ছোট ছোট্ট দলে বিভক্ত হয়ে বিন কাসিমের সৈন্যরা পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে ঘেরাও বেষ্টনী রচনা করতে শুরু করল। অর্ধরাতের মধ্যেই ঘেরাও কাজ সমাপ্ত করা হলো। ছোট ছোট মিনজানিকগুলো দুর্গের সদর দরজা বরাবর রাখা হলো, যাতে প্রধান ফটকে এগুলো থেকে পাথর নিক্ষেপ করা যায়। ভোরেই দুর্গের প্রহরীরা চিৎকার করে বলতে শুরু করলো, শত্রু বাহিনী আমাদের দুর্গ ঘেরাও করেছে। সবাই সতর্ক হয়ে যাও। কেউ দুর্গের বাইরে যাবেনা। দুর্গফটকের প্রহরা মজবুত করো।
বিন কাসিম বাহিনীর ঘেরাও এর খবরে সারা দুর্গে হৈচৈ পড়ে গেল। ঘোষণা শোনা মাত্রই হিন্দু তীরন্দাজ ইউনিট দুর্গপ্রাচীরে এসে অবস্থান নিলো। শহরের যেসব বেসামরিক লোক লড়াই করার মতো ছিল তারাও বর্শা হাতে নিয়ে দুর্গপ্রাচীরে এসে অবস্থান নিলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিম দুর্গের চতুর্দিকে অশ্ব হাঁকিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং দুর্গপ্রাচীরের অপেক্ষাকৃত দুর্বল জায়গাটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছিলেন। দুর্গের সার্বিক অবস্থা দেখে বিন কাসিম কিছুটা আশ্বস্থ হলো এই ভেবে যে, বুর্গপ্রাচীরের আগে কোন প্রতিরক্ষা খাল নেই। অবশ্য তাতে এটাও তিনি বুঝতে পারলেন যে, দুর্গ রক্ষার জন্য খাল খননের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি শত্রু বাহিনী। কারণ দুর্গপ্রাচীর খুব মজবুত। তিনি আরো প্রত্যক্ষ করলেন, দুর্গপ্রাচীরটি খাড়া নয় কিছুটা ঢালু। এতে এ বিষয়টিও তিনি বুঝে নিলেন, দুর্গপ্রাচীরের গঠনই বলে দিচ্ছে তা খুব শক্ত এবং অনমনীয় এবং চওড়া। এ ধরনের দেয়ালে সাধারণত কোন ছিদ্র থাকে না।
বিন কাসিম ছোট ছোট মিনজানিক থেকে দুর্গপ্রাচীরের অভ্যন্তরে পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। নির্দেশের সাথে সাথেই দুর্গাভ্যন্তরে পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। যেসব তীরন্দাজ দুর্গপ্রাচীরের ওপর অবস্থান নিয়েছিল তারা মিনজানিক উৎক্ষেপণকারী মুসলিম সেনাদের ওপর তীব্র তীর বর্ষণ শুরু করল। তাতে কয়েকজন মিনজানিক পরিচালনাকারী সেনা আহত হলো। ফলে মিনজানিক আরো পিছিয়ে আনা হলো। কিন্তু মিনজানিক দূরে সরিয়ে আনায় নিক্ষিপ্ত পাথর আর দুর্গাভ্যন্তরে নিক্ষেপ করা সম্ভব হচ্ছিল না।
হিন্দু যোদ্ধারা দারুন সাহসিকতার সাথে দুর্গের একটি ছোট গেট খুলে দ্রুত গতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে মুসলিম সৈন্যদের উপর তীর বর্ষণ করে আবার তড়িৎবেগে দুর্গের ভিতরে চলে যাচ্ছিল। মুসলিম যোদ্ধারাও তাদের ধাওয়া করত। কিন্তু তুলনামূলক ভাবে এই আক্রমণ প্রতি আক্রমণে মুসলিম বাহিনীই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হতে লাগলো।
