শাবান আলাফী ও তিন তরুণির স্বামীকে তার কাছে ডেকে আনলেন এবং বললেন, এই চার সিপাহী গতকাল বিকেলে টহল কাজে নিয়োজিত ছিল। যাদেরকে তোমরা এখানে দেখছে। আর তোমাদের তরুণিরা যাদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করেছে, এরা তখন চৌকিতে অবস্থান করছিল। শাবান তিন তরুণীকে ডেকে এনে তাদের স্বামীদের সাথে দাঁড় করালো।
অতঃপর সমবেত সবার উদ্দেশে শা’বান ছাকাফী বললেন, বন্ধুগণ! এ তিন তরুণী ভিন্ন ভিন্ন জায়গার কথা বলেছে। তোমরা মরু ভূমিতে জন্ম নিয়েছ এবং মরুতেই বড় হয়েছ। তোমরা জানো, মরুর ধুলিকণাও কথা বলে। চৌকির সৈনিক ঘোড়ায় সওয়ার ছিল। যে জায়গায় আক্রান্ত হওয়ার কথা এই তরুণিরা বলেছে, এই জায়গায় চারটি ঘোড়ার কোন চিহ্ন আছে কি
আমাকে দেখিয়ে দাও। ঘটনাটি গত সন্ধ্যার। এরপর না কোন মরুঝড় হয়েছে, না বৃষ্টি হয়েছে। এই তরুণী আমাকে জানিয়েছে তাকে মাটিতে ফেলে সম্ভ্রম হরণ করেছে। আমার সাথে তোমরা এসো এবং সেই জায়গাটি একটু দেখে নাও। শাবান তাদেরকে তরুণির দেখানো জায়গায় নিয়ে গিয়ে বললেন, দেখাও তো এখানে এমন কোন চিহ্ন খুঁজে পাও কি-না? প্রিয় স্বদেশী বন্ধুরা! আশ্রিত আরব বস্তিবাসীদের উদ্দেশে বললেন শাবান। এই তরুণিরা ভিন্ন ভিন্ন তিনটি জায়গার কথা বলেছে। তোমরা একটু চিন্তা করে দেখো, তাদের ভাষায় সৈনিকরা ছিল অশ্বারোহী। অশ্বারোহী সৈনিকদের কাছ থেকে এই তরুণী দু’জন পালিয়ে গেল? এরা কি ঘোড়ার চেয়ে বেশী দৌড়াতে পারে? আর তিন তরুণী সেখানে আক্রমণকারী হিসাবে যাদের চিহ্নিত করেছে, তাদের কেউই সেখানে যায়নি। যারা তখন ডিউটিতে ছিল এরা তোমাদের সামনে দাঁড়ানো। শাবান তরুণীদের উপস্থিতিতে সিন্ধী ভাষায় তরুণীদের বর্ণনা শোনালেন এবং বললেন, তোমরা তাদের জিজ্ঞেস করে দেখো, তারা কি একথা বলেনি?” সম্মানিত হারেস আলাফী! বললেন ছাকাফী। বনী ছাকীফের রক্তে এখনো কোন মিশ্রণ ঘটেনি। বনী উসামা যদি গোত্রীয় শত্রুতা ভুলে বন্ধুত্বের জন্য হাত বাড়ায়, তাহলে বনী ছাকীফের সেনাপতি জীবন দিয়ে বন্ধুত্বের হক আদায় করবে। তোমরা এ ঘটনার ব্যাপারে কেন একটু চিন্তা করোনি, এই তরুণিরা কিছুদিন আগেও ছিল পৌত্তলিক ঘরের সন্তান। এরা শৈশব থেকে মূর্তিকে পূজা করে করে বড় হয়েছে। এরপর যৌবনে তিন আরব তরুণ এদের কাছে ভালো লাগায় এরা তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাদের রক্তে রয়েছে পৌত্তলিক মানসিকতা। পৌত্তলিক এক প্রকার
মিথ্যাচারিতা। এরা যদি আরব বংশোদ্ভূত হতো, তাহলে আমি এতোকিছু করতাম না। শুধু জিজ্ঞেস করতাম, বলল, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা? আমি নিশ্চিত, তোমাদের ও আমাদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টির জন্য এটা একটা চক্রান্ত। আলাফী এতটা উঁচু চিন্তার অধিকারী ছিলেন না, তাছাড়া দীর্ঘদিন এখানে থাকার কারণে মাকরান ও হিন্দু অঞ্চলের চিন্তা চেতনা তার আরব সাথীদের মধ্যে কিছুটা প্রভাব সৃষ্টি করেছিল।
