এ তিন শয়তানীর ভাগ্যের সিদ্ধান্ত আমাদের সর্দার দেবেন? চিৎকার করে বলল এক তরুণির স্বামী।
“হ্যাঁ, এদের সবাইকে হত্যা করে ফেলো” বললেন আলাফী।
হত্যার কথা শুনে তরুণী তিনজন চিঙ্কার শুরু করে দিলো। তারা বলতে লাগল, এ কাজ তারা নিজেদের ইচ্ছায় করেনি। মায়ারাণী ও উজির বুদ্ধিমানের চক্রান্তে পড়ে করেছে। তারা কান্নাকাটি করে জীবন ভিক্ষা চাইলো। কিন্তু আলাফী আবারো ঘোষণা করলেন, না এদের ক্ষমা করা হবে না।”
“থামো আলাফী, বজ্র নির্ঘোষ আওয়াজে বললেন, সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম। এতক্ষণ পর্যন্তই তিনি এক পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফীর গোয়েন্দ তৎপরতা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি আলাফীর উদ্দেশে বললেন
“এদের নিরপরাধ মনে করো। রাজা দাহিরকে আমি একটি পয়গাম পাঠাতে চাই।” তিনি তরুণীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদেরকে আমার সৈন্যরা রাজধানীর পথে কোন বসতিতে রেখে আসবে। তোমরা রাজধানীতে
গিয়ে রাজা দাহির ও উজির বুদ্ধিমানকে বলবে, যুদ্ধ রণাঙ্গনে পুরুষে পুরুষে হয়ে থাকে, নারীকে যুদ্ধে ব্যবহার করা কোন বাহাদুরী নয়। যারা নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে যুদ্ধ জিততে চেষ্টা করে, তারা কাপুরুষ, তারা রণাঙ্গনে মোকাবেলা করার যোগ্যতা রাখে না। রাজাকে বলল, আপন বোনকে স্ত্রী বানিয়ে রাখার মতো অপরাধীর অপরাধের পরিমাণ অনেক হয়ে গেছে। তাকে তার কৃত অপরাধের শাস্তি ভোগ করতেই হবে। এজন্য সে যেন প্রস্তুত থাকে।”
মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রাণ ভরে আল্লাহর শোকর আদায় করে চৌকির কমান্ডারকে নির্দেশ দিলেন, এদেরকে ভিন্ন ভিন্ন ঘোড়র ওপরে বসিয়ে দু’জন সিপাহী দিয়ে রাজধানীর পথের কোন বসতিতে দায়িত্ববান কোন ব্যক্তির কাছে দিয়ে এসো। যাতে এদেরকে রাজধানীতে পৌছে দিতে পারে। সেই সময় মহাভারতের হিন্দুদের কূটকৌশল ছিল বিশ্বখ্যাত। তখন ভারতে মন্দির ও ব্রাহ্মণদের রাম রাজত্ব। মন্দিরগুলোই পরোক্ষভাবে দেশ শাসন করে এবং রাজাদের ওপর রাজত্ব করে। তখন মন্দিরগুলো ছিল রাজনীতি ও কূটনীতির আখড়া। এরা যে কোন শত্রুতায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতো নারী অস্ত্র। পক্ষান্তরে মুসলমান সংস্কৃতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিরোধী। মুসলমানরা নারীর সম্মান ও ইজ্জতকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস বলেই বিশ্বাস করতো। ফলে পরস্পর এই দুটি চেতনা ও সংস্কৃতির মধ্যে যখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন জন্ম নেয় বহু বিস্ময় সৃষ্টিকারী ঘটনা। যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে এবং আজো পাঠককে করে শিহরিত।
ডাভেলের চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরুর আগে এ ঘটনায় বিন কাসিম আন্দাজ করতে পারলেন, তার প্রতিপক্ষ তাকে কতোভাবে আঘাতের ব্যবস্থা নিয়েছে।
বিন কাসিম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চৌকি থেকে আরমান ভিলায় ফিরে গেলেন এবং পরদিনই ডাভেলের দিকে রওয়ানা হলেন।
০৫. মেঘের গর্জনের মতো
মেঘের গর্জনের মতো বজ্র কণ্ঠে তকবীর ধ্বনীতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে এগিয়ে চলল বিন কাসিমের কাফেলা। “ঐ বুদ্ধটা কি এখনো এসে পৌছেনি?” ক্ষোভ ও হতাশা মিশ্রিত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল রাজা দাহির।
“হয়তো আসছে মহারাজ!” জবাব দিলো মন্ত্রী। “নিরূন তো এতোটা দূর নয় যে, তিন দিনেও সে পৌছতে পারবে না। হয়তো আরবদের আনুগত্য স্বীকার করে আমরা যে ওকে প্রশাসক নিযুক্ত করে কিছু দায়িত্বভার দিয়েছি সেকথা ভুলে গেছে। ওকি জানে না, প্রশাসকের পদ যে কোন সময় আমরা ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারি।” বলল রাজা দাহির। দাহিরের কাছে আগেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল আরব থেকে এবার বিপুল সংখ্যক সৈন্য বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছে। তার কাছে এখবরও পৌছে গিয়েছিল কন্নৌজ ও আরমান ভিলা আরবরা দখল করে নিয়েছে। গত রাতে মায়ারাণী তাকে খবর দিয়েছিল তার নিয়োগকৃত তিন তরুণী ফিরে এসেছে এবং তার পরিকল্পনা বেকার হয়ে গেছে।
মায়ারাণীর প্রেরিত তরুণীদেরকে মুহাম্মদ বিন কাসিম হত্যা না করে সসম্মানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বিন কাসিমের সৈন্যরা যে পল্লীতে তরুণীদের রেখে গিয়েছিল পল্লীবাসীদের ওরা বলেছিল, তারা রাজার নিজস্ব লোক, তাদেরকে যেন খুব তাড়াতাড়ি রাজধানীতে পৌছার ব্যবস্থা করা হয়। দ্রুতগামী উটের ওপর বসিয়ে বারজন লোকের প্রহরাধীন দুই হিন্দু তরুণীকে উরুর পৌছানোর ব্যবস্থা করল গ্রামবাসী। গত রাতেই তরুণীদ্বয় রাজধানীতে পৌছে গিয়েছিল। মায়ারাণী রাতেই রাজা দাহিরের কাছে তাদের পৌছে দিয়েছিল। রাজা দাহির নিজে তরুণীদের কাছ থেকে তাদের চক্রান্ত ভণ্ডুল
হওয়ার কাহিনী শুনেছিল। রাজা দাহিরকে এক তরুণী বলল, “আমরা নিরপরাধ মহারাজ! আমরা আমাদের পরিকল্পনা মতোই কাজ করেছিলাম কিন্তু আমাদের জানা ছিল না আরবের লোকেরা মাটির নীচের খবরও বেমালুম জেনে নিতে পারে। আমরা ভেবেছিলাম মাকরানের আরব অধিবাসীরা যেভাবে আরব সৈন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠেছিল, তারা আরব চৌকির সৈন্যদের ওপর হামলে পড়বে। আর তাতে আরব সৈন্যদের সাথে তাদের শত্রুতা সৃষ্টি হবে এবং সর্দার আলাফী তার দলবল নিয়ে মহারাজের সাথে সাক্ষাৎ করবে কিন্তু হঠাৎ আরব সেনাপতি সেখানে উপস্থিত হলো। তার সাথে বহু লোকজনও ছিল।
