এতবেশি চিন্তার দরকার নেই। তুমি নিরূনের কথা বলো। আমি ভাবছি, আরব সৈন্যরা যদি ডাবেল থেকে আরো সামনে অগ্রসর হয়, তাহলে তারা নিরূন (হায়দারাবাদ) কেই তাদের সেনা ছাউনিতে পরিণত করবে। রাজার কথায় গভীর চিন্তায় পড়ে গেল উজীর বুদ্ধিমান। রাজা দাহির এক নাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছিল কিন্তু উজিরের কানে সেসব কথা প্রবেশ করছে বলে মনে হচ্ছিল না। সে কিভাবে হাত ছাড়া হয়ে যাওয়া নিরূনকে কব্জা করা যায় সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। রাজা দাহির আর উজির বুদ্ধিমান যখন নিরূনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিন্তামগ্ন, সে সময় নিরূন শাসক নিরাপদে তার অনুগত প্রহরী বেষ্টিত অবস্থায় নিরূনের রাজাসনে উপবিষ্ট। নিরাপদে তিনি মৃত্যু এড়িয়ে হায়দারাবাদ পৌছতে পেরেছিলেন মুসলমান রক্ষীদের বুদ্ধিমত্তায়। রাজা দাহিরের উজীর বুদ্ধিমান তার সৈন্যদের নিয়ে নিরূন শাসককে বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে সামরিক কায়দায় তরবারী নীচু করে তাকে সম্মান জানিয়ে বিদায় নেয়। এরপর কিছুদুর অগ্রসর হওয়ার পর নিরূন শাসকের ছয় নিরাপত্তা রক্ষীর কমান্ডার সবাইকে থামিয়ে দেয়। তার নাম ছিল ইবনে ইয়াসির। সে ছিল গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর একান্ত লোক।
ইবনে ইয়াসির মাকরানবাসী নিরাপত্তা রক্ষীর মাধ্যমে সুন্দরীর কাছে জানতে চাইলো, “সম্মানিত নিরূন শাসক! রাজা কি প্রায়ই এভাবে আপনাকে ডেকে পাঠায়? আপনি কি প্রায়ই রাজধানীতে আসেন?” “মাঝে মধ্যে রাজা ডেকে পাঠায়, আবার কখনো কখনো গভর্নররা নিজ থেকেও রাজার সাথে দেখা করতে আসেন।”
“কখনো কি এমন হয়েছে যে, আপনি সন্ধ্যায় এখানে এসেছেন আর রাতেই আপনাকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে?”
“না, এমনটি আর কখনো হয়নি।” বললেন সুন্দরী। এই প্রথম আমার সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে। সাধারণত যেসব গভর্নর এখানে আসে, তাদেরকে দুই তিন দিন রাজ প্রাসাদে রেখে খুব খাতির যত্ন করা হয়।
“আপনি কি রাতেই ফিরে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন?”
“না, রাজা নিজেই তার উজিরকে ডেকে বললেন, সুন্দরী রাতেই ফিরে – যাবে, তার ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হোক।”
“প্রতিবারই কি আপনাকে এমন সামরিক সম্মানের সাথে বিদায় জানানো হতো?”
“না, এমনটি আর কখনো করা হয়নি।” কিছুটা বিস্মিত কণ্ঠে জবাব দিলেন নিরূন শাসক। আমি নিজেও কিছুটা বিস্মিত হয়েছি। আজ আমাকে এতোটা সম্মান করা হচ্ছে কেন? আমি মনে করেছি রাজা আমাকে তোমাদের আনুগত্য প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। উদ্দেশ্য অর্জনে হয়তো রাজা আমার মন জয় করার জন্য একটু বেশী সম্মান দেখাচ্ছেন।”
“তার অনুরোধে আপনি কি বলেছেন?”
“আমি রাজাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, মুসলমানদের সাথে আমি যে মৈত্রী চুক্তি করেছি, তা থেকে আমি বিচ্যুত হবো না। আমি তাকে একথাও বলে এসেছি, আমি আমার শহরের নাগরিকদের বিবি বাচ্চার, জীবন সম্পদ আর মান-সম্মানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি।” “তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই এপথ ত্যাগ করে অন্য পথে নিরূন ফিরতে হবে।”
“কেন! রাস্তা বদল করতে হবে কেন?” জিজ্ঞেস করলেন নিরূন শাসক সুন্দরী।
“রাতে কোন না কোন জায়গায় আপনার ওপর হামলা করা হবে। আপনাকে কোন অবস্থাতেই নিরূন ফিরে যেতে দেয়া হবে না।”
‘আমারতো মনে হয় রাজা দাহির এসময় এমন কোন পদক্ষেপ নেবে।” এটা হয়তো তোমার একটা আশঙ্কা মাত্র।” বললেন নিরূন শাসক।” ‘সম্মানিত শাসক। আমরা আপনাদের দেশের ধোকা প্রতারণার বহু কাহিনী শোনেছি। কিন্তু আপনি আরবদের দরদর্শিতা, তীক্ষ্ণধী ও প্রচার কাহিনী তেমন শুনেনি। আপনি যখন রাজ মহলে রাজার সাথে বৈঠক করছিলেন, তখন আমরা দুর্গময় চষে বেড়িয়েছি। আমি শাহি খান্দানের এক ব্যক্তিকে দেখেছি খুবই ব্যস্ততার সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে। পরে জানতে পারি এই লোকটিই রাজার উজির বুদ্ধিমান। আমি দেখেছি আপনি রওয়ানা হওয়ার কয়েকঘন্টা আগে তিনি উষ্ট্রারোহী একটি কাফেলাকে দুর্গফটক পর্যন্ত এগিয়ে এসে বিদায় দিয়েছেন, সেই কাফেলায় কয়েকজন মহিলাও ছিল। আমি দেখেছি, উজির কাফেলার লোকদের অনেকক্ষণ কি যেন বলেছে এবং কাফেলার একজনকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে একাকীত্বে অনেক কথা বলেছে। উষ্ট্রারোহী কাফেলা যখন দুর্গফটক পেরিয়ে গেল উজিরও তাদের সাথে বেরিয়ে গেল। আমি তখন দুর্গফটকের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাফেলার যাত্রা ভঙ্গিটাই দেখে মনে হচ্ছিলো এই কাফেলা কোন সাধারণ
কাফেলা নয়। এজন্য আমি এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম উজির দুর্গে ফিরে এসে রাজার বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্রিফিং দিচ্ছে এবং তাদেরকে প্রস্তুত করছে। এই নিরাপত্তারক্ষীরাই পরবর্তীতে আপনাকে বিদায়ী সম্মান জানিয়েছে। এতে আমার সন্দেহ দৃঢ় হয়েছে যে, যে উদ্ভারোহী কাফেলা আগে বিদায় করা হয়েছে, সেই কাফেলা সাধারণ কোন মুসাফির কাফেলা নয়, অবশ্যই তারা সেনাবাহিনীর লোক এবং রাতের কোন না কোন প্রহরে তারা আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারে!
“তোমার ধারণা অমূলক নয়।” বললেন সুন্দরী। আমাকে কোন না কোনদিন খুন করা হবে তা প্রায় নিশ্চিত। ঠিক আছে তুমি রাস্তা বদল করে নিতে পারো।” “আমরাতো এখানকার পথঘাট ঠিকমতো চিনি না, কোন পথে গেলে আমরা নিরাপদে নিরূন পৌছাতে পারব, তা আপনিই ভালো বলতে পারবেন।” বললেন ইবনে ইয়াসির।
