আরো একমাস বিন কাসিম কন্নৌজ দুর্গ অবরোধ করে রাখলেন। এক পর্যায়ে দেখা গেল দুর্গপ্রাচীর থেকে আগে যে মাত্রায় তীর বৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হতো, তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। একদিন খুব সকালে মুসলিম বাহিনী খুব দ্রুততার সাথে আগের রাতের বিন কাসিমের দেয়া নির্দেশ পালনে ব্যস্ত হয়ে গেল। তারা দুর্গফটকের কাছেই অশ্বারোহণ করে পূর্ণ প্রস্তুতিতে রইলো, যাতে দুর্গ থেকে কোন সৈন্য বের হলেই ওদের তাড়া করা যায়। ওদিকে মিনজানিক গুলোকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো এবং মিনজানিক গুলোর নিরাপত্তার জন্য মিনজানিকের আগে বসানো হলো তীরন্দাজ ইউনিট। সূর্য ওঠার আগেই শুরু হলো দুর্গের ভিতরে পাথর নিক্ষেপ। মিনজানিক এগিয়ে আনার কারণে মিনজানিক থেকে নিক্ষিপ্ত পাথর এখন সরাসরি দুর্গের ভিতরে আঘাত হানতে শুরু করল। প্রধান ফটক পেরিয়ে হিন্দু তীরন্দাজরা
মিনজানিক চালকদের বেকার করে দেয়ার চেষ্টা করতেই অশ্বারোহী বাহিনীর তাড়া খেয়ে আবার দুর্গের ভিতরে চলে গেল। দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে মিনজানিক চালকদের উদ্দেশ্যে তীর নিক্ষেপ শুরু হলেও ওদের জবাবে মুসলিম তীরন্দাজরা ওদের দিকে তীর বৃষ্টি বর্ষণ করতে শুরু করল। এর ফলে হিন্দুরা আর মিনজানিককে বাধা দিতে পারল না।
মিনজানিকগুলো অবিরাম দুর্গপ্রাচীরের ওপর দিয়ে দুর্গের অভ্যন্তরে পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, এমনিতেই তখন দুর্গের ভিতরে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। পানির জন্য মানুষ ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল। এর ওপর টানা কয়েক দিনের অবিরাম পাথর নিক্ষেপের ফলে দুর্গের অনেক ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গেল, শীলা বৃষ্টির মতো নিক্ষিপ্ত হতে লাগল পাথর।
এমতাবস্থায় পাঁচদিন চলার পর দুর্গবাসীরা পরাজয় মেনে নিয়ে সাদা পতাকা উড়িয়ে দেয়ার জন্য সেনাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগল। দিন। যেতে না যেতেই দুর্গের ভিতরে দেখা দিলে সেনাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ। সেনাবাহিনীও ততোদিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় দুর্গশাসককে না জানিয়েই কিছু সৈনিক ও সাধারণ প্রজা মিলে দুর্গের প্রধান ফটকের ওপরে সাদা পতাকা উড়িয়ে দিলো এবং ফটক খুলে দিলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সৈন্যরা বিজয়ী বেশে দুর্গে প্রবেশ করল। বিন কাসিম দুর্গশাসককে নির্দেশ দিলেন, “যা কর নির্ধারণ করা হবে, নাগরিকদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করে যথাশীঘ্র বিজয়ী বাহিনীর হাতে পৌছাতে হবে।”
দুর্গের সকল সৈন্য ও পুরুষকে যুদ্ধবন্দি করা হলো এবং দুর্গ সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে ওখানে কিছু সৈন্য রেখে একজনকে দুর্গের শাসক নিযুক্ত করে বিন কাসিম তার সৈন্যদের সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
কন্নৌজের পরবর্তী শহর ছিল আরমান ভিলা। এবার মুহাম্মদ বিন কাসিম সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক যুদ্ধের প্রতিও মনোযোগী হলেন। তিনি কন্নৌজের কয়েকজন বন্দিকে মুক্তি দিয়ে আরমান ভিলায় পাঠিয়ে দিলেন। তাদের নির্দেশ দিলেন, “তোমরা আরমান ভিলায় গিয়ে বলবে, মুসলিম
বাহিনী আসছে, তোমরা কিছুতেই দুর্গ রক্ষা করতে পারবে না। দুর্গ বাঁচানোর চেষ্টা করলে আরো বেশী ক্ষগ্রিস্ত হবে।” মুহাম্মদ বিন কাসিমের নির্দেশে কন্নৌজের কিছু বাসিন্দা মুসলিম বাহিনী আরমান ভিলায় পৌছার আগে ওখানে গিয়ে ভীতিকর খবর ছড়িয়ে দিলো। ওরা বলল, “মুসলিম বাহিনী ভয়ানক শক্তিশালী। ওরা জিনের মতো শহরে বড় বড় পাথর দিয়ে ঢিল ছুড়ে ওদের সাথে কুলিয়ে ওঠা কোন মানুষের সাধ্য নেই। তবে এরা যতোটা ভয়ানক ততোটা হিংস্র নয়। আচার ব্যবহারে খুবই মায়াবী। তারা সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে কর নেয়ার বিনিময়ে জান-মাল ও ইজ্জত আক্রর নিরাপত্তা দেয়। কারো ব্যক্তিগত সম্পদ ও ইজ্জত সম্মানে আঘাত করে না। মানুষকে খুবই ইজ্জত করে। এরা বিজয়ী হলেও শহরে লুটতরাজ করে না।”
এর ফলে মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন দুর্গপ্রাচীরে ঘেরা দুর্গম শহর আরমান ভিলা অবরোধ করলেন, তখন দুর্গরক্ষীরা খুবই সামান্য প্রতিরোধ চেষ্টা করল বটে, কিন্তু এই প্রতিরোধ জোরালো ছিল না। বস্তুতঃ কয়েকদিন অবরোধ করে রেখে মিনজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করলেই দুর্গবাসীরা ফটক খুলে দিল। সহজেই এই দুর্গও বিন কাসিমের দখলে চলে এলো। . মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর সেনা বাহিনীকে শক্তিক্ষয় থেকে রক্ষা করে কঠিন যুদ্ধের মোকাবেলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন। আরমান ভিলা ছিল সেনাদের বিশ্রামের খুবই উপযোগী; তাই কিছুদিন এখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। অবশ্য আরমান ভিলায় অবস্থানের অপর কারণ মাকরান শাসক মুহাম্মদ বিন হারুণের অসুখ বৃদ্ধি। সামরিক চিকিৎসকগণ শত চেষ্টা করেও মাকরান শাসকের জ্বর কমাতে পারছিলেন না। অবশেষে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আরমান ভিলাতেই তাকে দাফন করা হয়।
বর্তমানের বিখ্যাত হায়দারাবাদ শহর তখন ছিল নিক্সন নামে খ্যাত। রাসুল সাঃ-এর হিজরত ও নবুয়তের মাঝামাঝি সময়ে এই নিরূন শহরের গোড়া পত্তন হয়। পরবর্তীতে মোগল বিজয়ীরা নিরূনের নামকরণ করেন হায়দারাবাদ। কারণ হায়দারকুলী খান এটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন।
মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন কন্নৌজ জয় করেন, তখন নিরূনে একদল হিন্দু প্রবেশ করল। গায়ে তাদের গেরুয়া বর্ণের আলখেল্লা। এলোমেলো
