সেই রাত পেরিয়ে ভোরের আলো দেখা দিলো কিন্তু নিরূন শাসকের ছোট্ট কাফেলা কোথাও একদণ্ড যাত্রা বিরতি করল না। মরুভূমিতে সূর্য উঠে চতুর্দিকে আলো ছড়িয়ে দিয়ে বেলা বাড়তে লাগল, কিন্তু সুন্দরীর কাফেলা বিরতিহীন ভাবে অগ্রসর হতেই লাগল। এদিকে সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগেই রাজা প্রহরীদের জিজ্ঞেস করল উজির বুদ্ধিমান এসেছে কি? প্রহরীরা তাকে জবাব দিলো, না মহারাজ! উজির আসেননি!
“যখনই আসবে ভিতরে পাঠিয়ে দেবে” বেলা প্রায় মাথার ওপরে উঠে গেলেও বুদ্ধিমানের দেখা না পেয়ে রাজা দাহির আবারও জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার। বুদ্ধিমান এখনো আসেনি? তখন সে প্রহরীদের নির্দেশ দিলো তাকে ডেকে নিয়ে এসো। প্রহরীরা উজিরের বাড়ীতে গিয়ে তাকে পেলো না। এদিক সেদিক খোজা খোঁজির পর দুর্গপ্রাচীরের ওপরে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো প্রহরীরা। উজির বুদ্ধিমান দুর্গপ্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে নিরূনের পথের দিকে তার পাঠানো সেনাদের আগমন প্রতীক্ষা করছিল। বেলা ওপরে উঠে যাওয়ায় মাঠের ধু ধু বালিকারাশি চমকাচ্ছিল, দূর দরাজ পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছিল তাতে বুদ্ধিমানের পাঠানো লোকদের দেখা যাচ্ছিল না। সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তার পাঠানো উষ্ট্রারোহীর আগমন প্রতীক্ষা করছিল, কারণ এতক্ষণে তাদের ফিরে আসার কথা কিন্তু তখনও পর্যন্ত কোন উষ্ট্রারোহীকেই এ পথে দেখতে পেলনা বুদ্ধিমান।
তাকে প্রহরীরা খবর দিলো, আপনাকে মহারাজ তলব করেছেন। আমরা আপনার খোঁজে দুর্গময় খোঁজ করেছি। ‘ ‘হতাশ ও ভগ্ন হৃদয়ে উজির বুদ্ধিমান দুর্গপ্রাচীর থেকে নেমে রাজার সকাশে হাজির হলো। “তুমি তো বুঝতেই পারছ, কিসের জন্য আমি তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি বুদ্ধিমান” “আমিও আপনার খবরের জন্যই দুর্গপ্রাচীরে অপেক্ষা করছিলাম মহারাজ। আমি তাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মনে হয় ওরা অনেক দূরে চলে গেছে। মনে হয় রাতে সুন্দরী কোথাও থামেনি। রাতে না থামলেও দিনের বেলায় কোথাও না কোথাও সে অবশ্যই থামবে। দিনের বেলায় কোথাও তাবু ফেলে যদি ওর প্রহরীরা শুয়ে পড়ে তখনই ওদের খতম করে ফেলবে আমার সৈন্যরা। আজ রাত না থামলেও আগামী রাতে তো অবশ্যই সে কোথাও না কোথাও তাঁবু ফেলবে। তখনই তার জীবনাবসান করে দেবে আমার লোকেরা। আশা করি আজ রাতে না হলেও আগামী দিনের বেলায় ওরা ফিরে আসবে মহারাজ!
