ইবনে ইয়াসিরের দু’দিন অনুপস্থিতির সময়েও এই ভয়ানক অবস্থা অব্যাহত ছিল। সেই সাথে দিনের বেলায় কিছু সময় মাটি থেকে আকাশের দিকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ উঠে যেতো আর ফোয়ারার পানির মতো ছড়িয়ে পড়তো চতুর্দিকে। শহরের বহু ঘরবাড়ি এই কয়েক দিনে খালি হয়ে গেছে। প্রথমে যখন এ ভয়ানক দৃশ্য দেখা যেতো মানুষ তা প্রত্যক্ষ করার জন্য ঘর ছেড়ে
বাইরে বেরিয়ে আসতো। কিন্তু এ কয়েক দিনে পরিস্থিতি এমন হয়ে গেছে, ভীত সন্ত্রস্থ লোকজন এখন আর ঘর ছেড়ে বাইরে আসার সাহস করে না। ইবনে ইয়াসির শহরের প্রধান মন্দিরের দিকে যেতে যেতে তার সহকর্মীদেরকে এ সম্পর্কে শাবান ছাকাফীর নির্দেশনার কথা ব্যক্ত করল। তারা যতোই মন্দিরের নিকটবর্তী হচ্ছিল নারীকন্ঠের চিৎকার ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছিল।”
মন্দিরের কিছুটা কাছে গিয়ে ইবনে ইয়াসির সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করল, “বন্ধুরা! বলো তো এই চিৎকার কি মন্দিরের ভিতর থেকে আসছে, না মন্দিরের বাইরে খালি আঙ্গিনা থেকে এ নারীকণ্ঠের আর্তনাদ ভেসে আসছে? সঙ্গীদের কাছ থেকে কোন সদুত্তর না পেয়ে ইবনে ইয়াসির তাদের জানালো, এই চিকার হিন্দুদের কোন দেবদেবী কিংবা জিন ভূতের নয়। এই আর্তনাদকারিণী জ্যান্ত মানুষ। এই নারী শয়তানীকেই আমাদের ধরতে হবে।”
“ইবনে ইয়াসির। বিস্মিত কণ্ঠে বলল তার এক সহকর্মী। গায়েবী কোন জিনিসকে তুমি ধরতে চাচ্ছে না তো? আমারতো ভয় হচ্ছে! আসমানী আগুনকে কিভাবে নিভাবে তুমি?” “তোমাদের কারো মনে যদি কোন ধরনের ভয়ের উদ্রেক হয় তাহলে মনে মনে সূরা ফাতিহা পড়তে থাকো। কুরআনের সামনে কোন জ্বিন-ভূতই টিকতে পারে না, সেই সাথে সূরা ফাতিহা পড়ে “ইয়য়াকা না’বুদু ওয়া ইয়য়াকা নাসতাঈন” “আমরা তোমারই ইবাদতকারি আর তোমার কাছেই সাহায্য চাই”। বারবার পড়তে থাকো। সাথীদের উদ্দেশে বলল কমান্ডার ইবনে ইয়াসির।
কমান্ডারের কথায় তার সাথীরা তাই করতে লাগল আর ইবনে ইয়াসির সাথীদের নিয়ে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। অবশেষে শহরের প্রধান সড়কের শেষ প্রান্তে যেখানে প্রধান মন্দির অবস্থিত সেখানে সাথীদের নিয়ে পৌছে গেল ইবনে ইয়াসির। একাদশী চাঁদ তখন পূর্ণ জ্যোত্সা ছড়িয়ে দিচ্ছে। চাঁদের কিরণে চারদিকে ঝিকমিক করছে। রাস্তা পেরিয়ে মন্দির আঙ্গিনা থেকে কিছুটা দূরে থাকতেই সে দেখতে পেল, এক নারীমূর্তি মন্দির প্রাঙ্গনের সিঁড়ি ভাঙ্গছে আর আর্তচিৎকার করছে। মন্দিরের প্রধান ফটকের কাছে একবার এসে সেই নারীমূর্তি মন্দিরের ভিতরের দিকে দৌড়ালো। এমন সময় মন্দিরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো দু’জন শক্ত সামর্থবান পুরুষ। তারা নারীটিকে ধরে টেনে হেঁচড়ে আবার
