর কোন হিন্দু সৈন্য ছিল না। মন্দির চূড়ার পতাকা ভেঙ্গে পড়া দেখেই ওদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গপ্রাচীর শত্রু মুক্ত দেখে মুসলিম সৈন্যরা রশিতে বাধা আংটা নিক্ষেপ করে রশি বেয়ে দুর্গপ্রাচীরের ওপরে উঠতে শুরু করল। সবার আগে দুর্গপ্রাচীরে উঠার মতো সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সাদী বিন খুজাইনা ইতিহাসের পাতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি ছিলেন কুফার অধিবাসী। দুর্গপ্রাচীরে আরোহণকারী দ্বিতীয় সৈনিক ছিলেন বসার অধিবাসী আজাল বিন আব্দুল মালিক।
দুর্গে অনবরত পাথর নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। তাতে শহরের অধিফসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন প্রাণ ভয়ে ছুটাছুটি শুরু করে দিল। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা কয়েকটি আংটা দিয়ে দ্রুতগতিতে দুর্গপ্রাচীরে উঠতে লাগল। কিছু সংখ্যক সৈন্য দুর্গপ্রাচীর থেকে নীচে নেমে দুর্গের প্রধান ফটক খুলে দিলে প্লাবনের মতো বিন কাসিমের বাহিনী দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করল।
