আল্লাহ তাআলার সাথে তোমরা এ ব্যাপারে অঙ্গীকার করো, এই জমিনে আজকের এ জুমআর নামায যেন শেষ জুমআ না হয়ে সূচনার জুমআ হয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করো যেন আমাদের এই রুকু ও সিজদা কবুল করেন। শাহাদাতের আকাঙ্খী বন্ধুগণ! আমরা জীবন নিয়ে ফিরে যেতে এ অভিযানে আসিনি। আমরা আল্লাহর পয়গাম নিয়ে এই দেশে এসেছি। এদেশের শেষ সীমানা পর্যন্ত আল্লাহর পয়গাম পৌছে দিতে হবে। আমরা নিরপরাধ স্বজাতীয় বন্দীদের মুক্ত করতে এসেছি। রাজা দাহির বারবার ইসলামের প্রহরীদের হুমকি দিয়েছে। এ পাপী জানে না, মুসলিম বাহিনী যদি কোথাও আসে তারা সাথে করে ইসলামের মহানত্বও নিয়ে আসে। মুসলিম সেনারা পালিয়ে যাওয়ার জন্য যুদ্ধে আসে না। বন্ধুগণ! সেইসব বীর মুজাহিদদের কথা স্মরণ করো, যাদের কবরের মাটি এখনো শুকিয়ে যায়নি। তারা পারস্য সম্রাটের মতো অহংকারী শক্তিকে পরাজিত করে তাদের স্বর্গরাজ্যের সীমানা সংকোচিত করে দিয়েছিলেন। মাদায়েনে কেসরার রাজ প্রাসাদ আমাদের পূর্ব পুরুষদের তকবীর ধ্বনীতে আজো কাঁপে। রোম পারস্যের অজেয় শক্তির দিকে তাকিয়ে দেখো, আমাদের পূর্ব পুরুষরা ওদের বিশাল শক্তিকে খর্ব করে রাজত্ব দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছিলেন। গভীর ভাবে চিন্তা করো সেই অজেয় শক্তির দাপট আমাদের পূর্ব পুরুষরা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন…।
আজ যে রাজা আমাদেরকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে, সে রোম পারস্যের কায়সার কিসরার মতো শক্তিধর হওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না।
এতো পারস্য শক্তির এক দশমাংশও হবে না। আল্লাহর কসম! আমি অহংকার দেখাচ্ছি না তোমরা যাদের ছেলে সন্তান, নাতিপুতি তাঁরা ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বীর বাহাদুর নির্ভিক।
আমি বসরার শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পয়গাম তোমাদের শোনাচ্ছি। তোমরা সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করো। আল্লাহর কাছে সাহায্য ও বিজয়ের আবেদন করতে থাকো। অবসর পেলেই “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” জপতে থাকো। আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের মদদ করবেন।” হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশ মতো বিন কাসিম ডাভেল দুর্গের অদূরে তার সৈন্যদের তাঁবু ফেললেন। তিনি তাঁবুর চার দিকে চওড়া আর ছয় হাত গভীর খাল খনন করালেন। হাজ্জাজ নির্দেশ দিয়েছিলেন, রাতের বেলায় খুব সতর্ক থাকবে যাতে রাতের আধারে তোমাদের অজ্ঞাতে শত্রু বাহিনী অতর্কিতে তোমাদের ওপর হামলা চালাতে না পারে। বিশেষ করে যেসব সৈন্য হাফেযে কুরআন তাদেরকে রাত জেগে তেলাওয়াত করতে বলবে। আর যারা কুরআন পড়তে না পারে তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেবে।
আর একদল সৈন্যকে রাতের বেলায় নফল নামাযে লিপ্ত রাখবে আর কিছু সৈন্যকে প্রদক্ষিণরত প্রহরায় নিযুক্ত রাখবে। মুহাম্মদ বিন কাসিম রাতের এই ইবাদতের কার্যক্রমের সূচনা করে দিয়েছিলেন। প্রতি রাতেই বিন কাসিমের তাঁবু থেকে কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে সিন্ধের বাতাসে ভেসে ভেসে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত। সেই সাথে সাধারণ সিপাহী থেকে সেনাপতি সবাই নফল নামাযে লিপ্ত থাকতেন। রাতের সেনা শিবির থাকতো মশালের আলোয় আলোকিত। সেই সাথে মুজাহিদদের ইবাদত বন্দেগীর রৌশনীতে প্রৌজ্জ্বল। আলোমর প্রভা শুধু তারাই অনুভব করতে পারতো, মাতৃভূমি থেকে বহুদূরে এসে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে যারা নিধুম নিশি যাপন করে। আর স্বজাতির মজলুম বন্দীদের মুক্ত করতে আসে। তারা জগত্বাসীকে জানাতে এসেছিল, সত্যের পতাকাবাহী বীর যোদ্ধাদের পদানত করতে পারে এ শক্তি কারো নেই।
কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ডাভেল দুর্গ থেকে দু’একটি সৈন্যদল বেরিয়ে এসে দূর থেকেই তীর বর্ষণ করে আবার দ্রুত গতিতে
দুর্গে প্রবেশ করতো। বিন কাসিমের তাঁবুর চতুর্দিকের প্রতিরক্ষা খালের জন্য ওরা বেশী অগ্রসর হতে পারতো না। মুহাম্মদ বিন কাসিমের পক্ষ থেকে কোন জবাবী আক্রমণ চালানোর প্রতি হাজ্জাজের নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু শত্রু বাহিনীর তীরন্দাজদের হটিয়ে দেয়ার জন্য জবাবী তীর বর্ষণের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিল মুসলিম বাহিনী। হাজ্জাজ চাচ্ছিলেন, ছোট ছোট সংঘর্ষে যেন মুসলিম বাহিনীর শক্তি ক্ষয় না হয়। পক্ষান্তরে শত্রু বাহিনী দুর্গের বাইরেই মুসলিম বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখার কৌশল নিয়েছিল। শত্রুবাহিনীর অব্যাহত উস্কানীর মুখেও বিন কাসিম তাঁর সৈন্যদের প্রতি আক্রমণ থেকে নিবৃত রাখলেন। অপেক্ষার পর একদিন হাজ্জাজের পক্ষ থেকে পয়গাম এলো, ডাভেল দুর্গকে ঘেরাও করে নাও। আর দুর্গ জয় করার জন্য প্রয়োজন হলে জীবন বাজী রেখো।” এ নির্দেশের জন্যই বিন কাসিম অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তিনি হুকুম দিলেন, আজ রাতেই ডাভেল দুর্গ ঘেরাও করতে হবে। দাভেল দুর্গ থেকে বিন কাসিমের সেনা শিবির দেখা যেতো। তাই দিনের বেলায় তারা তাবু উঠানোর কাজ থেকে বিরত থাকলেন। যাতে শত্রুরা তাদের তাঁবু উঠানোর বিষয়টি বুঝতে না পারে? বেলা ডুবে যাওয়ার সাথে সাথেই কাসিমের সেনা শিবিরে কর্মব্যস্ততা বেড়ে গেল এবং সবাই তাবু গুটিয়ে পরিষ্কার এক জায়গায় পারাপারের জন্য অখননকৃত জায়গা দিয়ে সবাই বেরিয়ে যেতে লাগল।