মন্দির প্রাঙ্গনের সিঁড়িতে নিয়ে এলো, এমতাবস্থায় নারীকণ্ঠের আওয়াজ আরো ভীতিপ্রদ হয়ে উঠল এবং নারীমূর্তিটি আবারো এলোপাতাড়ি সিঁড়িতে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। মন্দির থেকে যখন দু’জন লোককে বেরিয়ে আসতে দেখল, তখন ইবনে ইয়াসির তার সাথীদেরকে নিয়ে একটি গাছের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ফেলল। নারীমূর্তি এলোপাতাড়ি সিঁড়ি ভাঙ্গছিল আর চিৎকার করছিল, কিন্তু হঠাৎ করে সে পা পিছলে সিঁড়ির নীচে এসে পড়ল।
ঠিক এই মুহূর্তে আকাশে ছড়িয়ে পড়ল আগুনের কুণ্ডলী। এমন একটা ভীতিকর পরিস্থিতি যে কোন মানুষের মধ্যেই আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ঘটনার আকষ্মিকতা আরব যুবকদের মধ্যেও কিছুটা ভীতির সঞ্চার করল। তারা সবাই সূরা ফাতিহা পড়তে লাগল। নারীমূর্তির নড়াচড়া থেকে ইবনে ইয়াসিরের বুঝতে অসুবিধা হলো না, এ কোন যুবতী বা বয়স্কা নারী নয়, একান্তই বারো তেরো বছরের কিশোরী। সে আবারো আর্তনাদ করে সিঁড়ি ভাঙ্গতে শুরু করল। এক পর্যায়ে মেয়েটি মন্দিরের দিকে রওয়ানা হলে চিঙ্কার থেমে গেল এবং মেয়েটিও পড়ে গেল এবং সাথে সাথে আকাশে ভাসমান আগুনের কুণ্ডলীও গায়েব হয়ে গেল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল নিরূনের রাত। ইবনে ইয়াসিরের সাথীদের কাছে মনে হলো, তারা যেন দুনিয়াতে নয় কোন কবরস্থানে অবস্থান করছে। এমন সময় মন্দির থেকে আবার দু’জন বেরিয়ে এলো এবং মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গেল।
ইবনে ইয়াসির মন্দিরের প্রধান ফটকের সরাসরি সামনে দিয়ে মন্দির আঙ্গিনায় না গিয়ে অপর পাশের ছোট গেট দিয়ে প্রবেশ করল এবং মন্দিরের প্রধান দরজায় উকি দিলো। উঁকি দিয়ে দেখতে পেল, এখান থেকে একটি সুড়ং পথের মতো সামনে চলে গেছে এবং সুড়ং পথের শেষ প্রান্তে আলো দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে পরস্পর কথা বলার আওয়াজ। ইবনে ইয়াসির সাথীদের কাছে ডেকে কানে কানে বলল, কোন শব্দ করা যাবে না, খুব সন্তর্পণে নিঃশব্দে এগুতে হবে। তারা সবাই সারি বেঁধে পা টিপে টিপে অগ্রসর হতে লাগল। এক পর্যায়ে সুড়ং পথ শেষ হয়ে দুদিকে চলে গেল এবং এক প্রান্ত থেকে মানুষের কথা বলার আওয়াজ পরিষ্কার শুনতে পেল তারা।
ইবনে ইয়াসির একপ্রান্তের দরজা পর্যন্ত গিয়ে দেখল শেষ প্রান্তের দরজার ওপাশে বড়সড় কক্ষে একটি মঞ্চের মতো জায়গায় একটি বিবস্ত্র নারীমূর্তি। কক্ষের চার পাশের দেয়াল গাত্রে প্রদীপ জ্বলছে। দেয়ালেও রয়েছে অনেকগুলো বিবস্ত্র পাথরের নারীমূর্তি।