সেই দিন চলে গেল, রাত পেরিয়ে পরে দিনের বেলাও ওপরে উঠে গেল, বুদ্ধিমান আগের দিনের মতো সেদিনও দুর্গপ্রাচীরে গিয়ে তার পাঠানো সৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল কিন্তু কোন উষ্ট্রারোহীর কাফেলা এদিকে অ’তে দেখতে পেলো না বুদ্ধিমান। উজির বুদ্ধিমানের চেয়ে রাজা দাহির ছিল আরো বেশি পেরেশান। তৃতীয় দিন পেরিয়ে গেল। চতুর্থ দিন বুদ্ধিমানের পাঠানো লোকেরা ফিরে এলো। বুদ্ধিমানের পাঠানো সেনাদলের কমান্ডার নতশীরে বুদ্ধিমানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “মিশন সফল হয়নি মাননীয় উজির”। “কেন সফল হয়নি” গর্জে উঠলো উজির। তোমরা কি এই সুন্দরীদের নিয়ে মেতে উঠেছিলে? যাদেরকে তোমাদের সাথে পাঠিয়েছিলাম?” না মাননীয় উজির। আমরা কোথাও একদণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস নেইনি। আমরাতো একেবারে নিরূনের কাছ থেকে ফিরে এসেছি। কিন্তু পথের কোথাও আমরা ওদের দেখা-ই পাইনি। মনে হয় তারা রাস্তা বদল করে অন্য কোন পথে চলে গেছে। ‘ব্যর্থতার খবর শুনে উজির বুদ্ধিমানের জিহ্বা শুকিয়ে এলো। সে শুষ্ক কণ্ঠে রাজাকে জানালো, শিকার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে মহারাজ!
“শিকার যায়নি বলতে পারো নিরূন হাত ছাড়া হয়ে গেছে” উজিরের উদ্দেশে বলল রাজা দাহির। “ঠিক আছে। এখন অন্য কিছু ভাবো। যা হয়ে গেছে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনুশোচনা করে সময় নষ্ট করো না।” “তাই ভাবছি মহারাজ! বৌদ্ধটা গেল কোন পথে? তাহলে কি ওর মনে কোন আশঙ্কা ছিল?
“সাপ পালিয়ে গেছে। সাপকে বধ করতে না পেরে ওর গমণপথের চিহ্ন দেখে দেখে আফসোস করার মধ্যে মঙ্গল নেই। এখন চিন্তা করো নিরূনের লোকদেরকে কিভাবে ওর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা যায়। ওখানকার মানুষ এখন শান্তিবাদী হয়ে গেছে। সবাই শান্তি চায়। বুঝতে পারিনা, সুন্দরী নিরূনের অধিবাসীদের মধ্যে কি মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছে। ওখানকার সব অধিবাসীই কাপুরুষ হয়ে গেছে। ওরা সবাই একবাক্যে ওর কথাই শোনে, ওরই আনুগত্য করে।” বলল রাজা দাহির।
“সুন্দরীর আনুগত্য দূর করতে একটা কিছু করতেই হবে মহারাজ!”
আর কবে করবে? আমারতো মনে হয় তোমার বুদ্ধিজ্ঞান এখন লোপ পেয়ে গেছে। আমার মনে হচ্ছে আমি যদি সুন্দশ্রীকে শাসকের পদ থেকে বরখাস্ত করি তাহলে সেখানে অগ্নোৎপাৎ শুরু হবে। আমি তাকে নিজের ঘরের মধ্যেই খুন করাবো। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে তাকে ছলেবলে রাজধানীতে নিয়ে আসবো। যদি সে নিরূন ত্যাগ করতে অস্বীকার করে তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে সেনাভিযান করব।”
“আপনাকে কিছুই করতে হবে না মহারাজ! বলল উজির। পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে নয়। শত্রু বাহিনী ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসছে। এমতাবস্থায় আপনার সামান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও বিক্ষুব্ধদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। এখন যে কোন পদক্ষেপ আমাদেরকে ভেবে চিন্তে নিতে হবে। মহারাজা নিরূনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আমরাই দায়ী। আমরা বৌদ্ধদের উপাসনালয়গুলো গুড়িয়ে দিয়েছি। তাদের ওপর নানা জুলুম চালিয়েছি। তদুপরি মহারাজ এক বৌদ্ধকেই সেখানকার শাসক নিযুক্ত করেছেন। শুধু সুন্দশ্রীইতো নয়, বহু বৌদ্ধকে মহারাজ উচু ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছেন। বহু শহরের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোক। সবাই যদি সুন্দরীর মতো পর্দার আড়ালে মুসলমানদের সাথে আঁতাত করে ফেলে তাহলে পরিস্থিতি সামলানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
