আগে প্রেরিত দুই সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন মাবহান ও বুদাইল বিন তোফায়েল দুর্গ থেকে অনেক দূরে থাকাবস্থায়ই শাহাদাতবরণ করেছিলেন। এতে হিন্দুদের এই বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়েছিল। হিন্দুরা বিশ্বাস করতে শুরু করে ডাভেল শহর কারো পক্ষেই পদানত করা সম্ভব নয়, কারণ ডাভেলের হেফাযত খোদ দেবতা নিজে করেন।
মুহাম্মদ বিন কাসিম হিন্দুদের এসব ধারণা বিশ্বাস সম্পর্কিত কিছুই জানতেন না। তিনি ডাভেলকে একটি মন্দির ছাড়া আর কিছুই ভাবেন নি। প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনীর পক্ষে দুর্গপ্রাচীরের কোথাও ভাঙ্গন সৃষ্টি করা সম্ভব হলো না। দুর্গপ্রাচীরে নীচের দিকে ছিল দশবারো হাত চওড়া আর ওপরে ছয় সাত হাত চওড়া। অনায়াসে দুর্গপ্রাচীরের ওপর দিয়ে সৈন্যরা ঘোড়া দৌড়াতে পারত।
এভাবে আরো কয়েক দিন চলে যাওয়ার পর নিজেদের অজেয় ভেবে হিন্দু সৈন্যরা মুসলমান সেনাদের প্রতি বিদ্রুপাত্মক অঙ্গভঙ্গি দেখাতে শুরু করল। এক হিন্দু সেনা দুর্গপ্রাচীরে দাঁড়িয়ে বলল, “স্নেচ্ছের বাচ্চারা। যেদিক থেকে এসেছে সে দিকেই ফিরে যাও। আগের দুই সেনাপতি ও সৈন্যদের পরিণতির কথা স্মরণ করো। এটা দেবতাদের শহর। দেবদেবীদের আক্রোশ থেকে জীবন নিয়ে পালাও।” আরো নানা ধরনের উত্তেজক ও বিদ্রুপাত্মক কথা মুসলিম বাহিনীকে শোনাতে লাগল হিন্দুরা।
তাতে মুসলিম সৈন্যরা হতোদ্যম না হলেও তাদের এ বিষয়টি বুঝে আসলো যে, বড় ধরনের আত্মত্যাগ ছাড়া এই দুর্গ জয় সম্ভব নয়।
দিন শেষে এলো রাত। নিশুতি নিস্তব্ধ রাত। সবখানে নীরব নিস্তব্ধতা। এর মধ্যে আহত কোন সৈন্যের হু, হা রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে দিচ্ছিল। সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী বিন কাসিম বাহিনীর কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ত্রী সন্তানদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন। তাদের অবস্থান ছিল তাঁবুর ভিতরের দিকে। মহিলারা আহত সৈন্যদের সেবা শুশ্রুষা করত। দিনের বেলা সংঘর্ষে যেসব সৈন্য আহত হতো, সহকর্মী সৈন্যরা তাদেরকে সংরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত তাবুতে রেখে আসত, আর মহিলারা তাদের ক্ষতস্থানে পট্টি বেধে দিতো, সেবা করত।
মুহাম্মদ বিন কাসিম সব সেনাপতিদেরকে তার তাবুতে ডেকে পাঠালেন। সবাইকে নিয়ে দুর্গ জয়ের প্লান নির্ধারনে ব্যস্ত ছিলেন এমন সময় এক প্রহরী তাঁবুতে প্রবেশ করে বিন কাসিমকে জানালো, এক হিন্দু ঋষিকে পাকড়াও করে আনা হয়েছে। হিন্দু ঋষি আমাদের অবরোধ বেষ্টনীর আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল, তখন তাকে পাকড়াও করা হয়। ধৃত ঋষি এরপর জানায়, সে সম্মানিত সেনাপতির সাথে দেখা করতে চায়। সম্ভবতঃ সে গোয়েন্দা হয়ে থাকবে, বলল প্রহরী।
“ওকে ভিতরে নিয়ে এসো।” নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। দুভাষীকে ভিতরে পাঠিয়ে দাও।” ধৃত লোকটিকে যখন তাঁবুর ভিতরে নিয়ে আসা হলো, তাকে দেখেও ঋষী বা সন্নাসীই মনে হলো।
বিন কাসম দুভাষীকে বললেন, ওকে জিজ্ঞেস করো সে এখানে কি করছিল?”
