ইবনে ইয়াসির তার হাতের তরবারীর পিঠ দিয়ে যাদুকরের এক হাতে জোরে আঘাত করল এবং অপর হাতে তার মুখে কষে একটা ঘুসি মারল। যাদুকর গিয়ে আঁছড়ে পড়ল দেয়ালে। ইবনে ইয়াসিরের দুই সাথী ওকে ধরে মেঝের ওপর ফেলে দিলো এবং ওর পিঠের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে তরবারীর আগা ওর ঘাড়ের ওপর রেখে বলল, “সত্যিকথা বল, তুই কি যাদুকর? নয়তো তোর মাথা এখনই আলাদা করে ফেলব”।
‘বীভৎস চেহারার লোকটি হাত জোড় করে মাথা ঝাকাল।” সে যে যাদুকর নীরব সম্মতি দিয়ে তা বোঝাতে চেষ্টা করল।
দুই পণ্ডিত একটু দূরে দেয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল আর প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছিল। ইবনে ইয়াসির তার সহকর্মী দুভাষীর মাধ্যমে স্থানীয় ভাষায় পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে বলল, “ওদের বলো, ওদের হত্যা করে মরুভূমিতে ফেলে দেয়া হবে। যাতে শিয়াল কুকুর ও বন্যপশুরা ওদের দেহ। চিবিয়ে খেতে পারে।”
ইবনে ইয়াসিরের সাথী যখন তার কথা স্থানীয় ভাষায় পুরোহিতদের জানাল, তখন প্রায় ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল তিন পুরোহিত। আর দু’হাত প্রসারিত করে প্রণাম করল। এমতাবস্থায় ইবনে ইয়াসিরের সাথীকে ইশারায় কাছে ডেকে কানে কানে বড় পুরোহিত বলল, তোমার সাথীকে বলো, তোমরা এই দুই যুবতীকে
নিয়ে যাও, সেই সাথে তোমরা যত নিতে পারো আমরা তোমাদের সেই পরিমাণ সোনা দানা দেবো, এর প্রতিদান স্বরূপ আমাদের প্রাণ ভিক্ষা দাও। ইবনে ইয়াসিরের দুভাষী সাথী হাসতে হাসতে পুরোহিতের কথা তাকে জানালে ইবনে ইয়াসির বলল, “আরে বেঈমানের দল, আমরা নারী ও মুদ্রার বদলে ঈমান বিক্রি করি না।”
যাদুকর যাদুর কথা স্বীকার করায় ইবনে ইয়াসির তাকে বলল, তোমাকে বলতেই হবে কিভাবে তুমি এসব করেছ। যাদুকর তার ভাষায় জানালো, অবশ্যই সে সব বলবে, শুধু বলবেই না করে দেখাবে।
“ঠিক আছে তাহলে এখানে নয়, ওদের সবাইকে সুন্দরীর কাছে নিয়ে যাবো। সেখানে বলবে, কেনো কিভাবে এরা এই তেলেসমাতি করেছে, কি উদ্দেশ্যে করেছে?”।
তিন পুরোহিতকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ইবনে ইয়াসির ও সাথীরা নিরূন শাসকের কাছে নিয়ে এলো। সুন্দরী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ইবনে ইয়াসির বলল, গায়েবী আগুনের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। ইবনে ইয়াসির নিরূন শাসককে একথাও জানালো যে, গত দু’দিনে সে কি কারণে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। সবিস্তারে ব্যক্ত করল, কি ভাবে সে সাথীদের নিয়ে এই ভয়ানক রহস্যের জট খুলেছে এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কিভাবে সে মন্দিরে প্রবেশ করেছে। কিশোরী মেয়েটির সাথে পুরোহিত ও যাদুকর কি ব্যবহার করেছে তাও সে ব্যক্ত করল। সব শুনে সুন্দরী যাদুকর ও পুরোহিতের উদ্দেশ্যে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, “তোরা যদি একটুও মিথ্যা কথা বলিস তাহলে তোদের সবার দু’হাত কেটে দেয়া হবে এবং মরুভূমিতে ফেলে আসা হবে।”
