“আমরা যা দেখতে চেয়েছি তা দেখেছি। তোমরা সবাই এক্ষুনি এ শহর ত্যাগ করে চলে যাবে, কিন্তু নিজের দেশের দিকে যাবে, ভুলেও উরুঢ়ের দিকে পা বাড়াবে না।”
“সম্মানিত গভর্নর। আপনি এখনই এদের যেতে দেবেন না। শহরের লোকদেরকে এদের প্রতারণার কথা বোঝাতে হবে। তাদের বিশ্বাস করাতে হবে এটা কোন আসমানী গযব ছিল না। আপনি শহর জুড়ে ঢোল পিটিয়ে দিন, সকালে যেন শহরের সব লোক এক জায়গায় জড়ো হয়, সেখানে এদের ধোকাবাজির কথা তারা নিজেদের কানে শুনবে এবং ধোকাবাজি প্রত্যক্ষ করবে। বলল ইবনে ইয়াসির।
নিরূন শাসক তখনি নির্দেশ দিলেন, বাদক দলকে তলব করো, শহরের লোকজনকে ওমুক মাঠে জমায়েত হতে বলো।
সূর্য ওঠার সাথে সাথে নিরূনের ছোট বড় সকল অধিবাসী একটি মাঠে জমায়েত হলো। সুন্দরী শাসকের জাকজমক নিয়ে ময়দানে পদার্পণ করলেন। তার সাথে এলো তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী ইবনে ইয়াসিরের সঙ্গীরা, সেই সাথে ধৃত পুরোহিত ও যাদুকরকেও নিয়ে আসা হলো। সুন্দরীর নির্দেশে এক ঘোষক ঘোষণা করল, একটানা কয়েকদিন ধরে নিরূনের আকাশে আপনারা যে গায়েবী আগুনের কুণ্ডলী আর নারীর আর্তনাদ শুনতে পেয়েছেন, সেটি আসলে কোন আসমানী গযবের ইঙ্গিত ছিল না, সেটি ছিল এক যাদুকরের শয়তানী যাদু। সেই যাদু এখন আপনাদের সামনে দেখানো হবে। নিরূনের শাসক ও অধিবাসীদের ভীত সন্ত্রস্ত করে যুদ্ধে ফাঁসানোর জন্য এই চক্রান্ত করা হয়েছিল। আপনাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্থির ধীরভাবে এখন এই যাদুর প্রতারণা আপনারা প্রত্যক্ষ করুন।”
“যাদুকর ও পণ্ডিতকে নির্দেশ দেয়া হলো, তোমরা এখন তোমাদের যাদু দেখাও।”
যাদুকর একহাত কিশোরীর মাথার ওপর রেখে অপর হাতে তার মাথাসহ সারা শরীরে বুলাতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তরুণী চিৎকার শুরু করল এবং আকাশে আগুনের কুণ্ডলী ভেসে বেড়াতে শুরু করল। অবস্থা দেখে মানুষ ভয়ে দূরে সরে যেতে শুরু করলে তাদেরকে বলা হলো, ভয়ের কিছু নেই সবাই স্থির হয়ে দাঁড়াও।”
যাদুকর দুই হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তুলে কি যেনো বিড়বিড় করে বললো, তখন আকাশের আগুন গায়েব হয়ে গেল এবং জমিন থেকে ফোয়ারার মতো আগুনের স্ফুলিঙ্গ আকাশে উঠতে শুরু করল, একটু পরে অন্য একটি জায়গা থেকে পানির ফোয়ার উঠতে শুরু করল। জমিন
থেকে আগুন ও পানি আকাশের দিকে উঠে আসার জায়গার মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র পনের বিশ হাত। সবই সাধারণ লোকের দৃষ্টি সীমার ভিতরে ছিল এবং সবাই তা প্রত্যক্ষ করছিল। ইবনে ইয়াসির শাসকের মঞ্চে থেকে নেমে প্রথমে আগুনের ফোয়ারার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে আবার ফিরে এলো। একটু পরে আবার পানির ফোয়ারার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে ফিরে এসে সুন্দরীকে জানালো, “আমিতো আপনাদের সামনেই আগুন ও পানির মধ্য দিয়ে হেটে গেলাম, আমার গায়ে আমি না কোন আগুনের তাপ পেলাম না পানির ছোঁয়া।”