ছাকাফী বললেন, তোমরা দেশে থাকতে বিদ্রোহ করেছিলে। আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি তোমাদের বিদ্রোহ ছিল সঠিক। কিন্তু আজ তোমাদের সেই সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা কোথায় গেল?…তোমরা সবাই বিশেষ করে এদের স্বামীরা যদি আমাকে অনুমতি দাও, তাহলে এ ঘটনার পিছনে লুকিয়ে থাকা সত্য ও মিথ্যাকে আমি আলাদা করে দেখিয়ে দেবো।
হঠাৎ কথিত সম্ভ্রমহানির শিকার হওয়া তরুণির স্বামী তরুণির ওপর হামলে পড়লো। চিতাবাঘ যেভাবে শিকারের ওপর হামলে পড়ে ঠিক সেভাবে তরুণির চুল ধরে ওকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে মাটির ওপর আঁচড়ে ফেলল তার স্বামী। তরুণী চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। স্বামী ওর বুকে পা রেখে ওর গলার উপরে তরবারী ঠেকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “বাঁচতে চাস তো সত্য কথা বল হিন্দুর বাচ্চা!” অপর দিকে আলাফী নিজে তরবারী বের করে অপর দুই তরুণির মুখোমুখী দাঁড়িয়ে বললেন, বাঁচতে চাস্ তো সত্য কথা বল। অতঃপর সবার দিকে সম্বোধন করে আলাফী বললেন, “এদের চুলের সাথে রশি বেঁধে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে দাও।”
একথা শোনার পর এক তরুণির মুখে উচ্চারিত হলো ভয়ার্ত আর্তনাদ। “না, আমি এভাবে মরতে চাই না! তোমরা যদি সত্য কথা শুনতে চাও, তবে শোনো।” অপর দিকে যে তরুণির গলায় তার স্বামী তরবারী ধরে রেখেছিল সেও সত্য কথা বলার জন্য সম্মত হলো। অবশেষে তিন তরুণির বক্তব্যে যা বেরিয়ে এলো এর সার কথা হলো, এদের তিনজনকে রাজা দাহিরের বোন ও স্ত্রী মায়ারাণী ফুসলিয়ে রাজী করায়
যে, এরা তিন আরব যুবককে বিয়ে করে যেন এদের ওপর যাদুকরী প্রভাব সৃষ্টি করে। মায়ারাণী এ কাজ করেছিল, হাজ্জাজের পাঠানো দ্বিতীয় সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েলের মৃত্যুর পর। মুহাম্মদ বিন কাসিম মাকরানে আসার পর রাজা দাহিরের উজির বুদ্ধিমান তাকে পরামর্শ দিয়েছিল, রণ ক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক চালে মুসলমানদের দুর্বল করার জন্য এ দায়িত্ব উজির বুদ্ধিমান নিজের কাঁধে নিয়েছিল।
বুদ্ধিমানের জানা ছিল, মায়ারাণী এ অস্ত্র প্রয়োগের হাতিয়ার অনেক পূর্বেই প্রয়োগ করে রেখেছে। অতঃপর বুদ্ধিমান মায়ার সাথে যোগাযোগ করে এটিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিলো। নারী গোয়েন্দা পাঠিয়ে এই তরুণী তিনজনকে পরামর্শ দিলো, “আলাফী ও আরব আশ্রিতা শত্রুদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেছে। অতএব এদের মাঝে যে করেই হোক কঠিন শত্রুতার জন্ম দিতে হবে। বসতির পাশে বিন কাসিমের সেনা চৌকি স্থাপিত হলে এ তিন তরুণীকে ব্যবহার করে দু’পক্ষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। কারণ আরবরা নারীর সম্ভ্রমহানির অপরাধকে কখনও ক্ষমা করে না। নারীর ইজ্জত রক্ষায় অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। সেই সাথে নারীর অসম্মানকারীকে আরব মুসলমানরা প্রচণ্ড ঘৃণা করে।