বিন কাসিম সকল সেনাপতিদের নির্দেশ দিলেন, এমন কিছু সংখ্যক যোদ্ধা বাছাই করতে যারা দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশের জন্যে আক্রমণে অবতীর্ণ হবে। তিনি বললেন, যখনই শত্রু বাহিনী দুর্গের দরজা খুলবে তখনই যাতে মুসলিম সৈন্যরা দুর্গে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও তাতে সফলতা এলো না। কারণ দুর্গফটক খোলার পরক্ষণেই আবার হিন্দুরা বন্ধ করে দিতো। অনেকবার হিন্দু আক্রমণকারীদেরকে মুসলিম যোদ্ধারা বেষ্টনীর মধ্যে আটকাতেও চেষ্টা করেছে কিন্তু আটকানোর জন্যে তাদের দুর্গপ্রাচীরের কাছে চলে যেতে হতো, আর সেই সময় দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে তাদের উপর শত্রুরা পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করত।
রাতের বেলায় কিছু সংখ্যক সৈন্য দুর্গপ্রাচীরে আঘাত করে প্রাচীর ভাঙ্গার চেষ্টা করল, কিন্তু তাতেও ফলোদয় হলো না। বরং মুসলিম বাহিনীর
ক্ষয়ক্ষতিই বৃদ্ধি পেতে থাকল। এভাবে আক্রমণ প্রতি আক্রমণে কেটে গেল কয়েক দিন।
অতঃপর নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করা হলো। প্রতিটি মিনজানিকের সাথে বহু সংখ্যক তীরন্দাজ সৈন্য প্রেরণ করা হলো। তীরন্দাজ সেনারা মিনজানিকের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে দুর্গপ্রাচীরের ওপরে অবস্থানরত শত্রুসেনাদের উপর তীব্র তীরবৃষ্টি বর্ষণ করতে লাগলো, যাতে শত্রু সেনারা মাথা তুলে মিনজানিক পরিচালনাকারী সেন্যদের বাধাগ্রস্ত না করতে পারে। তাতে সুফল এই যে, শহরের ভিতরে মূহুর্মুহু পাথর বর্ষিত হতে লাগল এবং শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ভীতি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। শুরু হলো দৌড় ঝাপ। তদুপরি শত্রুবাহিনী শহরের বাসিন্দাদের অভয় দিয়ে তাদের হৈচৈ দমাতে চেষ্টা করতে লাগলো। যোদ্ধা ও সৈন্যরাও বিপুল উদ্যমে প্রতিরোধ করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠল।
এই শহরের প্রধান মন্দিরের নাম ছিল ডাভেল। মন্দিরের নামেই শহরের নামকরণ করা হয়। মন্দিরটি ছিল একটি উচু স্থানে অবস্থিত। কয়েকটি গম্বুজ বিশিষ্ট এই মন্দিরের কাঠামো ছিল চৌকোনা। মন্দিরের প্রধান গম্বুজটির উচ্চতা এতোটাই বিশাল ছিল যে, কয়েক মাইল দূর থেকে তা দেখা যেতো। কোন কোন ঐতিহাসিক এই মন্দির গম্বুজের উচ্চতা একশ ষাট গজের কথা উল্লেখ করেছেন। উঁচু মন্দির গম্বুজের ওপর একটি দীর্ঘ বাঁশের মধ্যে সবুজ পতাকা উড্ডীন ছিল। ডাভেল মন্দিরের পতাকার ব্যাপারে সেই অঞ্চলে এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, যে সফরকারী দল যতো বেশী দূর থেকে মন্দিরের পতাকা দেখতে পেতো, তাদের ভ্রমন হতো ততোটাই নিরাপদ। হিন্দুরা বিশ্বাস করত, মন্দিরের সেই পতাকা এক দেবতা নিজের হাতে উড্ডীন করে রেখেছে। হিন্দুরা একথাও বিশ্বাস করতো যে, এই মর্যাদাজনক পতাকা ধারণকারী মন্দির ও শহরকে যেই আক্রমণ করতে আসবে সে বা তারা আর জীবিত ফিরে যেতে পারবে না। তাদের সকল যুদ্ধশক্তি ধ্বংস হয়ে যাবে।