সুন্দরীর হুমকিতে যাদুকর তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা সবিস্তারে জানালো এবং কি কারণে, কার নির্দেশে সে এসব করেছে তাও ব্যক্ত করল। যাদুকর একথাও জানালো যে, সারা হিন্দুস্তানে এধরনের যাদুকর মাত্র তিনজন আছে। যাদুকর বলল, যে আগুনের কুণ্ডলী আপনারা আকাশে উড়তে দেখেছেন তা কারো কোন ক্ষতি করতে পারে না। এটা নিতান্তই একটা চোখের ভেলকি মাত্র। কিন্তু এটা সাধারণ কোন কাজ নয়। এ ধরণের ক্ষমতা অর্জন করতে কঠিন সাধনা করতে হয়। জমিন থেকে পানির ফোয়ারার মতো যে আগুনের ফুলিঙ্গ আপনারা আকাশে উঠতে দেখেছেন, তাও কোন ক্ষতি করতে পারে
এটাও নিতান্তই দৃষ্টি বিভ্রম। যে পানির ফোয়ারা আপনারা ভূমি থেকে আকাশে উঠতে দেখেছেন তাতে বিন্দুমাত্র পানি ছিল না, এই পানিতে হাত রাখলে আপনারা গায়ে মোটেও পানির কোন ছোঁয়া পেতেন না।
কেন তোমরা আমার রাজ্যে এসে এ ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে? জিজ্ঞেস করলেন সুন্দরী।
“সম্পদের লোভে করেছি মহারাজ! মহারাজা দাহির তার এক বন্ধু রাজার মাধ্যমে আমাকে ডেকে এনেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, নিরূনের অধিবাসী ও শাসকের মধ্যে ভীতি, চরম ভীতি সৃষ্টি করতে হবে। দাহির আমার সাথে আরো এক ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলেন, সে এসে এই পুরোহিতদের বলে গেছে, আমি যখন যাদু দেখাতে শুরু করবো, তখন পুরোহিতরা ভীতিকর আওয়াজের জন্য কি কি করবে। এরপর আপনার কাছে এসে কি কি বলবে তাও সেই ব্যক্তি ওদের বলে গেছে। মহারাজ! রাজা দাহির আমাকে এতো বিপুল পরিমাণ সম্পদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা আমার সাত পুরুষও খেয়ে শেষ করতে পারবে না।
“এ নিরপরাধ অবোধ বালিকাটিকে তোমরা কেন এমন কষ্ট দিলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে সুন্দরী জিজ্ঞেস করলেন?” “এই বালিকাটি তার মায়ের সাথে মন্দিরে পূজা দিতে এসেছিল। হঠাৎ আমি ওকে দেখে পুরোহিতদের বললাম, এই মেয়েটি আমাদের কাজের উপযোগী। মেয়েটি তখন তার মায়ের সাথে পূজা দিয়ে চলে গেল। জানিনা, সন্ধ্যায় এক পুরোহিত কিভাবে যেন এই বালিকাকে মন্দিরে নিয়ে এলো।
মহারাজ। এটা আমাদের একটা পেশা। আপনাকে আমি বুঝতে পারবো কিভাবে মানুষের সাহায্যে এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে। তবে একথা ঠিক মানুষের সহায়তা ছাড়া এ ধরনের যাদু দেখানো সম্ভব নয়। কোন জনগোষ্ঠিকে যদি এভাবে ভয় দেখাতে হয়, তাহলে সেই জনগোষ্ঠীর কোন লোকের ওপর এই যাদু প্রয়োগ করতে হয়। আগে সেই বাসিন্দাদের ওপর কিছু কাজ করতে হয়, এরপর যাদুকর সেখানে যদি পাথর নিক্ষেপ করতে চায়, আগুনের বৃষ্টি বর্ষণ করতে চায় তাই করতে পারে। আমি বলে আপনাকে তা বোঝাতে পারব, যদি অনুমতি দেন, তাহলে করে দেখাতে পারব।”
