“কাদের কথা বলছো তুমি? এসব লোক আমার প্রজা, আমি ইচ্ছা করলে। ওদের না খাইয়ে মারতে পারি, ইচ্ছা করলে তাদের প্রচুর সম্পদ দিয়ে প্রাচুর্য এনে দিতে পারি।” “অহংকারে মত্ত হয়ে যাবেন না মহারাজ! এরা সেই সব লোক, যারা সৃষ্টিকর্তার প্রিয়। আপনি সৃষ্টিকর্তার ক্ষোভকে ভয় করুন। তাদেরকে অন্যায় যুদ্ধে ঠেলে দেবেন না। কারণ এমনটা যেন না হয় যে, মহারাজের রাজ্য দুই অপরাধের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। প্রভু তার সৃষ্ট মানুষের আবেদন শুনেন। প্রভুর কাছে তার সৃষ্টির শান্তি নিরাপত্তা পছন্দনীয়। বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির ধর্ম। ইসলামও সাধারণ মানুষের ধর্ম, যে ধর্ম মানুষে মানুষে প্রেম ভালোবাসার শিক্ষা দেয়।” “হু, তুমি কি সেই ইসলামের কথা বলছে, যে ধর্মের লোকেরা আমাদের পল্লীগুলোকে উজার করার জন্যে এসেছে?”
“তারা আমার শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দিয়েছে। তারা শান্তি ও নিরাপত্তার জবাবে ভালোবাসা ও হৃদ্যতাই প্রদর্শন করে থাকে। আপনি
তাদের পক্ষ থেকে সদাচরণের আশা করতে পারেন না। কারণ আপনার আগে আপনার পিতা, পিতামহ আরবদের পরাজিত করার জন্য পারস্য সম্রাটকে সামরিক সহযোগিতা করেছিল। অথচ পারস্য শাসকরা হিন্দুস্তানের সিন্ধু ও মাকরান অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে সব সময়ই অস্থির করে রাখতে। সিন্ধু অধিবাসী কয়েক হাজার জাটকে পারস্য বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে গোলামে পরিণত করেছিল। পারস্য শাসকরা ছিল আপনার বংশের শত্রু। কিন্তু আপনার পিতামহ মুসলমানদের শত্রুতার কারণে পারস্য শাসকদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেছিল। সেই সাথে মাকরানের অধিবাসী মুসলমানদের সাথেও আপনার দাদা শত্রুতা শুরু করেন। তাদেরকে অস্থিতিশীল করার জন্য হিন্দু গোয়েন্দা ও লুটেরাদের সহযোগিতা দিতে শুরু করেন। আপনি নানা ভাবে আরব মুসলমানদের উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করেছেন। আরব শাসকদের সাথে বিদ্রোহ করে যেসব মুসলমান হিন্দুস্তানে পালিয়ে এসেছিল আপনার পিতা ও পিতামহ তাদেরকে এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়ে আরব শাসকদের সাথে শত্রুতাকে আরো শক্তিশালী করেন। বিদ্রোহীদেরকে আরব শাসকের বিরুদ্ধে সবসময়ই প্ররোচিত করেন। আপনার সময়ে আপনার অধীনস্থ লোকেরা আরবদের জাহাজ লুট করে তাদের মেয়ে শিশুসহ অধিবাসীদের কয়েদখানায় বন্দি করে রাখে। এতো সব করার পরও কি আপনার একথা বলা ঠিক যে, আরব সৈন্যরা আমাদের অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করতে এসেছে?