এদিকে বালিকা তখনো চিৎকার করছিল। ওর বাবা মা চিৎকার করে বালিকার কাছে পৌছানোর জন্য চেষ্টা করছিল, কিন্তু যাদুকর তাদেরকে বালিকার কাছে ঘেষতে দিলো না। যাদুকর বালিকার দেহ থেকে হাত সরিয়ে নিতেই চিল্কার থেমে গেল। বেহুশ হয়ে পড়ে গেল কিশোরী। সেই সাথে জমিন থেকে আগুন ও পানির ফোয়ারা বন্ধ হয়ে গেল।
শহরের অধিবাসীদেরকে এই যাদুকর এবং পুরোহিতদের অপকর্মের উদ্দেশ্যের কথা আবারো জানানো হলো। বলা হলো কে তাদের বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত করেছে। যাদুকরকে শহর থেকে বের করে দেয়া হলো। আর নিরূন শাসক সুন্দশ্রী পুরোহিতদের বললেন, যে ধর্ম যাদুর সাহায্যে ধোঁকাবাজি করে টিকে থাকতে চায় মানুষের মনের মধ্যে সেই ধর্মের কোন প্রভাব থাকে না।
বরং মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি করে। এবার আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু ভবিষ্যতে এ ধরনের কোন তৎপরতা চালালে ক্ষমা পাবে না।”
৯২ হিজরী সন মোতাবেক ৭১২ খৃস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম তার সেনাদের নিয়ে ডাভেলের কাছাকাছি ময়দানে পদার্পণ করলেন। শাবান ছাকাফী তাকে রিপোর্ট দিলেন, পথ পরিষ্কার। পথের কোথাও রাজা দাহিরের কোন সেনার অস্তিত্ব দেখা যায়নি। কোন বাধা বিপত্তির মুখোমুখি না হয়ে নির্বিবাদে বিন কাসিমের সৈন্যরা ডাভেল পৌছে গেল। রাজা দাহির আগেই তার অধীনস্থ সকল দুর্গশাসকদের বলে রেখেছিল, সকল সেনাকে দুর্গের ভিতরে রাখবে। বাইরের উন্মুক্ত ময়দানে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হবে না। যদ্দরুন সকল শত্র বাহিনী দুর্গের ভিতরে রণ সজ্জার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছিল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বিন কাসিম আগেই খবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, অমুক দিন আমি ডাভেলের উদ্দেশে রওয়ানা করব। প্রত্যুত্তরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাঁকে পয়গাম পাঠিয়েছিলেন, আমার নির্দেশ পাওয়ার আগে তুমি আক্রমণ করবে না। হাজ্জাজ আরো লিখেছিলেন, শত্রু বাহিনী যদি তোমাকে নানা ভাবে উস্কানীও দেয় তবুও আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, হাজ্জাজ বসরায় থেকেও সিন্ধু অভিযান নিয়ন্ত্রণের ভার নিজের হাতেই রেখেছিলেন। শুক্রবার দিনের জুমআর নামাযের আগেই মুহাম্মদ বিন কাসিমের সকল সৈন্য ডাভেল ময়দানে পৌছে গেল। বিন কাসিমের নির্দেশে এক দরাজ কণ্ঠের লোক উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে আযান দিলো। সম্ভবতঃ ডাভেলের জমিনে সেটিই ছিল প্রথম আযান। আযানের পর সকল সৈন্য নামাযের জন্য সারিবেঁধে দাঁড়িয়ে গেল। সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী সেনাপতি নিজেই জুমআর নামাযের ইমামতি করলেন। জুমআর খুতবায় মুহাম্মদ বিন কাসিম বললেন