“আপনাকে আল্লাহ অনুগ্রহ করুন” একথা আরবী ভাষায় বলে হেসে দিলো ঋষি। সাথে সাথেই জানালো, আমি মুসলমান। হারেস আলাফী আমাকে পাঠিয়েছেন।
“আচ্ছা, তাহলে এই ছদ্মবেশ ধারণ করলে কেন?
“ছদ্মবেশ ধারণ করার কারণ হলো, আমি দিনের বেলায় এদিকে এসেছি। আমাকে আসল সুরতে এদিকে আসতে দেখলে রাজা দাহিরের গোয়েন্দাদের নজর পড়তো, আর রাজার কাছে খবর পৌঁছে যেতো যে, রাজার আশ্রিত মুসলমানরা পর্দার আড়ালে মুসলমান সেনাদের যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। আর এই অভিযোগে আমাদের বসতিতে আক্রমণ চালানোর অজুহাত খাড়া করত।”
“ঠিক আছে, তবে বিশেষ কোন খবর আছে নাকি?”
“হ্যাঁ, সম্মানিত সেনাপতি! আলাফী বলেছেন, মন্দিরের প্রধান গম্বুজের ওপর যে পতাকা উড়ছে সেটিকে শীঘ্রই ভুলুণ্ঠিত করার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি শুনেছেন, আপনার কাছে নাকি একটা বড় ধরনের মিনজানিক আছে। সেটি দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করলে মন্দিরের প্রধান গম্বুজে আঘাত হানা। সম্ভব। তবে মন্দিরের গম্বুজ ভাঙ্গা সহজ ব্যাপার না। খুবই শক্ত মন্দিরের কাঠামো। তবুও আপনি অবিরাম পাথর বর্ষণ করতে থাকুন। এই পতাকা ধুলিস্যাত হলেই বুঝবেন, দুর্গ আপনার দখলে চলে এসেছে।” এই বলে সংবাদ বাহক ঋষীরূপী লোকটি দাড়িয়ে গেল এবং বলল, আমি আমার কর্তব্য সম্পাদন করেছি এখন আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন।” সকাল বেলায় বিন কাসিম জাউনা সালমী নামের এক সেনাকে তলব করল। সে নির্ভুল লক্ষ বস্তুতে মিনজানিকের সাহায্যে পাথর নিক্ষেপে পটু ছিল। সে তাঁবুতে প্রবেশ করতেই বিন কাসিম তাকে তাবুর বাইরে নিয়ে মন্দিরের ওপর উড্ডীন পতাকা দেখিয়ে বললেন, জাউনা সালমী! মন্দিরের
ওপরে উড্ডীন পতাকা দেখতে পাচ্ছো? এই পতাকাটি ধুলিস্যাত করতে হবে। আমি জানি, পতাকা নামাতে হলে মন্দিরের চূড়া ভাঙ্গতে হবে কিন্তু আমি জানি না, তুমি ঠিক লক্ষ্যে পাথর নিক্ষেপ করতে পারবে কি-না।”
“প্রধান সেনাপতিকে আল্লাহ রহম করুন এবং আপনার হায়াত দরাজ করুন।” সম্মানিত সেনাপতি! আল্লাহ যদি আমাদের প্রতি সহায় হোন, তাহলে আপনাকে আমি এই আশ্বাস দিতে পারি যে, মাত্র তিনবার পাথর উৎক্ষেপণেই আমি মন্দির চূড়া ধ্বংস করে দেবো।” “তুমি যদি পাথর নিক্ষেপ করে মন্দির চূড়া ভেঙ্গে পতাকা ফেলে দিতে পারো তাহলে আমি তোমাকে দশ সুগার দিরহাম পুরস্কার দেবো” বললেন বিন কাসিম।