“হু, বুঝতে পেরেছি সুন্দর! তোমার ওপর মুসলমানদের ভূত সওয়ার হয়েছে।” বলল রাজা দাহির।
“মহারাজ বলছিলেন, আমি যেন নিরূনের শাসন ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে রাজধানীতে চলে আসি। এই সিদ্ধান্ত জনগণকে করতে দিন। আপনি যদি শক্তি প্রয়োগ করে আমাকে নিরূনের ক্ষমতাচ্যুত করেন, তাহলে নিরূনের অধিবাসীরা আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। জনগণ শান্তিতে বসবাস করতে চায়। এমনটাও হতে পারে যে, সৈন্যরাও জনতার কাতারে গিয়ে শামিল হবে।”
“রাজা দাহির সুন্দরীকে মুসলমানদের কর না দেয়ার জন্য সম্মত করাতে আপ্রাণ চেষ্টা করল এবং অনুরোধ করল, তিনি যেন মুসলমানদের আনুগত্য গ্রহণ না করেন। এক পর্যায়ে দাহির তার প্রধান উজির বুদ্ধিমানকে তলব করলেন।
“নিরূন শাসক সুন্দরী আজ রাতেই নিরূন ফিরে যাচ্ছে, তাকে সসম্মানে বিদায়ের ব্যবস্থা করো।
রাজার নির্দেশে উজির বুদ্ধিমান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাজা দাহির নিরূন শাসককে তার ভোজন কক্ষে নিয়ে গিয়ে খাবার টেবিলে বসে আলাপ চারিতায় দীর্ঘক্ষণ কাটিয়ে দিলো। খাবার সময় রাজা দাহির নিরূন শাসককে এ প্রস্তাবও দিলো সে যদি মুসলমানদের আনুগত্য করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তাকে নিরূনের স্বাধীন শাসক করে দেয়া হবে। কিন্তু সুন্দরী রাজার এ প্রস্তাব হাসি মুখে ফিরিয়ে দিলেন। ঠিক এ মুহূর্তে উজির বুদ্ধিমান ঘরে প্রবেশ করল।
রাজা দাহিরের দীর্ঘক্ষণ খাবার টেবিলে কালক্ষেপণের লক্ষ্য ছিল, সুন্দরীকে রাতেই বিদায় করে দিয়ে তার বিরুদ্ধাচরণের প্রতিশোধের ব্যবস্থা করা। সুন্দরী রাতেই ফিরে যাওয়ার কথা উত্থাপন করেন নি, কিন্তু রাজা আগ বাড়িয়ে তাকে সসম্মানে বিদায় করার মধ্যে উজির বুদ্ধিমানের সাথে আগের দিনের চক্রান্ত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত ছিল। “উজির কক্ষে প্রবেশ করেই জানতে চাইলো, সম্মানিত নিরূন শাসক কি যাত্রার জন্য প্রস্তুত?
“সুন্দরী জবাব দিলো, হ্যাঁ বুদ্ধিমান, আমি প্রস্তুত।” কিছুক্ষণ পর রাজ প্রাসাদ থেকে সুন্দরী তার মুখ ঢাকা ছয়জন নিরাপত্তা রক্ষীসহ বের হলেন। তাদের আগে রাজার নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল যাচ্ছিল। উজির বুদ্ধিমান অশ্বারোহণ করে নিন শাসকের পাশাপাশি যাচ্ছিল। সময়টা ছিল রাতের প্রথম প্রহর। চাঁদনী রাতের চাঁদের জ্যোত্সা স্নাত শান্ত নিবিড় প্রকৃতি। রাজা দাহির নিরূন শাসককে বিদায় করার জন্য তার একান্ত নিরাপত্তা রক্ষীদের একটি দলকে পাঠিয়েছিল।
“নীরবে অভিযাত্রী দল এগুচ্ছিল। রাতের নীরবতা ভাঙছিল অশ্বখুরের আওয়াজে। দুর্গ থেকে কয়েক মাইল অগ্রসর হওয়ার পর উজির বুদ্ধিমান নিরূন শাসককে থামতে অনুরোধ করল। সে হাতজোড় করে নিরূন শাসককে প্রণাম করে বিদায় আরজ করল। দাহিরের নিরাপত্তারক্ষীরা ডানে বামে সারিবেঁধে দাঁড়িয়ে গেল। নিরূন শাসকের ছয় নিরাপত্তারক্ষী তাদের মাঝ দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে অগ্রসর হলো। অতঃপর উজির বুদ্ধিমান নিরাপত্তারক্ষীদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজের ঘোড়া দুর্গের দিকে হাঁকালো। বুদ্ধিমানের পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে দাহিরের নিরাপত্তা রক্ষীরা অশ্ব ছুটালো।
