ইবনে ইয়াসির ওখান থেকে সরে অপর দিকে অগ্রসর হলে দেখতে পেল আরেকটি অপেক্ষাকৃত ছোট কক্ষ। সেই কক্ষেও প্রদীপ জ্বলছে। সেখানে বসে আছে চার পুরোহিত আর দুই সুন্দরী তরুণী। এরা সবাই বৃত্তাকারে বসা। তাদের বৃত্তের ভিতরে বারো তেরো বছরের এক কিশোরী উপবিষ্ট। তার ভয়ার্ত দৃষ্টি আর পাণ্ডুর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তাকে কোন জায়গা থেকে জোর করে তুলে আনা হয়েছে এবং তার ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। এক পুরোহিত হাত বাড়িয়ে তার মাথা কাছে নিলো এবং কিশোরীর কপালে চুমু খেলো। দেখে মনে হবে যেন সে তার আপন কন্যাকেই আদর করছে। সুন্দরী তরুণীদের একজন একটি পেয়ালা তুলে ধরল কিশোরীর দিকে। কিশোরী এক নিঃশ্বাসে পেয়ালার পানীয়দ্রব্য নিঃশেষ করল এবং বিকট আওয়াজে কাঁদতে শুরু করল। কিশোরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগল, “আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও, আমার শরীরে আগুন ধরে গেছে।”
প্রদীপের আবছা আলোয় ঘরের ভিতরের লোকগুলোকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছিল না ইবনে ইয়াসির। কারণ সে দরজার আড়ালে থেকে দেখছিল, যাতে ভিতরে তার ছায়া না পড়ে। আর ভিতরের লোকগুলো কিশোরীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল তাই দরজার পাশে কেউ রয়েছে বা থাকতে পারে এটা ঘূর্ণাক্ষরেও তারা ভাবতে পারিনি। এমন সময় ইবনে ইয়াসির হাতের ইশারায় সাথীদের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়ে উচ্চ আওয়াজে নারা লাগাল। তারা নারার প্রতিউত্তরে পাচ সঙ্গী একই সাথে তকবীর ধ্বনি দিয়ে একযোগে ভিতরে প্রবেশ করে বসা সবাইকে ঘিরে ফেলল। হঠাৎ তাদের সম্মিলিত তাকবীর ধ্বনী মন্দিরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে মন্দিরের ভিতরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল আর আকস্মিক এই তকবীর ধ্বনীতে হিন্দু পুরোহিত ও তরুণিরা সবাই নির্বাক হয়ে গেল। ইবনে ইয়াসির সকলের উদ্দেশ্যে নির্দেশের সুরে বলল, “জীবন বাঁচাতে চাইলে সবাই দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে যাও”।
নির্দেশ মতো সবাই দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে গেল। এদের মধ্যে তিনজনকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এরা মন্দিরের পুরোহিত কিন্তু চতুর্থ পুরুষটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারার আর দু’জন ছিল সুন্দরী তরুণী আর সেই ভীত বিহ্বল কিশোরী। ইবনে ইয়াসির মাকরানবাসী সঙ্গীকে কাছে ডেকে বলল, তুমি স্থানীয় ভাষায় আমার সাথে এদের কথা বলতে সাহায্য করো। মাকরানবাসী সঙ্গী ইবনে ইয়াসিরের দুভাষী হিসাবে কথা বলতে শুরু করল।
এমতাবস্থায় কিশোরী মেয়েটি দৌড়ে এসে ইবনে ইয়াসীরের পা জড়িয়ে ধরে বলল, “আমাকে ওরা ঘর থেকে জোর করে উঠিয়ে এনেছে। আমাকে প্রাণ ভিক্ষা দিন, প্রাণে রক্ষা করুন।”
এরা তোমাকে কি বলে? দুভাষী সহকর্মীর মাধ্যমে কিশোরী মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল ইবনে ইয়াসির। কিশোরী মেয়েটি ওই লোকটির দিকে তাকালো যার অবয়ব পুরোহিতের মতো ছিল না। এরপর সে দু’হাত প্রসারিত করে ওই বীভৎস চেহারাওয়ালা লোকটির দিকে ইঙ্গিত করে আবার ইবনে ইয়াসিরকে জড়িয়ে ধরল, যেন সে খুবই ভয় পাচ্ছে। লোকটির চেহারা সুরত এতোটাই বীভৎস ছিল যে, যে কোন মানুষই তাকে দেখলে ভয় পেতো। বিশাল বপুধারী লোকটির চুল ছিল লম্বা, সেই সাথে সাদাকালো দীর্ঘ দাড়ি। আর গোঁফগুলো পেচিয়ে কানের সাথে বাঁধা। চোখ টকটকে লাল। তার মাথা লাল কাপড়ের পাগড়ীর মতো পেঁচানো। কানে বড়বড় রিং আর গলায় দীর্ঘ হাজার দানার মালা পেঁচানো। দেখে মনে হচ্ছিল সে কোন ধর্মীয় গুরু। অবে তার চেহারা সুরত ছিল পুরোহিতদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইবনে ইয়াসির কিশোরীকে একহাতে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে তাকে অভয় দিলো এবং দুভাষীকে বলতে বলল, “তুমি ভয় করো না। এরা তোমার আর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। বলল এরা তোমার সাথে কি আচরণ করেছে?”
