“তোমার বিবেক বুদ্ধি কি বলে? ওর সাথে কেমন আচরণ করা উচিত?” জিজ্ঞেস করল রাজা দাহির। আমার বিরুদ্ধাচরণ কখনো আমি বরদাশত করব না।”
“এ মুহূর্তে বিরুদ্ধাচরণ সহ্য করা উচিত মহারাজ। সে যদি আসে, তাহলে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ না করা ঠিক হবে যে, সে কেন আসতে বিলম্ব করল। তার সাথে আপনার এমন মনোভাব দেখানো উচিত, যেন সেও
আপনার মতোই একজন রাজা। কারণ আপনি তাকে বলতে চান সে যেন শত্রুদের সাথে হাত না মেলায়।”
হ্যাঁ, ঠিক বলেছ উজির। আমি তাকে ডেকে একথাই বলতে চাই।”
“আপনি তাকে একথাও বলে দিবেন, সে যেন, মুসলমানদেরকে আনুগত্যের প্রতারনায় ফেলে দেয়। শত্রুদের জন্য যেন শহরের দরজা খুলে দেয় এবং শহরে শত্রুদের স্বাগত জানায়। সকল শত্রু সৈন্য শহরে প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার সেনাদের নিয়ে শত্রুদের ওপর হামলা করে। দুর্গ হাতে পাওয়ার কারণে মুসলিম সৈন্যরা লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হতে চাইবে
সুন্দরীর যাতে শহরের বাসিন্দাদের বলে দেয়, প্রত্যেকেই যেন বাড়ীর ছাদে বড় বড় পাথর জমা করে রাখে। মুসলমান সৈন্যরা অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যখন দিক-বিদিক ছুটে অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়বে, তখন অধিবাসীরা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করবে।”
“সে যদি আমার প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে আমি কি করব?”
মহারাজ! আপনি কি বিষাক্ত নাগিনীকে ঘরে পুষতে চান? আগুন আর নাগকে নিয়ে খেলার পরিণতি আপনি জানেন। আগুন সময় মতো পানি দিয়ে নিভিয়ে ফেলতে হয় আর কালনাগের মাথা সময় মতো কেটে ফেলতে হয়।
রাজধানীতে হবে না মহারাজ! সে যখন ফিরে যেতে চাইবে পথেই সাপের মাথা কেট দেবো। আর প্রচার করবো, ওকে মুসলিম গুপ্ত ঘাতকরা হত্যা করেছে।
এ কাজটি রাজধানীতে করা ঠিক হবেনা, উজির। “তার সাথে তো নিরাপত্তা রক্ষী থাকতে পারে।”
“নিরাপত্তারক্ষী থাকুক। গোটা সেনাবাহিনীতো আর নিয়ে আসবে না। হয়তো বারোজন নিরাপত্তা রক্ষী থাকবে। ওদের কোন বিশ্রাম শিবিরে হামলা হবে। ওরা যখন তাঁবু ফেলে রাস্তায় ঘুমাবে তখন আমার লোকেরা ওদের হত্যা করবে। সে ব্যবস্থা আমি করবো মহারাজ। আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনি মনে করবেন এ ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না।” সেই সন্ধ্যায় সুন্দশ্রী উরুঢ় পৌছল। রাজা দাহিরের কাছে যখন সংবাদ পৌছল নিরূনের শাসক আসছেন, তখন সে তাকে অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে গেল। নিরূনের শাসকের সাথে ছিল মাত্র ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী। তার
আসবাবপত্র ছিল আটটি উটে বোঝাই করা। রাজা দাহির অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, সুন্দরীর নিরাপত্তারক্ষীরা এভাবে তাদের মাথায় পাগড়ী বেঁধেছে যে তাদের অর্ধেক চেহারাও ঢেকে গেছে। তাদের চোখগুলো শুধু নজরে পড়ছে।
এরা চেহারা ঢেকে রেখেছে কেন? দাহির সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করল।
“আমার কাছে এদের এভাবে পাগড়ী পরাটাই ভালো লাগে। এজন্য এভাবে পাগড়ী পরতে বলেছি। জবাব দিলো নিরূন শাসক। এভাবে পাগড়ী পরলে বেশী ভীতিপ্রদ মনে হয়। নিরাপত্তারক্ষীদের পোষাক এমন হওয়া উচিত যাতে তাদের দেখলে ভীতিপ্রদ মনে হয়।
“দাহির তার কথায় হেসে হালকা ভাবেই গ্রহণ করল। কারণ তার সামনে এর চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। তাই রাজা নিরূন শাসককে তার খাস কামরায় নিয়ে গেল।
“একথা কি সত্য যে তুমি মুসলমানদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছ।” দাহির জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, মহারাজ। কথা সম্পূর্ণ সত্য। “তুমি কি কর দিতেও সম্মতি দিয়েছ?”
“হ্যাঁ, মহারাজ। আমি যে শহরের অধিবাসীদের শাসক, তাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
“না সুন্দরী! এটা হতে পারে না। তুমি আমার মর্যাদা, সম্মান, তোমার ইজ্জত সম্মান আর শহরের অধিবাসী ও দেশের সম্মান শত্রুদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছ।” সেই সাথে খাজাঞ্চীখানার বিপুল সম্পদও শত্রুদের হাতে তুলে দিয়েছ। তুমি কি ভাবনি এরা বিধর্মী। আমাদেরকে গোলাম বাদী বানাতেই এরা আমাদের দেশে আক্রমণ করেছে?”
“মহারাজ! আমি একথাও ভেবেছি যে, এই বিধর্মীদেরকে আপনিই এদেশে ডেকে এনেছেন। এরা শুধু শুধু আমাদের দেশে সেনাভিযান চালায়নি।”
“সুন্দরী! তুমি আরবদের কোন দূত নও। তুমি আমার নিযুক্ত একটি অঞ্চলের শাসক। নিজের দেশের শাসকের মতো কথা বলো। তোমার তো উচিত নিজ দেশের জন্য লড়াই করে জীবন দেয়া।”
“আমার ধর্ম আমাকে লড়াই থেকে বিরত রেখেছে মহারাজ! তা ছাড়া আমরা নিজেরাই যেহেতু জালেম এমতাবস্থায় লড়াই করার শক্তি আমি পাইনি। মহারাজ কি বলবেন, নিজ দেশের গমনেচ্ছু আরবদের কোন্ অপরাধে কেন জেলখানায় বন্দি করে রেখেছেন?
“এদের সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। ওদেরকে হয়তো ওরা লুট করেছে, যাদের ওপর আমার কোন শাসন নিয়ন্ত্রণ নেই।”
“আরব বন্দিরা ডাভেলের বন্দিশালায় রয়েছে মহারাজ! এখনও সময় আছে আপনি আরব বন্দীদের মুক্ত করে দিন।”
“আমি তোমার নির্দেশ মানতে বাধ্য নই, বরং তোমার উচিত আমার নির্দেশ মেনে চলা।”
“আমি মহাত্মা বৌদ্ধের হুকুম মানতে বাধ্য মহারাজ!” “তাই যদি হয়, তাহলে তুমি নিরূন ছেড়ে রাজধানীতে এসে পড়ো।”
“তাহলে আপনি নিরূনবাসীদের বলুন, তারা যেন আমাকে বিদায় করে দেয়। নিরূনের একটি অবোধ শিশুও যদি বলে সুন্দরীকে এখান থেকে প্রত্যাহার করে নিন, তাহলে আমি আরব সাগরের ঢেউয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দেবো। আমাকে যদি মহারাজ ওখান থেকে সরাতে চান, তাহলে নিরূনের জনগণ আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।”
