দিনের দ্বিপ্রহরের একটু আগে নিরূন থেকে রওয়ানা করে অর্ধরাতের কিছুক্ষণ পরেই গন্তব্যে পৌছে গেল ইয়াসির। কারণ তার গন্তব্য তার দিকেই এগিয়ে আসছিল। সেই রাতের শেষ প্রহরেই ডাভেলের দিকে অগ্রাভিযান করার জন্য সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিন কাসিম।
মুহাম্মদ বিন কাসিম সব কিছু না বুঝে কোন পদক্ষেপ নিতেন না। তিনি ছদ্মবেশে কিছু সৈনিক আগে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যারা ভিনদেশী এই এলাকার সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে প্রতিনিয়ত তাকে খবর দিতো, সেই মোতাবেক তিনি সেনাবাহিনী পরিচালনা করতেন। কারণ ইতিমধ্যে দুইটি দুর্গ তিনি দখল করে নিয়েছিলেন। ডাভেল ছিল তার তৃতীয় টার্গেট। তাই প্রতিপক্ষ তাঁদের আগমন অপেক্ষা নির্বিকার দুর্গে বসে থাকবে এমনটি ভাবার কোনই অবকাশ ছিল না। বরং সম্ভাবনা ছিল শত্রু বাহিনী পথে পথে ওৎপেতে থাকবে এবং রাতের অন্ধকারে গুপ্ত হামলা চালাবে।
এই আশঙ্কা মাথায় রেখে মুহাম্মদ বিন কাসিমের কিছু সৈন্য রাতের প্রথম প্রহরেই ডাভেলের কি অগ্রসর হতে থাকে। এলাকাটি যেহেতু সামরিক দিক থেকে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল এজন্য অগ্রগামী দলের সাথে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী নিজেই গিয়েছিলেন। আরমান ভিলা থেকে কয়েক মাইল অগ্রসর হলেই তাদের কানে ভেসে এলো অশ্বখুরের আওয়াজ। শাবান ছাকাফী তার সাথীদেরকে রাস্তা থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিলেন এবং আগন্তুকের আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
আগন্তুকের ঘোড়া দ্রুত বেগে ছুটছিল। শা’বান ছাকাফী রাস্তায় এসে ধাবমান ঘোড়ার মুখোমুখি হয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। সাথে সাথে তার সহযোদ্ধারা এসে আগন্তুককে ঘিরে ফেলল।
“কে তুমি? কোথায় যাচ্ছ? দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন শা’বান ছাকাফী।
“আমি ইবনে ইয়াসির। এক লাফে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে বলল আগন্তুক। আমি আপনার আওয়াজ চিনতে পেরেছি। কেমন আছেন আপনি? বাকী সাথীরা কেমন আছে? সার্বিক অবস্থা কেমন?
ফজরের সাথে সাথেই সেনাবাহিনী ডাভেল অভিযান শুরু করবে। তুমি কি বুঝতে পারছো আমরা কেন এগিয়ে এসেছি?”
