দুর্গে প্রবেশ করে প্রথমেই উজির বুদ্ধিমান রাজার প্রাসাদে প্রবেশ করল।
“তোমার আয়োজন ব্যর্থ হবে না তো বুদ্ধিমান?” আশঙ্কা মাখা কণ্ঠে বলল রাজা দাহির।
“সকালে ঐ বৌদ্ধ আর তার নিরাপত্তা রক্ষীদের মরদেহ দুর্গে প্রবেশ করবে মহারাজ! আমি নির্বাচিত বিশজন সৈন্যকে পাঠিয়েছি। এরা সেনাবাহিনীর পরীক্ষিত বীর যোদ্ধা। ওরা উটে সওয়ার হয়ে গেছে। কেউ যাতে সেনাবাহিনী হিসেবে সন্দেহ করতে না পারে এজন্য মুসাফিরের বেশে তাদের সাথে কয়েকজন নারীকেও দিয়েছি। বেলা ওঠার আগেই সুন্দরী কোন জায়গায় অবশ্যই তাঁবু ফেলবে। যেখানেই ওরা তাবু ফেলুক, সেখানে কিছুক্ষণ ঘুমাবে। আর তখন ওদের প্রহরীরাও ঘুমাবে সেটাই হবে ওদের শেষ ঘুম। সেই ঘুম থেকে আর উঠতে পারবে না।” “এ বৌদ্ধকে জীবিত নিরূন যেতে দেয়া ঠিক হবে না।” বলল রাজা দাহির।
“নিরূন যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না মহারাজ! আপনি নিরূনের জন্যে নতুন করে কাউকে প্রশাসক নিযুক্ত করুন।”
“নিরূনের এখনকার শাসক হবে আমার ছেলে জেসিয়া।
মহারাজ। সুন্দরীর সাথে যেসব প্রহরী এসেছিল এদেরকে দেখে এ দেশের অধিবাসী বলে মনে হয়নি। ওদের নাক, কপাল, মাথা, চেহারা সবই ঢাকা ছিল। শুধু চোখগুলো দেখা গেছে। সুন্দরীকে নিয়ে আপনি যখন বৈঠক করছিলেন তখন ওরা সারা দুর্গ জুড়ে পায়চারি করেছে আর ফিসফিস করে পরস্পর কথা বলতে দেখা গেছে। ওদের হাভভাবও আমার কাছে ভিন্ন রকম মনে হয়েছে। আমি ওদের ঘোড়ার জিনগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি এগুলো এদেশের তৈরী নয়। “হ্যাঁ, এজন্যইতো ওরা চেহারা ঢেকে রেখেছিল।” বলল দাহির। তার মানে এরা আরব? তাহলে ও বৌদ্ধ এরই মধ্যে আরবদের সাথে দোস্তি করে ফেলেছে এবং নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে আরব লোক নিয়োগ করেছে।”
“যাই হোক। আজ রাত শেষে সেও আর থাকবে না, তার প্রহরীদেরও কোন পাত্তা থাকবে না।” বলল উজির বুদ্ধিমান। “উজির বুদ্ধিমান যখন রাজা দাহিরের সাথে সুন্দরীর জীবনাবসান নিয়ে কথা বলছে সুন্দরী তখন তার ছয় আরব প্রহরীকে নিয়ে নিরূনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নিরূন থেকে উরুঢ় যাতায়াতের জন্য মরুবিজন পথে একটি
পায়ে হাটার রাস্তা তৈরী হয়েছিল। এ পথেই সামরিক বাহিনীর লোকেরা যাতায়াত করত। পথিমধ্যে একটি জায়গা ছিল সবুজ শ্যামল। ওখানে পানির উৎস ছিল।
সুন্দরীর ছয় প্রহরীর সবাই ছিল আরব। তন্মধ্যে একজন ছিল হারেস আলাফীর নিজস্ব লোক। সে এখানকার পথঘাট জায়গা ও ভাষা জানতো। আর অন্য পাঁচজন ছিল মুহাম্মদ বিন কাসিমের সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ যোদ্ধা।
নিরূন শাসক সুন্দরী একদিন মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে একদূত মারফত খবর পাঠিয়েছিল, রাজা দাহিরের পক্ষ থেকে সে জীবননাশের আশঙ্কা করছে। তাই তার জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি উদ্বিগ্ন। এদিকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, নিরূন শাসক সুন্দরী আমাদের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। তাই তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। সেই সাথে তার শহরের অধিবাসীদের জীবন সম্পদের নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সুন্দরশ্রীর চাহিদা পূর্ণ করা তখনো মুহাম্মদ বিন কাসিমের পক্ষে সহজ ছিল না। কারণ এক সাথে তার সকল সৈন্যকে নিরূন নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
তাকে ধীরে ধীরে চতুর্দিক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সামনে অগ্রসর হতে হচ্ছিল। তিনি অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তার সেনা বাহিনীর বার জন চৌকস গোয়েন্দাকে হারেস আলাফীর দেয়া পথ প্রদর্শকের সাথে নিরূন পাঠিয়ে দিলেন। এদের পাঠানোর আগে তিনি এ ব্যাপারে আলাফীর সাথে অতি সঙ্গোপনে পরামর্শ করে নিলেন। আলাফী মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বললেন, নিরূনে আপনার গোয়েন্দার অবস্থান খুব জরুরী। আপনি কয়েকজন লোক দিন তাদের সাথে আমিও একজনকে দিচ্ছি। সে নিরূন শাসককে বলবে, তিনি যেন এদের সবাইকে নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে নিয়োগ দেন। যেহেতু সুন্দরীর সাথে শান্তিচুক্তি হয়ে গেছে, সে চুক্তি মেনে চলবে। আপনার ও আমার লোকেরা শহরের লোকদের গতিবিধি যেমন পর্যবেক্ষণ করবে তারা সুন্দরীকেও পর্যবেক্ষণ করবে, সে চুক্তিপত্র করে আমাদের সাথে কোন ধোকাবাজী করছে কিনা।
এই উসিলায় মুহাম্মদ বিন কাসিমের চার গোয়েন্দা সুন্দরীর একান্ত নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে নিয়োগ লাভ করে। এদের পাঠানোর আগে বিন কাসিমের গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তাদের বিশেষভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
উরুঢ়ের রাজার পক্ষ থেকে যখন সুন্দরীকে রাজধানীতে তলব করা হলো, তখনই সুন্দরী বুঝতে পেরেছিলেন, সেখানে কি ঘটতে পারে। কিন্তু রাজা দাহিরকে তখন তিনি মোটেও ভয় করেননি। তিনি ছিলেন যেমন বাস্তবদর্শী তেমনই সাহসী। তিনি তার সাবেক নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে নিয়েই উরুঢ় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু আলাফীর লোক তাকে বোঝালেন এরা সবাই হিন্দু। রাজা দাহিরের সাথে বিরোধ প্রশ্নে হিন্দু বিধায় ওরা দাহিরের পক্ষাবলম্বন করবে। তাই ওদের বাদ দিয়ে আমাদের সাথে নিয়ে চলুন। আরব গোয়েন্দারাই তাকে বুঝিয়েছিল, তারা চেহারা ঢেকে যাবে, যাতে তাদেরকে দেখে কেউ আরব হিসাবে চিনতে না পারে। এদিকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের পাঠানো গোয়েন্দাদেরকে সুন্দরী নিরাপত্তা বাহিনীতে নিযুক্ত করে তার সভাসদ ও প্রজাদের কাছে প্রচার করেছিলেন, এরা সবাই মাকরানে বসবাসকারী আমাদের সহযোগী মুসলমান।
