রাতটা কোনমতে ভয় আতঙ্কের মধ্যে অতিবাহিত হওয়ার পর সকাল হতেই লোকজন শহরের প্রধান মন্দিরে ভীড় জমালো। বিপুল হিন্দু জনগোষ্ঠির মধ্যে যেসব লোক বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল তারা বৌদ্ধ মঠে
জমায়েত হলো। সারা শহরজুড়ে একটা কথা চাওর হয়ে গেল যে, অবশ্যই এই শহরে এমন কোন অভিশপ্ত লোক এসেছে, যাদের উপস্থিতির কারণে এই মুসিবত নেমে আসছে। সেই সাথে একথাও আলোচিত হতে লাগল যে, গভর্নর সুন্দরী মুসলমানদের সাথে যে অহিংস নীতি অবলম্বন করেছে তা ঠিক নয়। এজন্যই দেবতা শহরবাসীকে সতর্ক করছেন। এর পরদিন দিনের বেলায় লোকজন যখন কাজ-কামে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় হঠাৎ রাতের তরুণির আর্তনাদ ভেসে এলো। শহরের মাঝখানে কিছুটা জায়গা ছিল খালি, জনশুন্য এবং বসতিহীন। সেই পরিত্যক্ত জনবসতিহীন জায়গা থেকে আগুনের কুণ্ডলী উঠে আকাশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষ ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে যে যেভাবে পারল কাজকর্ম ছেড়ে নিজেদের ঘরবাড়িতে পালাতে লাগল। শহরের পরিস্থিতি এতোটাই ভয়ানক হয়ে উঠল যে, মা তার কোলের সন্তানের খেয়াল করার অবকাশ পেল না। কেউ একবার এতটুকু ভাবার চিন্তা করেনি যে, এই আর্তনাদ কোথেকে আসছে আর আগুনের স্ফুলিঙ্গ কোথেকে আসছে? দিনটি এভাবে শেষ হলে রাতের বেলায় যখন সারা শহরের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ঠিক অর্ধরাতে আবার শুরু হলো সেই অজানা তরুণির আর্তনাদ। রাতের চিঙ্কার অনেকের কাছে মনে হলো কোন একজন চিত্তার করছে আর আর্তনাদকারিণী বাতাসে উড়ছে। অন্য রাতের মতো আকাশে সেই আগুনের কুণ্ডলীও ভেসে বেড়াতে লাগল কিন্তু এ রাতে জমিনের কয়েক জায়গা থেকেও আকাশে আগুনের স্ফুলিঙ্গ উঠতে দেখা গেল।
অন্যান্য রাতের মতোই কয়েক ঘন্টা চলল এমন অগ্নোৎপাত আর, চিকারের তাণ্ডব। রাত পোহালে সকাল বেলায় বড় মন্দিরের প্রধান দুই পুরোহিত নিরূন শাসক সুন্দরীর সাথে সাক্ষাত করতে এলো।
প্রধান পুরোহিত নিরূন শাসক সুন্দরীকে বলল, “মহারাজ! গত তিনরাত ধরে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারিনি। পরিস্থিতি জানার জন্য আমরা দুজন অভিজ্ঞ জ্যোতিষীকে ডেকে এনেছিলাম, তারা হিসাব কিতাব করে দেখেছে, আমরাও ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছি যে, এসব হচ্ছে আমাদের দেবদেবীদের সতর্ক সংকেত। তার মর্মার্থ হলো, আমরা যেনো নিজেদের ধর্ম-কর্ম, মান-সম্মান অক্ষুন্ন রাখার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিই। আমরা এই গায়েবী ইঙ্গিতও পেয়েছি যে, এই শহরের জমিনে হাজারো মহামনীষী ও ঋষি সাধু মহাত্মার দেহাবশেষ মিশে রয়েছে। আমরা শুনেছি,
আপনি নাকি এই শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব ভিনধর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। জানি না, আপনার ধর্ম কি বলে, তবে আমরা যতোটুকু জানি, আপনার ধর্মও এই শহরের নিরাপত্তার দ্বায়িত্ব পর ধর্মের কারো হাতে তুলে দেয়ার ব্যাপারটিকে সমর্থন করবে না।