কিশোরী বললো, এই জটাধারী লোকটি আমাকে সামনে বসিয়ে এক হাতে আমার মাথা ধরে রাখতো আর অন্য হাতে আমার শরীরে হাত বুলাতো। আর আমার চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এমতাবস্থায় আমার শরীরে আগুনের মতো জ্বালা শুরু হয়ে যেত। আমি বেহুশের মতো হয়ে যেতাম। আর কষ্ঠ থেকে বিকট চিৎকার বেরিয়ে আসত। এমতাবস্থায় এই পুরোহিতরা আমাকে মন্দিরের আঙ্গিনায় সিঁড়িতে ফেল আসত। আমি ভয়ে আতঙ্কে মন্দিরের দিকে পালিয়ে আসতে চাইতাম, কিন্তু এদিকে এলেই এরা আমাকে আবার টেনে হেঁচড়ে মন্দিরের সিঁড়িতে রেখে আসতো। আমি চিৎকার করতে করতে বেহুঁশ হয়ে যেতাম। বেহুঁশ হয়ে গেলে আমার শরীরের জ্বালা কিছুটা কমে যেত। এরা আমাকে এনে শরবতের মতো কি যেনো পান করাতো আর আমার সাথে অশ্লীল আচরণ করত। দয়া করে আপনারা আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। এরা আমাকে মেরে ফেলবে।”
বন্ধুরা! সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলল ইবনে ইয়াসির। উস্তাদ ‘বান ছাকাফী আমাকে একথাই বলে দিয়েছেন। তিনি আমাকে একথাও বলে দিয়েছিলেন, কিছুতেই ভয় পেয়ো না। এটা হচ্ছে এদেশের হিন্দুদের ধোকাবাজি। মনে সাহস করে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করো, সফল হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, তোমরা মুজাহিদ। দুনিয়ার সবচেয়ে সত্য শান্তির অধিকারী তোমরা, তোমাদের বুকের ভিতর আছে পবিত্র কুরআন। তোমাদেরকে কোন কুফরী যাদুই পরাস্ত করতে পারবে না। এই বদসুরত লোকটি পৌত্তলিক যাদুকর। ইবনে ইয়াসির আরবী ভাষায় তার সহকর্মীদের সাথে কথা বলছিল। যার ফলে হিন্দু পুরোহিত ও যুবতীদের তা বোঝার উপায় ছিল না। ইবনে ইয়াসির হিন্দু দুই যুবতী, যাদুকর ও দুই পুরোহিতের উদ্দেশ্যে বলল, সবাই মাথা নিচের দিকে করো। তোমাদের হত্যা করা হবে। ভয়ে সবাই মাথা নীচের দিকে করল। এমন সময় যাদুকর ভিড়ভিড় করে কোন মন্ত্র চালান দিতে চাচ্ছিল। যাদুকর দু’হাত ওপরের দিকে করে যাদু করার চেষ্টা করছিল।
