হ্যাঁ, এর পর যা ঘটেছে সে খবর আমি শুনেছি। বলল রাজা দাহির। আচ্ছা, তুমি কি আরব সেনাপতিকে নিজ চোখে দেখেছ?
হ্যাঁ, মহারাজ। আমরা আগেই জেনে নিয়েছিলাম, আরব থেকে যে সেনাদল এসেছে সেই সেনাবাহিনীর সেনাপতি কে? তার নাম কি? তিনি কেমন লোক ইত্যাদি। আমার স্বামী আমাকে বলেছিল।
তার নাম কাসিম! অনুচ্চ শব্দে উচ্চারণ করল দাহির। তোমরা ভুল নাম শোননিতো? হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তো নয়?
না, মহারাজ! আমরা ঠিকই শুনেছি। এতে কোন সন্দেহ নেই মহারাজ! আরব সেনাপতির নাম মুহাম্মদ বিন কাসিম। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নয়!
মহারাজ! সে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নয় তবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাতিজা। বয়সে আমাদের চেয়েও ছোট।
“সে একেবারেই বালক মহারাজ।” বলল অপর তরুণী। কিন্তু দেখতে খুবই সুন্দর। তাকে দেখে মনেই হয় না সে সেনাপতি। কিন্তু তাঁর যেসব নিরাপত্তা রক্ষী এসেছিল, তারা কথায় কথায় “সালারে মুহতারাম” বলে। সম্বোধন করত। সেই আমাদেরকে আমাদের স্বামী ও হারেস আলাফীর হাতে নিহত হওয়া থেকে প্রাণ বাঁচিয়েছে। সেই তাদের সৈন্যদেরকে নির্দেশ দিয়েছিল, নিকটবর্তী কোন পল্লীতে ওদের দিয়ে এসো। তা থেকে তাঁর সেনাপতি হওয়ার বিষয়টি আরো সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে।”
রাজা দাহির অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ল।
শুনেছি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খুব বুদ্ধিমান লোক। কিন্তু বোকার মতো কাজ করেছে। সে এই বালকটিকে কেন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলো। সে মনে হয় এই
আত্মশ্লাগা অনুভব করতে চায় যে, অভিজ্ঞ সেনাপতিদের ব্যর্থতার পর অল্প বয়সী ভাতিজার হাতে বিজয় মাল্য পড়বে। আচ্ছা! রাণী বলল, সেই বালক সেনাপতি নাকি মহা রাজার কাছে বলার জন্য তোমাদের কাছে কি পয়গামও দিয়েছে?”
রাণীর এ কথায় তিন তরুণী পরস্পর চোখাচোখি করল। ওদের মনোভাব এমন যে, মহারাজার সামনে মুহাম্মদ বিন কাসিমের পয়গাম মুখে নিতে তারা ভয় পাচ্ছে এবং লজ্জাবোধ করছে। তারা সবাই মায়ারাণীর দিকে তাকাল। কি হলো, মহারাজকে বলো, আরব সেনাপতি মহারাজকে বলার জন্য কি পয়গাম দিয়েছে? বলল মায়ারাণী। “সে বলেছিল’ থমকে থমকে আড়ষ্ঠ কণ্ঠে বলল এক তরুণী। সে বলেছিল, লড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে হয়ে থাকে, আর লড়াই হয় পুরুষে পুরুষে, আপনি যেন নারীদেরকে যুদ্ধে ব্যবহার না করেন…। সে আরো বলেছে, আপন বোনকে স্ত্রী করে ঘরে রাখার শাস্তি তাকে ভোগ করতেই হবে। সে যেন কঠিন শাস্তির জন্য তৈরী থাকে।….
“ও, সে তো শুধু বালকই নয়, বহুত বড় কথা বলেছে?”
তরুণীদের বের করে দিয়ে রাজা দাহির মায়ারাণীকে বলল, এসব তরুণীদের ব্যাপারে এখন কি করা উচিত? “এরা এখন আর কোন হিন্দুর সংসার করার যোগ্য নয়” বলল মায়ারাণী। এরা মুসলমানের সাথে সংসার করে এসেছে। এদেরকে যে কোন মন্দিরে সেবিকা করে দেবো তাও সম্ভব নয়। আসার পর থেকেই আমি ওদের হাড়ি পাতিল আলাদা করে দিয়েছি। আমি এদেরকে আমার কাছেই রাখব। আমি ওদের পাঠিয়েছিলাম, আমি ওদের সাথে বেঈমানী করতে পারি না। কারণ ওরা আমার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে।
“একথা ভুলে যেয়ো না মায়া। এই অস্বতী মেয়েগুলো আমাদের দেশের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনবে। ওদেরকে বেশী দিন তোমার কাছে রাখা ঠিক হবে না।”
সেই রাত শেষে দিনের প্রত্যুষে রাজ দরবারে বসে রাজা দাহির মন্ত্রীকে ‘ জিজ্ঞেস করল, সেই বৌদ্ধ কি এখনো পৌছেনি? রাজা দাহির জিজ্ঞেস করছিল নিরূনের শাসক সুন্দরীর কথা।
নিরূনের শাসক ছিল বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তার নাম ছিল সুন্দরী। রাজা দাহির গোপনসূত্রে জানতে পেরেছিল সুন্দরী আরবদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু এনিয়ে সে শাসক সুন্দরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। কারণ এতে বিভিন্ন রাজ্যে গোলযোগ দেখা দিতে পারে। দাহিরের প্রতি অসন্তুষ্ট শাসকরা একের পর এক বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। সাধারণত হিন্দুস্থানে এমন হয় না। কিন্তু বিলাসী ও আরাম প্রিয় শাসকরা বিদেশী আক্রমণে ভীত হয়ে লড়াই না করে আগাম বশ্যতা স্বীকার করে নেয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল। দাহির ছিল যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও কপট। বিদেশী আক্রমণ মুহূর্তে সে কোন সামন্ত শাসকের ওপর অত্যাচার চালানোর পক্ষপাতি ছিলনা। এতে রাজধানী থেকে বহু দূরে অবস্থিত কোন রাজ্যের শাসককে বাগে রাখার বিষয়টি যথেষ্ট কঠিন হয়ে যেত। দাহিরের বিশ্বাস ছিল, পূর্ববর্তী দুই আরব বাহিনীর মতোই তার সৈন্যরা মুহাম্মদ বিন কাসিমের বাহিনীকেও ডাভেল অতিক্রমের সুযোগ দেবে না। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি ভিন্নতর হয়ে উঠল। এ কারণে সে সুন্দরীকে উরুঢ় ডেকে পাঠিয়েছিল। কথা মতো সেদিন থেকে দুই তিন দিন আগেই সুন্দরীর উরুঢ় পৌছে যাওয়ার কথা কিন্তু অতিরিক্ত তিনদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও নিরূনের শাসক সুন্দরীর দেখা পাওয়া গেল না। সুন্দরীর অবস্থা দৃষ্টে রাজা দাহিরের দূত মারফত খবর পাওয়ার পরও তা তামিল করা জরুরী মনে করেনি। এদিকে নিরূনের শাসকের অনুপস্থিতিতে রাজা দাহির দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সে তার উজির বুদ্ধিমানকে ডেকে পাঠালো।
“উজির! বৌদ্ধতো এখনো এলো না। এতে কি মনে হয় না সে আরবদের সাথে হাত মিলিয়েছে?”
“শত্রুদের সাথে হাত মিলাক বা না মিলাক। তবে সে যে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। ..তবে চিন্তার কারণ নেই মহারাজ। সে অবশ্যই আসবে।”