যে ধর্ম আমাদের ধর্মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী তাদের হাতে এই শহর তোলে দেয়া কোন মতেই সমর্থনযোগ্য মনে হয় না। জ্যোতিষী ও গণকরা বলছেন, শাসক সুন্দরী যদি এই শহরের নিয়ন্ত্রণ বিধর্মীদের হাতে তুলে দেয় তাহলে এই শহরের পতন অবশ্যম্ভাবী। এই শহরকে কেউ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না। মহারাজ! ইতোমধ্যে বহু লোক শহর ছেড়ে চলে গেছে এবং আরো কিছু সংখ্যক লোক শহর ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। “হ্যাঁঁ, আমাকে ভাবতে দাও পণ্ডিত, আমাকে চিন্তা-ভাবনা করতে দাও।”। বললেন সুন্দরী। “পুরোহিতদ্বয় চলে যাওয়ার পর সুন্দরী ইবনে ইয়াসীরকে ডেকে বললেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্দিরের প্রধান দুই পণ্ডিত তাকে কি বলে গেছে এবং এ ব্যাপারে তিনি কি ভাবছেন।”
“আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, তোমরা সবাই এখান থেকে চলে যাও, তাহলে তোমরা এ ব্যাপারে কি বলবে?” কারণ আমার কাছে শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়। আমি এই শহরের অধিবাসীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তোমাদের সেনাপতির কাছে আত্মসমপর্নের প্রস্তাব করেছিলাম। তাছাড়া আমার ধর্মও খুনোখুনি, যুদ্ধ-বিগ্রহ পছন্দ করে না। কিন্তু যে মুসিবত এখন আমার মাথার ওপর পড়েছে, তাতে আমি কি-ইবা করতে পারি?”
“বেশি নয় মাত্র তিনটা দিন আমাদের সময় দিন সম্মানিত গভর্নর!” বলল ইবনে ইয়াসির। আমার বিশ্বাস এই মুসিবতকে আমরাই দূরীভূত করতে পারব।
“তোমরা দূর করবে এই মুসিবত?” বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন সুন্দরী। যে শক্তিকে দেখা যায় না, অদৃশ্য শক্তিকে তোমরা কিভাবে মোকাবেলা করবে?”
“মাত্র তিনটি দিন আমরা আপনার কাছে সময় চাচ্ছি সম্মানিত গভর্নর। তিনদিনের মধ্যেই আশা করি আমরা আপনাকে তা করেই দেখিয়ে দেবো।”
বিন কাসিমের গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর অন্যতম সহযোদ্ধা অভিজ্ঞ গোয়েন্দা ইবনে ইয়াসিরের ওপর দায়িত্ব ছিল সে যেন সুন্দরী ও
বিন কাসিমের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পানাহার সামগ্রী সাথে নিয়ে ইবনে ইয়াসির বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। তখন মুহাম্মদ বিন কাসিম আরমান ভিলায় অবস্থান করে ডাভেলের দিকে অগ্রাভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন।
নিরূন থেকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের অবস্থান আরমান ভিলার দূরত্ব একশ মাইল। ইবনে ইয়াসিরের হাতে সময় মাত্র তিন দিন। সে শুরু শা’বান ছাকাফীকে নিরূনের অবস্থা জানিয়ে তার দিক নির্দেশনার প্রয়োজন বোধ করল। ইবনে ইয়াসির কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না নিরূনের ওপর দেবতাদের অভিশাপ পড়েছে। কারণ মুসলমানরা দেবদেবীর ক্ষমতায় বিশ্বাস করে না। তারা জানে দেবদেবীদের ওপর বিশ্বাস সম্পূর্ণ অবাস্তব ভিত্তিহীন এবং মানুষের মনগড়া ধারণা মাত্র।