অগ্রগামী দল হিসাবে আমরা চলে এসেছি। তুমি এতোদূর কি করে এলে? বিশেষ কোন খবর আছে নাকি? ইবনে ইয়াসিরকে জিজ্ঞেস করলেন শাবান।
ইবনে ইয়াসির গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে নিরূনের উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানালো এবং নিরূন শাসকের উরুঢ় গমণ, সেখানে রাজার সাথে তার কথোপকথন ও রাজার প্রস্তাব সুন্দরীর প্রত্যাখ্যানের কথা সবিস্তারে জানালো। সবশেষে বলল, এ মুহূর্তে আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরূনের আকাশে ঘূর্ণমান আগুনের কুণ্ডলী আর অজানা নারীকণ্ঠের আর্তনাদ। আমরা বুঝতে পারছি না, এই আগুন কি হতে পারে? এ ক্ষেত্রে আমাদেরই বা করণীয় কি? আগামী দুদিনের মধ্যে যদি আমরা এ ব্যাপারে যথার্থ ভূমিকা না নিতে পারি, তাহলে নিরূন আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে।
“এসো ইবনে ইয়াসির” গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী ইবনে ইয়াসিরকে রাস্তা থেকে নামিয়ে সুবিধামতো একটি জায়গায় বসিয়ে বললেন
“এই আগুনের রহস্য তোমাকে বলে দিচ্ছি।” আগুনের অন্তরালে কি কারসাজী রয়েছে এবং সাথীদের নিয়ে তোমাকে কি ভূমিকা পালন করতে হবে, গোয়েন্দা প্রধান পরিষ্কার ভাবে সবকিছু ইবনে ইয়াসিরকে বুঝিয়ে দিলেন।
“আমাকে এখনই ফিরে যেতে হবে সম্মানিত অধিপতি! আমার ঘোড়াটা বদলে দিতে হবে, আমি এটাকে বিশ্রাম দেয়ার অবকাশ পাইনি।” ক্লান্ত শ্রান্ত অনুচ্চ আওয়াজে বলল ইবনে ইয়াসির।
“তোমারও বিশ্রামের প্রয়োজন ইবনে ইয়াসির! কিন্তু তোমরা যদি অশ্বপৃষ্ঠ ছেড়ে আরামে ঘুমিয়ে পড়, তাহলে আমাদের ইতিহাস এবং জাতির ভাগ্যও ঘুমিয়ে পড়বে। জাতি ও মিল্লাত আমাদের ত্যাগের প্রত্যাশা করে। আমাদের এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করা খুব জরুরী…। যাও বন্ধু.. আল্লাহ তোমার সাহায্য করবেন।” তাজা তাগড়া একটি আরবীয় ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ইবনে ইয়াসির পায়ের গোড়ালী দিয়ে ঘোড়াকে আঘাত করল, উর্ধ্বঃশ্বাসে ছুটে চলছে ঘোড়া। মরুময় এলাকায় নিস্তব্ধ রাতে কিছুক্ষণ ইবনে ইয়াসিরের অশ্বখুরের আওয়াজ শোনা গেল। এরপর রাতের প্রকৃতি নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
পরদিনের শেষ প্রহরে ইবনে ইয়াসির নিরূন পৌছল। অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্রান্তির কারণে সহকর্মীদের কাছে পৌছে চৌকিতে বসে দু’পা সোজা করে সটান শুয়ে পড়ল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। তার ঘোড়ার শরীর থেকে এভাবে ঘাম ঝরছিল যেন ঘোড়াটি মাত্র কোন জলাশয় সাতরে এসেছে। দিন শেষে অর্ধরাতের পর আবার শুরু হলো সেই নারীকণ্ঠের। আর্তচিৎকার। ইবনে ইয়াসিরের সাথীরা শোরগোলে ঘুম থেকে জেগে উঠল। ইতিমধ্যে ইবনে ইয়াসিরও বেশ সময় ঘুমিয়েছে। শোরগোলে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চিকারের সাথে সাথে আকাশে কান্নার আওয়াজও শোনা গেল। ঘুম ভাঙতেই লাফিয়ে উঠল ইবনে ইয়াসির এবং তরবারি কোষমুক্ত করে বলল, বন্ধুরা! এসো আমার সাথে। আজকের পর আর কোন দিন এ ধরণের আগুনের কুণ্ডলী আকাশে ভেসে বেড়াতে তোমরা দেখবে না। নির্দেশ মতো পাঁচসঙ্গী তরবারী কোষমুক্ত করে তাকে অনুসরণ করল। তখনো মন্দিরে ঘন্টা ধ্বনী আর পণ্ডিতদের শিঙ্গার বাজনা অবিরাম বেজেই চলছে। মন্দিরের ওপর থেকেই আগুনের কুণ্ডলী আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সারা শহর জন শুন্য। কোন একটা লোকও নেই ঘরের বাইরে। একাদশী চাদ তখনও আকাশে জোৎস্না ছড়াচ্ছে। চাদের আলোয় বেশ দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
