“বিকল্প পথ অবশ্য একটা আছে কিন্তু পথটা খুবই জটিল এবং কণ্টকাকীর্ণ। টিলা, জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ে ভরা। এমন হতে পারে যে, আমরা ঘুরে ফিরে একই জায়গায় চক্কর খাচ্ছি।”
হোক না ঝুকিপূর্ণ, আপনি সে পথেই চলুন।
“শাবান ছাকাফীর পরীক্ষিত গোয়েন্দা ইবনে ইয়াসির ছিল এ ধরনের জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথেও লক্ষ ও সুনির্দিষ্ট দিক নির্ণয়ে পারদর্শী। সে নতুন অজানা পথেই সুন্দরীকে নিরূন নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। এর কিছু দিন পরের ঘটনা। হঠাৎ এক রাতে নিরূনবাসী এক তরুণির বিকট আর্তচিৎকার শুনতে পেল। নারী কণ্ঠের আর্তচিৎকার শুনে কয়েকজন লোক ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, কিন্তু তাদের পক্ষে ঠাহর করা সম্ভব হচ্ছিল না কোখেকে আসছে এই আর্তচিৎকার। লোকজন নারী কন্ঠের আর্তচিৎকার শুনে এদিক ওদিক দৌড়াতে লাগল, কোথেকে চিৎকারটা আসছে তাকে দেখার জন্য। এমন সময় হঠাৎ আওয়াজ এলো ওপরের দিকে তাকাও। লোকজন যখন ওপরের দিকে তাকালো তখন দেখতে পেল, বাতাসের মতো একটা আগুনের শিখা শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত কয়েকবার বয়ে গেছে। আগুনের শিখার ঘূর্ণনে শহরের লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো আতঙ্ক। অধিকাংশ লোক ঘরের দরজা বন্ধ করে ভয়ে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে থাকল, আর কিছু লোক ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে শহরের বাইরে পালাতে লাগল।
শোরগোলের আওয়াজে গভর্নর সুন্দরীও ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি নিজ চোখে আকাশে আগুন শিখার ঘুর্ণন দেখতে পেলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন শাসক এবং শহরের লোকদের নিরাপত্তা দানের কাজটি তিনি নিজের কর্তব্য মনে করতেন, তাই তিনি ভয়ে ঘরের ভিতরে না গিয়ে শহরে বেরিয়ে পড়লেন এবং আকাশে ঘূর্ণমান আগুন প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। আগুনের একটি শিখা শহরের আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর আর্তনাদের মতো একটা আওয়াজ ভেসে আসছিল। পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়েছিল যে, ভীত সন্ত্রস্ত লোকজন বিষয়টাকে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না, যে যেদিকে পারলো ভয়ে ছুটে পালাতে লাগল। আকাশে আগুন শিখার ঘূর্ণনের সাথে সাথে শহরের মন্দির ঘরগুলোতে বিপজ্জনক ঘন্টা অবিরাম বাজতে লাগল। সেই সাথে মন্দিরের পুরোহিতরা বিশেষ শিঙ্গা বাজাতে শুরু করল। মন্দিরের ঘন্টা আর পুরোহিতদের শিঙ্গার বেসুরো আওয়াজ আর আকাশের আর্তনাদ মিলে সত্যিকার অর্থেই রাতের নিস্তব্ধ শহরে একটা ভূতুড়ে পরিস্থিতির জন্ম দিল। সারা শহর কেঁপে উঠল অজানা আশঙ্কায়। এই ভয়ানক পরিস্থিতি কয়েক ঘন্টা অব্যাহত থাকল।
হিন্দু অধিবাসীরা তাদের ঘরে ঘরে পূজা অর্চনায় লেগে গেল, বৌদ্ধরা তাদের মতো করে ঘরে ঘরে উপাসনায় লিপ্ত হয়ে গেল। সুন্দরী পরিস্থিতি অবলোকন করে তার প্রাসাদের দিকে ফিরে এলেন। তিনি প্রাসাদের কাছে এসে দেখতে পেলেন, তার আরব নিরাপত্তারক্ষীরা প্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে অবস্থা অবলোকন করছে। নিরাপত্তারক্ষীদের উদ্দেশ্যে সুন্দরী বললেন, “বন্ধুরা উপস্থিত দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হিন্দু ও বৌদ্ধরা পূজা অর্চনা ও উপাসনায় লিপ্ত হয়েছে, তোমরা এই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য তোমাদের ইবাদতে লেগে যাও। বুঝতে পারছি না, কি বিপদ ঘনিয়ে আসছে! ভয় হচ্ছে, যেসব আগুনের কুণ্ডলী আকাশে দেখেছি, এসবের একটিও যদি জমিনে নেমে আসে, তাহলে সারা শহরে আগুন লেগে যাবে।”
“সম্মানিত শাসক। আমাদের প্রভু আমাদেরকে এ ধরনের বিপদ দিয়ে কখনো আতঙ্কিত করেন না।” বলল এক আরব নিরাপত্তারক্ষী।
“আরে! তুমি কি দেখতে পাচ্ছে না, এই বিপদ আসমান থেকে আসছে?”
“সম্মানিত গভর্নর। আপনি ভিতরে চলে যান। বিপদ না ছাই আমরা দেখছি।” বলল ইবনে ইয়াসীর।
সুন্দরী ঘরে প্রবেশ করতে না করতেই তরুণির আর্তচিৎকার বন্ধ হয়ে গেল। সেই সাথে আকাশে অগ্নিকুণ্ডের দাপাদাপিও বন্ধ হয়ে গেল। কিছু লোক রাতেই শহরের প্রধান মন্দিরে চলে গেল। যারা রাতে যেতে পারল না তারা ভোরেই প্রধান মন্দিরে গিয়ে জড় হতে লাগল। শহরের প্রধান মন্দিরটি ছিল বিশাল জায়গা জুড়ে আর অপেক্ষাকৃত উচু জায়গায়। মন্দিরটির চারপাশে ছিল খোলা আঙ্গিনা। টিলার মতো উঁচু মন্দিরে উঠতে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভাঙতে হয়। সকাল বেলায় মন্দিরে এতো লোক জমায়েত হলো যে মন্দিরের ভিতরে বাইরে মন্দিরের আঙ্গিনায় ও সিঁড়ির কোথাও তিলধারনের জায়গা খালি ছিল না।
ছেলে বুড়ো নারী শিশু সব বয়সের মানুষে লোকে লোকারণ্য মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্দিরের ভিতরে পুরোহিতরা মূর্তির সামনে হাত জোড় করে আর্ত কণ্ঠে প্রার্থনা করছে। আর মন্দিরের বাইরে সমবেত লোকজনও পুরোহিতদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে করজোড়ে দেবদেবীদের কাছে মিনতি করছে।
প্রার্থনা শেষে মন্দির আঙ্গিনায় সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে প্রধান পুরোহিত বলল, “হে লোকসকল! এই শহরের ওপর কঠিন মুসিবত নেমে আসতে পারে। মনে হচ্ছে, এই শহরে এমন কোন মানুষ এসেছে, যাদের উপস্থিতি আমাদের দেবদেবী পছন্দ করেন না। দৃশ্যত মুসিবত সমুদ্রের দিক থেকে আসছে। এই শত্রুদের মোকাবেলার জন্য তৈরী হয়ে যাও। তোমরা যদি এই শ্লেচ্ছাদের জন্য শহরের দরজা বিনা প্রতিরোধে খুলে দাও, তাহলে দেবতা এই শহর আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবেন।”
প্রধান পুরোহিতের সতর্কবাণী শুনে ভীত বিহ্বল অবস্থায় লোকজন বাড়ী ঘরে ফিরে এলো। সারা দিন শহরময় রাতের ভয়ানক অগ্নিকুণ্ডলী নিয়েই সবাই পরস্পর আলাপ আলোচনা করল! আর ভয় আতঙ্ক সারা শহরবাসীকে আরো ভীত সন্ত্রস্থ করে তুলল। পরদিন মধ্যরাতে ঠিক পূর্বরাতের মতোই এক তরুণির আর্তনাদ শোনা গেল। আজকের আর্তনাদ ছিল গতরাতের চেয়েও আরো ভয়ার্ত। সেই সাথে আগুনের কুণ্ডলী সারা শহরের ওপর চক্কর দিতে লাগল। লোকজন ভয়ে আতঙ্কে নিজ নিজ ঘরে জড়সড় হয়ে বসে রইল আর মন্দিরগুলোতে বিশেষ ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনী বাজতে শুরু করল।
